রাত প্রায় ১১টা। উত্তর চব্বিশ পরগনার প্রান্তিকতম জনপদ স্বরূপনগরের রাস্তাঘাট শুনশান। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে যাওয়া রাস্তায় বাঁকের পর বাঁক থাকা সত্ত্বেও গাড়ি হু-হু করে ছোটানো যাচ্ছে। কিন্তু সীমান্তের এক-দেড় কিলোমিটার আগে বিএসএফ চেকপোস্টের কাছাকাছি অপেক্ষা করছিল বিস্ময়! রাস্তার ধারে সার সার পুলিশের গাড়ি। কনস্টেবল আর সিভিক ভলান্টিয়ারদের ছোট-বড় জটলা। ইতিউতি কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের টহল। কী ব্যাপার! এক সাব ইনস্পেক্টর বললেন, “অ্যাডিশনাল সাহেব এসেছেন।” অর্থাৎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। এসেছেন এসডিপিও-ও।
কাঁধে কাঁধ
ঘড়ির কাঁটা এখন ১১টার ঘর পার করছে। আর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পার্থ ঘোষ এবং এসডিপিও আয়ুষ পাণ্ডে বার বার চেকপোস্টের গেট পারাপার করছেন। ব্যস্ত পদক্ষেপে এক বার বিএসএফ চৌকির দিকে যাচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে যখন এসেছিলাম হাকিমপুরে, পুলিশি তৎপরতার এই ছবি দেখিনি। বিএসএফ চেকপোস্টের বাইরে তখনও এ রকমই ভিড় ছিল। হয়তো বা খানিকটা বেশিই। এসআইআর আবহে তখন ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে ফেরার হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল বিএসএফ। কিন্তু তাদের সাহায্য করার জন্য ত্রিসীমানার কোথাও মমতার পুলিশের দেখা মেলেনি। আর এ বার, রাজ্যে পালাবদলের পরে বিএসএফ-পুলিশ প্রায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। ক্ষমতার হাতবদল এ ভাবে ফারাক গড়ে দিয়েছে হাকিমপুর সীমান্তে।
পদ্ধতি বদল
অনুপ্রবেশকারীদের ফেরানোর পদ্ধতিও বদলে গিয়েছে ছ’মাসের মধ্যে। আগে যাঁরা বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছিলেন, তাঁদের সীমান্ত পার করানোর পুরো প্রক্রিয়া বিএসএফ-এর হাত দিয়েই হচ্ছিল। তখন হাকিমপুর চেকপোস্টের বাইরে ভিড় জমানো অনুপ্রবেশকারীদের ভাগে ভাগে চেকপোস্টের ভিতরে ডাকা হচ্ছিল। তাঁদের বাংলাদেশি নথি পরীক্ষা করে নাম-ঠিকানা নথিভুক্ত করা হচ্ছিল। তার পরে একসঙ্গে ৫০-১০০ জনকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল সীমান্তের নিকটবর্তী বিএসএফ ক্যাম্পে। সেখানে তাঁদের নাম-ঠিকানা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-র হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল। তালিকা যাচাইয়ের পরে বিজিবি-র তরফে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হলে বিএসএফ ক্যাম্পে অপেক্ষারতদের তুলে দেওয়া হচ্ছিল বিজিবি-হাতে।
এ বার পদ্ধতি ভিন্ন।
হাকিমপুর সীমান্তে যাঁরা ভিড় করেছেন, তাঁদের অনেকেরই প্রশ্ন, বিএসএফ চেকপোস্টে নাম নথিভুক্ত করার পরে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? এ বার আর সরাসরি সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না শুনে তাঁদের আশঙ্কা, তবে কি গ্রেফতার করবে? তাঁদের জন্য আশ্বাস আসছে জমায়েতের মধ্যে থেকেই, “না না, গ্রেফতার করবে কেন? শুভেন্দু অধিকারী তো বলেছেন, কাউকে আটকাব না। যারা চলে যেতে চায়, তাদের চলে যেতে দেওয়া হবে।”
তা হলে হোল্ডিং সেন্টার কেন? সেখানে ক’দিন থাকতে হবে? থাকা-খাওয়া ঠিকঠাক মিলছে তো? আমাদের নামে মামলা হবে না তো? চিন্তান্বিত মুখ নিয়ে এমন নানা প্রশ্ন নানা জনের।
আসলে অনুপ্রবেশকারী বলে কেউ চিহ্নিত হলেই তাঁকে হোল্ডিং সেন্টারে (আটক শিবির) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। সে জন্য জেলায় জেলায় অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারও খুলে গিয়েছে রাতারাতি। অতএব গত চার-পাঁচ দিন ধরে যাঁরা হাকিমপুর চেকপোস্টের বাইরে এসে জড়ো হচ্ছেন, তাঁদের বাংলাদেশি নথি বিএসএফ-এর পাশাপাশি পুলিশও পরীক্ষা করে দেখছে। তাঁদের নাম নথিভুক্ত করার পরে ১০০ থেকে ১৫০ অনুপ্রবেশকারীর এক একটি দলকে বাসে চাপিয়ে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে হোল্ডিং সেন্টারে। সেখানে আটকদের থাকাখাওয়ার বন্দোবস্ত করছে স্থানীয় প্রশাসন। তার পরে বাংলাদেশ থেকে বিএসএফের কাছে বার্তা এলে হোল্ডিং সেন্টার থেকে আটকদের ফের সীমান্তে আনছে পুলিশ। তাঁদের সীমান্ত পার করিয়ে বিজিবি-র হাতে তুলে দিচ্ছে বিএসএফ।
স্বরূপনগরে তিনটি হোল্ডিং সেন্টার আপাতত চলছে। একটি তেঁতুলিয়ায় ‘পথের সাথী’ অতিথিশালায়। পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুবিধার জন্য রাজ্য জুড়ে এমন বহু অতিথিশালা তৈরি হয়েছিল তৃণমূল আমলে। দ্বিতীয় হোল্ডিং সেন্টারটি চলছে চারঘাট হাইস্কুল সংলগ্ন ফ্লাড শেল্টারে। তৃতীয়টি মেদিয়ার একটি স্কুলে। সর্বত্রই পুলিশ মোতায়েন। আটকদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের জন্য আশা কর্মীরা যাতায়াত করছেন। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন স্থানীয় মেডিক্যাল অফিসার সৌরভ আচার্যও। বুধবার তেঁতুলিয়ার হোল্ডিং সেন্টারে আটক অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ছিল ১১৬। তাঁদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিডিও অফিসের পক্ষ থেকে। অন্য দিকে, চারঘাট হাইস্কুলে আটক ৬৩ জন এবং মেদিয়ার স্কুলের হোল্ডিং সেন্টারে আটক ৫২ জনের জন্য রান্নার দায়িত্ব পড়েছে স্কুলেরই মিড ডে মিল কর্মীদের উপর। তাঁদের গরমের ছুটি আপাতত বাতিল। দুপুরে এবং সন্ধ্যায় স্কুলে গিয়ে রান্না করছেন মিড ডে মিল কর্মীরা। আর জলখাবারের জন্য স্বরূপনগর বিডিও অফিস থেকে নানা রকম শুকনো খাবার পাঠানো হচ্ছে। বুধবার দুপুরে চারঘাট হাইস্কুল চত্বরে যখন দাঁড়িয়ে আছি, তখনই খবর এল, আরও ৭০ জন অনুপ্রবেশকারীকে আনা হচ্ছে হোল্ডিং সেন্টারে। ফলে তৎপরতা বাড়ল। হোল্ডিং সেন্টারগুলির পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনা দেখভাল করতে স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরাও সক্রিয়। চারঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য রাজেশ মণ্ডল এবং বিজেপি সমর্থিত নির্দল সদস্য মানস বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, মঙ্গলবার রাতে বিডিও-র তরফ থেকে তাঁদের হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করার কথা জানানো হয়। মধ্যরাত থেকেই পঞ্চায়েত সদস্যরা সক্রিয় হন। কেউ কেউ বুধবার ভোর পর্যন্ত স্কুলে দাঁড়িয়ে থেকে সব বন্দোবস্ত সুনিশ্চিত করে তার পর ঘরে ফিরেছেন।
বুলডোজ়ারের ভয়!
ছ’মাস আগের আর এখনকার পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক আরও এক জায়গায়। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে যাঁরা বাংলাদেশে ফিরছিলেন তাদের বক্তব্য ছিল, “এসআইআর হচ্ছে, আমাদের তো আর থাকতে দেবে না, তাই চলে যাচ্ছি।’’ অর্থাৎ, সে বার নিজেদের ইচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অনুপ্রবেশকারীরা। সে দফায় মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকারা এ বার ফিরে যাচ্ছেন বাধ্য হয়ে। নিউটাউন সংলগ্ন ঘুনি বস্তি হোক বা এয়ারপোর্টের কাছে বাঁকড়া, হাওড়ার কোনও বস্তি থেকে আসা পরিবার হোক বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ বারাসত থেকে আসা মহিলা, সবার মুখে একই কথা। “যাদের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, তারা আর থাকতে দিচ্ছে না। বলছে, তোমরা থাকলে আমাদের বিপদ হবে। পুলিশ এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে। আমাদের বাড়ি বুলডোজ়ার দিয়ে ভেঙে দেবে। তোমরা চলে যাও।’’
ঘুনি বস্তি থেকে সীমান্তে পৌঁছোনো মফিজুল মোল্লা পুলিশি হানার কথাও শোনাচ্ছেন। বলছেন, ‘’আগের বারই পুরো বস্তি প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমরা ২০-২২ ঘর রয়ে গিয়েছিলাম। তার পরে আগুন লেগে পুরো বস্তি পুড়ে গেল। পাশের পাড়াগুলোয় ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলাম। কিন্তু সরকার বদলে যাওয়ার পরে মাঝেমধ্যেই পুলিশ আসছিল। ভয়ে রাতে বাড়িতে থাকতে পারছিলাম না। বাড়িওয়ালাও বলল, আর এক দিনও থাকা যাবে না। এখনই চলে যাও।’’
উধাও তৃণমূল
ফারাক আরও একটা চোখে পড়ছে হাকিমপুরে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে চেকপোস্টের বাইরের জমায়েতকে ঘিরে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশমুখী অনুপ্রবেশকারীরা কী খাবেন, তাঁদের মাথার উপরে কী রকম ছাউনি দিতে হবে, সমস্ত দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন স্থানীয় তৃণমূল নেতারা। এমনকি এই অনুপ্রবেশকারীরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন কি না, বললে ক’জনের সঙ্গে বলবেন, কতটুকু বলবেন, কী প্রশ্ন করা যাবে আর কী যাবে না, সে সবের নিয়ন্ত্রণও ছিল তৃণমূলের হাতে। সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন প্রতিনিধির উপরে সে বার হামলাও হয়েছিল। এ বার সে সব ছবি উধাাও। সেই থমথমে আবহ এ বার নেই। হাকিমপুর চেকপোস্টের ত্রিসীমানায় আর কোনও তৃণমূল নেতাকে দেখা যাচ্ছে না। শাসানি, চোখরাঙানি অতীত। অথচ স্থানীয় পঞ্চায়েতের বোর্ড ছ’মাস আগে যাদের দখলে ছিল, এখনও তাদের দখলেই রয়েছে। প্রধান, উপ-প্রধান তখন যাঁরা ছিলেন, এখনও তাঁরাই রয়েছেন। শুধু ছ’মাস আগের স্বঘোষিত ‘দায়দায়িত্ব বোধ’ গায়েব হয়ে গিয়েছে।
এক বদলেই বেমালুম বদলে গিয়েছে হাকিমপুর সীমান্ত!
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় মধ্যরাতে বাসা থেকে ডেকে নেওয়ার পর সাগর হোসেন ওরফে বুলেট (২৮) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ইতোমধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, গত ২১ জুলাই দিবাগত রাত ১টার দিকে এক কিশোর সাগরকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরদিন ভোরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহতের বড় বোন শারমিন বেগম দাবি করেন, তার ভাইকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে কী কারণে এবং কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নন তারা। ছোট ভাই শাওন বলেন, ১৪ বছর বয়সী ইমন নামে এক কিশোর সেদিন রাতে সাগরকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তার দাবি, ওই কিশোরের মাধ্যমেই পরিকল্পিতভাবে সাগরকে হত্যার ফাঁদে ফেলা হয়। বর্তমানে ইমন পুলিশ হেফাজতে রয়েছে বলে জানান তিনি। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহতের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাজারীবাগ থানা সূত্র জানায়, নিহত সাগর ওরফে বুলেটের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি, ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্তসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে। তিনি এলাকায় একজন চিহ্নিত ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, পূর্ববিরোধের জেরে কয়েকজন অভিযুক্ত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাগরের ওপর হামলা চালায়। প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ধাওয়া করে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হুমায়ুন কবির, আকাশ, সাব্বির ও মোল্লা ইমনসহ অজ্ঞাত আরও ২ থেকে ৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে হুমায়ুন কবির ও মোল্লা ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি লোহার রড ও একটি ধারালো ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেন জানান, মামলার তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তার দুই আসামির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার পূর্ণ রহস্য উদ্ঘাটনে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নে বাবার গলায় করাত ধরে হত্যার চেষ্টা এবং মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এক যুবককে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও তিন দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা সুলতানার নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত এ দণ্ডাদেশ দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত মিরাজ আলী (২৪) সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের বিশমনি গ্রামের বাসিন্দা। উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত বুধবার মিরাজের বাবা মো. জাহিদুল ইসলাম ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি জানান, তার ছেলে দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং চুরি, মারামারি, পারিবারিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। একাধিকবার মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হলেও তিনি আবারও মাদক সেবন ও অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগে আরও বলা হয়, মাদকের টাকা না পেলে মিরাজ বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে দেন, চুরির সঙ্গে জড়িত থাকেন এবং পরিবারের সদস্যদের মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেন। এর আগে গাঁজা বিক্রির অভিযোগে তিনি দুইবার কারাভোগও করেছেন। তার আচরণের কারণে স্ত্রীও তাকে তালাক দিয়ে চলে গেছেন। গত ২২ জুলাই পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে বাবা কারণ জানতে চাইলে মিরাজ ঘর থেকে একটি করাত এনে তার গলায় ধরে হত্যার চেষ্টা করেন। এ সময় মা বাধা দিতে গেলে তাকেও আক্রমণের চেষ্টা করেন। পরে বাবা-মা দুজনই পালিয়ে গিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতে শুনানির সময় মিরাজ মাদক সেবনের কথা স্বীকার করেন। পরে তার বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আলামত উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ, স্বীকারোক্তি এবং উদ্ধার হওয়া আলামতের ভিত্তিতে আদালত তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ১০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা সুলতানা বলেন, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ, তার স্বীকারোক্তি এবং উদ্ধার হওয়া আলামতের ভিত্তিতে প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ডিআইজি এবং অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ ১ শাখা থেকে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনস্বার্থে এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তারা বিধি অনুযায়ী অবসর সুবিধা পাবেন।