সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ।
বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক এ রায় ঘোষণা করেন।
বেঞ্চের অপর ছয় বিচারপতি হলেন— বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
আপিল বিভাগ বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের দেওয়া সিদ্ধান্তগুলো হলো-
>> পূর্বের রায় বাতিল ও আপিল মঞ্জুর : আদালত সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আগের রায়টিতে বেশ কিছু ভুল ছিল। তাই, আদালত আগের সেই রায়টিকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দিয়েছে।
ফলস্বরূপ, এর সাথে সম্পর্কিত সব আপিল মঞ্জুর করা হয়েছে এবং পুনর্বিবেচনার আবেদনগুলিও নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
>> তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার (এনপিসিজি) : এই রায়ের ফলে, সংবিধানের চতুর্দশ খণ্ডের ২এ অধ্যায়, যা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত, সেটি সক্রিয় ও পুনরুজ্জীবিত হলো।
এই ব্যবস্থাটি ১৯৯৬ সালের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল।
>> কার্যকারিতা শুরু হওয়ার শর্ত : তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটলেও, এর কার্যক্রম শর্তসাপেক্ষ। এটি তখনই কার্যকর হবে, যখন ত্রয়োদশ সংশোধনীর ৫৮খ(১) এবং ৫৮গ(২) অনুচ্ছেদগুলোর বিধান কার্যকর করা হবে।
>> ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্যতা : এই আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসারে, পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানগুলো কেবল ভবিষ্যৎ থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, অতীতের কোনো ঘটনার উপর এই রায়ের সরাসরি প্রভাব পড়বে না, কিন্তু ভবিষ্যতের সবকিছুর জন্য এটি প্রযোজ্য হবে।
এর বিস্তারিত রায় বা পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পরে প্রকাশিত হবে।
২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন তৎকালীন আপিল বিভাগ। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরাতে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়। চলতি বছরের ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আবেদন মঞ্জুর করেন সর্বোচ্চ আদালত। দেওয়া হয় আপিলের অনুমতি। এরপর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার ও পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক আপিল করেন।
এরপর ২২, ২৩, ২৮, ২৯ অক্টোবর এবং ২, ৪, ৫, ৬ ও ১১ নভেম্বর শুনানি হয়। শুনানি শেষ করে রায়ের জন্য ২০ নভেম্বর দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগ।
এ আপিলে বিএনপি মহাসচিবের করা আপিলের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। জামায়াতের করা আপিলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিকের পক্ষে আপিল শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
এর আগে, আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সম্ভব নয়। কারণ সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কথা বলা আছে। এখন তো কোনো সংসদ নেই। সংসদ ভেঙে গেছে এক বছরের বেশি সময় আগে। আমরা আশা করছি, চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। আমরা সব আবেদনকারী আপিল বিভাগে এর পরের নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়েছি।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের চাপে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আনে বিএনপি সরকার। ওই বছর ২৭ মার্চ সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন ঘটে। এরপর এ পদ্ধতির অধীনে ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়।
২০০৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানবহির্ভূত আখ্যা দিয়ে আইনজীবী এম সলিমউল্যাহসহ তিন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট করেন। শুনানির পর তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন। রায়ে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত ও বৈধ। এ সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।
পরে রিট আবেদনকারীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০১০ সালে আপিলে শুনানি শুরু হয়। সর্বোচ্চ আদালত এ মামলায় অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে সহায়তাকারী) হিসেবে দেশের আটজন সংবিধান বিশেষজ্ঞের বক্তব্য শোনেন। তাদের প্রায় সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এমনকি সে সময়ের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন।
তখনকার প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতি শুনানি গ্রহণ করেন। ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে রায় দেন। এ ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে ছিলেন বিচারপতি খায়রুল হকসহ চারজন। আর তিনজন ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠের দেওয়া রায়ে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অর্থাৎ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন অগণতান্ত্রিক এবং তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে তা বাতিলযোগ্য। তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ রায় ঘোষণার সাত দিন পর অর্থাৎ ১৭ মে অবসরে যান এ বি এম খায়রুল হক। অবসরে যাওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।
তখন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রায় পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। পূর্ণাঙ্গ রায় থেকে ‘তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।’ এ পর্যবেক্ষণ বাদ দেওয়া হয়। পরে এ পূর্ণাঙ্গ রায়কে আশ্রয় করে দলীয় সরকারের অধীনে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকেন শেখ হাসিনা। জুলাই অভ্যুত্থানে গত বছর ৫ আগস্ট তার পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে (রিভিউ) আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
কার্যাদেশের ঘাটতি, মালিকদের আর্থিক সংকট, শ্রম অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকট শিল্প খাতকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ৩৯৮টিই গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড ও ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আর্থিক সংকটের কারণ দেখিয়ে গত ১৬ জুন থেকে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর প্রতিষ্ঠান দুটি স্থায়ীভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এ দুই কারখানা বন্ধের ফলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৮৭টি তৈরি পোশাক খাতের বাইরে। বাকি কারখানাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সদস্য ১০৮টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্য ৩৫টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্য আটটি এবং বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটির (বেপজা) আওতাধীন ১৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে উৎপাদন ও কার্যাদেশ কমে যাওয়ার কারণে ৭৯টি কারখানা মোট ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। এর আগে বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে পড়া, ব্যাংকিং জটিলতা, কাঁচামালের সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে। এ ছাড়া কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য আরও ৫ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে পোশাক খাতের সংগঠনগুলোর কাছে বন্ধ ও আংশিকভাবে বন্ধ থাকা কারখানার তথ্য চেয়েছে। এ বিষয়ে গত ১৪ জুন বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের কঠোর শর্তের কারণে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এসব সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সব বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নেই, আবার অনেকের সিআইবি প্রতিবেদনও সন্তোষজনক নয়। তিনি বলেন, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, কার্যাদেশ কমে যাওয়া, কিছু কারখানার অদক্ষতা, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে না পারাও কারখানা বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ। বিজিএমইএর সহসভাপতি শিহাব উদদোজা চৌধুরী জানান, প্রায় ২০০টি বন্ধ এবং ১২৩টি আংশিকভাবে বন্ধ কারখানা সরকারের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যেসব কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কার্যকর মূলধন পেলে খুব দ্রুত কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, জামানতসংক্রান্ত শর্তের কারণে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই সিএমএসএমই খাতের জন্য ৭ শতাংশ সুদে ঋণ এবং ন্যূনতম ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিজিএমইএ জানিয়েছে, আগ্রহী কারখানাগুলো পরিদর্শনে দুটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে সংগঠনটি।
চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাকযোগে বাংলাদেশের পণ্য চীনে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। শনিবার (২৭ জুন) সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতিতে নবীন আইনজীবীদের কর্মশালা ও নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী জানান, চট্টগ্রামে প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর একটি চীনা শিল্পপার্ক স্থাপনের বিষয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশে বড় পরিসরে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সব পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বেশি চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, যাতে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হয়। শাহজালাল (রহ.) মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং বিধি-বিধান অনুসরণ করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়নে আইনজীবীদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধের বিষয়ে তিনি জানান, কঠোর শাস্তির বিধান রেখে একটি নতুন আইন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, যা সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত পাস হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আইনবিষয়ক গবেষণা, কেস স্টাডি বিশ্লেষণ এবং আদালতে কার্যকর উপস্থাপনার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতে আরও দক্ষ আইনজীবী ও বিচারক তৈরিতে সহায়ক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্স খুলে এবার রেকর্ড পরিমাণ অর্থ পাওয়া গেছে। প্রায় ছয় মাস পর খোলা দানবাক্সগুলো থেকে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা উদ্ধার হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও রুপার সামগ্রীও পাওয়া গেছে। শনিবার (২৭ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদ গণনা শেষে এ তথ্য জানান। এর আগে সকালে জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। সেখান থেকে সংগ্রহ করা অর্থ ৪৩টি বড় বস্তায় ভরে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নেওয়া হয়। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ ঘণ্টাব্যাপী চলে টাকা গণনার কাজ। গণনায় অংশ নেন পাগলা মসজিদ-সংলগ্ন মাদ্রাসার ১০৬ জন এবং আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদ্রাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা, মসজিদের ৩৫ জন কর্মী এবং জেলা প্রশাসনের ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এই কাজে সহযোগিতা করেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো কার্যক্রমে মাঠে ছিলেন জেলা প্রশাসনের ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ৮ জন র্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের প্রতি মানুষের গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলনই এই বিপুল দান। তিনি জানান, দানবাক্সে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও রুপার সামগ্রী জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত কোনো কাজে ব্যবহার করা হয় না। জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সহায়তা এবং জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে এই অর্থ অনুদান হিসেবে ব্যয় করা হয়। উল্লেখ্য, সর্বশেষ প্রায় ছয় মাস আগে দানবাক্স খোলার সময় ১৩টি দানবাক্স থেকে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এবার সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।