নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আজ মঙ্গলবার প্রেস ব্রিফিংয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন দপ্তর-সংস্থাসমূহের গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সামগ্রিক কার্যক্রম ও অর্জন তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিকায়নমূলক সিদ্ধান্তের ফলে দেশের নৌখাত আজ একটি শক্তিশালী, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে ভারি কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লালদিয়া এলাকায় হেভি লিফট কার্গো জেটি নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। পাশাপাশি PPP মডেলে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য APM Terminals BV-এর সঙ্গে ৩৩ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা ২০২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে অপারেশনে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ২,৩৭৮.৭৭ কোটি টাকা, ব্যয় ৮৩৭.৯৯ কোটি টাকা এবং উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১,৫৪০.০৮ কোটি টাকা। কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে এবং ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বকালের সর্বোচ্চ কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডে ISPS অডিটে ‘Zero Observation’ অর্জন বন্দরের নিরাপত্তা সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা জানান, মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে সংরক্ষণ ড্রেজিং প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নাব্যতা সংকট নিরসনের পথ সুগম হয়েছে।
একই সঙ্গে মোংলা বন্দরে আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা (PRF) প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব বন্দর ব্যবস্থাপনার একটি মাইলফলক।
পায়রা বন্দরে দেশি ও বিদেশি জাহাজ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পিপিএফটি প্রকল্পের আওতায় সড়ক, ব্রিজ ও মোবাইল হারবার ক্রেন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্যোগে কুতুবদিয়া, হাতিয়া, মহেশখালী, ভাসানচর ও অন্যান্য দ্বীপাঞ্চলে সি-ট্রাক ও ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় দুর্গম এলাকার জনগণের যাতায়াত নিরাপদ, সহজ ও সময় সাশ্রয়ী হয়েছে।
নতুন লঞ্চঘাট, পন্টুন ও জেটি স্থাপনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং যাত্রী সাধারণের সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক ৩০ এর অধিক লঞ্চঘাট এবং ৫০ এর অধিক পন্টুন স্থাপন করা হয়েছে বলে উপদেষ্টা জানান।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩০৬.৫৬ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে এবং নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে দেশের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আদায়ও সরকারের সাফল্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মাধ্যমে GMDSS, কোস্টাল রেডিও স্টেশন ও লাইটহাউজ স্থাপনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় নৌনিরাপত্তা জোরদার হয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদ-নদীর অবৈধ দখল ও দূষণ রোধে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি মেরিন একাডেমি ও ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটসমূহে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নাবিক ও মেরিটাইম জনবল তৈরিতে অগ্রগতি হয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ের সমাপনী বক্তব্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, ‘নৌখাত কেবল পরিবহন ব্যবস্থাই নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। আমাদের লক্ষ্য হলো— বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেরিটাইম হাবে পরিণত করা। এই অর্জনগুলো সেই লক্ষ্যে আমাদের দৃঢ় অগ্রযাত্রার প্রতিফলন।’
সংবাদ সম্মেলন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী, এনডিসিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
একদিন বাদে (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এবারের নির্বাচনে মূল লড়াইটা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। তবে বলাই বাহুল্য, আসন্ন নির্বাচনে দেশের রাজনীতিতে বেশ সরব দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার-বিলবোর্ডে এখন চোখে পড়ছে সাদা দাড়িওয়ালা এই নেতার (জামায়াতের আমির) চেহারা, যেখানে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে, দেশের ‘প্রথম ইসলামপন্থী সরকারকে’ ক্ষমতায় আনার জন্য। ৬৭ বছর বয়সী এই নেতা এতোদিন মূলত ইসলামপন্থী মহলের বাইরে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু দলের প্রধান হিসেবে তিনি এখন আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এবারের নির্বাচনে জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও একসময়ের জোটশরিক বিএনপির বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই গড়ে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের প্রায় ৯১ শতাংশই মুসলিম, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ হিসেবে পরিচিত করেছে। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও দেশটির সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দেশটিতে জনসংখ্যার বড় অংশ হলো সুন্নি মুসলিম। বিভিন্ন জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াত, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, এবার তারা ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফল পেতে পারে। বিষয়টি মধ্যপন্থী মহল ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়। জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতা কারাবন্দি হন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনে দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শেষমেষ দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ডে ঠেলে দেওয়া হয়। ২০২২ সালে দলটির বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানকেও একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনকে সহযোগিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৫ মাস কারাভোগ করেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান জামায়াত ও শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। ওই বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। পরে ২০২৫ সালে আদালত দলটির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এর ফলে বহু বছর গোপনে কার্যক্রম চালানো জামায়াত আবার প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ পায়। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর দ্রুত সংগঠিত হয় জামায়াত। দলটি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, বন্যা-ত্রাণসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে মাঠে নামে। সাদা পোশাক ও সাদা দাড়ি শোভিত শফিকুর রহমান এসব কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। গত বছরের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেন– আমরা আমাদের কথা বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু বারবার আমাদের দমন করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা আবার উঠে আসার সুযোগ পেয়েছি। রাজনৈতিক শূন্যতা ও উত্থান: বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন জামায়াত আমির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ মোস্তফার ভাষায়, অভ্যুত্থানের পর প্রথম এক মাস দেশে তেমন কোনো দৃশ্যমান নেতা ছিল না। বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওই সময় তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করছিলেন, আর শফিকুর রহমান দেশজুড়ে সফর করে দ্রুত গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত আমিরের বক্তব্য অনেক ভোটারের মধ্যে সাড়া ফেলছে, যেখানে জামায়াত নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক বিকল্প শক্তি হিসেবে। গত ডিসেম্বরেই দলটি জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) সঙ্গে জোট গঠন করে, যা তরুণ ও অপেক্ষাকৃত কম রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। এদিকে, শফিকুর রহমানকে নিয়ে 'গেম অব থ্রোনস' থেকে অনুপ্রাণিত প্রচারণা পোস্টারও দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা ‘দাদু ইজ কামিং’। অনেকের কাছে শফিকুর রহমান জামায়াতের তুলনামূলক মধ্যপন্থী মুখ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তিনি সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ওপর জোর দিচ্ছেন এবং সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান আচরণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে নারীদের ভূমিকা নিয়ে তার বক্তব্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জামায়াত এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। শফিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, নারীদের দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করা উচিত নয়, যাতে তারা পারিবারিক দায়িত্বে বেশি সময় দিতে পারেন। সম্প্রতি তার নামে একটি সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ছড়ালে ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ হয়। জামায়াতের দাবি, ওই অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছিল। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, তারা যুক্তিসঙ্গত ও নমনীয় নীতিতে বিশ্বাসী। তার ভাষায়, ইসলামি মূল্যবোধ শুধু মুসলমানদের জন্য নয় বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। সূত্র: রয়টার্স
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা ও গণসংযোগ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এবার ভোট দেওয়ার পালা। এই মুহূর্তে আলোচনার মূল বিষয় প্রার্থীরা কে কোথায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশান-২ নম্বরের ১/ডি ব্লকের ৮৬ নম্বর রোডে অবস্থিত গুলশান মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। আজ মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবীর খান। গুলশান এলাকাটি ঢাকা-১৭ নির্বাচনী আসনের অন্তর্ভুক্ত এবং এটিকে ভিআইপি আসন হিসেবে গণ্য করা হয়। তারেক রহমান এবার ঢাকা-১৭ এবং তার পৈতৃক নিবাস বগুড়া-৬ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটের প্রচারণার সময় তিনি বারবার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানান এবং ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার ব্যাপক আগ্রহের কারণে ভোটের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটিই তরুণ ভোটার। এই বিশালসংখ্যক তরুণকে কেন্দ্রমুখী করতে কমিশন বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এমনকি তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে নিবন্ধনের সময় ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভোট দেওয়ার স্পৃহা এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যদি এই ৪ কোটি তরুণের একটি বড় অংশ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়, তবে ভোট কাস্টিংয়ের হারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। ’ মোট ১৩ কোটি ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই কমিশনার বলেন, প্রচার-প্রচারণা ও কেন্দ্রে উপস্থিতির ক্ষেত্রে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এবার সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারী ভোটারদের এই উদ্দীপনা ভোটের দিনে বজায় থাকলে তা মোট শতাংশে বড় প্রভাব ফেলবে।