ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে নতুন সেলিব্রিটি ‘স্টেবল কয়েন’, যার আবির্ভাব ২০১৪ সালে। ডিজিটাল মুদ্রাকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে এটি চালু করে টিথার লিমিটেড নামের একটি মার্কিন কোম্পানি। এটি ডলার পেগড—অর্থাৎ ১ স্টেবল কয়েনের দাম ১ মার্কিন ডলারের সমান। ডিজিটাল কারেন্সির মূল্য ওঠানামা থেকে ব্যবহারকারীদের স্বস্তি দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। টিথারের পর স্টেবল কয়েন প্রকল্পে যুক্ত হয় সার্কেল, কয়েনবেজ এবং বাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠান। এদিকে, প্রায় দুই বছর ধরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেও মার্চের প্রথম ১৪ দিনে এসেছে ২২০ কোটি ডলার। ব্যাংকিং চ্যানেলে এই অর্থ আসায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রবাসীদের জন্য বাড়তি প্রণোদনাও চালু রয়েছে। তবে ব্লকচেইন পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান চেইনালাইসিস বলছে, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে স্টেবল কয়েনের ব্যবহার বাড়ছে। ব্যাংকিং চ্যানেলের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে প্রবাসীরা পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পাঠাচ্ছেন। এসব লেনদেনের বড় অংশই টিথারভিত্তিক এবং দেশে এসে তা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে উত্তোলন করা হচ্ছে, যা সম্পন্ন হতে সময় লাগছে মাত্র কয়েক মিনিট। আরেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিপ্টো ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশে ক্রিপ্টো ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২৫ শতাংশ। এর বড় অংশই স্টেবল কয়েন ব্যবহার করে পিয়ার-টু-পিয়ার পদ্ধতিতে অর্থ পাঠাচ্ছেন, ফলে লেনদেন খরচও প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. শাহ মোহাম্মদ আহসান হাবীব বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে ব্যবহারকারীরা পরে সমস্যায় পড়তে পারেন। স্টেবল কয়েন তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত নয়, ফলে ঝুঁকি থেকেই যায়। বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবহারের দিক থেকে দেশটির অবস্থান শীর্ষের দিকে। ফ্রিল্যান্সিং খাতে আয় গ্রহণ, অনলাইন গেমিং ও বেটিং প্ল্যাটফর্মেও ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এড়াতে নানা বিকল্প গেটওয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। জাইতুন বিজনেস সল্যুশনের চেয়ারম্যান মো. আরফান আলী বলেন, এসব লেনদেনের বিপরীতে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রবেশ না করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ব্যাংক বা বৈধ মানি ট্রান্সফার চ্যানেলের মাধ্যমে এ ধরনের লেনদেন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক প্রতিবেদনে ক্রস-বর্ডার পেমেন্টে স্টেবল কয়েন ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি এ ধরনের লেনদেন নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইন প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম আড়াই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ২৫ হাজার ব্যবহার অনুমতি (ইউপি) জারি করেছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এনবিআর জানায়, বন্ড সুবিধাভোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত ও সহজ সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নামে একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্ডেড গুদাম লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে অনলাইনে ব্যবহার অনুমতি নিতে পারছে। এতে আরও বলা হয়, আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত কাগজপত্র অনলাইনে যাচাইয়ের সুবিধার্থে সফটওয়্যারটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর সরাসরি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে গিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্যবহার অনুমতি জারিসহ এ-সংক্রান্ত সব সেবা গ্রহণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে এই সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমানে এনবিআরের অধীন তিনটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকেই অনলাইনে সব ব্যবহার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত সময়ে মোট ২৪ হাজার ৯৬৩টি ব্যবহার অনুমতি অনলাইনে জারি করা হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, সেবাটি আরও সহজ ও কার্যকর করতে বন্ড সুবিধাভোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তর এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। এনবিআরের মতে, অনলাইনে ব্যবহার অনুমতি জারি হওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। এতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য আরও গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশও উন্নত হচ্ছে। কাস্টমস প্রশাসনকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও দক্ষ করতে পর্যায়ক্রমে বন্ড নিরীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের ২৩ দিনে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহ ৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৮২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। গত বছর একই সময়ে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল ২ হাজার ৬৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা ২৫ হাজার ২৮১ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২১ হাজার ১২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও সরকার দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা, ভাড়া বৃদ্ধি না করা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি বয়ে এনেছে। রোববার (২২ মার্চ) চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদিবাগের বাসভবনে নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হলেও সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে ঈদযাত্রায় কোথাও জ্বালানির সংকটে পরিবহন বন্ধ হয়নি এবং ভাড়াও বাড়েনি। চেষ্টা করছি এটা ধরে রাখার। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। জ্বালানি তেলের উৎস খোঁজা ও সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য জনগণের সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সংযম প্রয়োজন। সবাই মিলে এটার সমাধান করতে হবে। ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘ দিন অব্যাহত থাকে, তবে চাপের মাত্রা আরও বাড়বে। বিশ্বজুড়ে যেভাবে চাপ বাড়ছে, তার প্রভাব আল্টিমেটলি আমাদের জনগণের ওপরও এসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই কঠিন সময় মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে সংযমী হতে হবে। একমাত্র সংযমের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহামুদ চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষ মালিকানা ফিরে পাওয়ায় এবারের ঈদ উৎসবমুখর পরিবেশে ও নির্ভয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে গার্মেন্টস খাতে বেতন-ভাতা আগাম নিশ্চিত করায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যায়নি, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় বড় পরিবর্তন। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে- ফ্যামিলি কার্ড ও ফারমার্স কার্ড চালু, কৃষকদের হাজার কোটি টাকার ঋণ মওকুফ এবং ইমাম-মোয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা প্রদান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি তিনি দেশের মানুষকে সংযম, সহযোগিতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে যেকোনো ধরনের সামরিক হামলা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প। এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে তেলের দাম ১৩ শতাংশেরও বেশি কমেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা। আল-জাজিরার তথ্যমতে, জিএমটি ১১ :০৮ নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলে প্রায় ১৭ ডলার বা ১৫ শতাংশ কমে ৯৬ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ১৩ ডলার বা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে সেশন লো ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে অবস্থান করছে। এর আগে জাহাজে ইরানের হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের উপরে উঠে গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে স্বর্ণের দামে বড় পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) গত ১৯ মার্চ এক দিনেই দুই দফায় স্বর্ণের দাম কমানোর যে ঘোষণা দিয়েছিল, সোমবারও (২৩ মার্চ) সেই নির্ধারিত দামেই বাজারে কেনাবেচা চলছে। দুই দফায় ভরিতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা কমানোর ফলে এখন ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার টাকার নিচে নেমে এসেছে। সবশেষ নির্ধারিত মূল্য তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ২ লাখ ৬২ হাজার ২৬৫ টাকা ছিল। একইভাবে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকায় নেমে এসেছে। এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ এখন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকায় কেনা যাচ্ছে। স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে যেখানে ২২ ক্যারেট রুপার ভরি ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা এবং ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ১৩২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৯ মার্চ এক দিনে দুই দফায় এবং ২০ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সিদ্ধান্তে স্বর্ণের দাম ভরিতে প্রায় ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা কমানো হয়েছে। বিশ্ববাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা গোল্ডপ্রাইস ডট ওআরজি অনুযায়ী প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলারের ঘর থেকে বড় পতনের মাধ্যমে ৪ হাজার ৩৬৪ ডলারে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তেজনায় মাসের শুরুতে দাম বাড়লেও বর্তমানে তা স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। এই বৈশ্বিক প্রভাবের কারণেই দেশের বাজারে ১৯ মার্চ এক দিনেই দুইবার দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাজুস যেখানে প্রথম দফায় সকালে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় বিকেলে আরও ৭ হাজার ৬৯৮ টাকা কমানো হয়। চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৪৫ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে যার মধ্যে ১৯ বার দাম কমানোর ঘটনা ঘটেছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঠিক আগ মুহূর্তে স্বর্ণের এই বড় দরপতন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কিছুটা কমায় স্থানীয় বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অস্থিরতা থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি খালাস কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। মার্চের প্রথম দিন থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত ২২ দিনে বন্দরে মোট ২৫টি জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস করা হয়েছে। রবিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেন বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। তিনি জানান, মার্চ মাসে এখন পর্যন্ত মোট ২৫টি জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ওমান থেকে আসা একটি জাহাজে এলপিজি গ্যাস খালাস কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড থেকে বেস অয়েল নিয়ে আসা একটি জাহাজ বহির্নোঙরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ‘বিক বরনহলম’ এবং ‘মর্নিং জেন’ নামের দুটি জাহাজ বন্দরের পথে রয়েছে। জাহাজ দুটি ২৫ মার্চের মধ্যে বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ওমান থেকে আসা ‘এলপিজি সেভান’ জাহাজে গ্যাস খালাস চলছে। অন্যদিকে থাইল্যান্ড থেকে বেস অয়েল নিয়ে আসা ‘এবি অলিভিয়া’ জাহাজটি বহির্নোঙরের ব্রাভো পয়েন্টে অবস্থান করছে এবং খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে কথা বলেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশ একাধিকবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও বাংলাদেশে তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।’ রবিবার (২২ মার্চ) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের মেহেদিবাগে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বর্তমানে জ্বালানি তেলের নতুন উৎস খোঁজা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট মোকাবেলায় তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা ও সংযম কামনা করেন।’ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে জানান আমির খসরু। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের ফলে ঈদযাত্রায় কোথাও জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন বন্ধ হয়নি এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ভাড়ার বোঝাও চাপানো হয়নি। এবারের ঈদ অত্যন্ত উৎসবমুখর ও নির্ভয় পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষ মালিকানা ফিরে পাওয়ায় একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া রমজান ও ঈদে পোশাক খাতের শ্রমিকদের আগাম বেতন-ভাতা পরিশোধের ফলে কোনো শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়নি, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির একটি বড় লক্ষণ।’ সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নিম্নবিত্ত ও কৃষকদের সহায়তায় কার্ডের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে। ঋণ মওকুফ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণের বোঝা লাঘব করা হবে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য চলমান ভাতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।’ এ সময় চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সবাইকে সংযম, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিশ্ববাজারে একদিনে স্বর্ণের দাম ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ পতন হয়েছে। রোববার (২২ মার্চ) বিশ্বজুড়ে স্বর্ণ ও রুপার দামের নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট ‘গোল্ডপ্রাইস’ এ তথ্য জানিয়েছে। সবশেষ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১০৮ দশমিক ৮৩ ডলার কমে ৪ হাজার ৪৯৪ ডলারে নেমে এসেছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে দাম কমলে এর প্রভাব পড়ে দেশের বাজারেও। তাই যে কোনো সময় দেশের বাজারেও দাম কমানো হতে পারে। সবশেষ বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেলে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সেদিন ভরিতে মূল্যবান এই ধাতুটির দাম ৭ হাজার ৬৯৮ টাকা কমানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ ও রুপার (পিওর গোল্ড ও সিলভার) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়ছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে। এটা কঠিন সময়, আমাদের স্বীকারই করতে হবে। একে তো অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে এই যে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে, সেটার কারণে অর্থনীতির উপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং এই যুদ্ধ যদি চলতে থাকে চাপটা আরও বাড়তে থাকবে। রোববার (২২ মার্চ) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগে নিজ বাসভবনে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কারে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তায় খুব সজাগ আছি। ইতোমধ্যে আমাদের জ্বালানি যে প্রকিউরমেন্ট—ভালো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এখনো অব্যাহত আছে। যাতে জ্বালানির অভাবে মিল-কারখানা, পাওয়ার সেক্টর বাধাগ্রস্ত না হয়। সেটা এখনো মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখনো পর্যন্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের চাপ সামাল দিতে চেষ্টা করছে সরকার। তবে ভবিষ্যতের চাপ সামলাতে জনগণকেও সংযমী হতে হবে। তিনি বলেন, আমরা এ ধারা অব্যাহত রাখার জন্য চেষ্টা করছি। যুদ্ধ যদি বেশিদিন অব্যাহত থাকে, চাপটা বাড়তে থাকবে। সেই চাপটা আলটিমেটলি জনগণের উপর আসবে। যেভাবে বিশ্বব্যাপী আসছে, সেটা বাংলাদেশেও আসবে। এটার জন্য জনগণের সমর্থন, সহযোগিতা, সহানুভূতি লাগবে, সংযম লাগবে। আমির খসরু বলেন, সবাই মিলে তো সমাধান করতে হবে। সরকার সরকারের পক্ষ থেকে সবকিছু করছে। আমরা জনগণের সহযোগিতা ও সহানুভূতি চাই এবং সংযমও আমাদের মধ্যে থাকতে হবে। সংযমের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। যুদ্ধ তো আমাদের হাতে নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, যু্দ্ধ হচ্ছে অন্য জায়গায়। এটার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশে। সবদেশে কম-বেশি। বাংলাদেশে বেশি কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের জ্বালানির মূল সোর্সটা। আমাদের উপর চাপটা অনেক বেশি। মন্ত্রী বলেন, আমরা জ্বালানিতেও চেষ্টা করছি। অলটারনেটিভ অনেকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা জ্বালানি আনার চেষ্টা করেছি। কিছু কিছু শুরুও হয়েছে। এই পর্যন্ত একটা ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে আমরা মোটামুটি ভালো জায়গায় আছি। এ সময় চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জিয়াউদ্দীন এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতু দিয়ে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক যানবাহন পারাপার এবং সর্বোচ্চ টোল আদায়ের এক নতুন মাইলফলক অতিক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে গৃহীত সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ফলে পদ্মা সেতুতে চলতি বছরের প্রথম তিন দিনে (১৭ থেকে ১৯ মার্চ) ১ লাখ ৯ হাজার ২৫টি যানবাহন পারাপার হয়ছে, ২০২৫-এ এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮০২টি। চলতি বছর প্রথম তিন দিনে মোট টোল আদায় হয় ১২ কোটি ৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, যা ২০২৫ সালে ছিল ১২ কোটি ৭৮ হাজার ৪০০ টাকা। একইভাবে যমুনা সেতুর ক্ষেত্রে চলতি বছর ১৮ মার্চ এক দিনে সর্বোচ্চ ৫১ হাজার ৩৮৪টি যানবাহন পারাপার হয়, ২০২৫-এ এই সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৪৮ হাজার ৩৬৮টি। ২০২৬ সাল এক দিনে সর্বোচ্চ মোট টোল আদায় হয় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ টাকা, যা ২০২৫ সালে ছিল ৩ কোটি ৪৬ লাখ ২৭ হাজার ৮৫০ টাকা। ২০২৫ সালের তুলনায় যানবাহনের চাপ বেশি থাকলেও এই বছর বড় কোন দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের যানজট পরিলক্ষিত হয়নি। এই পরিসংখ্যানগুলো দেশের সড়ক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় সেতু কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও দক্ষতার প্রতিফলন। সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থাকে সহজ ও আধুনিক করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীও আসন্ন ঈদযাত্রা নিয়ে অত্যন্ত সজাগ এবং বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখছেন।
দাম কমানোর প্রায় ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম আরও এক দফা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভরিতে ৭ হাজার ৬৯৮ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকা। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেলে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় সংগঠনটি। এতে বলা হয়, নতুন নির্ধারিত দাম আজ বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে কার্যকর হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম কমে যাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং রপ্তানি বিল ক্রয়ের সুবিধার্থে আজ ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার) দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ মার্চের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত কিছু এলাকায় ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখাগুলো স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ঢাকা মহানগরীসহ আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের তৈরি পোশাকশিল্প-ঘন এলাকাগুলোতে এই বিশেষ সেবা দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ব্যাংকের অফিস চলবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। তবে গ্রাহক লেনদেন হবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এর মধ্যে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে দেড়টা পর্যন্ত জোহরের নামাজের জন্য স্বল্প বিরতি থাকবে। ঈদের সরকারি ছুটি শুরু হলেও পোশাক খাতের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক তাদের নির্দিষ্ট কিছু শাখা খোলা রেখেছে। প্রাইম ব্যাংক আগ্রাবাদ, নারায়ণগঞ্জ, গণকবাড়ী ও টঙ্গী শাখা চালু রেখেছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আগ্রাবাদ করপোরেট শাখা, ঢাকার হেড অফিস কমপ্লেক্স, লোকাল অফিস ও নারায়ণগঞ্জ শাখায় লেনদেন চালু রেখেছে। ব্র্যাক ব্যাংক মতিঝিল, টঙ্গী, গণকবাড়ী, জয়দেবপুর, সিডিএ অ্যাভিনিউ, রোকেয়া সরণি, রংপুর, ধানমন্ডি-২৭, বড় বাজার, গুলশান নর্থ অ্যাভিনিউ, যশোর ও সিদ্ধিরগঞ্জ শাখায় সেবা দিচ্ছে। সিটি ব্যাংক উত্তরবঙ্গ ও রংপুর অঞ্চলের পাশাপাশি পাবনা ও বগুড়ার শাখাগুলো চালু রেখেছে। এনসিসি ব্যাংক মতিঝিল, সাভার, জয়দেবপুর ও বাইপাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক তাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক মতিঝিল, কাওরানবাজার ও গুলশানসহ কিছু নির্দিষ্ট শাখা খোলা রেখেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক চন্দ্রা, বিসিক ও জুবিলি রোডসহ শিল্পাঞ্চলভিত্তিক কয়েকটি শাখায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিধি অনুযায়ী বিশেষ ভাতা পাবেন। মূলত পোশাক শিল্পের আর্থিক কার্যক্রম সচল রেখে ঈদ উদযাপন নির্বিঘ্ন করতে এই বিশেষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ ভীতি জাগালেও এখনও বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে পড়েনি বাংলাদেশ; তবে শুরুতেই ধাক্কা লেগেছে আমদানিনির্ভর এ খাতে, বিশেষ করে চাপে পড়েছে গ্যাসের মজুদ। যুদ্ধের দামামা বাড়তে থাকলে বিশ্বের তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বাংলাদেশের গ্যাস ও তেল আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা সরবরাহ ব্যবস্থায় ছেদ পড়েছে। শুরুতেই কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কার্গো আসার কথা ছিল, তা মিলছে না। এতে মার্চ মাসের চাহিদা মেটাতে সরকারকে উচ্চ দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। প্রথম ধাক্কাতেই এ গ্যাস কেনার খরচ বেড়ে গেছে প্রায় তিনগুণ। অপরদিকে প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর এলপিজি সরবরাহের ব্যবস্থার কী হবে তা ভাবিয়ে তুলছে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সরকারি নীতিনির্ধারকদেরও। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে খুব বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। কেননা মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনা বন্ধ হলেও ভারতসহ অন্য দেশ থেকে পরিশোধিত তেল আনার পথ খোলা থাকছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার যুদ্ধের শুরুতে রেশনিংয়ের ঘোষণা দিলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল নিতে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। এতে তেলের সংকট না থাকলেও দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে গিয়ে সেখানে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয় গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের। পরে রেশনিং তুলে নেওয়া হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে, দুশ্চিন্তা বাড়ছে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে শুরু করেছে। পাল্টা হামলায় ইরান দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির নিশ্চিত সরবরাহ নিয়ে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি ঝুঁকি এখন তিন খাতে স্পষ্ট। গ্যাস মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সার খাত সরাসরি এর ওপর নির্ভরশীল। কিছুদিনের জন্য প্রয়োজনীয় তেল মজুদ থাকলেও আতঙ্কের প্রভাব দেখা গেছে বাজারে। এলএনজির মতো এলপিজি আমদানির মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে আনতে উচ্চ ব্যয় নিয়ে ভাবনায় পড়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে আরও কিছু জটিলতা মিলিয়ে সামনের দিনে চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে তা নিয়ে নতুন অস্থিরতার ভিত্তি তৈরির কথা বলছেন তারা। তারা বলছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এলপিজির কয়েকটি বড় চালান বাংলাদেশের পথে ছিল। চট্টগ্রাম, মোংলা ও সীতাকুণ্ডমুখী আরও কয়েকটি ট্যাংকারে প্রায় ১০ হাজার টন এলপিজি ছিল। অর্থাৎ মার্চে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা কিছুটা কমলেও এপ্রিলের পরিস্থিতি নির্ভর করছে যুদ্ধ, জাহাজ চলাচল, বিকল্প উৎস থেকে সংগ্রহ এবং ব্যাংকিং সহায়তার ওপর। করণীয় কী বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে না দেওয়া এবং সীমিত জ্বালানি সম্পদের ব্যবহারে স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে সীমিত জ্বালানিকে সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার আগে ঠিক করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। গত দুই দশকে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করে তোলার ফলে আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় ঝুঁকি বাড়ছে বলেও মত দেওয়া হয়েছে। শুরুতেই ধাক্কা গ্যাস আমদানিতে ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে এলএনজিতে। মার্চে সরবরাহ সচল রাখতে অতিরিক্ত চারটি স্পট কার্গো কিনতে হয়েছে। মার্চে নেওয়া স্পট কার্গোগুলোর মধ্যে একটি প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮.২৮ ডলার, আরেকটি ২৩.০৮ ডলার, অন্যগুলো ২০.৭৬ ও ২১.৫৮ ডলারে কেনা হয়েছে। অথচ জানুয়ারিতে একই ধরনের গ্যাস প্রায় ১০ ডলারের আশপাশে পাওয়া গিয়েছিল। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আমদানি ব্যয়ের এই উল্লম্ফনই এখন সবচেয়ে বড় চাপ। দেশে এখন দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ হয় প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে প্রায় ৯০০–৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে এলএনজি থেকে। ফলে আমদানিনির্ভরতা এখন স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে সার খাতে সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎ ও জরুরি খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভাবাচ্ছে এলপিজিও যুদ্ধের মধ্যে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে বেশি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ খাত প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। দেশে প্রতিদিন এলপিজির চাহিদা প্রায় ৫ হাজার টন। ডিলার পর্যায়ে চাহিদার তুলনায় কম সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সামনে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমদানিকারকদের মতে, মার্চে কিছুটা সরবরাহ থাকলেও এপ্রিলের পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভর করছে যুদ্ধ পরিস্থিতি, জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর। পাশাপাশি পরিবহন ও বীমা ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও এতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারনে কাতারে ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে অনুষ্ঠিতব্য ফিনালিসিমা বাতিল হয়ে যাওয়ায় গুয়াতেমালার সাথে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দোহায় স্পেনের বিপক্ষে আগামী ২৭ মার্চ ফিনালিসিমায় মুখোমুখি হবার কথা ছিল। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর আয়োজকরা নতুন ভেন্যু ও তারিখ খোঁজার প্রতি মনোযোগী হয়। আর্জেন্টিনা সব ধরনের প্রস্তাব নাকচ করে দেয়ায় শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি বাতিল করতে বাধ্য হয় উয়েফা। ম্যাচ বাতিলের একদিন পর ২৭ মার্চ ভিয়ারিয়ালে সার্বিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলার ঘোষনা দেয় স্পেন। এবার আর্জেন্টিনা ৩১ মার্চ বুয়েন্স আয়ার্সে গুয়াতেমালার সাথে ম্যাচ খেলার ঘোষনা দিল।
বৈশ্বিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মতো বহুমুখী চাপের মধ্যেও দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। আজ বুধবার রাজধানীর বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মাহমুদ হাসান খান বলেন, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নানা সংকটের মধ্যেও বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলো শ্রমিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তাদের বেতন, ভাতা ও উৎসব বোনাস পরিশোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এর ফলে শ্রমিকরা তাদের আইনসম্মত পাওনা বুঝে পেয়েছেন এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধে সহজ শর্তে বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান এবং দ্রুত ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা ছাড় করায় উদ্যোক্তাদের তারল্য সংকট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। এতে শিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বিজিএমইএ’র তালিকাভুক্ত কারখানাগুলোর মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এবং ৯৯ দশমিক ৮১ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কয়েকটি কারখানায় পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা আজকের মধ্যেই সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও প্রায় ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ কারখানা মানবিক বিবেচনায় মার্চ মাসের আংশিক বেতন অগ্রিম হিসেবে শ্রমিকদের প্রদান করেছে। শিল্পাঞ্চলে যাত্রীদের চাপ কমাতে এলাকাভিত্তিক ধাপে ধাপে ছুটি প্রদান করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়। ১৭ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং আজ ও আগামীকালের মধ্যে বাকি কারখানাগুলোতেও ছুটি দেওয়া হবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খানসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে ৬০টি দেশের ‘যথেষ্ঠ পদক্ষেপ’ নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তদন্তে নামায় এককভাবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রপ্তানির গন্তব্যের দেশটিতে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না সেই ভাবনা সামনে এসেছে। আপাত দৃষ্টিতে এটিকে শুধু নীতি ও পদক্ষেপ যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ তদন্তের ফল নেতিবাচক হলে তা ভবিষ্যতে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরিতে কতটা প্রভাব ফেলবে সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মধ্যে। নিজেদের ক্রেতা ও শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় তখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার শঙ্কা থাকছে। এরপরও এ তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের নেতারা। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি সব ধরনের ‘কমপ্লায়েন্স’ মেনে চলায় তারা একক দেশ হিসেবে বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের এ তদন্তকে ‘ভয়ের কারণ’ দেখছেন না। একইরকম ভাষ্য মিলেছে সরকারের তরফেও। রপ্তানি বাজারে এর কোনো ‘প্রভাব থাকবে না’ বলে মনে করছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। যে আইনের অধীনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর- ইউএসটিআর তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে সেই আইন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে কোনো দেশের নীতি বা বাণিজ্য আচরণ তাদের ব্যবসার জন্য ‘অযৌক্তিক’ বা ‘বৈষম্যমূলক’ তাহলে ‘প্রতিক্রিয়ামূলক বাণিজ্য ব্যবস্থার’ মত পদক্ষেপ নিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- শুল্ক আরোপ বা আমদানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া; ওই দেশের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তির আওতায় রপ্তানিতে ছাড় দেওয়া হলে তা তুলে দেওয়া বা প্রত্যাহার করা; অথবা দেশটির সরকারের সঙ্গে ‘বাধ্যতামূলক’ চুক্তি করে ‘বিতর্কিত’ কার্যক্রম বন্ধ করা বা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকেও এমন তদন্তের মধ্যে রাখার সিদ্ধান্তকে ‘মোস্ট স্ট্রেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার। তিনি বলেন, ‘জোরপূর্বক শ্রম’ হিসেবে যে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। তবে যুক্তরাষ্ট্র বড় বাজার হওয়ায় বাংলাদেশসহ সব দেশের জন্যই এ তদন্তকে ‘ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের’ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশকে কৌশলগত দেনদরবারের দিকে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এই পরামর্শক। কেন এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসটিআর বৃহস্পতিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর–তা খতিয়ে দেখতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। এ তদন্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারার আওতায়, যেটির মাধ্যমে অন্য দেশের বাণিজ্য নীতি মার্কিন বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক মনে হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য থাকার পরও দেশগুলোর সরকার তাদের বাজারে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করব, বিদেশি সরকারগুলো জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি না এবং এসব অনৈতিক চর্চা মার্কিন শ্রমিক ও ব্যবসার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে। ইউএসটিআর বলছে, তদন্ত শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত দেশের সরকারগুলোর কাছে আলোচনার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। এ তদন্তের শুনানি ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে বলে তুলে ধরেছে ইউএসটিআর। শুনানিতে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মতামত দিতে চায় বা অংশ নিতে চায় বা সাক্ষ্যের সারসংক্ষেপ জমা দিতে চায়, তাদের ১৫ এপ্রিলের মধ্যে লিখিত মতামত ও আবেদন জমা দেওয়ার কথা বলেছে মার্কিন সংস্থটি। তদন্ত মানেই কি নিষেধাজ্ঞা? তদন্ত শুরু হওয়া মানেই তাৎক্ষণিক শুল্ক বা আমদানি নিষেধাজ্ঞা নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্প্রসারণে একের পর এক যেসব সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে তাতে শঙ্কাও কম নয়। সাধারণত এমন তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি ও আইন মূল্যায়ন করা হয় এবং পরে প্রয়োজন হলে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মূলত মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষা ও তার সম্প্রসারণের একটা ব্যবস্থা হিসেবে এটি গ্রহণ করা হয়। ৩০১ ধারা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, আমদানি সীমাবদ্ধতা আরোপ বা বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আবার সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেও বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমবার এসে ২০১৭ সালে এ ধারার ব্যবহার শুরু করে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অরগানাইজেশন (ডব্লিউটিও) ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর অনেক বছর যুক্তরাষ্ট্র এ ধারা মূলত সংস্থাটিতে মামলা করার ভিত্তি তৈরির জন্য ব্যবহার করত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেবার এ আইনের ব্যবহার বাড়ায়। প্রথমেই ২০১৭ সালে চীনের প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মেধাস্বত্ব নীতির তদন্ত চালু করে এবং পরের বছর দেশটির প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে ২৫ শুল্ক আরোপ করে। এ সিদ্ধান্তকে ‘চ্যালেঞ্জ’ করে চীন ডব্লিউটিও এর দ্বারস্থ হয় এবং বলে- এটি সংস্থাটির বিধিবিধানের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। পরে সংস্থাটি চীনের পক্ষে রুল জারি করলেও যুক্তরাষ্ট্র সেটি আমলে না নিয়ে শুল্ক আরোপ চালিয়ে যায়। এরপর ২০২০ সালে বিমান শিল্পে ভর্তুকি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক বসানো হয়, যা পরে ২০২১ সালে স্থগিত করা হয়। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসেও পরে এ ধারা অব্যাহত রাখে। নতুন করে নিকারাগুয়ার শ্রম ও মানবাধিকার নীতি, চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নীতি এবং চীনের জাহাজ নির্মাণ ও শিপিং খাত নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করে। ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় দফায় এসে ব্রাজিলের ডিজিটাল বাণিজ্য ও ইলেক্ট্রনিক পেমেন্ট সেবা, ইথানল মার্কেট এক্সেস এবং চীনের বিরুদ্ধে আরও একটি তদন্ত শুরু করে। সবশেষ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ছাড়া অন্য যেসব দেশের ওপর তদন্ত হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা, বাহরাইন, ব্রাজিল, কম্বোডিয়া, কানাডা, চিলি, চীন, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ইকুয়েডর, মিসর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), গুয়াতেমালা, গায়ানা, হন্ডুরাস, হংকং (চীন), ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইসরায়েল, জাপান, জর্ডান, কাজাখস্তান, কুয়েত, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, নিউজিল্যান্ড, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, নরওয়ে, ওমান, পাকিস্তান, পেরু, ফিলিপাইন, কাতার, রাশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাজ্য, উরুগুয়ে ও ভেনেজুয়েলা। এর আগে গত বুধবার উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দেশটি। ‘শঙ্কার কারণ নেই’ বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের শিল্পে পণ্য উৎপাদনে দীর্ঘদিন থেকেই জোরপূর্বক শ্রম না থাকার দাবি করে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এ নিয়ে ‘শঙ্কার কোনো কারণ’ দেখছেন না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন তার দেশের বাণিজ্য বাড়াতে একের পর এক যেসব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে এবং শুল্কের বোঝা চাপিয়ে দেশটির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য চুক্তি সেরে নিচ্ছে- তাতে কিছুটা হলেও ভয় দেখছেন তিনি। এজন্য রপ্তানিকারকদের সঙ্গে বসে বর্তমান সরকারকে দ্রুত কৌশল ঠিক করার তাগিদ দিয়েছেন এই ব্যবসায়ী নেতা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। পরে দর কষাকষি করে এ হার ২০ শতাংশ নামে, যা ১ অগাস্ট কার্যকর হয়। আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক; সব মিলিয়ে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। বাড়তি এ শুল্ক কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়ায় বাংলাদেশ। বোয়িং, গম, সয়াবিন, তেলসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়াতে দেয় প্রতিশ্রুতি। এ নিয়ে দেন দরবারের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে আরোপিত পারস্পরিক সম্পূরক শুল্ক ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে হয় ১৯ শতাংশ। তাতে করে মোট শুল্কহার আগের কমে হয় ৩৪ শতাংশ। নতুন এ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ছাড় দেবে; কিন্তু বিনিময়ে তাদের পণ্য আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারে তাদের আরও বড় ছাড় দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারকে। কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে করা এ চুক্তি নিয়ে পরে সমালোচনা আসে বিভিন্ন মহল থেকে। বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে কী আমদানি করবে বা করবে না সেক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখার বাধ্যবাধকতার মতো বিষয়গুলোও ঠাঁই পাওয়ার সমালোচনা করেন তারা। বিকেএমইএর সভাপতি হাতেম ওই দিকটায় ইঙ্গিত করে বলেন, “সরকারকে আহ্বান করব যে বিষয়টা নিয়ে স্টেকহোল্ডারদের সাথে বসে আলোচনা করে এটার কৌশল ঠিক করা দরকার। কোন পয়েন্টে কীভাবে কথা বলতে হবে, কী করতে হবে–এগুলো নিয়ে মনে হয় একটু প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে আমাদের। ২৮ এপ্রিল বোধহয় ডেট দিছে। তো তাহলে এর আগে একটা প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে এখনই ‘কোনো শঙ্কার কারণ নেই’ মন্তব্য করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “আমাদেরকে কেন ফেলল (তদন্তে), সেটাও আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তবে আমরা এটাকে স্বাগত জানাই। খুব ট্রান্সপারেন্ট ওয়েতেই আমরা বিজনেস করি। সুতরাং তারা আসুক, তদন্ত করতে চায় করুক, এতে কোনো আপত্তি নেই। বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে সেখানে শিশু শ্রম বা জোরপূর্বক শ্রমের বিষয় আছে কি না কিংবা এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে হাতেম বলেন, “না, আমরা কী আমদানি করি? আমরা র' মেটেরিয়ালস (কাঁচামাল) আমদানি করি চীন থেকে। এখন চীনে শিশু শ্রম আছে? আমেরিকার বেশির ভাগ রপ্তানিই তো যায় চীন থেকে। তারা কি চীনের রপ্তানি বন্ধ করে দিছে? সুতরাং এটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত না। ‘সম্পর্কে কৌশলী হতে হবে’ যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে বাংলাদেশের নাম আসায় বিস্ময় প্রকাশ করে তাদের ‘ইনটেনশন’ আমলে নেওয়ার কথা বলেছেন বাণিজ্য বিশ্লেষক জায়েদী সাত্তার। বলেন, এটা তো আমি যতটুকু পড়ে দেখলাম, এটা তো মোস্ট ‘স্ট্রেঞ্জ’। মানে তারা ফোর্সড লেবার যেভাবে বর্ণনা করেছে, এটা আমাদের এখানে তো অ্যাপ্লাই-ই করে না। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক বাণিজ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ডব্লিউটিওর বিধিবিধান মানছে না। আবার দেশটির বাজারে পণ্য রপ্তানির প্রবেশাধিকারও প্রয়োজন, কেননা সেখানে চাহিদা বেশি, মূল্যও পাওয়া যায় বেশি। এসব কারণ তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘স্ট্র্যাটেজিক এবং ট্যাক্টফুল রিলেশনশিপ মেনটেইন’ করার পরামর্শ তার। দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পাশাপাশি এমন তদন্ত থেকে মুক্ত থাকতে আইএলও কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক যেসব শ্রম বিধি-বিধান আছে সেগুলো অনুসরণ করার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, “কারণ আমরা রপ্তানি করছি কিন্তু উন্নত দেশে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একদিকে আছে, ইউরোপ আছে, অন্যদিকে নর্থ আমেরিকা আছে। সুতরাং আমাদেরকে আজকে না হোক কালকে আমাদেরকে ওদের শ্রম আইন এবং ওদের যে এমপ্লয়মেন্টের যে এনভায়রনমেন্ট থাকে, ওটার কাছাকাছি যেতে হবে। সব একেবারে নিখুঁত না হলেও অন্তত বোঝাতে হবে যে আমরা আন্তর্জাতিক শ্রম আইন-বিধি অনুসরণে আগ্রহী। তিনি আরও বলেন, “মনে হচ্ছে যে শুধু বাংলাদেশের উপরে না। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা সবাই আছে এই ৬০ দেশের মধ্যে। এবং বিস্ময়করভাবে আছে নিউ জিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্যও। সুতরাং মনে হচ্ছে এটা ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকেও আশ্বস্ত করা হয়েছে যে এ তদন্তে বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমাদের মনে হয় না। এটাতো প্রায় ৬০টা দেশের মধ্যে হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ব্রিটেনও আছে। আমাদের শিশু শ্রম অনানুষ্ঠানিক খাতে আছে। যেমন দোকানদারি—এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। তৈরি পোশাক খাতে আগে ছিল, এখন নেই। এটি মূলত শ্রম বিষয়ক একটি ইস্যু। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোতে অতিরিক্ত সক্ষমতা নেই এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো কোনো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও জোরপূর্বক শ্রমের বিষয় প্রযোজ্য নয় বলেই মনে করেন তিনি। প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে একটি টিম গঠন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হবে। তবে আগের মতো বড় ধরনের দেনদরবারের প্রয়োজন হবে না বলেই মনে করছেন তিনি।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বুধ ও বৃহস্পতিবার ব্যাংক খোলা থাকবে। বুধবার (১৮ মার্চ) নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এর পরের দিন ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার) থেকে শুরু হচ্ছে ঈদের নির্ধারিত ছুটি। ওই দুইদিন ব্যাংক বন্ধ থাকার কথা থাকলেও পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাসসহ অন্যান্য ভাতা পরিশোধ এবং রপ্তানি বিল বিক্রয়ের সুবিধার্থে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ ও ১৯ মার্চ পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যাংক শাখাগুলো সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। ওই দুইদিন সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে নির্ধারিত সময়ে লেনদেন চলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ সাইট সুপারভিশন থেকে গত ১০ মার্চ এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। নির্দেশনায় বলা হয়, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক কর্মচারী/কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও রপ্তানি বিল ক্রয়ের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো ঈদের আগের সরকারি ছুটির দিন ১৮ ও ১৯ মার্চ সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। ঢাকা মহানগরী, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে অবস্থিত তপশিলি ব্যাংকের তৈরি পোশাক শিল্প-সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ছুটির দিন সংশ্লিষ্ট শাখা খোলা থাকবে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত লেনদেন হবে আর অফিস চলবে দুপুর ২টা পর্যন্ত। এর মধ্যে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে দেড়টা পর্যন্ত জোহরের নামাজের বিরতি থাকবে। ছুটির মধ্যে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করবেন তাদের বিধি মোতাবেক ভাতা দিতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানিবাহী জাহাজের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে গতি আনতে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ছে আরও দুই জ্বালানিবাহী জাহাজ। বর্তমানে খালাস চলমান থাকা ‘চ্যাং হ্যাং হং তু’ ও ‘এলপিজি সেভান’- এর মধ্যে প্রথমটি আগামীকাল বুধবার এবং দ্বিতীয়টি আগামী শুক্রবার (২০ মার্চ) বন্দরে ভিড়বে, যা জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তালিকা অনুযায়ী, চ্যাং হ্যাং হং তু’ নামের জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস অয়েল নিয়ে ১৫ মার্চ বন্দরে এসেছে এবং বর্তমানে ব্রাভো মুরিং-এ অবস্থান করছে। জাহাজটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন কার্গো খালাস করেছে এবং এর সম্পূর্ণ খালাস শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ১৯ মার্চ ২০২৬। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, জাহাজটি আগামীকাল বুধবার বন্দরে ভিড়বে। অন্যদিকে, 'এলপিজি সেভেন' জাহাজটি ওমান থেকে এলপিজি নিয়ে ৮ মার্চ আগমন করে কুতুবদিয়া এলাকায় অবস্থান করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০২০ মেট্রিক টন এলপিজি খালাস হয়েছে এবং জাহাজটির সম্পূর্ণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০ মার্চ ২০২৬। জাহাজটি শুক্রবার বন্দরে ভিড়বে বলে জানা গেছে। তালিকায় আরও দেখা যায়, মোট ২৮টি জ্বালানিবাহী জাহাজের মধ্যে অধিকাংশই ইতোমধ্যে কার্গো খালাস সম্পন্ন করে বন্দর ত্যাগ করেছে। এর মধ্যে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ওমান ও ভারতের বিভিন্ন বন্দর থেকে আসা জাহাজগুলো এলএনজি, এলপিজি, ক্রুড অয়েল, গ্যাস অয়েল, এইচএসএফও ও বেস অয়েল সরবরাহ করেছে। এছাড়া কয়েকটি জাহাজ বর্তমানে ‘প্যাসেজ’-এ রয়েছে, অর্থাৎ তারা বন্দরের পথে রয়েছে। এর মধ্যে কাতার, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, অ্যাঙ্গোলা, থাইল্যান্ড ও ওমান থেকে আসা জাহাজ রয়েছে, যেগুলো এলএনজি, এইচএসএফও, এলপিজি ও বেস অয়েল বহন করছে। তথ্যগুলো নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়াত হামিম বলেন, ‘জ্বালানি খালাস ও সরবরাহ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নতুন জাহাজগুলোর আগমনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
ঈদ এলেই নতুন নোটের চাহিদা বেড়ে যায়। নতুন নোট পণ্য হিসেবে বিক্রি বেআইনি হলেও রাজধানীতে প্রকাশ্যেই চলছে এই বেচাকেনা। রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশেই এবং গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের সামনের ফুটপাতে নতুন নোটের অবৈধ বাজার জমে উঠেছে। এ ছাড়াও বিক্রি হচ্ছে শাঁখারি বাজার মোড়ে- এসব এলাকা মিলিয়ে শতাধিক অস্থায়ী দোকানে নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকা কেনাবেচা করতে দেখা গেছে। বিক্রেতাদের কাছে দুই টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত নতুন নোটের বান্ডিল পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব বান্ডিল কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন নোট ছাড়েনি বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্দিষ্ট পরিমাণ নতুন নোট সংগ্রহ করতে পারবেন। ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে গিয়েও নতুন নোট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা। চার-পাঁচ দিন ধরে বেড়েছে চাহিদা : নতুন নোটের ব্যবসায়ীরা জানান, গত চার-পাঁচ দিন ধরে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। এবার ঈদের আগে ছুটি শুরু হওয়ায় মানুষ আগেভাগেই নতুন নোট সংগ্রহ করতে আসছেন। গত রবিবার সকালে মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাতের ওপর বা অস্থায়ী টেবিলে সাজিয়ে নতুন নোট বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। বিক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার কিছু নোটের দাম কিছুটা কম। কোন নোটের চাহিদা বেশি : বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে ৫, ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোটের। পাশাপাশি ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নতুন নকশার নোটও বিক্রি হচ্ছে। নতুন নকশার নোটের জন্য ক্রেতাদের অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে। মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে পুরোনো নকশার ২ টাকার নতুন এক বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়তি দামে। ১০ টাকার পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে। নতুন নকশার ১০ টাকার নোট কিনতে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। এ ছাড়া ২০ টাকার নতুন নকশার নোটের বান্ডিল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং পুরোনো নকশার নোট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ টাকার পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা বাড়তি দামে এবং নতুন নকশার নোটের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ১০০ টাকার নতুন ও পুরোনো নোটের বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি দামে। এ ছাড়া ২০০, ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোটের বান্ডিল কিনতেও ক্রেতাদের দিতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা অতিরিক্ত। তবে বিক্রেতা ভেদে দামে কিছুটা কমবেশি রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দরদাম করে বান্ডিলপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা কমাতেও দেখা গেছে। ব্যাংকে না পেয়ে ফুটপাতে : মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে নতুন নোট কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ২০ টাকার এক বান্ডিল নতুন নোট কিনতে ৩৩০ টাকা অতিরিক্ত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে ফরিদপুর যাব। বাড়ির ছোট ভাই ও শিশুদের জন্য নতুন নোট নিতে চেয়েছিলাম। সকালে ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত এখানে এসে কিনতে হলো।’ গুলিস্তানে নতুন নোট কিনতে আসা রেজাউল করিম বলেন, ‘গ্রামে যাওয়ার আগে তারা ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোটের বান্ডিল কিনতে এসেছেন। তাদের কাছে বান্ডিলপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম চাওয়া হয়েছে।’ দাম আরও বাড়তে পারে : গুলিস্তানের এক বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে এবার নতুন নোটের সরবরাহ কম। বর্তমানে দাম কিছুটা কম থাকলেও ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, চাহিদা বাড়লে দাম আরও বাড়তে পারে। নতুন নোট বিক্রি বেআইনি : বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন নোটকে পণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্যিক ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা যদি এ ধরনের কাজে জড়িত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, প্রতিটি উৎসবে নতুন নোটের চাহিদা থাকলেও ধীরে ধীরে এই আকাঙ্ক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, কারণ দেশ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। নতুন নোট কোনো পণ্য নয়, তাই এটি বিক্রি করাও বেআইনি। তিনি জানান, এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে এবং ব্যাংকিং খাতের কেউ যুক্ত থাকলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
রপ্তানি বাণিজ্যের নিয়মকানুন আরও শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ মূল্যের শিপমেন্টের ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকরা সরাসরি আমদানিকারকের কাছে শিপিং ডকুমেন্ট পাঠাতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আজ এফইপিডি-১ সার্কুলার নং-০৬-এর মাধ্যমে এ নির্দেশনা দিয়েছে জারি করেছে। এতে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই তারিখের এফই সার্কুলার নং-৩১-এর অনুচ্ছেদ ১৪-এর প্রতি অনুমোদিত ডিলারদের (এডি) দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, যেখানে রপ্তানি সংক্রান্ত শিপিং ডকুমেন্ট প্রেরণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, অনুমোদিত ডিলাররা এখন থেকে রপ্তানিকারকদের বিদেশি আমদানিকারক বা অন্য কোনো মনোনীত পক্ষের নামে পরিবহন সংক্রান্ত ডকুমেন্ট ইস্যু করার অনুমতি দিতে পারবেন। এই সুবিধা সর্বোচ্চ এক লাখ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ মূল্যের চালানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে আমদানিকারক বা মনোনিত পক্ষের কাছে এসব ডকুমেন্ট সরাসরি পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ক্যারিয়ার কোম্পানিকে এফই সার্কুলার নং-৩১/২০২৫-এর পরিশিষ্ট-৩ অনুযায়ী একটি সনদ প্রদান করতে হবে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এ সুবিধা পেতে রপ্তানিকারককে গত তিন অর্থবছরে মোট অন্তত ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ রপ্তানি আয় নিশ্চিত করতে হভে। এছাড়া সুবিধা গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকের কোনো বকেয়া রপ্তানি আয় থাকা যাবে না। অনুমোদিত ডিলারদের এ ধরনের চালান ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বৈধ রপ্তানি আদেশ সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে এফই সার্কুলার নং-৩১/২০২৫-এর অনুচ্ছেদ ১৩(১) অনুযায়ী বিদেশি আমদানিকারক বা কনসাইনি সম্পর্কে যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে হবে। সার্কুলারে রপ্তানি আয় সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি সুরক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সুবিধা নিতে রপ্তানিকারকদের লিখিত সম্মতি দিতে হবে এবং অনুমোদিত ডিলারদের রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আসার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সন্তুষ্ট হতে হবে। অনুমোদিত ডিলারদের নিশ্চিত করতে হবে যে এসব ব্যবস্থায় কোনোভাবেই রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আসার প্রক্রিয়া ব্যাহত না হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার জন্য কার্যকর তদারকি বজায় রাখতে হবে। এই নির্দেশনা ৩১ জুলাই ২০২৫ সালের এফই সার্কুলার নং-৩১-এর কাঠামোর ভিত্তিতে রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও সহজ করার একটি উদ্যোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত ডিলারদের নির্দেশ দিয়েছে যাতে ২০২৫ সালের সার্কুলারে বর্ণিত সব বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এফইপিডি-১ বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. আবু বকর সিদ্দিক এ নির্দেশনা জারি করেন এবং এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রপ্তানি লেনদেন সংক্রান্ত অন্যান্য সব নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।