ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শুক্রবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে—এমনটা তিনি বিশ্বাস করেন না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন পদক্ষেপ নিলে ন্যাটোর জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে।
নতুন বছরের ঐতিহ্যবাহী সংবাদ সম্মেলনে মেলোনি বলেন, আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর উপস্থিতি জোরদার করা হলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো ওই অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে পারে—এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্বেগ রয়েছে, তা মোকাবেলা করা যাবে এবং ওয়াশিংটনের একতরফা পদক্ষেপের চাপ কমবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরোপীয় ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন মেলোনি বলেন, ‘আমি এখনো মনে করি না যে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক অভিযান চালাবে—এমন কোনো সম্ভাবনায় আমি বিশ্বাস করি।
এমন একটি বিকল্পকে আমি স্পষ্টভাবেই সমর্থন করব না।’
গত সপ্তাহান্তে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক অভিযানের পর আর্কটিক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে ভূমিকা ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে; সেই প্রেক্ষাপটেই মেলোনির এই মন্তব্য আসে, যা গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে ট্রাম্পের অভিপ্রায় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ উসকে দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ নেতা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানে আটক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও, মেলোনি বলেন তিনি ওই অভিযানকে সমর্থন করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা বিষয়ে আমি ট্রাম্পের সঙ্গে একমত।
গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে আমি একমত নই।’ তিনি আরো বলেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি কৌশলগত অবস্থানে থাকা এই বিশাল ভূখণ্ড দখল করা কারো স্বার্থেই হবে না।
তিনি যোগ করেন, ‘স্পষ্ট করে বললে, এটি যুক্তরাষ্ট্রেরও স্বার্থে হবে না।’
হোয়াইট হাউস মঙ্গলবার জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মেলোনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পদক্ষেপ ন্যাটোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে—এটা ‘সবার কাছেই স্পষ্ট’; আর এ কারণেই তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত হুমকি বাস্তবায়ন করবে না।
তবে তিনি বলেন, ওই অঞ্চলে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি জানান, ‘অন্যান্য পক্ষের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ—যারা এমনকি শত্রুভাবাপন্নও হতে পারে—ঠেকানোর প্রয়োজন’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ তিনি বোঝেন।
মেলোনির সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং গত বছর ট্রাম্পের অভিষেকে উপস্থিত থাকা একমাত্র ইউরোপীয় নেতা ছিলেন তিনি।
তার সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, তিনি ট্রাম্পের কাছে বিশেষ প্রবেশাধিকার পাবেন এবং ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে উঠবেন।
তবে এখন পর্যন্ত তার পরামর্শে ট্রাম্প কান দিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
মেলোনি শুক্রবার বলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমার দ্বিমত আছে। উদাহরণ হিসেবে, আমি মনে করি আন্তর্জাতিক আইনকে দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা জরুরি। … যখন আমার দ্বিমত হয়, আমি তাকে তা বলি—এতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ইতালির রাজধানী রোমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধ, মাদ্রিদে তাঁবু গেড়ে অবস্থান এবং ফ্রান্সের রাজপথে বিক্ষোভ—ইউরোপজুড়ে তরুণরা এমন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, রাজনীতিকেরা তাদের কথা শুনছেন না, তাদের চাহিদা ও সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। তরুণদের দাবিগুলো একেক জায়গায় একেক রকম হলেও একটি বিষয়ে তাদের ঐক্য রয়েছে। তারা চান, রাজনীতি ও সমাজে প্রায়ই উপেক্ষিত তাদের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পাক। দাবি আদায়ে কখনো কখনো তারা কঠোর কর্মসূচিও ঘোষণা করছেন। অন্যদিকে, পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের। রোমের কাভুর হাইস্কুলের ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী দামিয়ানো ফুসা বলেন, ‘আমরা লড়াই করছি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছি।’ ইতালির রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল কর্মসূচির মধ্যে কাভুর হাইস্কুলই প্রথম অবরুদ্ধ হয়। ফুসা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো কেউ নেই।’ তিনি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কট্টর ডানপন্থি জোটের পাশাপাশি আগের মধ্য-বামপন্থি সরকারগুলোরও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, এসব সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমিয়েছে এবং তরুণদের প্রয়োজন উপেক্ষা করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক লাখ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছেন। কোনো কোনো বিক্ষোভ সহিংসতায়ও রূপ নিয়েছে। সরকারগুলো মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফ্রান্সের কিছু এলাকায় আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে, আর ইতালিতে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাসদস্য। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ তাদের মূল দাবিগুলোকে আড়াল করছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলতে পারে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের ১৯ বছর বয়সী মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লুইস মার্কেস বলেন, ‘রাজনীতিকেরা বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও একেবারেই অযৌক্তিক উপায়ে পরিস্থিতির জবাব দিচ্ছেন।’ শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে লাগামহীন বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরক্ষা খাতের পরিবর্তে শিক্ষায় বেশি অর্থ ব্যয় এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিক্ষোভের পেছনে আরও গভীর সংকট রয়েছে। ইউরোপের বহু তরুণ মনে করছেন, তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। আন্তর্জাতিক সমাজতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি জিওফ্রে প্লেয়ার্স বলেন, ‘এই তরুণেরা শুধু মনে করেন না যে রাজনীতিতে তাদের কোনো জায়গা নেই; তারা মনে করেন, তাদের কথা একেবারেই শোনা হচ্ছে না।’ রোমের লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোজারিও ফোরলেনজা এই আন্দোলনকে ‘ইউরোপজুড়ে প্রজন্মগত বিদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এর মূলে রয়েছে এমন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট, যার কার্যকর সমাধান দিতে রাজনীতিকেরা ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তরুণেরা জনসংখ্যার এমন একটি অংশ, যাদের অনুপাত ক্রমেই কমছে। ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বও ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।’ ‘অন্যদের অনুপ্রাণিত করছি’ ফ্রান্স ও ইতালিতে তরুণদের ক্ষোভ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। দেশ দুটিতে শনিবার নতুন করে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। গত সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের বোর্দো শহরে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২০ বছর বয়সী এডি নামে এক শিক্ষার্থী এএফপিকে বলেন, ‘মানুষ খুব ক্ষুব্ধ, তারা আর সহ্য করতে পারছে না। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করেও কেনাকাটার ঝুড়ি ভরার মতো সামর্থ্য থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু ভাঙচুর করলে কি কিছু বদলাবে? আমার মনে হয়, এতে রাজনীতিকদের ঘুম ভাঙতে পারে। নিজেদের কথা শোনানোর জন্য আর কী করতে পারি, তা আমরা জানি না। ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন? এখন আর তাতে আমাদের বিশ্বাস নেই।’ ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলন একে অপরের কাছ থেকে ক্রমেই অনুপ্রেরণা নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত ও নেপালের মতো দেশগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন থেকেও তারা শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইতালিতে গত সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের একটি স্লোগানে বলা হয়, ‘ফ্রান্সের মতো করো’। এছাড়া জলদস্যুদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘জলি রজার’ পতাকাসহ বিভিন্ন অভিন্ন প্রতীক ইউরোপের তরুণদের সমাবেশে দেখা যাচ্ছে। মাদ্রিদের ২২ বছর বয়সী পরীক্ষাগারের মাননিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিবিদ মার্কোস নাভারো বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীরা নিজেদের কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নাভারো বলেন, ‘তারা আমাদের কাছে এসে জানতে চেয়েছেন, ‘তোমরা কীভাবে আন্দোলন করেছ? কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করো?’ আমরা ইতিমধ্যে নিজেদের মধ্যে নানা আইডিয়া বিনিময় করেছি।’ আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি ও উচ্ছেদের প্রতিবাদে গত সেপ্টেম্বর থেকে নাভারো মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় পুয়ের্তা দেল সল চত্বরে শত শত মানুষের সঙ্গে তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছেন। ওই শিবিরের চিকিৎসাকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা ২৬ বছর বয়সী নৃবিজ্ঞানী আইলা হেরেরো বলেন, ‘আমরা অন্যদের অনুপ্রাণিত করছি—এটা জানতে পারা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। আমাদের আন্দোলন শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।’ ‘এটা গ্রহণযোগ্য নয়’ ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাও তরুণদের বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের এক্সারখিয়া এলাকার ১৭ বছর বয়সী হাইস্কুল শিক্ষার্থী নিকোস মাভরুদিস বলেন, সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে তার স্কুলের পেছনে অর্থ ব্যয় করা হলে তা বেশি কাজে আসত। স্কুলের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে বলে তিনি জানান। মাভরুদিস বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষ বিপজ্জনক অবস্থায় থাকবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ ভবিষ্যতে রাঁধুনি হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই শিক্ষার্থী ইউরোপের অন্য কোনো দেশে চলে যেতে চান। তার ভাষায়, তিনি এমন দেশে যেতে চান, ‘যেখানে পরিস্থিতি আরও ভালো’। রোমের দখল করা মর্গাগনি হাইস্কুলে শিক্ষার্থীরা টেবিল দিয়ে প্রবেশপথ আটকে রেখেছেন। সেখানে বিক্ষোভকারীরা বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবকাঠামোকে কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, ইতালির সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতিকেরা কিছু বিক্ষোভকারীর লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এর ফলে এই ব্যবস্থার শিকার শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেই মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে।’ বিক্ষোভে সহিংসতার বিষয়ে ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইউনিয়নের সমন্বয়ক ২৪ বছর বয়সী সাবরিনা ব্রিজোলা বলেন, তার সংগঠনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই ‘প্রজন্মের ক্ষোভকে’ সংগঠিত করা এবং গঠনমূলক পথে পরিচালিত করা। তিনি বলেন, ‘আমাদের উদ্বেগগুলো একই রকম, যদিও প্রতিবাদের পদ্ধতি একেকজনের একেক রকম।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৭৫ সালের মধ্যে বিশ্বের অগভীর পানির প্রায় সব প্রবালপ্রাচীর ধসেচরম বিপন্ন হওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এ ধরনের প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়নে বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাটি বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থাকে ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এটি ঝুঁকি মূল্যায়নের সর্বোচ্চ শ্রেণি। প্রবাল তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল এবং মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে এবং প্রবালের ক্ষতিকর ব্লিচিং বা বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে ও তীব্র হচ্ছে। আইইউসিএনের প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রের লাল তালিকা মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক প্রধান মিশাল গুদকা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ হুমকি ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে এবং তা অত্যন্ত গুরুতর। এর ফলে এসব বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’ আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কপ-১৭ সম্মেলনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রাকৃতিকভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া ‘সুপার’ এল নিনো পরিস্থিতির উদ্ভবও এ বছর প্রবালের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। আইইউসিএন কপ-১৭ সম্মেলনে তাদের এ মূল্যায়ন তুলে ধরেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্েযর ক্ষয় বন্ধ ও তা পুনরুদ্ধারে ঐতিহাসিক চুক্তির বাস্তবায়নে অগ্রগতি অর্জনের জন্য সম্মেলনে সরকারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। মূল্যায়নের জন্য আইইউসিএন জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মধ্যম মাত্রার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়ে দেওয়া গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে বর্তমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলে চলতি শতাব্দীতে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে বুধবার জাতিসংঘ সতর্ক করেছে। আইইউসিএন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তাপীয় চাপ বিশ্বজুড়ে প্রবালপ্রাচীরের অবক্ষয়ের সবচেয়ে ধারাবাহিক হুমকি।’ সংস্থাটি জানায়, অতিরিক্ত মাছ ধরাও প্রবালের ক্ষতি করছে। কারণ, কিছু তৃণভোজী মাছ ও শিকারি প্রাণী শৈবালের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্যারটফিশ ও অন্যান্য গ্রুপার মাছ অতিরিক্ত আহরণের ফলে বিশ্বের ৬৩ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে। উপকূলীয় উন্নয়ন, দূষণ, পর্যটন এবং ঘন ঘন শক্তিশালী ঝড়ও প্রবালপ্রাচীরের জন্য বড় হুমকি। চরম বিপন্ন প্রবালপ্রাচীর আইইউসিএনের বিশ্লেষণে ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ১২৭টি প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রবালপ্রাচীরের মোট আয়তন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬২ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধিক জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কয়েকটি প্রবালপ্রাচীরকেও ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কোরাল ট্রায়াঙ্গল, ক্যারিবীয় অঞ্চলের মেসোআমেরিকান ব্যারিয়ার রিফ ব্যবস্থা এবং লোহিত সাগরের প্রবালপ্রাচীর। শক্ত প্রবাল, যেগুলো প্রবালপ্রাচীরের জীবন্ত ভিত্তি তৈরি করে, বেশির ভাগ বিলুপ্ত হয়ে সেখানে শৈবাল, ভাঙা প্রবালের টুকরো ও স্পঞ্জের আধিক্য দেখা দিলে একটি প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র ধসে পড়েছে বলে বিবেচিত হয়। গত সপ্তাহে ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক প্রবাল প্রজাতি বিলুপ্তির ‘বর্ধিত আপেক্ষিক ঝুঁকিতে’ ছিল। এ অবক্ষয়ের প্রধান কারণ ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে গুরুতর সতর্কতা সত্ত্বেও আইইউসিএন বলেছে, বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলের প্রবালপ্রাচীর এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সংস্থাটির মতে, ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস বাদ দিয়ে শুধু গত ৫০ বছরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন বিবেচনা করলে বিশ্বের ২৪ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রকে ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হতো। ভবিষ্যৎ উষ্ণায়নের প্রভাব যুক্ত করায় এ হার বেড়ে ৯৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গুদকা বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে সংরক্ষণ প্রচেষ্টা ও জলবায়ু কার্যক্রম জোরদার করার জন্য এটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা দাঁড় করেছে।’ তিনি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় সমুদ্র গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা কর্ডিও ইস্ট আফ্রিকার গবেষণা পরিচালকও। তিনি আরও বলেন, ‘আগামী কয়েক বছরে আমরা যে পদক্ষেপ নেব, তা নির্ধারণ করবে শতাব্দীর শেষভাগে এসব বাস্তুতন্ত্র কেমন থাকবে—আমরা যেভাবে এগুলোকে চিনি, সেভাবে টিকে থাকবে, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে, যার মূল্য প্রকৃতি ও মানুষের কাছে কম হবে।’ আইইউসিএনের মহাপরিচালক গ্রেথেল আগুইলার বলেন, প্রবালপ্রাচীরকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, কী করা প্রয়োজন—নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা জোরদার করা এবং সহনশীল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও এগুলোর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।’
সৌদি আরবে মাদক মামলায় এক ভারতীয় নাগরিকের ২৫ বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হলেও বিষয়টিতে কূটনৈতিকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করেছে দিল্লি। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাজা বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নের এই ঘটনাকে একেবারেই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে দেখা গেছে প্রতিবেশীদের নিয়ে দাদাগিরিতে মত্ত মোদি সরকারকে। দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সউদী আরবের দাম্মাম কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় কেরালার মাহের পেরিংগাদির বাসিন্দা আবৃত্তি ভাল্লিয়িরের (৪১)। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তারের পর তাকে প্রথমে ২৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সউদী রিয়াল জরিমানা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সউদী রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের প্রেক্ষিতে বিচারিক আদালত সেই রায় পরিবর্তন করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতীয় প্রবাসীর পরিবারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তোলা সত্বেও সউদী আরবের কঠোর সার্বভৌম আইন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে তাদের জিরো-টলারেন্স নীতি এবং ভারতের কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই এ বিষয়ে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ, রাষ্ট্রদূতকে কোনো তলব বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমানে একটি মোবাইল ফোনের দোকানে কর্মরত আবৃত্তি ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সউদী আরবে নতুন কাজের সন্ধানে ছিলেন। ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর, যেদিন তার দেশে ফেরার কথা ছিল, কান্নুরের ওই ব্যক্তি তাকে তার গাড়িটি সউদী আরবে নিয়ে গিয়ে সেখানে একজনের কাছে পৌঁছে দিতে বলেন। তাকে রিটার্ন টিকিটের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়। এদিকে তার পরিবার কালিকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (কারিপুর) তার জন্য অপেক্ষা করছিল। তার মোবাইল ফোনটি বাজেয়াপ্ত ও বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, ফলে তার কী হয়েছে তা পরিবারের জানা ছিল না। কয়েকদিন পর পরিবার তার গ্রেপ্তারের খবর জানতে পারে। পরিবারের ভাষ্যমতে, কান্নুরের এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে সউদী-ওমান সীমান্ত দিয়ে একটি গাড়ি সউদী আরবে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে ভিসা ও যাতায়াতের টিকিটের লোভ দেখায়। ওই ব্যক্তি আবৃত্তিকে জানান যে গাড়ির দুটি ট্যাংকের মধ্যে একটি লিক আছে, তাই যেন সেখানে পেট্রোল না ভরা হয়। প্রকৃতপক্ষে, সেই ফুয়েল ট্যাংকের ভেতরেই ৪৩ কেজি মেথঅ্যামফিটামিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সীমান্ত পার হওয়ার সময় গাড়ি তল্লাশি করে মাদক উদ্ধার করা হয় এবং সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও আবূত্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। আবূত্তিই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। মৃত্যুকালে তিনি মা, স্ত্রী, দুই সন্তান ও তিন বোনকে রেখে গেছেন। তার বাবা আগেই মারা যান। অর্থসংকটের কারণে তার পরিবার সউদী আরবে উপযুক্ত আইনি সহায়তা নিতে পারেনি বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, আবৃত্তির বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, দুই সন্তান এবং তিন বোন তাকে বাঁচানোর জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। পরিবার সরকারের কাছে বারবার আবেদন জানিয়ে এসেছেন যে তিনি সম্পূর্ণ নিরপরাধ এবং তাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। পরিবারের অভিযোগ, যে ব্যক্তি আবৃত্তিকে গাড়িটি দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তিনি তাকে প্রতারিত করার কথা স্বীকার করেন এবং বিষয়টি মিটমাট করার জন্য টাকার প্রস্তাবও দেন, কিন্তু তার সত্বেও তার মুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দিল্লির কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে দায়ী করে এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় ভারতীয়দের। পরিবার আরও অভিযোগ করে যে, আবৃত্তির মুক্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্য এক ব্যক্তি তাদের কাছ থেকে আড়াই লাখ (২.৫ লাখ) রুপি হাতিয়ে নিয়েছে। দিল্লির নীরবতা: কেন কোনো ‘টু শব্দ’ করেনি ভারত? এদিকে, আবূত্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর এবং এর আগে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো কূটনৈতিক প্রতিবাদ বা জোরালো হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরেও রিয়াদের বিরুদ্ধে দিল্লি কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি বা কঠোর মন্তব্য করেনি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উদ্বেগকে আমলে নিয়ে বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি ভারতের মানবাধিকার সংগঠনগুলোকেও। প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সবসময় নাক গলানো ও শক্তিশালী কূটনীতির দাবি করা দিল্লির এই নীরবতার পেছনে মূলত কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমত; সউদী আরবে তাজির আইনে মাদক পাচার বা চোরাচালানের মতো অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর (স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর বিচারিক রায়)। এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সউদী সরকার সাধারণত অন্য কোনো দেশের কূটনৈতিক চাপে রায় শিথিল করে না। দ্বিতীয়ত; ভারত ও সউদী আরবের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত ঘনিষ্ট কৌশলগত, বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে তেল বাণিজ্য ও কোটি কোটি ভারতীয় প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষায় দিল্লি সাধারণত এমন সংবেদনশীল বিচারিক বিষয়গুলোতে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত থাকে। ফলে ভারত সরকার এ ধরনের মামলায় সাধারণত অভিযুক্তকে আইনি সহায়তা প্রদান ও কনস্যুলার অ্যাক্সেস নিশ্চিত করার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রেখেছে, একে রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদে রূপ দেয়নি।’