পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের ক্ষত এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার ফলে ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আয়যোগ্য সম্পদের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর আয়ও নিম্নমুখী। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের সব সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার কারণে খাতটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে সংঘটিত অনিয়ম ও লুটপাটের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতির দায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। তাদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে আরও কঠিন সংকট মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্যও অশনিসংকেত। এমন পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। এসব খাতে অগ্রগতি না হলে সামগ্রিক অর্থনীতি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট দেখা দিলে ঋণ বিতরণ ক্ষমতা কমে গিয়ে আরও গভীর সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ানো আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। তিনি জানান, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন এখন ব্যাংকগুলোতে নেই পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ায় ব্যাংক খাত নাজুক অবস্থায় পড়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। কারণ অবলোপিত ঋণ, নবায়নকৃত ঋণ ও আদালতে আটকে থাকা ঋণ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার করা ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নেই।
সূত্র মতে, দেশের অর্ধেক ব্যাংক এখন খেলাপি ঋণের চাপে পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এই ব্যাংকগুলোর বড় দুটি সমস্যা হলো আমানতকারীদের টাকাই ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না এবং আস্থাহীনতার কারণে নতুন আমানতও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এ ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনীতি বা বিনিয়োগ কার্যক্রমে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংক এখনো তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকলেও বাকিগুলো মধ্যম মানে অবস্থান করছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে বিনিয়োগের চাপ তৈরি হবে, তার তুলনায় ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত পুঁজি নেই। এছাড়া উচ্চ সুদের হারও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ হওয়ায় অধিকাংশ উদ্যোক্তা এত উচ্চ সুদে ঋণ নিতে সাহস পাচ্ছে না।
দুর্বল ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহেও এখন হাহাকার অবস্থা দেখা দিয়েছে। অনেক ব্যাংক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও ১৩–১৪ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হবে। উচ্চ সুদে নেওয়া ঋণও পরিশোধ করতে না পেরে নতুন করে খেলাপিতে পরিণত হবে।
খেলাপি ঋণে রেকর্ড বৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫.৭৭ শতাংশ। পূর্ববর্তী সরকার পতনের পর গত এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। শুধু চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই তা বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ছিল। অবলোপিত ও নবায়নকৃত ঋণসহ বিবেচনায় নিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক আরও বড় যা ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
২০০৯ সালে পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অথচ বর্তমানে তা সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে।
খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকার পতনের আগের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১২.৫৬ শতাংশ। সরকার পতনের পর বাস্তব পরিস্থিতি প্রকাশ পেতে শুরু করলে সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা (১৬.৯৩ শতাংশ)। একই বছরের ডিসেম্বরে তা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা (২০.২০ শতাংশ)।
২০২৫ সালের শুরুকে কেন্দ্র করে খেলাপি ঋণের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা (২৪.১৩ শতাংশ)। জুনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে, কারণ এই তথ্য প্রকাশ করলে ব্যাংক খাতের বাস্তব সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠত।
প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতির ভয়াবহতা
খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ায় প্রভিশন ঘাটতিও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের শেষ দিকে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে তা লাখ কোটি টাকার বেশি হয়ে যায়। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যদিও সেপ্টেম্বরে কিছুটা কমে ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি হয়েছে। পাশাপাশি মূলধন ঘাটতি, সম্পদের মানহানি এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণও বাড়ছে। এতে ব্যাংকগুলোর আয় কমে গিয়ে অন্তত ৫০–৬০ শতাংশ ব্যাংক গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জীবিকা নির্বাহের জন্য চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং বা যেকোনো পেশা বেছে নেওয়া মানুষের জীবনের একটি বড় অংশ। অনেকেই মনে করেন ইসলাম কেবল ব্যবসা–বাণিজ্যের নিয়ম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চাকরিজীবী, করপোরেট কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের জন্যও শরিয়ত দিয়েছে অমোঘ কিছু নীতিমালা। কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা ও কর্মীর অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি বড় ইবাদত। কর্মক্ষেত্রে সততা ও হালাল ক্যারিয়ার গড়ে তোলার এমন পাঁচটি সোনালি ইসলামি নীতি নিচে আলোচনা করা হলো। ১. শর্তের প্রতি শতভাগ অনুগত থাকা যেকোনো সংস্থায় যোগ দেওয়ার সময় যে কাজের বিবরণ (জব ডেসক্রিপশন) ও শর্তাবলি নির্ধারণ করা হয়, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা প্রত্যেক কর্মীর ধর্মীয় দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়, তবে অলসতা বা অবহেলার কারণে কাজের সময় নষ্ট করলে তার বেতন থেকে বরকত কমে যায় এবং সে আমানতের খেয়ানতকারী হিসেবে গণ্য হয়। (ইবনে কুদামাহ, আল–মুগনি, ৬/৪৩, মাকতাবাতুল কাহেরা, কায়রো, ১৯৬৮) পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১) ২. পারিশ্রমিক সময়মতো পরিশোধ করা নিয়োগকর্তা বা বসের জন্য সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো কর্মীর কাজের মূল্যায়ন করা এবং তার প্রাপ্য বেতন–ভাতা কোনো ধরনের টালবাহানা ছাড়া বুঝিয়ে দেওয়া। আব্বাসীয় যুগের বিখ্যাত প্রধান বিচারপতি ইমাম আবু ইউসুফ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত শ্রমের অধিকার নিয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, কোনো কর্মীকে খাটিয়ে তার পারিশ্রমিক আটকে রাখা বা দেরিতে দেওয়া একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক জুলুম, যা রাষ্ট্রের শান্তি বিনষ্ট করে। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/১৩২, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৭৯) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৪৩) ৩. কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বর্জন আজকের করপোরেট বা সরকারি চাকরিতে প্রমোশন, নতুন নিয়োগ কিংবা ফাইল পাসের ক্ষেত্রে ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তিকে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কোনো পদে বসানো আমানতের বড় খেয়ানত এবং ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত যেকোনো পদ বা অর্থ পুরোপুরি হারাম। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১৩/১২১, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়ে লানত দিয়ে বলেছেন, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩১৩) ৪. কাজের সময়কে আমানত মনে করা অফিসের সময়ে ব্যক্তিগত কাজ করা, বসের অনুপস্থিতিতে অলস সময় কাটানো কিংবা ভুয়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দিয়ে ছুটি কাটানো ক্যারিয়ারের হালাল উপার্জনকে কলঙ্কিত করে। কর্মক্ষেত্রের সময়টুকু কর্মীর কাছে একটি আমানত, যা সে বেতনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছে। সুতরাং এই সময়ে অবহেলা করা মানে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা। (ইমাম আল–গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ২/৮৮, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৮২) নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩) ৫. কর্মীকে সামর্থ্যের অধিক চাপ না দেওয়া ম্যানেজার বা নিয়োগকর্তাদের উচিত অধীন কর্মচারীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা এবং তাদের ওপর এমন কোনো কাজের বোঝা না চাপানো, যা তাদের শারীরিক বা মানসিক ক্ষমতার বাইরে। ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা এতটাই ওপরে যে তাদের দাস বা নিচু স্তরের ভাবা যাবে না; বরং তাদের নিজেদের ভাইয়ের মতো সম্মান দিতে হবে। (ইমাম নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, ১১/১৩১, দারুল ইহয়া আত–তুরাস আল–আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২) মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তারা তোমাদেরই ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন... সুতরাং তাদের এমন কাজের কষ্ট দিয়ো না, যা তাদের সাধ্যের অতীত, আর যদি এমন কঠিন কাজ দাও, তবে তোমরা নিজেরাও তাদের সাহায্য করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০) কর্মজীবীদের ৩টি জিজ্ঞাসা ১. চাকরিজীবীদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে ‘উপহার’ বা ‘বকশিশ’ নেওয়ার বিধান কী? শরিয়তের দৃষ্টিকোণ হলো, কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি তাঁর পদের কারণে কোনো পক্ষ থেকে উপহার বা অতিরিক্ত টাকা নেন, তবে তা ‘হাদিয়া’ নয়; বরং একপ্রকার সুপ্ত ঘুষ বা আত্মসাৎ। মহানবী (সা.) সরকারি কর্মকর্তার এমন উপহার গ্রহণকে সরাসরি ‘খেয়ানত’ বলে অভিহিত করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬০১) ২. কেউ যদি সুদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তবে তাঁর আয়ের বিধান কী হবে? ইসলামে সরাসরি সুদের হিসাব রাখা, সুদের চুক্তি লেখা বা সুদে সাহায্য করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইমাম শাফেয়ি লিখেছেন, যে কাজের মূল ভিত্তিই হারাম, তার মাধ্যমে অর্জিত আয়ও শরিয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। (ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, ৩/২৫৪, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৯০) তবে সুদের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয়, এমন সাধারণ আইটি বা সিকিউরিটি পদে থাকলে ওলামাদের ভিন্ন মত রয়েছে। ৩. বর্তমান যুগের ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট জবের ক্যারিয়ারের হালাল–হারাম হওয়ার বিষয়টিও নির্ভর করে কাজের ধরনের ওপর। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে যে কাজটি করা হচ্ছে (যেমন ওয়েব ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং বা অ্যাকাউন্টিং)। তা যদি কোনো অবৈধ বা হারাম পণ্যের (মদ, জুয়া, সুদ) প্রচার বা প্রসারে সাহায্য না করে এবং কাজের চুক্তিতে কোনো ধোঁকা না থাকে, তবে সেই ক্যারিয়ার সম্পূর্ণ হালাল। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/১৩৮)
ময়মনসিংহের গৌরীপুর রেলওয়ে জংশন স্টেশন এলাকায় চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনের তিনটি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বুধবার (২৪ জুন) রাত পৌনে ১১টার দিকে স্টেশন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে দুর্ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। রেলওয়ে সূত্র জানায়, জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাত সোয়া ১০টার দিকে গৌরীপুর রেলওয়ে জংশন স্টেশনে পৌঁছায়। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ইঞ্জিনের দিক পরিবর্তনের পর ট্রেনটি পুনরায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে স্টেশন এলাকা অতিক্রম করার সময় তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ঘটনার পরপরই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেয়। লাইনচ্যুত বগিগুলো সরিয়ে রেলপথ সচল করতে উদ্ধারকারী ট্রেনকে খবর দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আকতার হোসেন বলেন, বিজয় এক্সপ্রেসের তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। দুর্ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং উদ্ধারকাজ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, লাইনচ্যুত বগিগুলো উদ্ধার এবং রেললাইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতে বিলম্ব হতে পারে।
গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়া আদালতের অপারগতা ন্যায়বিচার ও আদালতের মৌলিক নীতি ও চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। দুর্নীতি-অনিয়মের জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত রক্ষক এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে এ ধরনের স্ববিরোধী অবস্থান একদিকে যেমন বিব্রতকর ও আত্মঘাতী, অন্যদিকে দুর্নীতির সহায়ক ড. ইফতেখারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি এ ধরনের চিঠির বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রায় আছে। ওটা সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন। যতক্ষণ না রায়টা আপিল বিভাগ অকার্যকর করবে, সবাই তা মানতে বাধ্য। এ ধরনের তথ্য সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ দিতে বাধ্য। না দিলে যে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। চ্যালেঞ্জ করলে সুপ্রিম কোর্টের নতুন চিঠিও অবৈধ হবে মো. বদিউজ্জামান তপাদার সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিচার বিভাগে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগের কোনো শেষ পরিণতি দেখা যায় না। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের অভাবে একসময় বাতাসে ভেসে বেড়ানো এসব অভিযোগ বাতাসেই মিলিয়ে যায়। তবে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে অর্ধশত বিচারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে অন্তত ১৫ জন বিচারকের সম্পদের বিবরণী চেয়ে গত বছর এপ্রিলে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠায় দুদক। আইন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে বিচারকদের বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে থাকে সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। যথারীতি এ সম্পদ বিবরণীর তথ্য প্রেরণে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ চাওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। তবে গত এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন এক সিদ্ধান্তে অভিযুক্ত বিচারকদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দুদকে পাঠাতে সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেনি বলে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে অভিযুক্ত বিচারকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এক ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার অনুসন্ধান ও তদন্ত দুদক করতে পারে। সেই কাজে দুদক যে কোনো কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাইতে পারে। দুদক আইন ২০২৪ এর ১৯ (১) ও ১৯ (২) ধারা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহে বাধ্যবাধকতার বিষয় উল্লেখ আছে। এর আগে ২০১৭ সালের ২ মার্চ আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে কাগজপত্র চেয়ে চিঠি দেয় দুদক। পরে সুপ্রিম কোর্টের চিঠি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় এবং হাইকোর্ট বিষয়টি নিয়ে রায় দেন। হাইকোর্টের ওই রায়ে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের চিঠি প্রশাসনিক যোগাযোগ মাত্র; এটিকে আনুষ্ঠানিক মতামত হিসেবে গণ্য করা যাবে না। রায়ে আরও বলা হয়, বিচার বিভাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে তদন্ত পরিচালনা করতে হবে এবং কাউকে অযথা হয়রানি করা যাবে না। এরপর ওই রায়ের আলোকে বিভিন্ন সাবেক বিচারপতির বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান ও মামলা করে। এ অবস্থায় আবারও বিচারকদের সম্পদ তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনসম্মতভাবে দুদক তথ্য চাইলে তা দেওয়া উচিত। গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়া অপারগতা ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, যে কোনো সংস্থার কাছ থেকেই দুদক তথ্য চাইতে পারে এবং তা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তথ্য না দিলে তদন্ত নিজস্বভাবে এগিয়ে নিতে পারে দুদক। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বদিউজ্জামান তপাদার বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী প্রশাসনিক আদেশে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা অমান্য করা হলে চ্যালেঞ্জের সুযোগ আছে এবং আইনগতভাবে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দুদকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিচারকের ব্যক্তিগত নথি ও সম্পদের বিবরণী চেয়ে চিঠি পাঠানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়ে এখনো সমাধান হয়নি।