ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনে ব্যবহৃত সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং সিএনজির দাম ৪৩ টাকা থেকে প্রায় ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে। গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলোও বিতরণ মাশুল বাড়ানোর আবেদন করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোবাংলার প্রস্তাব বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠানো হবে। এরপর কমিশন গণশুনানি করবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত ও আর্থিক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ করবে।
বর্তমান আইনে দেশে গ্যাসের দাম নির্ধারণ ও পরিবর্তনের দায়িত্ব বিইআরসির। পেট্রোবাংলা কিংবা গ্যাস বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাব সরাসরি কার্যকর হয় না। কমিশনের অনুমোদনের পরই নতুন দাম কার্যকর করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি খাতের গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক বা বিদ্যমান শিল্প গ্রাহকদের জন্য নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং একই বছরের নভেম্বরে সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে ২৯ দশমিক ২৫ টাকা করা হয়েছিল।
এদিকে গ্যাসের দামের পাশাপাশি বিতরণ মাশুলও বাড়াতে চায় বিতরণ কোম্পানিগুলো। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বর্তমান ৩৭ পয়সার পরিবর্তে ১ টাকা ২১ পয়সা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি ২৪ পয়সা থেকে ৪১ পয়সা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরা হলে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ পয়সা এবং ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা বিতরণ চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫ পয়সা করার আবেদন করেছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, বর্তমান মাশুল দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান অপরিচালন আয় দিয়ে কোনোভাবে টিকে আছে। লোকসান অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
এ বিষয়ে জানতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নানের মোবাইলে গতকাল বৃহস্পতিবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও ফোন ধরেননি।
জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি শুনেছি। তবে আমাদের কাছে এখনও প্রস্তাব আসেনি। প্রস্তাব এলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ার কারণে গ্যাস সংগ্রহে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উৎস থেকে কেনা গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ঘনমিটার ৩১ দশমিক ৬৫ টাকা। বিপরীতে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২৩ দশমিক ৬৩ টাকা। ফলে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৮ দশমিক শূন্য ২ টাকা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঘনমিটারে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ২৭ দশমিক ৬৪ টাকা। কিন্তু এপ্রিল থেকে জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ৭৯ টাকায়। ওই তিন মাস আগের বিক্রয়মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি বেড়ে হয় ২১ দশমিক ৮২ টাকা। এতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
দেশি ও বিদেশি–উভয় উৎস থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করে পেট্রোবাংলা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কেনা হয় ১ টাকায় এবং বাপেক্স থেকে ৪ টাকায়। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেভরন বাংলাদেশ থেকে প্রতি হাজার ঘনফুট ২ দশমিক ৭৬ ডলার এবং আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি তাল্লো থেকে ২ দশমিক ৩১ ডলার দরে গ্যাস কেনা হয়। অন্যদিকে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম প্রতি হাজার ঘনফুট ১০ দশমিক ৬৬ ডলার এবং ওমান থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম ১০ দশমিক ৯ ডলারের কাছাকাছি। ফলে দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা এলএনজির ব্যয় কয়েক গুণ বেশি।
একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হলেও মজুত কমে যাওয়ায় তা এখন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে আমদানির মাধ্যমে এবং ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে। তবে পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে এই চিত্র উল্টে যেতে পারে। তখন দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হবে এবং দেশীয় উৎসের অবদান নেমে আসবে ৩০ শতাংশে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ৩০ শতাংশ আমদানি করা গ্যাসের কারণেই গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে আমদানি নির্ভরতা ৭০ শতাংশে পৌঁছালে এই চাপ আরও বাড়বে। সে কারণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম না হওয়ায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে প্রতিবছর অন্তত চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নতুন গ্যাস সংযোগে। বর্তমানে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ প্রায় বন্ধ। বিদ্যমান অনেক শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে শুধু আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আগামীকাল শনিবার (১ আগস্ট) থেকে সব গণপরিবহনে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ডিভাইস সংযোজন ও সচল রাখা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। এদিন থেকে নতুন রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ নবায়নের সময় জিপিএস সংযোজনের প্রমাণপত্র এবং মোবাইল অ্যাপে এর কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে হবে। এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নয়, কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। দেশের সড়কে প্রতিদিনই দেখা যায় গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চিত্র। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় বাসের বেপরোয়া রেষারেষি, যেখানে-সেখানে থেমে যাত্রী ওঠানামা এবং একাধিক লেন দখল করে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে প্রায়ই সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। এতে দুর্ভোগ বাড়ে সাধারণ যাত্রীদের, ব্যাহত হয় স্বাভাবিক যান চলাচলও। এ অবস্থায় সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে সব গণপরিবহনে জিপিএস ডিভাইস স্থাপন ও সচল রাখাকে বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির গাড়িতে জিপিএস সংযোজনের বিষয়ে এরই মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তবে ১ আগস্ট থেকেই সব গাড়িতে এটি পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হবে না। এজন্য আরো কিছু সময় প্রয়োজন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জিপিএস সংযুক্ত ও সচল না থাকলে কোনো গণপরিবহনের নতুন নিবন্ধন বা ফিটনেস সনদ দেওয়া কিংবা নবায়ন করা হবে না। এ বিষয়ে পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বিআরটিএ চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, নতুন কোনো গাড়ি নিবন্ধনের জন্য এলে জিপিএস সংযুক্ত অবস্থায়ই আসতে হবে। একইভাবে ফিটনেস সনদ নবায়নের ক্ষেত্রেও জিপিএস থাকা বাধ্যতামূলক। বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য বিআরটিএ নিজস্ব প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে, যেন সহজেই নিশ্চিত হওয়া যায় কোনো যানবাহনে জিপিএস সংযুক্ত রয়েছে কি না। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সংস্কারও জরুরি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারও করতে হবে। প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন তা সুশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এ উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ ও লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনে জিপিএস সংযোজন কতটা বাস্তব ফল দেবে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
জুলাই গণ-আন্দোলনের অর্জন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একার নয়, এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্মিলিত অর্জন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বলেন, জনগণ যে রায় দিয়েছেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলে সেই রায় মেনে নিতে হবে। জনগণের রায় অস্বীকার করা মানে জনগণকে অপমান করা। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার বিরোধিতা করা হবে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে আয়োজিত বাংলাদেশ পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন সরকার অন্যায়ভাবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে সেই সিদ্ধান্তের কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। জনগণের আন্দোলন ও আল্লাহর ইচ্ছার কারণেই তা সম্ভব হয়েছিল। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে শ্রমিক সমাজ। জাতিসংঘের তথ্য মোতাবেক, প্রায় এক হাজার ৪০০ শহীদের মধ্যে পেশাভিত্তিক হিসেবে শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। এরপর ছাত্র এবং সাধারণ জনগণ সবচেয়ে বেশি আত্মত্যাগ করেছেন। সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, দেশে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কমেনি, বরং বেড়েছে। পরিবহণ শ্রমিকরা এখনো চাঁদাবাজদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, গাড়ি ভাঙচুরসহ নানা হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকারের এক জ্যেষ্ঠ নেতাও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। যখন ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিলেন, তখন কি এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো নৈতিকতা থাকে? নৈতিক দিক থেকে সরকার দেশ পরিচালনার অধিকার হারিয়েছে। পরিবহণ শ্রমিকদের ১২ দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় এসব দাবি উত্থাপন করতে হচ্ছে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী পাশে থাকবে। জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে কেউ যেন একক দাবি না করে, সে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই আন্দোলন কোনো দলের ছিল না; এটি পুরো জাতির আন্দোলন। আহত ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার বিরোধিতা করা হবে। সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, বাংলাদেশ পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কবির আহমদ প্রমুখ।
বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার বিষয়ে প্রকাশিত এক জরিপের পর বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানিয়েছে, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার বিএসটিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত এক জরিপে সাতটি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে বিএসটিআই নিজ উদ্যোগে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে স্বতন্ত্র পরীক্ষাগারে পরীক্ষা শুরু করেছে। বিএসটিআই জানায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিক বা অন্যান্য অজৈব পদার্থের অতিক্ষুদ্র কণা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদীয়মান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংস্থাটি আরো জানায়, বাংলাদেশে বিডিএস ১২১৬:২০১২ স্পেসিফিকেশন ফর টুথপেস্ট অনুযায়ী টুথপেস্টে ক্ষতিকর উপাদান, জীবাণু এবং বিষাক্ততার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। পরীক্ষায় কোনো টুথপেস্টে মাইক্রোবিডের উপস্থিতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোক্তাদের উদ্দেশে বিএসটিআই পরামর্শ দিয়েছে, টুথপেস্ট কেনার সময় উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, বিএসটিআইয়ের সিএম লাইসেন্স নম্বর যাচাই করতে হবে এবং অজানা বা অনুমোদনহীন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া আমদানীকৃত টুথপেস্টের ক্ষেত্রেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমদানি ও বাজারজাতকরণে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই।