ভারতের রাজধানী দিল্লির লাল কেল্লার কাছে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় নয়জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর দেশটির সরকার পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপাল সীমান্তজুড়ে উচ্চসতর্কতা জারি করেছে। সোমবার সন্ধ্যার এই বিস্ফোরণের পর রাতে আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) পাঞ্জাবের ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি উত্তর প্রদেশ-নেপাল সীমান্ত ও অন্যান্য সেনা চৌকিগুলোতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বিস্ফোরণটি ঘটে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটে লাল কেল্লা মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি হুন্দাই আই২০ গাড়িতে। বিস্ফোরণের শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের বেশ কয়েকটি গাড়ি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ঘটনাস্থলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসাবশেষ ও ছিন্ন-ভিন্ন মরদেহ।
দিল্লির উপপ্রধান অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তা একে মালিক জানান, বিস্ফোরণের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটের দিকে।
বিস্ফোরণের পর লাল কেল্লা ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের কাছে এই বিস্ফোরণে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে একই দিনে দিল্লি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে হরিয়ানার ফরিদাবাদ এলাকায় ২ হাজার ৯০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
বিস্ফোরণের কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি দিল্লি পুলিশ। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) ও দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা। এছাড়া, ঘটনাস্থলে ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি) সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
বিস্ফোরণ ও নিরাপত্তা জোরদারের এই ঘটনাগুলো ভারতের বিভিন্ন স্থানে সতর্কতা জারি ও তদন্ত জোরদারের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে জ্বালানির দাম কমাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ার সঙ্গে হওয়া এক সমঝোতার অংশ হিসেবে এবার যুক্তরাষ্ট্রমুখী হয়েছে রুশ ডিজেলের প্রথম চালান। ২০২২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রুশ তেল ও পেট্রোলিয়াম আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। সেই নিষেধাজ্ঞার পর এই প্রথম রাশিয়ার কোনো পেট্রোলিয়াম পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, মাল্টার পতাকাবাহী ‘আজিওই ফানেন্দেস’ নামের একটি ট্যাংকার গত ২২ অক্টোবর রাশিয়ার প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে রওনা দেয়। আগামী ৭ নভেম্বর জাহাজটির যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে এর ক্রেতা বা বিক্রেতা কে, তা এখনো জানা যায়নি। চুক্তিটি সফল করতে ট্রাম্প নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কিছু নিয়ম শিথিল করেছেন। এছাড়া ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের জরুরি রিজার্ভ থেকে জ্বালানি না ছাড়লে তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন, চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রথমে ৩ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল পাঠাবে। এরপর নভেম্বরে ৫ লাখ টন এবং পরবর্তীতে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। ক্রেমলিনও প্রথম জাহাজটি রওনা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার পর এতদিন রাশিয়া মূলত তুরস্ক, ব্রাজিল ও আফ্রিকার দেশগুলোতে ডিজেল বিক্রি করত। তবে মার্কিন এই চুক্তির ফলে রাশিয়া তাদের ডিজেল রপ্তানির ওপর দেওয়া নিজেদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো চুক্তি চূড়ান্ত করার পর যুক্তরাষ্ট্রমুখী চালান আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন রুশ কর্মকর্তারা। সূর্ত্র: রয়টার্স
বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট তৈরিতে ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা ‘পিএইচপি’-তে মারাত্মক একটি কোডিং ত্রুটি ধরা পড়েছে। এর ফলে হ্যাকিংয়ের হাত থেকে বাঁচতে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি ওয়েবসাইট ও জরুরি অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে খুঁজে বের করা এই ত্রুটিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘পিএইচপি২শেল’। এটি প্রায় ১০ বছর ধরে পিএইচপির ভেতরে লুকিয়ে ছিল। এই ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা যেকোনো ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভেতরে থাকা মানুষের গোপন তথ্য ও পাসওয়ার্ড চুরি করতে পারে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর পিএইচপি কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই সমস্যার সমাধানের জন্য নতুন আপডেট প্রকাশ করেছে এবং সব ওয়েবসাইট মালিককে তা অবিলম্বে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে। ওয়ার্ডপ্রেস, জুমলা ও মেজেন্টো দিয়ে তৈরি সব ওয়েবসাইটই এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। হামলা এড়াতে নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সরকার তাদের বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবা আপাতত বন্ধ রেখেছে। জনপ্রিয় তথ্যকোষ উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট আর্কাইভও কিছু সময়ের জন্য সেবা বন্ধ রেখে তাদের নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এছাড়া এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া সরকার দেশে বিশেষ সাইবার সতর্কতা জারি করেছে। সূত্র: আল-জাজিরা
চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, গত ২৬ বছরের মধ্যে এটিই মহাদেশটিতে দাবদাহজনিত সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণা সাময়িকী নেচার হেলথ-এ প্রকাশিত দুটি পর্যালোচিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে তীব্র গরমের কারণে আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬০০টির বেশি মৃত্যুর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করা হয়েছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ু ও চরম আবহাওয়াবিষয়ক গবেষক ক্লেয়ার বার্নস জানিয়েছেন, প্রাণহানির পরিসংখ্যান বিবেচনায় ইউরোপের অর্ধেকের বেশি অঞ্চলের জন্য এবারের গ্রীষ্ম সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় ছিল। স্বাভাবিকের চেয়ে ১২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি তাপমাত্রা গবেষণায় দেখা গেছে, মে মাসের শেষভাগ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করেছে। বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপে এবারের গ্রীষ্ম ছিল রেকর্ড উষ্ণ। এ সময় অঞ্চলটির গড় তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের স্বাভাবিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কিছু দেশে নির্দিষ্ট দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে সর্বোচ্চ ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ সেখানকার জনস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। ৩০ দেশের ৮৫৪ শহরের তথ্য বিশ্লেষণ দাবদাহে মৃত্যুর সম্ভাব্য সংখ্যা নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীরা ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় বাস্তবে রেকর্ড করা তাপমাত্রার সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব না থাকলে সম্ভাব্য তাপমাত্রা কত হতে পারত, তার তুলনা করা হয়। এরপর জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে একটি বৈজ্ঞানিক মডেলের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রাণহানির হিসাব তৈরি করা হয়। গবেষকদের দাবি, অতীতেও একই পদ্ধতিতে নির্ণয় করা আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকারি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানের কাছাকাছি পাওয়া গেছে। তবে এবারের ৫০ হাজারের বেশি মৃত্যুর হিসাব সরাসরি নিবন্ধিত মৃত্যুর চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; এটি গবেষণাভিত্তিক একটি অনুমান। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে প্রবীণরা গবেষণার ফল অনুযায়ী, দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তুলনামূলক শীতল জলবায়ুর যুক্তরাজ্যসহ উত্তর ইউরোপের দেশগুলোও তীব্র গরমের প্রাণঘাতী প্রভাব থেকে রক্ষা পায়নি। দাবদাহে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে। তবে শুধু বয়স্করাই নন, অপেক্ষাকৃত তরুণ জনগোষ্ঠীও এই বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন। গবেষণায় ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী অন্তত ৮০০ জনের মৃত্যুর সঙ্গে অতিরিক্ত তাপমাত্রার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৬৫ বছরের কম বয়সী কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর পেছনেও দাবদাহের প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে গবেষণায় উঠে এসেছে, অতিরিক্ত গরমের কারণে মৃত্যুর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপে দাবদাহজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উষ্ণায়নের সম্পর্ক ছিল। বর্তমানে সেই হার বেড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এর ফলে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে। ‘নীরব ঘাতক’ হয়ে উঠছে তাপপ্রবাহ গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন বিশেষজ্ঞরাও ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেস বলেন, অতিরিক্ত গরমের প্রাণঘাতী প্রভাব অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। এ কারণেই দাবদাহকে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। তাঁর মতে, কম বয়সী মানুষের মৃত্যুর তথ্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এটি প্রমাণ করে, তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি শুধু প্রবীণ কিংবা আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ গ্রীষ্মের সতর্কবার্তা জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের আগে প্রকাশিত এই গবেষণা বিশ্বনেতাদের জন্য নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য অর্জন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। গবেষক ক্লেয়ার বার্নসের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতি ঠেকাতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। তিনি সতর্ক করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপকে আরও ঘন ঘন তীব্র তাপপ্রবাহ এবং বড় ধরনের প্রাণহানির মুখোমুখি হতে হবে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।