মোস্তফা কামাল আকন্দ
নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী
তিতাসের গ্যাস নেই—সিলিন্ডার কিনুন। বিদ্যুৎ নেই—আইপিএস, জেনারেটর কিংবা সোলার আছে। কিন্তু পানি নেই? পানির বিকল্প কী?
প্রশ্নটি শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু ঢাকার দুই কোটির বেশি মানুষের শহরে এর উত্তর অত্যন্ত কঠিন। কারণ পানি শুধু পান করার জন্য নয়। পানি দিয়ে রান্না হয়, গোসল হয়, কাপড় ধোয়া হয়, বাসন পরিষ্কার হয়, বাথরুম ও টয়লেট ব্যবহার করা হয়, শিশু ও বয়স্কদের পরিচর্যা করা হয়। একটি বহুতল ভবনে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যে অস্বস্তি শুরু হয়, তা একসময় স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সংকটে পরিণত হয়।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, পানি সংকটের অর্থ শুধু পানির সংকট নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত Hygiene, Sanitation এবং Dignity—ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন। পানি না থাকলে মানুষ শুধু তৃষ্ণার্ত হয় না; তার দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত হয়, টয়লেট ও বাথরুম ব্যবহারে সমস্যা হয়, রান্না ও খাবার প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ে।
তাই রাজধানীর কোনো এলাকায় দিনের পর দিন পানি না থাকাকে নিছক স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি জবাবদিহির প্রশ্ন।
ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ সালের ৭ নভেম্বর। তখন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৮৫ লাখ। দৈনিক পানির চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ কোটি লিটার এবং সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১৩ কোটি লিটার। অর্থাৎ তখনও ঘাটতি ছিল। কিন্তু শহরের জনসংখ্যা, আয়তন ও অবকাঠামোর সঙ্গে সমস্যাটির মাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আজকের ঢাকা সেই ঢাকা নয়। ২০২৬ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় দৈনিক পানির চাহিদা ৩২০ থেকে ৩২৫ কোটি লিটার বলে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ ছয় দশকের কিছু বেশি সময়ে দৈনিক পানির চাহিদা ১৫ কোটি লিটার থেকে বেড়ে ৩২০–৩২৫ কোটি লিটারে পৌঁছেছে।
শুধু মানুষ বাড়েনি। বদলে গেছে শহরের কাঠামোও। একতলা-দোতলা বাড়ির জায়গায় এসেছে ১০, ১৫, ২০ তলা ভবন। একটি ভবনে এখন থাকতে পারে শতাধিক পরিবার। একই পানির সংযোগের ওপর নির্ভর করছেন কয়েক শ মানুষ।
তাই আজকের প্রশ্ন শুধু—ঢাকা ওয়াসা কত পানি উৎপাদন করে? প্রশ্ন হওয়া উচিত—
কত পানি উৎপাদন হয়, কত পানি বিতরণ করা হয়, কত পানি পথে হারিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নাগরিকের কলের মুখে কতটা নির্ভরযোগ্য পানি পৌঁছায়?
ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ অবকাঠামো গত কয়েক দশকে বেড়েছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক প্রায় ৫,১০০ কিলোমিটার। একই সময়ে ছিল ৩৮টি ওভারহেড ট্যাংক, পাঁচটি পানি শোধনাগার এবং এক হাজারের বেশি গভীর নলকূপ।
অর্থাৎ অবকাঠামো নেই—এ কথা বলা যাবে না। নতুন পানি শোধনাগার হয়েছে, বড় প্রকল্প হয়েছে, surface water ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পদ্মা ও গন্ধর্বপুরের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও রয়েছে।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটি—শোধনাগারে পানি তৈরি হলেই কি নাগরিকের কল পর্যন্ত পানি পৌঁছে যায়? উত্তর—সব সময় নয়। একটি আধুনিক পানি সরবরাহব্যবস্থা শুধু পানি উৎপাদনের কারখানা নয়। এর সঙ্গে জড়িত transmission line, pumping station, reservoir, pressure management, zoning, leakage control এবং শেষ প্রান্তের delivery। অর্থাৎ একটি শোধনাগার আধুনিক হলেই পুরো শহরের পানি সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক হয়ে যায় না। নাগরিকের কাছে শেষ বিচারের মাপকাঠি খুব সহজ: কল খুললে পানি আসে কি না।
শুধু ট্যাংকের সংখ্যা দিয়ে অবশ্য একটি শহরের পানি সরবরাহের সক্ষমতা বিচার করা যায় না। ভূগর্ভস্থ reservoir, pumping station, transmission network, pressure zone—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্নটি তবু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ঢাকা যখন ক্রমেই ঘনবসতিপূর্ণ ও vertical city হয়ে উঠছে, তখন তার পানি সরবরাহব্যবস্থার buffer capacity ও emergency resilience কি একই গতিতে বাড়ছে?
কারণ একটি বহুতল ভবনে পানি পৌঁছানো আর একটি একতলা বাড়িতে পানি পৌঁছানো এক বিষয় নয়। পানির চাপ কমে গেলে নিচের তলায় হয়তো পানি থাকবে, কিন্তু ওপরের তলায় থাকবে না। তখন ওয়াসার হিসাব বলবে—“এলাকায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।” আর ভবনের বাসিন্দা বলবেন— “আমাদের বাসায় পানি নেই।” দুটিই একই সঙ্গে সত্য হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী পানি সংকটের খবর প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ব কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার বাসিন্দারা প্রায় দুই মাস ধরে পানি সংকটে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে এসেছে। রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়েছে। অনেকে ট্যাংকারের পানি কিনেছেন; কোথাও কোথাও ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করার কথাও এসেছে।
এখানে “পানি সংকট” শব্দটি যথেষ্ট নয়। এটি আসলে জীবনযাত্রার সংকট। কারণ পানি না থাকলে মানুষ শুধু তৃষ্ণার্ত হয় না। বাথরুম অচল হয়ে পড়ে, টয়লেট পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়, গোসল বন্ধ থাকে, রান্নাঘরে বাসন জমে যায়, কাপড় ধোয়া যায় না, শিশুদের পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত হয় এবং বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে।
অর্থাৎ পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারের Hygiene ও Sanitation ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের Dignity—মর্যাদাপূর্ণভাবে জীবনযাপনের অধিকার।
একজন মানুষ নিয়মিত গোসল করতে পারছেন না, টয়লেট পরিষ্কার রাখতে পারছেন না, শিশুদের পরিচ্ছন্ন রাখতে পারছেন না, রান্নাঘর স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে পারছেন না—এটি কেবল অস্বস্তি নয়; এটি তার জীবনযাপনের মান ও মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।
পানি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না; পানি মানুষের পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য এবং মর্যাদা রক্ষা করে। তাহলে প্রশ্ন হলো—এই ক্ষতির কোনো হিসাব কি ওয়াসার Annual Report-এ থাকে?
তাই পানি সংকট শুধু নগর-সেবার সমস্যা নয়। এটি সামাজিক বৈষম্যের সমস্যাও। যার টাকা আছে, সে পানি কিনবে। যার টাকা নেই, সে অপেক্ষা করবে। এভাবে একটি মৌলিক নাগরিক প্রয়োজন ধীরে ধীরে বাজারের পণ্যে পরিণত হয়।
একটি পরিবার বোতলজাত পানি কিনে পান করতে পারে। কিন্তু বোতলজাত পানি দিয়ে কি টয়লেট flush করা যায়? সেই পানি দিয়ে কি শত মানুষের গোসল করা যায়? কাপড় ধোয়া যায়?
রান্নাঘর পরিষ্কার করা যায়? একটি বহুতল ভবনের sanitation system চালানো যায়? না।
এ কারণেই পানি অন্য সব utility থেকে আলাদা। পানির বিকল্প ব্যবস্থা একটি ব্যক্তিগত পরিবার তৈরি করতে পারে না। পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা তাই রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। আর এখানেই Hygiene, Sanitation এবং Dignity-র প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে।
নিরাপদ পানি ছাড়া ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা টেকসই হয় না। পর্যাপ্ত পানি ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা যায় না। আর এই দুটো ব্যাহত হলে মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনও বাধাগ্রস্ত হয়। অতএব পানি কোনো সাধারণ utility নয়; এটি একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ নগরজীবনের পূর্বশর্ত।
২০২৪ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অনুমতি ছাড়া রাস্তা কাটার অভিযোগে ঢাকা ওয়াসাকে ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৯২ টাকা জরিমানা করেছিল। পরে ওয়াসা সেই জরিমানা পরিশোধ করে। এখানে প্রশ্নটি নাগরিককে রাস্তা কাটার অনুমতি দেওয়া উচিত কি না—তা নয়।
প্রশ্নটি হলো— নাগরিকের ওপর যদি নিয়মের খড়্গ নামে, সেবাদাতার ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও কি সমান শক্তির জবাবদিহির খড়্গ নামে? একজন বাড়ির মালিক অনুমতি ছাড়া রাস্তা কাটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু কোনো এলাকায় দিনের পর দিন পানি না থাকলে? একটি পরিবারকে বাড়তি টাকা দিয়ে পানি কিনতে হলে? একজন কর্মজীবী মানুষকে গভীর রাতে পানি সংগ্রহ করতে হলে? একজন গৃহিণীকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি সংগ্রহে ব্যয় করতে হলে?
এই ক্ষতির দায় কার? বিলের হিসাব আছে, ভোগান্তির হিসাব নেই -নাগরিক পানি বিল দেন। বিল বকেয়া থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কিন্তু পানি না পাওয়ার দিনের হিসাব কে রাখে? নাগরিকের বিলের প্রতিটি টাকা হিসাবযোগ্য। তাহলে নাগরিকের প্রাপ্য সেবার ঘাটতিও কি হিসাবযোগ্য হওয়া উচিত নয়? একটি আধুনিক পানি সরবরাহব্যবস্থায় কিছু প্রশ্নের উত্তর নাগরিকের জানার অধিকার থাকা উচিত:
কোন এলাকায় কত ঘণ্টা পানি সরবরাহ হচ্ছে? কোথায় pressure কম? কোথায় pipeline failure? কখন মেরামত হবে? কোন zone-এ emergency tanker প্রস্তুত আছে? কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার বেশি পানি না থাকলে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত response time কত? এসব তথ্য কি নাগরিক real-time দেখতে পারেন? যদি না পারেন, তাহলে পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ করার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু নাগরিকের কল যদি নির্ধারিত সময়ে পানি না পায়, তাহলে সেই ব্যবস্থার শেষ প্রান্তে সমস্যা থেকেই যায়। তাই ঢাকা ওয়াসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুধু “আরও পানি উৎপাদন” নয়, প্রয়োজন—আরও নির্ভরযোগ্য distribution, প্রয়োজন zone-wise pressure management,প্রয়োজন leakage ও system loss কমানো, প্রয়োজন বহুতল ভবনভিত্তিক demand assessment,প্রয়োজন emergency water protocol,প্রয়োজন real-time public information,আর সর্বোপরি প্রয়োজন— accountability।
আমরা নাগরিককে প্রশ্ন করি— বিল দিয়েছেন? অনুমতি নিয়েছেন? রাস্তা কেন কাটলেন? ফি দিয়েছেন? নিয়ম মানলেন তো? এসব প্রশ্ন থাকবে।
কিন্তু নাগরিকও প্রশ্ন করতে পারেন— আমি বিল দিয়েছি—পানি কোথায়? আমি নিয়ম মেনেছি—সেবা কোথায়? আমি অপেক্ষা করেছি—সমাধান কোথায়? আমি পানি কিনেছি—এই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় কার?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২০২৬ সালে ঢাকার একজন নাগরিককে কেন নিয়মিত পানির জন্য ট্যাংকারের অপেক্ষা করতে হবে? ঢাকা ওয়াসার বয়স ৬৩ বছর -১৯৬৩ সালের ঢাকা আর নেই --শহর বদলেছে--জনসংখ্যা বেড়েছে--বহুতল ভবন বেড়েছে--প্রযুক্তি বদলেছে--পানি শোধন প্রযুক্তি বদলেছে--নতুন প্রকল্প হয়েছে--পানি সরবরাহের নেটওয়ার্কও বড় হয়েছে--এখন বদলাতে হবে আরও একটি জিনিস—জবাবদিহির কাঠামো।
কারণ নাগরিক পানি উৎপাদনের হিসাব পান করেন না--তিনি Annual Report পান করেন না--তিনি প্রকল্পের উদ্বোধনী ফলকও পান করেন না-তিনি শুধু চান—কল খুললে পানি আসুক।
আর যদি দিনের পর দিন কল খুলে শুধু বাতাস বের হয়, তাহলে নাগরিকের মুখ থেকে যে দীর্ঘশ্বাস বের হয়— “পানি ছাড়াই ভালো ছিলাম!” সেটি নিছক বিরক্তি নয়। সেটি একটি মহানগরের নাগরিকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের সেবা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার সতর্কবার্তা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই খুব সরল: ঢাকা ওয়াসা কি শুধু পানি উৎপাদন করবে, নাকি নাগরিকের কাছে নির্ভরযোগ্য পানি পৌঁছানোর নিশ্চয়তাও দেবে? কারণ পানি কোনো বিলাসিতা নয় -কোনো দয়া নয়--কোনো অতিরিক্ত সুবিধাও নয়। পানি শুধু নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন নয়; নিরাপদ পানি, Hygiene ও Sanitation নিশ্চিত করা একটি মর্যাদাপূর্ণ নগরজীবনের পূর্বশর্ত।
আর সেই প্রয়োজন পূরণ করতে না পারলে সবচেয়ে আধুনিক শোধনাগারও নাগরিকের শুকনো কলের কাছে এসে ছোট হয়ে যায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।