ঢাকা সারা বিশ্বে ১২৬টি নগরীর মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। এবারই প্রথম না, এর আগেও এত শীর্ষে আমরা পৌঁছাতে পেরেছি। তবে এই শীর্ষস্থান দখল উদযাপন করার বিষয় না—দূষণে তৃতীয় হয়েছে আমাদের শহর ঢাকা। গত এক মাস ধরেই উত্তরোত্তর খারাপের দিকে যাচ্ছে ঢাকার বায়ুমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণ জানার পরেও এর বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াতে না পারাও এক ধরনের অপরাধ। কেননা, এই দূষণের কারণে অন্তত ৬ বছর আয়ু কমছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের। কেবল মানুষ না, বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রাণী ও উদ্ভিদ জগৎও। আবার, এত ভয়াবহতার মধ্যে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে দায়সারা ভাব দেখছেন পরিবেশবাদীরা। যখন আমরা দূষণের শীর্ষে পৌঁছে যাচ্ছি—তখন এটা প্রতিরোধে গড়ে তোলা জাতীয় কমিটি কোনও সভা বসায়নি।
বায়ুদূষণের দেশগুলোতে শীর্ষস্থানে ঘুরে ফিরে নাম আসে—ভারত, পাকিস্তান, চীন, বাংলাদেশ, গ্রিস, তাজিকিস্তানের নাম। আবার কী কারণে এসব দেশে দূষণ বেশি, তার কারণগুলোও কাছাকাছি একই রকমের। বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎসগুলো জানার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া এবং প্রকল্পকেন্দ্রিক চিন্তা আমাদের এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। এই কারণে প্রকল্প শেষ হলে সেই সক্রিয়তা আর থাকে না। একইভাবে এটি যেমন কেবল কোনও একটি মন্ত্রণালয়ের বিষয় না, তেমনই বাতাসের বিষয়ে আঞ্চলিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দূষিত নগরের বিষয়ে গবেষণায় দূষণের কারণ হিসেবে বেরিয়ে এসেছে— যানবাহনের ধোঁয়া ও রাস্তার যানজট। এছাড়া শিল্প ও উত্তপ্ত কয়লাভিত্তিক জ্বালানি, কৃষি‑খড় পোড়ানো, ইটভাটা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, ছোট কারখানা ও অপরিকল্পিত শিল্পকলার কারণে সূক্ষ্ম কণা নির্গমন বেশি, মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা। এমনকি প্রায় তালিকায় শীর্ষ পাঁচে অবস্থান নেওয়া গ্রিসেরও বায়ুমান কমার পেছনে কারণ অনেকটা একই। এথেন্সের মতো জায়গায় নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইডের স্তর অনেক জায়গায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। আবাসিক তাপায়ন ও কাঠ বা কাঠকয়লা পোড়ানো—শীতে ঘরোয়া জ্বালানির কারণে দূষণ বেশি বলে জানা গেছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট দুই বছর আগের একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত—যার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান রয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ বসবাস করে। এই এলাকার বায়ুদূষণের মাত্রা মানুষের গড় আয়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
এর ফলে কী হচ্ছে?
বায়ুদূষণ ও আয়ু কমে যাওয়া প্রসঙ্গে একাধিক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশর বায়ুমান বিশ্লেষণে জানা গেছে, বায়ুদূষণের কারণে এখানকার মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর কমে আসছে। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘‘এখন স্মোক আর ফগ মিলিয়ে বাতাসে ‘স্মোগ’ তৈরি হয়েছে। এটা ধোঁয়া ও কুয়াশা এবং ধুলার সন্নিবেশ। সব মিলিয়ে এর মধ্যে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এতে শ্বাসকষ্টের রোগী, শিশু, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।’’
আসলে কী পরিস্থিতিতে আছি আমরা, প্রশ্নে পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের চিকিৎসক লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বায়ুদূষণে অনেক দিন যাবৎ নগরীগুলো এই পরিস্থিতিতেই আছে। আমাদের যত লোক হার্ট অ্যাটাকের কবলে পড়েন, তার কারণ বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্রীয় অসুখ—হাঁচি, কাশি, টিবি জাতীয় সংক্রামক রোগ হয়। বায়দূষণের কারণে ত্বকে অ্যালার্জি হয়। দূষিত বাতাসে এমন কিছু ধাতব পদার্থ থাকে—যার কারণে শিশু ও গর্ভের শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি বায়ুদূষণের কারণে নারী পুরুষের উর্বরতা হ্রাস পায় এবং এ কারণে বন্ধ্যা দম্পতি বাড়ছে। দূষিত বায়ুর কারণে হার্টের ও ব্লাড প্রেসারের ওপর প্রভাব পড়ায় মানুষ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। সংক্রামক অসুখের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে গাছের সালোক সংশ্লেষণ ক্ষমতা কমে যায়, দূষণটা জমে জমে পানিতে দ্রবীভূত হয়। ফলে জলজ-প্রাণী ও ভূমিজ-প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ কেবল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এর কারণে প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ‘’
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দ্রুত স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে চীন ইতোমধ্যে লাভবান হয়েছে। স্বল্পমেয়াদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারকে দৃঢ় হতে হবে এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে হবে। এখন পরিকল্পনাগুলো নিয়ে আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। আসলেই কাজটি আপনি করতে চান, এমন মনোভাব নিয়ে সক্রিয় হতে হবে।’’
কার্যকর উদ্যোগ আছে?
অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, ‘‘ঢাকার বাতাসে দূষণের উৎস আমরা জানি—ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ইটের ভাটা, ১২ মাস রাস্তা কাটা ও দীর্ঘদিন সে অবস্থাতেই ফেলে রাখা, বর্জ্য পোড়ানো। উৎস জানা থাকার পরেও সেটা নিয়ন্ত্রণের কোনও কার্যকর পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছি না এবং কোনও সমন্বয়ও নেই। হাইকোর্ট মাঝে মাঝে রুলিং দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায়। তবে আজ পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপই নিয়মিত নয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা ফিটনেসবিহীন গাড়ির অভিযান করি ঘোষণা দিয়ে, যেন অপরাধীকে সুযোগ করে দেওয়া হয়। অথচ খুব সহজেই এগুলো বন্ধ করা যায়। আদালতের নির্দেশ আছে ২৫ বছরের পুরোনো গাড়ি রাস্তায় থাকবে না। তারপরও কেন থাকে, কাদের আকাঙ্ক্ষায় থাকে। সরকার ব্যবসায়ীদের চাপে নতি স্বীকার করে এই ধরনের যানবাহন, শিল্প চলতে দিচ্ছে। যতদিন সেটা করবে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।’’
অধ্যাপক কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘‘আমরা কখনোই বলছি না রাতারাতি কিছু হবে। আমরা যদি নিয়মিত কাজটি করতাম, গত ২০ বছর ধরে সবার সামনে দিয়ে এই দূষণ যেভাবে বাড়ছে সেটা হতো না।’’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সরকার কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করে দেশ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে শুক্রবার বিকালে তার দলের গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ অভিযোগ করেন। বিরোধী দল ও আওয়ামী লীগ একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে ও আন্দোলন করছে বলে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিযোগ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নাহিদ ইসলাম বলেন, “সরকারপ্রধানের বক্তব্য প্রসঙ্গে বলব, এটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত এবং উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মত। নির্বাচনের আগে আমরা দেখেছি সরকার ও বিএনপি আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক কাছে টানার জন্য তারা মিথ্যা মামলা দিয়েছে, মামলা বাণিজ্য করেছে এবং ব্ল্যাকমেইল করেছে। “এখনো তারা আওয়ামী লীগ ও ভারতের সাথে এক ধরনের সমঝোতা করে দেশ চালাচ্ছে। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়েও তারা স্পষ্ট কিছু বলতে পারছে না।” সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাহিদ বলেন, ‘‘আপনারা নিজেদের দিকে তাকান, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করুন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন। আমরা আগেই বলেছি, শুধু ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তন হলেই হবে না, পুরো বন্দোবস্তের পরিবর্তন হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘অবনতি’, জ্বালানি সংকটসহ সার্বিক ব্যর্থতার দায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জ্বালানিমন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে দাবি তুলে নাহিদ বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত সাত মাসে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা ঠিক না রেখে সংবিধান কাটাছেঁড়া করতে ব্যস্ত। ফলে সালাউদ্দিন আহমেদের এই দায়িত্বে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। “জ্বালানি মন্ত্রীও কোনো উদ্যোগ নিতে পারেননি, তাই মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠন করা উচিত।” দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আরও তিনটি দাবি তোলেন এনসিপি আহ্বায়ক। সেগুলো হচ্ছে, ‘একদলীয়’ সংবিধান সংশোধন কমিটি অবিলম্বে বিলুপ্ত করে গণভোটে রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা। সাইবার আইনের সংশোধনী প্রস্তাব বাতিল করতে হবে এবং গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইনের মত ‘কর্তৃত্ববাদী আইনগুলো’ বাতিল করা। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর থেকে জুলাই গণহত্যা ও খুনের যে বিচার শুরু হয়েছে, তা দ্রুত শেষ করতে হবে। জুলাই যোদ্ধাদের এবং শহীদ ও আহত পরিবারের ওপর আক্রমণ বন্ধ করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নাহিদ বলেন, এসব দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে দুপুর ৩টায় গণবিক্ষোভ পালিত হবে। ‘দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে পালিত, সরকারের ক্রেডিট নেই’ সদ্য সমাপ্ত দুর্গাপূজা নিয়ে বিরোধী দলীয় এই উপনেতা বলেন, ‘‘বাংলাদেশে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে। এ জন্য হিন্দু-মুসলিম সকল শান্তিপ্রিয় মানুষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে এতে সরকারের বিন্দুমাত্র ক্রেডিট নেই। সাধারণ মানুষ, বিরোধী দল ও মাদ্রাসার ছাত্ররা পাহারা দিয়ে সহযোগিতা করেছে।” মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের কেনাকাটার ক্ষমতা অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে দাবি করে নাহিদ বলেন, “বাজেট অধিবেশনে সরকারদলীয় এমপিরা সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার মিথ্যা ও প্রতারণামূলক কথা বলেছে যে দাম বাড়েনি এবং বাড়বে না। অথচ জ্বালানি তেলের দাম তিন দফা বাড়ানো হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে। কিন্তু সরকারের কোনো সঠিক পরিকল্পনা নেই। “এই গণবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ ছাড়া জনগণের অধিকার আদায় হবে না।” এনসিপির ২০২৫ সালের ১ মার্চ গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি শুক্রবার সকালে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে দলটির আহ্বায়ক বলেন, ‘‘আমাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম বিস্তার করার জন্যই পুনর্গঠিত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের পর সংগঠনে অনেকে নতুন যুক্ত হয়েছেন, দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের জন্য এটি করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে।’’ পরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে বিকাল পৌনে ৫টার দিকে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ উদ্বোধন করেন নাহিদ ইসলাম। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের সঞ্চালনায় গণসংযোগ উদ্বোধনকালে আরও বক্তব্য দেন দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ অন্যান্যরা।
রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ প্রতিবাদ জানান। এর আগে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দফতরের অন্য শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সই করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এ ঘটনায় দেওয়া স্ট্যাটাসে জামায়াত আমির লেখেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত একজন ডিআইজির মালিকানাধীন একটি বাড়ি থেকে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার দায়ে ৮৪ জন নারী-পুরুষকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। একই সঙ্গে বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ পণ্য (মাদক) উদ্ধার করা হয়েছে। এখান থেকেই বোঝা যায়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে।’ তিনি লেখেন, ‘দেশের সর্বত্র আইনশৃঙ্খলাবিরোধী ও অসামাজিক কার্যকলাপের পাশাপাশি চাঁদাবাজির মহোৎসব, ছিনতাই, লুণ্ঠন ও ডাকাতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। স্বয়ং পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানাধীন বাড়িতে এ ধরনের অপকর্ম সংঘটিত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।’ তার ভাষ্য, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যাও তো রয়েছেই। এসব জনদুর্ভোগ নিরসন ও অপকর্ম দমনের পরিবর্তে সরকার এখন বিরোধী দলের চরিত্র হননে ব্যস্ত। হায় সেলুকাস! আমাদের এই বাংলাদেশ! তরুণদের আরেকবার জাগতে হবে।’
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে পাবনার ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের প্রিয়াঙ্কা কমিউনিটি সেন্টারের পাশের একটি ভবনের পঞ্চম তলায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মকলেছুর রহমান মিন্টু, ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার সাবেক মেয়র আলহাজ আবুল কালাম আজাদ মিন্টু এবং আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র শহিদুল ইসলাম রতন। পুলিশ সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার তিন নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ঢাকায় অবস্থান করে দলীয় কার্যক্রম জোরদারের বিষয়েও তারা তৎপর ছিলেন বলে জানা গেছে। এদিকে তিন নেতার গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের ঈশ্বরদী থানায় হস্তান্তর করা হবে।’