চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে আজ এক পোস্ট দেন। এই পোস্টে তিনি তার দায়িত্বপালনকালে কী কী পদক্ষেপ ও কার্যক্রম করেছেন তা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ্য করেন, ‘কি কাজ হয়েছে?’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
এগুলো হলো : ১) ২২ টি আইনি সংস্কার। ২) ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন। ৩) ২৪ হাজার ২৭৬টি হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহার। ৪) গণহত্যার বিচার ব্যবস্থাপনা। ৫ ) প্রায় তিনগুণ পরিমাণে দৈনন্দিন কার্যক্রম।
১) আইনি সংস্কার
ক) আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ : এই আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এতে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা, সাক্ষীর সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, অন্তবর্তীকালীন আপিল, এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে।
খ) সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ : এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বতন্ত্র জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে মেধা, সুযোগের সমতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
গ) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ : বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিচার বিভাগের নিজস্ব কর্তৃত্বে ন্যস্তকরণের বিধান করা হয়েছে।
ঘ) বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ : এর মাধ্যমে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে দালিলিক সাক্ষ্যভিত্তিক বিচার, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, মধ্যস্থতা, ভার্চুয়াল শুনানি এবং অনলাইন মামলা ব্যবস্থাপনার সুবিধা রাখা হয়েছে।
ঙ) মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন : জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়নের মাধ্যমে কমিশনের তদন্ত, ক্ষতিপূরণ আদায় ও নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং ওপিসিএটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠন করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো গণবিজ্ঞপ্তি ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সুযোগ্য কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
চ) গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ : গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড নির্ধারণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত ক্ষমতা প্রদান, ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
ছ) জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা প্রদান এবং একই সঙ্গে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণীত হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধে অংশগ্রহণের কারণে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার এবং নতুন মামলা দায়ের নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়েছে।
জ) দেওয়ানি কার্যবিধিতে সংশোধন: এই সংশোধন করে দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থায় যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে। মৌখিক সাক্ষ্যগ্রহণের পরিবর্তে এফিডেভিটের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ, অনলাইনে সমনজারি এবং মূল মামলার অধীনেই রায় কার্যকর করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ঝ) ফৌজদারি আইনে সংস্কার: ফৌজদারি আইন সংশোধনের মাধ্যমে গ্রেফতার ও রিমান্ড প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হয়েছে। সেই সাথে অভিযুক্তের অধিকারের নিশ্চয়তা, জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ পরিহার, তদন্ত প্রক্রিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনা, মিথ্যা মামলার হয়রানী রোধ করাসহ বিভিন্ন সংশোধনী আনা হয়েছে।
ঞ) মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার বিধান সংযোজন: আইন সংশোধন করে নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের মামলার ক্ষেত্রে মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার বিধান করা হয়েছে। মধ্যস্থতা-চুক্তি আদালতের ডিক্রির সমতুল্য মর্যাদা পাচ্ছে। প্রতি জেলায় একজন বিচারকের স্থলে তিনজন বিচারককে লিগ্যাল এইড অফিসে পদায়ন করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া চালু করে ২০টি জেলায় এডিআর ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের ফলে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে সফল নিষ্পত্তির গড় হার ৩৩৯ দশমিক ৮৬% বৃদ্ধি পেয়েছে ও যৌতুকের মামলা ৭৯ দশমিক ৭৪% হ্রাস পেয়েছে। বন্টনের মামলা, অগ্রক্রয় সহ বিভিন্ন বিরোধের একদিনেই নিষ্পত্তি হচ্ছে।
ট) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন: এই সংশোধনীর মাধ্যমে তদন্ত ও বিচার শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তদন্ত সম্পন্নে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার জবাবদিহির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাক্ষীদের সুরক্ষা, শিশু ধর্ষণ মামলার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পুরুষ শিশু নিপীড়নকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
ঠ) গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংস্কার: প্রবাসীদের জন্য ডাক ব্যালট প্রবর্তন, নির্বাচনী অপরাধ বিচারে বিচারকদের সমন্বয়ে অনুসন্ধান ও বিচার কমিটি গঠন এবং নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিচারিক ক্ষমতা জোরদার করা হয়েছে।
ড) সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে যৌথভাবে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে পূর্বের সাইবার নিরাপত্তা আইনের নিপীড়নমূলক ধারাগুলো এবং এসবের অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
ঢ) পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালায় সংশোধনী: পূর্বে বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশি বৈধ পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। এখন বাংলাদেশি বৈধ পাসপোর্ট না থাকলেও, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিগণ তাদের পাসপোর্টে ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ স্টিকার থাকলে বা জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয় পত্র থাকলেই বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে পারছেন। এতে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের সম্পত্তি হস্তান্তরসহ নানা আইনি কাজ অনেক বেশি সহজ হয়েছে।
ণ) বিবাহ নিবন্ধন বিধিমালা সংশোধন: বিবাহ নিবন্ধন বিধিমালা সংশোধন করে জেন্ডার বৈষম্যমূলক বিধান বাতিল করা হয়েছে। কাবিননামা ফরম সংশোধন করে তা সময় উপযোগী ও অধিকতর স্পষ্ট করা হয়েছে। অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন করার বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
এছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ সংস্কার কমিশন অধ্যাদেশ, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীসহ বিভিন্ন আইনে অধ্যাদেশ প্রণয়নে আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহকে সহযোগিতা প্রদান করেছে।
২) প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন
ক) জুডিশিয়াল সার্ভিসের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তিনটি পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদসৃজনের ক্ষমতা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, ২০২৫’ এবং সার্ভিসের সদস্যদের সরকারের আইন ও বিচার বিভাগে পদায়নের সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। পূর্বে পদ সৃজনের সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল বিধায় বিচারকের পদ সৃজনে বিলম্ব হতো এবং মামলা জট বাড়তো। এখন সুপ্রিম কোর্টের অধীন একটি বিশেষ কমিটিকে বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সঠিকভাবে পদায়ন ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার জন্য পদায়ন ও পদোন্নতি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
খ) তথ্য ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন: বিচারপ্রার্থী জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিতকরণে দেশের সকল আদালত প্রাঙ্গণে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মামলার সর্বশেষ অবস্থা, শুনানির তারিখ এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি কমেছে।
গ) কেন্দ্রীয়ভাবে আদালতের কর্মচারী নিয়োগ: একটি স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে দক্ষ কর্মচারী নিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ কার্যক্রম চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিধিসমূহ সংশোধন করা হয়েছে এবং সারাদেশের আদালতের মোট ২ হাজার ৭৩৩টি শূন্যপদে নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
ঘ) দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রম: অধস্তন আদালতের বিচারকদের সম্পত্তির হিসাব গ্রহণ এবং সংগৃহীত হিসাবের নথিসমূহ পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রারদের জন্য ব্যক্তিগত তথ্য বিবরণী তৈরি করা হয়েছে।
ঙ) প্রসিকিউশন মনিটরিং সেল: জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের প্রসিকিউশন কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।
চ) বিচার কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন: বিচার কার্যক্রম দ্রুততর করার লক্ষ্যে ডাক্তার, ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যান্য সরকারী চাকরিজীবীদের অনলাইনে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের পত্রের আলোকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্র্যাক্টিস ডিরেকশন্স জারি করেছে। এছাড়া ৮০% আদালতে ই-কজলিস্ট নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে, একে দ্রুততম সময়ে শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ছ) ই-ফ্যামিলি কোর্ট : আদালত ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুইটি পারিবারিক আদালতে ই-ফ্যামিলি কোর্টের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইনে মামলা দায়ের, হাজিরা ও শুনানি, কোর্ট ফি প্রদান এবং রেকর্ড সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। এই ডিজিটাল কাঠামো পারিবারিক আদালতের কার্যক্রম আধুনিক ও সহজতর করেছে।
জ) অনলাইন বেইলবন্ড : ৯টি জেলায় ই-বেইলবন্ড কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে যার ফলে জামিন প্রাপ্তির পর পূর্বে ১৪টি ধাপকে কমিয়ে এক ধাপে নামিয়ে আনা হয়েছে।
ঝ) আইন মন্ত্রণালয়ে ডিজিটালাইজেশন : আইন ও বিচার বিভাগে ডি-নথির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া, এ মন্ত্রণালয়ের অ্যাটেসটেশন সেবাকে শতভাগ অনলাইন প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা হয়েছে।
ঞ) জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা : এই সময়কালে আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়াও, জরুরি আইনগত সহায়তা, প্রবাসী নাগরিকদের সহায়তা প্রদান এবং পেশাদার মধ্যস্থতাকারী সৃষ্টির লক্ষ্যে সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিনামূল্যে আইনি পরামর্শের জন্য সহজে মনে রাখার মতো নতুন ফোন নম্বর (১৬৬৯৯)-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ট) দেওয়ানি আদালতের পরিচিতি : দেওয়ানি বা সিভিল আদালত হওয়া সত্ত্বেও আদালতের নামের সাথে ‘সিভিল’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সহকারী’ শব্দটি থাকায় ‘সহকারী জজ আদালত’ ও ‘সিনিয়র সহকারী জজ আদালত’-এর স্বাধীনতা ও এখতিয়ার বিষয়ে বিচারপ্রার্থী ও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরী হতো। বর্তমানে আইন সংশোধন করে আদালতের নাম পরিবর্তন করে ‘সিভিল জজ আদালত’ ও ‘সিনিয়র সিভিল জজ আদালত’ করা হয়েছে।
ঠ) দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পৃথকীকরণ এবং রেকর্ড সংখ্যক নতুন আদালত সৃজন : এই সময়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পৃথক করা হয়েছে, যার ফলে এক বিচারককে একাধিক প্রকৃতির মামলার বিচার করতে হবে না। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা কমবে। এসময়ে রেকর্ডসংখ্যক ১ হাজার ৬০৫টি নতুন আদালত সৃষ্টি হয়েছে।
ণ) নিবন্ধন অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন বিভাগের সংস্কার: রেজিস্ট্রেশন সেবার মানোন্নয়ন, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, এবং জনবান্ধব সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। নিবন্ধন অধিদপ্তর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরুর দ্বার প্রান্তে। এ পদ্ধতি চালু হলে দাতা/বিক্রেতার বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাইপূর্বক রেকর্ডপত্র অনলাইনে ডিজিটাল বালামে সংরক্ষিত হবে। সূচিবহি ও দলিল অনলাইনে থাকবে। ভূমি অফিস থেকে এলটি নোটিশ এবং রেজিস্ট্রিকৃত দলিল অনলাইনে দেখা যাবে। ফলে জাল দলিলে নামজারি বন্ধ হবে।
৩। হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার কার্যক্রম, রাজনৈতিক হয়রানীমূলক মামলা : এ বিষয়ে জেলা পর্যায়ে গঠিত কমিটি এবং আইন ও বিচার বিভাগের পর্যালোচনার পর এধরনের ২৩ হাজার ৮৬৬টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। সূচারুভাবে সকল ভূক্তভোগীকে এই সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এরূপ হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া সাইবার আইনের অধীনে ৪১০টি স্পিচ অফেন্স সংক্রান্ত মামলা, এবং জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রায় সকল মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহারে সীমাহীন ভোগান্তি ও হয়রানী থেকে মুক্তি পেয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।
৪) গণহত্যার বিচার সহায়তা: জুলাই গণ-অভূত্থানে সংগঠিত গণ-হত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক ও প্রসিকিউটরদের নিয়োগ, তাদের সকল লজিস্টিক সহায়তা প্রদান, প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন ও প্রসিকিউশন কাজের তদরকীর দায়িত্ব পালন করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এই আদালতে চারটি মামলার রায় হয়েছে, আরো কমপক্ষে ছয়টি মামালার বিচার চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, গুম সহ বহু মামলার বিচার শুরু হয়েছে।
৫) দৈনন্দিন কার্যক্রম: এ সরকারের কার্যকালে মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে লক্ষ্যনীয় গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দেড় বছরে মন্ত্রীপর্যায়ে নিষ্পত্তিকৃত নথির সংখ্যা ২ হাজার ২৮১টি, বিগত সরকারের একই সময়ে ১ হাজার ২৩৫ টি নথি নিষ্পত্তি হয়েছিলো। গত দেড় বছরে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ অন্যান্য দপ্তরে ৫৭৮টি বিষয়ে আইনি মতামত প্রদান করা হয়েছে (গত সরকারের আমলে ২১০টি)। আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রেকর্ড ১৫টি অংশীজন মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগ সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনগুলো, গুম সংক্রান্ত অপরাধ তদন্ত কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সাচিবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো বিধিমালা ও প্রবিধানগুলোকে কোডিফাই করার কাজ শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে প্রণীত ১২৭টি অধ্যাদেশ ও একটি আদেশ নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে।
এছাড়া ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগকৃত সকল আইন কর্মকর্তা পালিয়ে যাওয়ার কারণে গত দেড় বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যাক আইন কর্মকর্তাকে (প্রায় সাড়ে ৫ হাজার) নিয়োগ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগে ৪৮ জন বিচারপতি নিয়োগে সাচিবিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দায়িত্বপালন শেষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি-শুরু করেছি মাইনাস থেকে। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছি। আজ অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে-তা যেন কখনো থেমে না যায়।’ নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের একদিন আগে আজ সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে তিনি ভাষণ দেন। ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। আমাদের সকলের দায়িত্ব দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র হিসেবে পরিস্ফুটিত করা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য এই দরজা খুলে দিয়েছে। আমরা যদি সেই স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।’ গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছে, শরীরের অঙ্গ হারিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছে, যাদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, যাদের লাশ এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যারা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে-তাদের সকলের আত্মত্যাগকে এ জাতি যেন কোনোদিন ভুলে না যায়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা যেন তাদের ছবি মনে রেখে সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ক্ষমতাবানদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, সে শিক্ষাটি যেন দিয়ে যেতে পারি’। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা মানুষকে কীরকম মনুষ্যত্বহীন করে তুলতে পারে সেটা জাতির ইতিহাসে ধরে রাখার জন্য আমরা পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান গণভবনকে জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে যাচ্ছি।’ প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন,‘এখানে আপনাদের স্মৃতির বাস্তব নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। জাদুঘর যখন জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে তখন আপনি যেখানেই থাকুন, দেশে থাকুন, বিদেশে থাকুন- আমি অনুরোধ করব আপনি সপরিবারে একবার এসে কিছুক্ষণ জাদুঘরে কাটিয়ে যাবেন’। সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল-তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে’। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করে না, পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না। জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে’। বিচার বিভাগ সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে যুগান্তকারী সংস্কার করা হয়েছে।’ অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, অর্থপাচার ছিল লাগামহীন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। আমাদের দেশপ্রেমিক প্রবাসী ভাই-বোনদের রেমিট্যান্সের টাকায় এই রিজার্ভ ক্রমেই বাড়ছে।’ অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও দেশের মর্যাদা-এই তিনটি মূল ভিত্তি আমরা দৃঢ়ভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অপর দেশের নির্দেশনা ও পরামর্শনির্ভর বাংলাদেশ এখন আর নয়-আজকের বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন স্বার্থ রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল’। রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মৃতপ্রায় এই ইস্যুটিকে পুনরায় বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।’ উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ১৮ মাসে ক্রমান্বয়ে এ দেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, একটি কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাক-স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারা-সমালোচনা করতে পারা-জবাবদিহিতায় আনতে পারার যে চর্চা শুরু হলো, তা অব্যাহত রাখতে হবে। এই ধারা যেন কোনোরকমেই হাতছাড়া হয়ে না যায়।’ জুলাই সনদ অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘ অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ, যার ভিত্তিতে গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছে দেশের মানুষ। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করব এটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন হবে’। একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুরে অবৈধভাবে পাচারকালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৩শ’ বস্তা টিএসপি ও ডিএপি সার জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। আজ সোমবার বিকেলে সদর উপজেলার মজু চৌধুরীরহাট ফেরিঘাট এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই সময় ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ফেরিঘাট রুট ব্যবহার করে ভোলা ও বরিশালে অবৈধভাবে বিএডিসি’র সার পাচার করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভি দাশের নেতৃত্বে ফেরিঘাট এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে একটি ইঞ্জিনচালিত লোহার ট্রলার ভর্তি ৩শ’ বস্তা টিএসপি ও ডিএপি সার জব্দ করা হয়। পাচারকারী চক্রের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত দেলোয়ার হোসেনকে জরিমানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ধরনের কাজ না করার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভি দাশ জানান, সার পাচার রোধে কৃষি অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কৃষকের অধিকার রক্ষায় এবং সারের অবৈধ পাচার বন্ধে প্রশাসনের এই ধরনের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।
সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেছেন, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়কে সকল নারী ও শিশুর আস্থার জায়গা তৈরিতে কাজ করেছি। তিনি বলেন, একটি স্বৈরশাসনের পরিপ্রেক্ষিতে বৈষম্যহীন, মানবিক, উদার ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র তৈরিতে আমরা এসেছিলাম। এ মন্ত্রণালয় দুটোর যে দুর্বল দিকগুলো ছিল তা সংস্কারের জন্য এই ১৬ মাস নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছি। আজ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে নারী ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে গৃহীত কার্যক্রম ও অর্জন বিষয়ে নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় আয়োজিত বিদায়ি অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। উপদেষ্টা বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নিরসনে ‘পাশে আছে’ প্রকল্পের মাধ্যমে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ গঠন করে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যন্ত সর্বক্ষণিক সেবা, স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জুলাই কন্যাদের শনাক্তকরণ ও সংখ্যা নিরূপণ, তাদের জীবনের গল্প সংরক্ষণ এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য একমাত্র ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ডাটাবেজ তৈরি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতার আলোকে জেন্ডার সমতা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায় বিচার ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিদ্যমান কাঠামো রূপান্তর করে জেন্ডার সমতা উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার কার্যক্রম অনুমোদন করা হয়েছে। শারমীন এস মুরশিদ বলেন, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬ দ্বারা যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করে একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ আইনি কাঠামো, কর্মপরিধি প্রদান করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬ দ্বারা পরিবারের নারী ও শিশুর অধিকার মর্যাদা ও পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতির বাস্তব প্রতিফলন করা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে গেলাম, তা ভবিষ্যতে যে নতুন সরকার আসবেন তারা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন এবং এ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দুটোর সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সুনাম অক্ষুণ্ন রাখবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদের সভাপতিত্বে বিদায়ি অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের সকল স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।