র্যাব-১ কার্যালয়ের গোপন বন্দিশালা ‘টিএফআই সেল’-এ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কক্ষটি শনাক্ত করা হয়েছে।
শনিবার (১ আগস্ট) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নিয়ে র্যাব-১ এর টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির রুল ৪৬এ, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল এই বিচারিক পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, এতদিন ‘আয়নাঘর’ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হলেও বিচারকদের শুধু নথি বা সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর না করে ঘটনাস্থল সরেজমিনে দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ একটি মেমোরেন্ডামে লিপিবদ্ধ হবে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।
পরিদর্শনে ভবনের ভেতরে মোট ২২টি ছোট-বড় কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো। তাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে অনেককে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি। তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীসহ আরও অনেকে রয়েছেন। গত বছরের আগস্টের পর কয়েকজন ভুক্তভোগী ফিরে এসে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে মিলিয়ে আয়নাঘরের কয়েকটি নির্দিষ্ট কক্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, ব্যারিস্টার আরমানকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, তদন্তকারীরা সেটিও শনাক্ত করেছেন। একইভাবে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে র্যাব-১ এর এই স্থাপনায় একটি কক্ষে আটকে রাখার এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, র্যাব-১ এর টিএফআই সেল পরিদর্শনের পর এবার ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত আরেকটি গোপন আটককেন্দ্র, জেআইসি, পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে আগামী শনিবার বিচারকেরা সেখানে বিচারিক পরিদর্শনে যাবেন।
আইনগত বিষয় তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয় এবং গ্রেফতারের কারণ জানাতে হয়। একই বাধ্যবাধকতা রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারায়। কিন্তু আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সাংবিধানিক ও আইনি বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, অবৈধভাবে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার মতো অভিযোগগুলো শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এসব অভিযোগে ইতিমধ্যে বিচার চলছে এবং আরও অনেক ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল তুলে আগের কাঠামো আড়াল করার চেষ্টার আলামতও দেখা গেছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, তদন্তের শুরুতে ঘটনাস্থলের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তদন্ত কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে কয়েকটি স্থানে নতুন করে নির্মিত দেয়াল অপসারণ করা হয়। তখনই আড়ালে থাকা কক্ষগুলো বেরিয়ে আসে এবং সেখানে ভয়াবহ পরিস্থিতির বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ভবনের নিচতলায় একটি কক্ষকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিচে ও ওপরে মিলিয়ে মোট ২২টি কক্ষ পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় কোনো বৈধ প্রয়োজনে ব্যবহার না হলে এতগুলো ছোট ছোট কক্ষ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল, তার জবাব সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদেরই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, পরবর্তীকালে দেয়াল তুলে বা নতুন নির্মাণের মাধ্যমে যারা এসব কক্ষের অস্তিত্ব গোপন করার চেষ্টা করেছেন, তারাও বিচারের বাইরে থাকবেন না। প্রমাণ নষ্ট বা আড়াল করার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে বিচার পরিচালনায় প্রসিকিউশন অঙ্গীকারবদ্ধ। তার দাবি, আয়নাঘরের বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে এটি কোনো ‘রূপকথার গল্প’ নয়, বরং একটি ভয়াবহ বাস্তবতা।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মাঠপর্যায়ে যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাদের পাশাপাশি যাদের নির্দেশে এসব হয়েছে এবং সে সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মানবপাচার বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর, অমানবিক ও নিষ্ঠুর অপরাধগুলোর একটি। এটি প্রতিরোধে আইনকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আইন মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দফতর (ইউএনওডিসি) আয়োজিত ‘মানব পাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া শক্তিশালীকরণ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শ সভা’য় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মানবপাচার প্রতিরোধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। মানবপাচারের সংজ্ঞাকে আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করা হয়েছে, যাতে এর বিস্তৃত পরিসরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা যায়। তিনি বলেন, অনলাইন জুয়া, অনলাইনের মাধ্যমে সংঘটিত পাচারসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মানবপাচারবিষয়ক প্রোটোকল অনুমোদন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী বাংলাদেশ এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তবে মামলা পরিচালনা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জনবল, অভিযোগকারীদের সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, এর জন্য বিচারকদের দোষারোপ করা যায় না; বরং এটি বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার বিষয়। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৪৬ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন। সরকার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে তিনি বলেন, জীবিকা ও উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধানে মানুষকে বিদেশে যাওয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখা সম্ভব নয়। তবে বিদেশে গিয়ে অনিয়মিত অভিবাসীতে পরিণত হয়ে অনেক বাংলাদেশি নানা ধরনের দুর্ভোগের শিকার হন। তাদের অধিকার সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। আইনমন্ত্রী বলেন, লিগ্যাল এইড অধিদপ্তর অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশাপাশি অভিবাসী কর্মীদেরও আইনগত সহায়তা প্রদান করছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীরা প্রয়োজন হলে এ সহায়তা নিতে পারেন। এ জন্য লিগ্যাল এইডের হটলাইনও রয়েছে। তিনি বলেন, নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের গঠনমূলক পরামর্শকে সরকার স্বাগত জানায় এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। মাদক অপরাধ মোকাবিলার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশোধিত আইন মাদকসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, অনলাইনে মাদক বিক্রি ও ক্রয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় সরকার পুলিশের একটি পৃথক সাইবার ইউনিট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। আইন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইউএনওডিসির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিস্টিয়ান হোলগে। অনুষ্ঠানে আইন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, ইউএনওডিসি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য দাখিলের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পাশাপাশি প্রার্থীর নিয়োজিত নির্বাচনী এজেন্টের ব্যাংক হিসাব নম্বর অন্তর্ভুক্ত করার বিধান করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮ সংশোধন করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন গতকাল বুধবার জারি করা হয়েছে। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ৯৪-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধান সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত বিধানের ফলে মনোনয়নপত্রের ফরম-১-এ নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে প্রার্থী অথবা প্রার্থীর নিয়োজিত নির্বাচনী এজেন্টের হিসাব নম্বর উল্লেখের বিধান যুক্ত হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮-এর সংশোধনের পাশাপাশি প্রার্থীর হলফনামা সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় প্রার্থীর হলফনামার সংযুক্তি-১-এর ক্রমিক ৩(খ)-এর বিশেষ দ্রষ্টব্য অংশে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যে তথ্য ‘সংযুক্ত করিতে হইবে’ বলা হয়েছিল, সংশোধনের পর তা ‘দাখিল ঐচ্ছিক মর্মে বিবেচিত হইবে’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া হলফনামার সংযুক্তি-১-এর ক্রমিক ৩(গ)-এ ‘অভিযুক্ত’ শব্দটির ব্যাখ্যাও যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত বলতে সেই আসামিকে বোঝাবে, যার বিরুদ্ধে আদালত কর্তৃক অভিযোগ (charge) গঠিত হয়েছে। হলফনামার আরেকটি ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান ও নির্ভরশীলদের আয়করসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার বিষয়টি ঐচ্ছিক করা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় ক্রমিক ১০-এর বিশেষ দ্রষ্টব্যে বলা হয়েছে, ছকের ক্রমিক ২, ৩ ও ৪-এ উল্লিখিত যথাক্রমে স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান ও নির্ভরশীলদের আয়করসংক্রান্ত তথ্য প্রদান ঐচ্ছিক হিসেবে বিবেচিত হবে। নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতীকের তালিকাতেও নতুন করে বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধিত বিধি ৯-এর উপ-বিধি (১) অনুযায়ী, বিধির অন্যান্য বিধান সাপেক্ষে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অনুচ্ছেদ ২০-এর দফা (১)-এর অধীন স্থগিত প্রতীক ব্যতীত তালিকাভুক্ত প্রতীকগুলোর মধ্য থেকে প্রাপ্যতা সাপেক্ষে যে কোনো একটি প্রতীক বরাদ্দ করা যাবে। গেজেটে মোট ১২০টি নির্বাচনী প্রতীকের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকার ৬৫ নম্বর প্রতীক হিসেবে ‘নৌকা’ স্থগিত উল্লেখ করা হয়েছে। সংশোধিত বিধানে স্থগিত প্রতীক বাদ দিয়ে প্রাপ্যতা সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা-২০০৮ সংশোধন করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক স্থগিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ও রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের জন্য ১২০টি প্রতীক সংরক্ষণ করা হয়েছে। একক প্রার্থী থাকা আসনে ভোটারদের মতামত জানানোর সুযোগ দিতে যুক্ত করা হয়েছে ‘না’ প্রতীক। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার, ১৯৭২-এর আর্টিকেল ৯৪-এ দেয়া ক্ষমতাবলে এ অধিকতর সংশোধনী প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিধিমালার বিধি-৯ এর উপবিধি (১) প্রতিস্থাপন করে নতুন প্রতীক তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২০-এর দফা (১) অনুযায়ী, স্থগিত প্রতীক বাদ দিয়ে সংরক্ষিত তালিকা থেকে প্রাপ্যতা সাপেক্ষে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। সংরক্ষিত ১২০টি প্রতীকের মধ্যে রয়েছে—আনারস, আপেল, আম, আলমিরা, ঈগল, উট, গরুর গাড়ি, গাভী, গামছা, গোলাপ ফুল, ঘণ্টা, ঘুড়ি, ট্রাক, ট্রাক্টর, ডাব, ড্রেসিং টেবিল, ঢেঁকি, তারা, ফুলের মালা, বই, বক, বটগাছ, সাইকেল, বাঘ, রকেট, রিকশা, রেল ইঞ্জিন, লাঙল, লিচু, শাপলা কলি, উদীয়মান সূর্য, একতারা, কবুতর, কম্পিউটার, কলম, কলস, কলার ছড়ি, কাঁচি, কাঁঠাল, কাপ-পিরিচ, কাস্তে, কুঁড়ে ঘর, কুড়াল, কুমির, কুলা, কেটলি, কোদাল, খেজুর গাছ, ঘোড়া, চশমা, চাকা, চাবি, চিংড়ি, চিরুনি, চেয়ার, ছড়ি, ছাতা, জগ, জাহাজ, টর্চ লাইট, টিউবওয়েল, টেবিল, টেবিল ঘড়ি, টেবিল ল্যাম্প, টেলিফোন, টেলিভিশন, তালা, থালা, দাঁড়িপাল্লা, দালান, দেওয়াল ঘড়ি, দোতলা বাস, দোয়াত কলম, দোলনা, ধানের শীষ, নোঙ্গর, নৌকা (স্থগিত), পাগড়ি, পানির ট্যাপ, পালকি, প্রজাপতি, ফুলের ঝুড়ি, ফুটবল, ফুলকপি, বালতি, বেবী টেক্সি, বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক বাল্ব, মই, মগ, ময়ূর, মশাল, মাইক, মাছ, মাথাল, মিনার, মোটরগাড়ি (কার), মোটরসাইকেল, মোড়া, মোবাইল ফোন, মোমবাতি, মোরগ, সিংহ, সিঁড়ি, সূর্যমুখী ফুল, সেলাই মেশিন, সোনালি আঁশ, সোফা, হরিণ, হাঁস, হাত (পাঞ্জা), হাতঘড়ি, হাতপাখা, হাতি, হাতুড়ি, হারিকেন, হুক্কা, হেলিকপ্টার, হ্যান্ডশেক ও ‘না’ প্রতীক। এছাড়া প্রজ্ঞাপনে মনোনয়নপত্র ও হলফনামা দাখিলের বিধিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। তফসিল-১ এর ফরম-১ এর তৃতীয় অংশে নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য ব্যাংক হিসাব নম্বরের পাশাপাশি প্রার্থী অথবা তার নির্বাচনি এজেন্টের হিসাব নম্বর যুক্ত করার শর্ত রাখা হয়েছে। হলফনামার সংযুক্তি-১ এর ৩(খ) অংশে বিশেষ দ্রষ্টব্যের ‘সংযুক্ত করিতে হইবে’ বাক্যটি পরিবর্তন করে ‘দাখিল ঐচ্ছিক মর্মে বিবেচিত হইবে’ করা হয়েছে। এছাড়া ৩(গ) অংশে নতুন দ্রষ্টব্য যুক্ত করে বলা হয়েছে, ‘অভিযুক্ত’ বলতে এমন আসামিকে বোঝাবে, যার বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ বা চার্জ গঠন করেছে। প্রজ্ঞাপনের ১০ নম্বর ক্রমিকের নতুন দ্রষ্টব্য অনুযায়ী, প্রার্থীর স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং নির্ভরশীলদের আয়করসংক্রান্ত তথ্য দাখিল করাও ঐচ্ছিক হিসেবে গণ্য হবে।