উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছরে নতুন ঋণ নেয় ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার। চড়া সুদ ছাড়াও ঋণের বড় অংশই ছিল কঠিন শর্তের জালে বন্দি।
বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে আগামী অর্থবছরে, ইতোমধ্যে চলতি মার্চ পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৪০০ কোটি ডলার। আর স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট বিদেশি ঋণের মধ্যে ৭৮ শতাংশই নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ওই সরকারের সময় ২০০৮ সালে তা বেড়ে হয় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
ওই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর ২০২৪ সালে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৪৭৬ কোটি ডলারে। অন্তর্বর্তী সরকার ডলার–সংকট মেটাতে ঋণ নেয়। ফলে ২০২৫ সালে বিদেশি ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
অর্থাৎ দেশের মোট বিদেশি ঋণের ৭৯.৯২ শতাংশ নিয়েছে আ.লীগ সরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ২০০৯ সালের শুরুতে ডলারের দাম ছিল ৬৯ টাকা। তবে ক্ষমতা ছাড়ার সময়ে ২০২৪ সালের আগস্টে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ টাকা। এমনকি ব্যাংকে ১৩২ টাকা দরেও ডলার বিক্রি হয়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে বেড়েছে বৈদেশিক ঋণের সুদের হারও।
২০০৯ সালের শুরুতে বৈদেশিক ঋণের সুদহার ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশ। কোনো কোনো খাতে আরো কম। এখন ঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ থেকে ৯ শতাংশ। ২০২২ থেকে ২৪ সালে বৈশ্বিক মন্দার সময়ে এ হার আরও বেশি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী মোট ঋণের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ঋণের সুদ ও বিনিময় হারই বাজারভিত্তিক হবে। অর্থাৎ ঋণ যখন পরিশোধ করা হবে তখন বাজারে যে সুদহার ও ডলারের দাম যা থাকবে ওই হারে পরিশোধ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ৫১ টাকা। এতে সমান হারে টাকার মান কমেছে। ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে নিয়মিত বাড়তি সুদের পাশাপাশি দণ্ড সুদ বা সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এতে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। মোট ঋণের প্রায় ৭৬ শতাংশ চড়া সুদ ও কঠিন শর্তের ঋণ। এসব শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াতে হয়েছে। এসব মিলে বৈদেশিক ঋণের অর্থ অপব্যবহারের ফলে সব চাপ পড়েছে জনগণের ওপর।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেপরোয়া বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার কারণে এখন ওই সব ঋণ পরিশোধের চাপও বেশি। সরকারি বা বেসরকারি খাতের প্রতিটি ঋণের বিপরীতেই রাষ্ট্র বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্যারান্টি রয়েছে। ফলে অনেক ঋণগ্রহীতা এখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বা জেলে থাকলেও ওইসব ঋণ এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে পরিশোধ করতে হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রাহকের নামে ফোর্স লোন সৃষ্টি করে বাজার থেকে চড়া দামে ডলার কিনে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সূত্রমতে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট বিদেশি ঋণের ৭৮ শতাংশই নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। বাকি ২২ শতাংশ নেওয়া হয়েছে অন্যান্য সরকারের আমলে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঋণের প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত শুধু সরকারি খাতেই ৪০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে হবে। এরপর থেকে ঋণ পরিশোধ কমতে থাকবে। সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ শোধ করার নিয়ম হচ্ছে রাজস্ব আয় বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে টাকা দেবে সরকার। ওই অর্থ দিয়ে ডলার কিনে ঋণ শোধ করা হবে। এখন অর্থনৈতিক মন্দায় রাজস্ব আয় কম হওয়ায় বৈদেশিক ঋণ শোধের জন্য টাকার জোগান রাজস্ব আয় থেকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারকে স্থানীয়ভাবে ঋণ নিয়ে তা দিয়ে ডলার কিনে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৭ ডলারে। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে ছিল ১৬৯ ডলার। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪৩৮ ডলার। মাথাপিছু মোট বৈদেশিক ঋণের ৭০ দশমিক ৫১ শতাংশই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেড়েছে। বাকি ২৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়েছে অন্যান্য সরকারের আমলে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মাথাপিছু বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৭ ডলারে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থাৎ ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। ক্ষমতা ছাড়ার সময়ে ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। আলোচ্য সময়ে দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার।
সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপে পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ যুদ্ধের অজুহাতে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে এখন রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশি ঋণ ও অনুদান বাবদ যেসব বৈদেশিক মুদ্রা আসে তা দিয়ে আমদানি ব্যয়, সেবা খাতের ব্যয়, বেসরকারি খাতের ঋণ পরিশোধ করার পর বাড়তি ডলার থাকছে না। ফলে রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে সরকারি খাতের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভে চাপ বেড়েছে। অথচ আগে দৈনন্দিন আসা ডলার থেকে ওইসব ব্যয় মিটিয়ে যা উদ্বৃত্ত থাকত তা দিয়ে সরকারি খাতের ঋণ শোধ করা হতো।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়েও বছরে বৈদেশিক ঋণ বাবদ পরিশোধ করা হতো ১৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলার। এখন পরিশোধ এত বেড়েছে যে, শুধু গত অর্থবছরেই পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে পরিশোধের পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সে অনুপাতে দেশের রিজার্ভ না বাড়ায় এখন ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত একেবারেই কম। এ অনুপাত এখন ২৩ শতাংশে নেমেছে। ২০২০ সালে যা ছিল ৬০ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর গবেষক হেলাল আহমেদ জনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সেগুলো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করলে কিছুটা সুফল মিলত। কিন্তু ঋণের টাকার একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বিদেশি ঋণের টাকায় দেশে কিছুই করা হয়নি। বরং দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ায় দেশের দায় বেড়েছে। সাধারণত বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তা যদি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়-এমন সব প্রকল্পে ব্যয় করা হলে তাহলে পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে তার প্রায় সবই খরচ করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রা নির্ভর প্রকল্পে। ফলে দুভাবে ওইসব ঋণ অর্থনীতিতে ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
এক. পাচার করে ও দুই. স্থানীয় অর্থ আয় নির্ভর প্রকল্পে ব্যয় করে। যে কারণে এখন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী রিজার্ভ বাড়ানো যাচ্ছে না। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এ নেতিবাচক প্রভাব আরো বেড়েছে। যার সরাসরি দায় বহন করতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতে অর্থায়ন বাড়িয়ে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিল বাস্তবায়নে বুধবার (১৯ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মধ্যে চুক্তি সই হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এবং পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের। এ সময় দুই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ২৩ মে দেশের কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে পিকেএসএফের মাধ্যমে বিশেষায়িত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তহবিল ব্যবহারে দেশব্যাপী কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে পিকেএসএফ। কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সম্ভাবনাময় ব্যবসাগুচ্ছ ও মাইক্রোএন্টারপ্রাইজে বাড়ানো হবে অর্থায়ন। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পিকেএসএফ জানিয়েছে, কর্মসূচিটি তিনটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হবে। এগুলো হলো—আর্থিক পরিষেবা প্রদান, ব্যবসাগুচ্ছভিত্তিক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন। এর মাধ্যমে শুধু ঋণ বিতরণ নয়, উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতাও বাড়ানো হবে। তহবিলটি আবর্তক তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে। ফলে একবার অর্থায়ন করা অর্থ পুনরায় ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায় অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে অর্থের প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও পিকেএসএফের এ উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সংকট কমিয়ে দেশের তৃণমূল অর্থনীতিকে আরো সক্রিয় করার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
শাকসবজির দাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও জীবনযাপনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, “শাকসবজির দাম বেশি মনে হলেও উৎপাদন খরচের বিষয়টিও দেখতে হবে। কারণ, কৃষকেরও পেট আছে, সংসার আছে, বাঁচতে তো হবে।” মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) কৃষিপণ্য রফতানি বাড়াতে কার্গো ভিলেজ, কোল্ড স্টোরেজ ও কুল রুমসহ বিমানবন্দরে বিভিন্ন সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। কৃষিমন্ত্রী বলেন, “আমি প্রত্যেক দিন বাজার করি এবং ব্যাগ নিয়ে। মহাখালী বাজার আমার পরিচিত বাজার।” বর্ষা মৌসুমে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে কৃষিপণ্যের যে দাম আছে, এটা বৃষ্টির সিজন। এই সিজনে বিশেষ করে ভেজিটেবল উৎপাদন করা খুব সহজ কাজ না। পানি জমে গেলে গাছ মরে যায়। তার পর উৎপাদন খরচটাও একটু বেশি থাকে। কাঁচামরিচের উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “এ ধরনের ফসল উৎপাদনে শেড তৈরি করতে হয়, যা ব্যয়বহুল।” সবজির কেজি দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “এক কেজি করলা ফলাইতে কয় টাকা খরচ হয়, একটু দেখেন না। কৃষকেরও পেট আছে, সংসার আছে, বাঁচতে তো হবে!” উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয়ে গুরুত্ব কৃষিপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন এখনো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ কারণে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে উৎপাদন ও চাহিদার হিসাব আরও নির্ভুল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি যদি জানি আমার এই জেলায়, এই উপজেলায় ভেজিটেবলের চাহিদা আছে, সেই অনুযায়ী ওই এলাকার কৃষককে যদি উদ্বুদ্ধ করতে পারি—ভাই, তুমি এটা ফলাও, তোমার উপজেলায় এটা বিক্রি হবে। এর কিন্তু ক্যারিং কস্ট নাই।” মন্ত্রীর মতে, কোন এলাকায় কোন কৃষিপণ্যের চাহিদা রয়েছে, সেই তথ্য অনুযায়ী উৎপাদন পরিকল্পনা করা গেলে কৃষকের পরিবহন খরচও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ হবে। উৎপাদন এলাকায় মিনি কোল্ড স্টোরেজ কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে মিনি কোল্ড স্টোরেজের ধারণা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে বলেও জানান কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষক যে এলাকায় ফসল উৎপাদন করবেন, তার কাছাকাছি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে ফসল পরিবহনের ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “কৃষক যেখানে ফলাবে, তার গ্রামে এসে কাঁধে ভারে, মাথায় নিয়ে কোল্ড স্টোরেজে নিয়ে রাখবে। কোনো ক্যারিং কস্ট নাই। তাহলে তার কস্টিংটা কমে যাবে। এই কনসেপ্ট নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, উৎপাদনস্থলের কাছাকাছি সংরক্ষণ সুবিধা তৈরি করা গেলে একদিকে কৃষকের ব্যয় কমবে, অপরদিকে কৃষিপণ্য দ্রুত সংরক্ষণ করে বাজারে সরবরাহের সময়ও আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার একটি ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত চার শতাংশ কৃষিতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা দিয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এত দিন মোট ঋণের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষিতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা ছিল। সে হিসাবে, গত অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এক সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকসমূহ ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই এই নীতিমালার প্রধান উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে তিনি কৃষি ঋণ কর্মসূচির তদারকি জোরদার করতে একটি বিশেষ ‘ওয়েব বেসড এগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস সফটওয়্যার’ করা হয়েছে। নতুন নীতিমালার উল্লেখযোগ্য ও নতুন বিষয় এবারের নীতিমালায় বেশকিছু নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের জন্য প্রচলিত স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক বা দলবদ্ধ জামানত ব্যবহার করা যাবে। বিশেষ করে, নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এই অর্থায়ন সহজ করা হয়েছে। শস্য, ফসল এবং মৎস্য খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ অঞ্চলের বিভিন্ন আয়-উৎসারি কর্মকাণ্ডে দলবদ্ধভাবে ঋণ দেওয়া যাবে এবং দলের সদস্য সংখ্যার সীমা শিথিল করা হয়েছে। নীতিমালায় নতুন খাত হিসেবে হ্যাচারিতে মাছ ও হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ব্লুবেরি ফল, শিমুল মূল, অর্শ্বগন্ধা ও ডিমের খোসা দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের মতো নতুন নতুন খাতকে ঋণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রকৃত কৃষক যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় কৃষি, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়ন অথবা সরকারি ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবহার করা হবে। ঋণ পাওয়ার জন্য পাসবই থাকার বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কৃষকদের বিমা সুবিধার আওতায় আনার নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করে, এই সময়োপযোগী নীতিমালা দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।