ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আবারও বাড়ছে ঘরমুখো মানুষের ঢল। এমন পরিস্থিতিতে মহাসড়কে অতিরিক্ত ভীড় নিয়ন্ত্রণ, চালকদের ক্লান্তি কমানো এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই যানবাহন, অনিরাপদ চালনা এবং পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর টেকসই ও সমন্বিত সমাধান প্রয়োজন। বিশেষ করে বড় ছুটির সময়ে এসব ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, ‘দুর্ঘটনার কারণগুলো আমাদের সবারই জানা। তারপরও কার্যকর প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।’
প্রতিটি বড় ছুটিতে কোটি মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে গন্তব্যে ছোটেন বলে পরিবহন নেটওয়ার্কের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। এসময় যানবাহনে ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী ওঠে এবং চালকরা টানা পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মহাসড়কে অনুমোদনহীন যান চলাচল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. মাহবুব তালুকদার। যথাযথ অনুমোদন ও প্রশিক্ষিত চালক ছাড়াই দূরপাল্লার রুটে চলাচলকারী সিটি বাসগুলো তার মধ্যে অন্যতম।
নসিমন ও করিমনের মতো স্থানীয়ভাবে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনকে প্রধান সড়ক থেকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
এই সড়ক বিশেষজ্ঞের মতে, ঈদযাত্রার সময় অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন যেন মহাসড়কে চলতে না পারে, সেটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, দেশের সড়ক অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশপাশি দক্ষ চালক তৈরি, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নজরদারি জোরদারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
এ বছর সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের একটি হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি।
তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক তরুণ চালক লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়া দীর্ঘপথে মোটরসাইকেলে যাতায়াত করছেন। অথচ প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার বড় অংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট।
অধ্যাপক মাহবুব আলম সতর্ক করে আরও বলেন, যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ছুটির মৌসুমে বাণিজ্যিক যানবাহনের চালকদের একটানা ও দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালাতে হয়। এতে তাদের ক্লান্তি বাড়ে এবং সড়ক নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে।
তার ভাষায়, ‘এ অবস্থায় ক্লান্তি, অতিরিক্ত গতি কিংবা অনিরাপদ গাড়ি চালনা এড়ানো অনেকটাই অসম্ভব হয়ে ওঠে।’
এজন্যই তিনি নির্ধারিত ঈদ রুটে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার গতিসীমা আরোপসহ কঠোর গতি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
পাশাপাশি সড়কের নকশা, যানজটের ধরন ও জনঘনত্ব বিবেচনায় বৈজ্ঞানিক ট্রাফিক পরিকল্পনার ওপরও জোর দেন।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ঈদের সময়ে অনিরাপদ বাণিজ্যিক পরিবহনের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস এবং প্রশিক্ষিত চালকসহ সব ধরনের সরকারি গণপরিবহন এখনই কাজে লাগানো উচিত।
প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিবহন, স্থানীয় সরকার, বাণিজ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান অধ্যাপক তালুকদার।
তার মতে, ঈদের সময় বিপুল পরিমাণ যানবাহনের চাপ শুধু পুলিশের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রমে এনজিওগুলোর প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়োজিত করার পরামর্শ দেন।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর মহাসচিব লিটন আরশাদও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, ঈদযাত্রার ঘরমুখী মানুষের ঢলে সমন্বয় ও বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
মহাসড়কগুলোতে বিপুল যানচলাচল সামলাতে হাইওয়ে পুলিশের বাড়তি জনবল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার।
আরশাদ বলেন, ছুটির মৌসুমে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন অপরিহার্য। অথচ ঈদের সময় ফিটনেসবিহীন যানবাহন প্রকাশ্যেই চলাচল করে। আবার বাড়তি উপার্জনের আশায় অনেক চালক কোনো বিশ্রাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান।
তিনি বলেন, পেশাদার চালক প্রশিক্ষণ ও কঠোর গতিনিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহুদিন ধরে সুপারিশ থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।
দূরপাল্লার যাত্রায় মোটরসাইকেল এমনকি ট্রাক ব্যবহারের প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলছেন নিরাপদ সড়ক চাই-এর মহাসচিব।
আরশাদের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট প্রাণহানির ৫১ থেকে ৫৩ শতাংশের ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেলই দায়ী।
অবকাঠামোর বিপজ্জনক ত্রুটির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নকশা না থাকায় অনেক স্থানে ফিডার রোড সরাসরি মহাসড়কে মিশেছে। এসব স্থানে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে আরশাদ বলেন, মৃত্যুহার কমাতে সঠিক ‘ব্যবস্থাপনা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ঈদের অতিরিক্ত যাত্রাচাপ সামাল দিতে বিআরটিসিসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত চালকদের সাময়িকভাবে বেসরকারি পরিবহন খাতে নিয়োগ দেওয়ারও প্রস্তাব দেন।
একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করে যথাযথ আইন প্রণয়নেরও পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের টেকসই অঙ্গীকার ও সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘পরিবহন খাতে প্রভাব ও নিয়মভঙ্গের সংস্কৃতি সড়ক নিরাপত্তা প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।’
গত তিন বছরের তথ্য বলছে, শুধু ঈদ মৌসুমেই ৪শ’ থেকে ৫শ’ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতেই স্পষ্ট হয়, শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও সমন্বিত পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
এ পরিস্থিতিতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ঈদযাত্রায় যানজট কমাতে ও নিয়ম বাস্তবায়নে ঢাকাজুড়ে ৬৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, যাত্রীদের যত্রতত্র ওঠানামা বন্ধে পরিবহন মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কে মোতায়েন থাকবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, গোয়েন্দা সদস্য ও হাইওয়ে পুলিশ সদস্যরা।
ভ্রমণের চাপ কমাতে সরকার পোশাক কারখানা মালিকদেরও তিনদিনে পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ঈদুল ফিতরের যাত্রাকালে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩৫১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, শুধু মার্চ মাসেই সারা দেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত এবং ২ হাজার ২২১ জন আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
জাতিসংঘ সদর দফতরে সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি ইতিবাচক পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ও বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে আয়োজিত ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে অংশ নিয়ে তিনি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা, কূটনীতির ভাষা, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার প্রভাব তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে শব্দের প্রকৃত অর্থ প্রায়ই হারিয়ে যায়। যে কারণে যুদ্ধ ও শান্তির মতো মৌলিক ধারণার মধ্যে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশন শব্দের স্পষ্টতা ও প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের সাধারণ মানুষের বড় আকাঙ্ক্ষা এখন এই অধিবেশনের দিকে নিবদ্ধ। ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপট টেনে তিনি জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচি দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে উন্নত বিশ্বেও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। ২০০৮ সালে নিউ ইয়র্কে মাত্র ৫০০ ডলারের সর্বোচ্চ সীমা দিয়ে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম আজ ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ বিতরণ করেছে, যার পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ। হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও এই কাঠামোর আওতায় এনে সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে আমানত গ্রহণ বা সঞ্চয় ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান কিছু আইনি বাধার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসার তাৎপর্য তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে সুখ দিতে পারে, তবে অন্যের জীবনকে ইতিবাচকভাবে স্পর্শ করতে পারাটা পরম আনন্দের। সামাজিক ব্যবসা মুনাফাকেন্দ্রিক না হয়ে মানুষের সমস্যা সমাধানে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে এ মডেলের আওতায় ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে এবং গ্রামীণ ফোনের সুবিধার মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে সেবা পাচ্ছেন। পাশাপাশি চক্ষু হাসপাতালের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যা নিজেদের উদ্বৃত্ত আয় থেকেই নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণে সক্ষম। তরুণদের উদ্দেশে তিনি জানান, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে মূলত চাকরিপ্রত্যাশী বানিয়ে তোলে, অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা। এই ধারণা বাস্তবায়নে আগামী ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের শুধু সনদের পেছনে না ছুটে সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। তিনি সবাইকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নেট কার্বন নিঃসরণমুক্ত পৃথিবী গড়তে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, রেললাইন অবরোধ ও স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্টেশনে আইয়ুব আলী নামের ওই শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আহত অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, চাচাকে স্টেশন থেকে নিতে সেখানে গিয়েছিলেন আইয়ুব আলী। এ সময় ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত রেলওয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আইয়ুব ওই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বললে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার প্রতিবাদে রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এতে ঢাকাগামী আন্তনগর ধূমকেতু এক্সপ্রেসের নির্ধারিত যাত্রা ব্যাহত হয়। ট্রেনটি রাত ১১টা ২০ মিনিটে রাজশাহী স্টেশন থেকে ছাড়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে যাত্রা শুরু করতে পারেনি। পরে শিক্ষার্থীরা স্টেশনের দিকে এগিয়ে গিয়ে কয়েক দফায় ভাঙচুর করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, স্টেশনের জানালার কাচ, চেয়ার, ডাস্টবিন, দোকানপাট, সাইনবোর্ড ও কয়েকটি কার্যালয়ের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস ও নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়েও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। এদিকে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্য—মো. আরিফ হোসেন, মো. রোকন উদ্দীন, মো. শফিকুল ইসলাম ও মো. শাহাদত হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রোববার রাজশাহী রেলওয়ের চিফ কমান্ড্যান্ট মোহা. আশাবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দপ্তরাদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশে বলা হয়েছে, ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পূরণের আশ্বাস দিয়ে আলোচনা করার পর পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হয়। পরে শিক্ষার্থীরা স্টেশন ছেড়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যান। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাপরিচালক আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানো হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আহ্বান জানান। চার আরএনবি সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রকৃত কারণ, ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং স্টেশনে ভাঙচুর ও রেললাইন অবরোধে কারা অংশ নিয়েছেন—এসব বিষয় তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
সরকারি চাকুরেদের বেতন দ্বিগুণ ও এরও বেশি বেতন বাড়ার প্রজ্ঞাপন জারির পর অবসরে যাওয়া পেনশনভোগীদের ভাতা কতটুকু বাড়ছে তা নিয়ে সাবেক চাকুরে ও তার পরিবারের সদস্যদের আগ্রহ জন্মেছে। নতুন বেতন কাঠামোতে বর্তমান কর্মীদের বেতন-ভাতা বাড়ার পাশাপাশি পেনশনভোগীদেরও বেতন বাড়ানোর কথা বলেছে সরকার; তবে এটিও বাস্তবায়িত হবে কয়েক ধাপে। প্রজ্ঞাপনের পর নতুন বেতন কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব কর্মীরা খুব কম মূল বেতন নিয়ে চাকুরি ছেড়েছিলেন এবং দীর্ঘদিন অবসরের পরও তার আয় সীমিত, তাদের পেনশন বাড়ার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এতে বলা হয়েছে, যেসব পেনশনভোগী বর্তমানে ৯ হাজার টাকা বা এরও কম নিট পেনশন পান, তারা এখন নতুন বেতন কাঠামোয় নিট পেনশন পাবেন সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। অর্থ্যাৎ এক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা ১০০ শতাংশ বেড়েছে। অপরদিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যারা মাসে ৪০ হাজার ১ টাকা থেকে এর বেশি পেনশন পান, তারা পাবেন সর্বনিম্ন ৬২ হাজার ১ টাকা থেকে ৭০ হাজার ২০০ টাকা টাকা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসে ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন গ্রহণকারীদের পেনশন বেড়েছে ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা এর বেশি নিট পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বাড়বে ৫৫ শতাংশ।