দেশের জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে। সংস্থাটির অধীন ৮টি প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণ হয় চট্টগ্রাম থেকেই। তবে বিপিসির চেয়ারম্যান থেকে পরিচালক পদমর্যাদা ৫ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কেউ চট্টগ্রামে যান না। সংযুক্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে তারা রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিটিএমসি ভবনে লিয়াজোঁ অফিসে বসেই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এতে বিপিসি ও এর অধীনস্থ তেল কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সভা, ফাইল অনুমোদন ও দাপ্তরিক সমন্বয়ের জন্য ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয় রেখে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় একদিকে যেমন দাপ্তরিক সমন্বয়হীনতা বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে বিমান ভাড়ায়।
বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েলসহ আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে। দেশের আমদানিকৃত জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয়, পতেঙ্গার স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষণ করা হয় এবং সেখান থেকেই দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়। ফলে পুরো জ্বালানি খাতের মূল কার্যক্রম চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ঢাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিপিসির শীর্ষ কর্তারা নিয়মিত চট্টগ্রামে অফিস না করায় কার্যত ঢাকাকেন্দ্রিক একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ফলে বিপিসি ও অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের মাসে ৪ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করতে হয়। বেশিরভাগ সময়ই এই যাতায়াত বিমানে করা হয় এবং প্রতিবার ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা।
একেকজন কর্মকর্তার পেছনে মাসে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিমান ভাড়া ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক সময় ঢাকায় বড় সভা থাকলে পুরো বিমানের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রীই থাকেন তেল কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী। অথচ হাতে গোনা কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়মিত চট্টগ্রামে অফিস করলেই এই বিপুল ব্যয় কমানো সম্ভব ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, কর্তা ছাড়া অফিস হলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। বিপিসি ও অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের নির্দেশনা বা মতামত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমের গতি দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা মো. রেজানুর রহমান গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিপিসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা কারণে দেশে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়। মার্চ ও এপ্রিল মাসে পুরোটা সময় দেশের জ্বালানি খাতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। অথচ এমন সংকটেও সরেজমিন চট্টগ্রামে যাননি তিনি। সবশেষ গত ৬ মে চট্টগ্রাম ভ্রমণে যান এ শীর্ষ কর্মকর্তা। চট্টগ্রামে তার সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের সময়সূচি তৈরি হয়। আর ওই সূচি প্রণয়ন করা হয়েছে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয় থেকে। এটি নিয়ে তেল সেক্টরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হয়।
এছাড়া বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীন গত রমজান মাসে মাত্র একদিনের জন্য চট্টগ্রামে অফিস করেছেন। পরিচালক (বিপণন) মো. সাবেত আলী, পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে এম সামছুল হক এবং পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক গত ৬ ও ৭ মে চট্টগ্রামে অফিস করেছেন।
যদিও বিপিসির চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয়ে চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য সুপরিসর ও অত্যাধুনিক অফিস কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এসব কক্ষের অধিকাংশই তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন কক্ষগুলো ব্যবহার না হয়ে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সেখানে কার্যত প্রশাসনিক স্থবিরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো ব্যবহারের পরিবর্তে ঢাকাকেন্দ্রিক অফিস সংস্কৃতি বজায় রাখার কারণে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয় অনেকটাই আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে বিপিসির অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ঢাকাপোস্টকে বলেন, বিপিসির চেয়ারম্যান স্যার থেকে শুরু করে কেউ চট্টগ্রামে আসেন না। নিয়মিত আমাদের কোম্পানির লোকজনকে ফাইল-পত্র নিয়ে ঢাকায় যেতে হয়। অথচ চেয়ারম্যান স্যার এবং পরিচালকরা সপ্তাহে দুয়েকদিন করে চট্টগ্রামে সময় দিলে কাজ অনেক সহজ হত।
উল্টো এখন প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নেয়ার আলোচনা
তেল সেক্টরের সবকিছু চট্টগ্রামে হলেও বিপিসি কর্তারা এখন উল্টো প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এ নিয়ে স্বয়ং বিপিসি ও তার অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বিরোধিতা শুরু করেছেন।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির অংশ হিসেবে ১৯৯০ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন সরকার বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কারণ, বিপিসির মূল কার্যক্রম ও এর অধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ কার্যক্রম চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। বর্তমানে বিপিসির প্রধান দায়িত্ব বিদেশ থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা। আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয় এবং পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মাধ্যমে দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান স্থাপনা চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত। এছাড়া আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি তেলও চট্টগ্রামে সংরক্ষণ করে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে পাঠানো হয়। বিপিসির আমদানিকৃত জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে খালাস করা হয় এবং বিপিসির অধীন আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। ফলে প্রধান কার্যালয় ঢাকায় সরিয়ে নেয়া হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি জটিল হয়ে পড়বে এবং সার্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বাস্তবায়ন করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একই এলাকায় আধুনিক ট্যাংক টার্মিনাল ও এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রমও চলছে। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক এসব অবকাঠামো সরেজমিনে তদারকির জন্য প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকা জরুরি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম আইন ২০১৬-এর ৫(১) ধারায় বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা হলে চট্টগ্রামে থাকা বিপিসির মূল্যবান জমি ও স্থাপনা বেহাত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কার্যালয়ও ঢাকায় সরিয়ে নেয়ার চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। অতীতেও কয়েকবার বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুসারে ১২ মে ২০২৬ তারিখে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী সংসদে একটি নোটিশ দেন। সেখানে তিনি জনস্বার্থে বিপিসির প্রধান কার্যালয় পুনরায় ঢাকায় স্থানান্তর এবং সেখানে স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ওই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে মতামত চাওয়া হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে এবং চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
চট্টগ্রামে নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে
দীর্ঘদিন ধরে বিপিসির কার্যক্রম শিপিং কর্পোরেশনের ভবনে ভাড়ায় চলছে। তবে চট্টগ্রাম নগরের জয়পাহাড়ে বিপিসির প্রধান কার্যালয়ের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। এর আগে সেখানে ২০ তলা নান্দনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের আপত্তির মুখে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেখানে আবারও প্রধান কার্যালয়ের জন্য প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়তলা স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বিপিসির জানতে বিপিসির চেয়ারম্যানকে কয়েকদিন ধরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর সংস্থাটির সচিব শাহিনা সুলতানার সঙ্গে তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, দেশের জ্বালানি খাতের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম হলেও বিপিসির কয়েকজন ‘রাজাদের’ ঢাকায় বসে কার্যক্রম পরিচালনা করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে করে অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের ছোটখাটো কাজেও ঢাকায় যেতে হচ্ছে। তাদের যাতায়াতে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে। যে দেশের সাধারণ মানুষ স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য কিনতে ট্রাকের পেছনে দৌড়ায়, সে দেশের কর্তাদের এমন বিলাসিতা কাম্য নয়। আবার কর্তাদের অনুপস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়ছে। যেখানে তেল খালাস, সংরক্ষণ, পরিশোধন ও সরবরাহের পুরো অবকাঠামো চট্টগ্রামকেন্দ্রিক, সেখানে বিপিসির শীর্ষ কর্তাদের ঢাকায় বসে কার্যক্রম চালানোটা একেবারে অযৌক্তিক।
তিনি আরও বলেন, এখন আবার তাদের সুবিধার জন্য বিপিসির কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটি সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতিরও পরিপন্থি। দ্রুত শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়মিত চট্টগ্রামে অফিস নিশ্চিত এবং প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগ থেকে সরে আসার দাবি জানাচ্ছি। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, এখন আসলে দাবি কাদের জানাব। সবাই তো ভোগবিলাসে ব্যস্ত। তাদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্তারাও দেখবেন আরও দুর্নীতিগ্রস্থ।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের গানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতি সংহতি প্রকাশ করছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেই। বিষয়টি আমি আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। ভিডিওটিও দেখিনি। তবে যাদের কাছে শুনেছি, তারা বলেছেন সেখানে কোনো অশ্লীলতা নেই। যদি সত্যিই কোনো অশ্লীলতা না থাকে, তাহলে শুধু গান গাওয়াকে আমি অন্যায় মনে করি না। ভিডিও না দেখে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ এ ঘটনায় শিক্ষক সমাজের অনেকেই বলছেন, শিক্ষকরাও রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদেরও আনন্দ-বেদনা, ব্যক্তিগত জীবন ও মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। প্রতিদিন সমাজে নানা অশালীন ও অনৈতিক ঘটনা ঘটলেও তা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। অথচ শিক্ষকরা ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সাধারণ বিষয় প্রকাশ করলেই তা সমালোচনার মুখে পড়ে। কলেজশিক্ষক জান্নাত আরা খান পান্না ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমিও শিক্ষক। নাচতে জানি না বলে হাঁটছি। কারও দৃষ্টিতে যদি নাচ মনে হয়, তবে নাচছি। আর কারও জাত গেলে আমার কিছু করার নেই। সংহতি বিউটি পাল।’ শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’ শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী লিখেছেন, ‘একজন শিক্ষকও রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও আনন্দ প্রকাশের অধিকার আছে, কষ্টে মন খারাপ হওয়ার অধিকার আছে। যা অশ্লীল, তা শুধু শিক্ষকের জন্য নয়, সবার জন্যই অশ্লীল। আর যা শালীন ও মার্জিত, তা কোনো নির্দিষ্ট পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’ রাসেল আমিন লিখেছেন, ‘একটি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়া সহজ কথা নয়। বিউটি রানী পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। তিনি অত্যন্ত মেধাবী। তাকে নিয়ে এক শ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষ নোংরামি করার চেষ্টা করেছে। তবে তারা সফল হয়নি।’ শিক্ষক দীপা মণ্ডল লিখেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের নাচ, গান, অভিনয়সহ নানা দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়। অথচ একজন শিক্ষক নিজের আনন্দের একটি মুহূর্ত প্রকাশ করলেই সমালোচনার মুখে পড়েন। শাড়ি পরিহিত অবস্থায় একটি সাধারণ ভিডিও কীভাবে অশ্লীল হতে পারে?’ শিক্ষক তন্দ্রা তনু লিখেছেন, ‘এখনও কেউ কেউ মনে করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মানেই অভাবের প্রতীক। তাই একজন শিক্ষক পরিচ্ছন্ন পোশাকে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাসিমুখে থাকলে তা অনেকের সহ্য হয় না। কিন্তু সময় বদলেছে। শিক্ষকও সুন্দরভাবে বাঁচবেন, হাসবেন, নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করবেন, এটাই স্বাভাবিক।’ জানা গেছে, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল স্কুল চলাকালে নয়, বরং ছুটির পর ভিডিওটি ধারণ করেন বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা। পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে ভিডিওটি প্রকাশ করেন প্রবাসী তরুণ আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ। বিউটি রানী পাল বলেন, ‘আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ আমার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে তার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছেন। সেখানে আমাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যও করা হয়েছে।’ তার দাবি, আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণের পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে এমন কাজ করেছেন। পরে ফোন করে ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রশ্ন করে হেনস্তার চেষ্টা করেন। ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিউটি রানী পালের পক্ষে অবস্থান নেন। অনেকেই তার ব্যবহৃত একই গান দিয়ে ভিডিও তৈরি করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বিউটি রানী পাল বলেন, ‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। এভাবে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা কাম্য নয়।’ তিনি শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হলে সমাজ আরও বেশি নৈতিক হবে।’ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আইনি জটিলতায় যেতে চাই না। সারা দেশের মানুষের যে নৈতিক সমর্থন পেয়েছি, সেটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’ অভিযোগের বিষয়ে আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ বলেন, ‘আমি ম্যাডামকে আদাব জানিয়ে শুধু ভিডিওটি সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে চেয়েছি। এর বাইরে আর কিছু বলিনি।’ এ বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সুহেল মোল্লা বলেন, ‘বিউটি রানী পালের মূল পোস্টটি আমি এখনো সরাসরি দেখিনি। তবে ভাইরাল ভিডিওটি দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালার কোনো লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।’ তিনি আরও জানান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনায় ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন। তবে কী ধরনের পোস্ট বা মন্তব্য করা যাবে, সে বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বিউটি রানী পালের ভাইরাল ভিডিও বা পোস্টে নীতিমালাবিরোধী কোনো বিষয় রয়েছে কি না, সেটিই তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। প্রসঙ্গত, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ উপলক্ষে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা নির্বাচিত হন বিউটি রানী পাল। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার জয়দেবপুর সড়কে অবস্থিত রাজমনি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ ও দুইজন নারী রয়েছেন। শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুরে পরিচালিত এ অভিযানে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ হোটেলটিতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। আটকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলছে। বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুন অর রশিদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে সাতজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের পরিচয় যাচাই এবং প্রাথমিক আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আটক ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা ও মামলার বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। পুলিশ জানায়, মহানগর এলাকায় অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক ৩ মামলায় জামিন পেয়ে কারামুক্ত হয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) অনেকটা গোপনীয়তার সঙ্গেই কারামুক্ত হয়েছেন তিনি। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আরও পাঁচটি মামলার এজাহারে নাম থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। এর আগে গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে বরিশাল থেকে গ্রেপ্তার হন আফ্রিদি। এরপর থেকে বুধবার (২২ জুলাই) পর্যন্ত প্রায় ১১ মাস ছিলেন কারাগারে। বিষয়টি পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা দাবি করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বললেন, ‘তৌহিদ আফ্রিদি পরিচিত ব্যক্তি, তার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা আছে পুলিশের জানার কথা। কিন্তু কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে কেন গ্রেপ্তার দেখানো হলো না। এর জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। জানা যায়, তৌহিদ আফ্রিদির বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৮টি মামলা হয়। এর মধ্যে ওয়ারি থানার একটি ছাড়া অন্য ৭টি মামলায় তিনি এজাহারনামীয় আসামি। এসব মামলার মধ্যে তাকে ওয়ারি থানার প্রতারণা, যাত্রাবাড়ী ও বাড্ডা থানার হত্যাচেষ্টার পৃথক তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তবে এ তিন মামলার বাইরে তার নামে রামপুরা থানার একটি হত্যা এবং বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও বনানী থানার পৃথক চারটি হত্যাচেষ্টা মামলা রয়েছে। এসব মামলার এজাহারে তার নাম থাকলেও গ্রেপ্তার দেখানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তথ্য পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাধারণত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কোনো মামলায় আসামির জামিন হলে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগকে জানানো হয়। তখন ওই আসামির বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা আছে কি না, তার খোঁজ নেওয়া হয়। মামলা থাকলে আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। সেই আবেদন অনুযায়ী আসামির উপস্থিতিতে শুনানি হয়। এজাহারে নাম থাকলে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কিন্তু মামলা থাকা সত্ত্বেও তৌহিদ আফ্রিদির ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করার হয়নি। আদালত ও মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট রাতে বরিশাল থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলায় তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। রিমান্ড শেষে ৩০ আগস্ট তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। পরে বাড্ডা থানায় হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে দেখানো হয় গ্রেপ্তার। এ মামলার তদন্ত শেষে তার অব্যাহতি চেয়ে সুপারিশ করা হয়। এরপর প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ওয়ারি থানার এক মামলায় ১৫ জুন আফ্রিদিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। হত্যা ও হত্যাচেষ্টার দুই মামলায় হাইকোর্ট থেকে তিনি জামিন পান। পরে গত ৪ মে আপিল বিভাগ তার জামিন বহাল রাখেন। সর্বশেষ গত ২১ জুলাই ওয়ারী থানার প্রতারণার মামলায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম ১ হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। ওইদিন তার আইনজীবী ইকবাল মাহমুদ জানিয়েছেন, সব মামলায় জামিন পাওয়ায় তৌহিদ আফ্রিদির কারামুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই। আফ্রিদি কারামুক্তি বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের মিডিয়া উইং জানায়, কারাগারে জামিননামা যাচাই-বাছাই করেই বৃহস্পতিবার তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এদিকে, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আসামি গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি বাধ্যতামূলক নয় বলে জানিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়টি সম্পূর্ণ পুলিশের ওপর নির্ভর করে। তবে আসামি কারামুক্ত হলেও তদন্তে সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।