সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে। আর এজন্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগে সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান যোগদানের পর এমন তথ্য জানিয়েছেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
এর আগে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগদান করেন। এ সময় তাকে স্বাগত জানান ডেপুটি গভর্নর ও প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। সাংবাদিকরা তার বক্তব্য চাইলে গভর্নর বলেন, ‘আগে কাজ, পরে কথা।’ এরপর তিনি ওপরে গিয়ে প্রথমে ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে তিনি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর দপ্তরে যান।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র জানান, অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানমুখী করতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সুদহার কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পূর্ববর্তী গভর্নরের খাতের কিনারা থেকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তিনি সেই স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে কাজ করবেন বলে জানান। বিশেষ করে গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে নীতি সহায়তা, প্রয়োজনীয় প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদার করার কথা বলেন। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আরিফ হোসেন খান বলেন, সভায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন গভর্নর। একই সঙ্গে বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এমন উচ্চ সুদের হারের বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
মুখপাত্র বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিয়ম-ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন করা হবে বলে গভর্নর জানান। কাজের গতি বাড়াতে ‘ডেলিগেশন অব অথরিটি’ বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
ভোজ্যতেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও সরবরাহে কারসাজির মাধ্যমে মাত্র দুই মাসে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে ৫০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩২ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, বাজারে সংকটের পরিবেশ তৈরি এবং মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপুল মুনাফা করেছে কম্পানিটি। অনলাইন নিউজ পোর্টাল এনপিবি নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২২ সালে সরবরাহ ঘাটতির কথা বলে দেশের ৮টি প্রতিষ্ঠান সরকারকে তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য করে। অথচ তখন এ আটটি কম্পানির গুদামে তেলের কোনো সংকট ছিল না। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা ছিল টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। শবনম ভেজিটেবল অয়েল কম্পানির সঙ্গে জড়িত একটি সরবরাহ আদেশে দেখা যায়, কম্পানিটি তার পরিবেশকদের কাছে তেল সরবরাহে প্রায় ২৫ দিন সময় নেয়। যেখানে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে চাহিদাকৃত পণ্য সরবরাহ করার নিয়ম রয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ ২০১১ এর অনুচ্ছেদ ৯-এর(৩) অনুযায়ী একটি সাপ্লাই অর্ডারের মেয়াদ থাকে ১৫ দিন। এর বেশি মেয়াদ কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। অথচ এই আইনের তোয়াক্কা না করেই শবনম ভেজিটেবল অয়েল ও এর পরিবেশকদের মধ্যে একটি পরোক্ষ চুক্তি হয়। যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আইন ২০১২-এর ধারা ১৫-এর উপধারা ১ অনুযায়ী অন্যায়। এই পরোক্ষ যোগসাজশে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখা দেয় এবং তেলের চাহিদা বাড়ে। আর আট কম্পানির এই কারসাজির ফলে তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয় সরকার। এর প্রমাণও মেলে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে মাসে ভোজ্যতেলের দাম এক লাফে বাড়ে ৮ টাকা। ১৬০ টাকা প্রতি লিটারে বিক্রি হওয়া তেল ১৬৮ টাকা নির্ধারণ করলেও এই দামে বিক্রি হয়নি। বরং সে সময় ১৭৫ টাকার নিচে তেল পাওয়া যায়নি। এনপিবির অনুসন্ধানে দেখা যায়, শবনম ভেজিটেবল অয়েল কম্পানি তাদের তৎকালীন উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগায়নি। কৃত্রিম সংকট তৈরি করার লক্ষ্যে তাদের ক্ষমতার অর্ধেকে নামিয়ে আনে তেলের উৎপাদন। এ সময় কম্পানিটি যা উৎপাদন করত তার পুরোটাও বাজারে সরবরাহ করেনি। সে সময়ে কম্পানিটির অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ব্যাপক মজুদ পাওয়া যায়। ২০২২ সালের এপ্রিলে রমজান মাস উপলক্ষে তেলের চাহিদা অনেক বেশি বেড়ে যায়। ঠিক এ সময়টিকেই বেছে নেয় কম্পানিটি তেলের সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণের। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য মতে, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের তুলনায় মে মাসে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে ৩০ শতাংশ। বাজারে তেলের ঘাটতির অজুহাতে ২২ দশমিক ৪৭ ও ২৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ দাম বাড়ে ভোজ্যতেলের। ঠিক এ সময়ে তেল পরিবেশকরা তাদের সাপ্লাই অর্ডার বা পরিবেশন আদেশ হাতবদল করে দাম বাড়ায়। এরমধ্যেই শবনম ভেজিটেবল অয়েল কম্পানিটি তাদের কাছে থাকা পণ্যের আদেশ অনুযায়ীও তেল সরবরাহ করেনি। ২০২২ সালের এই সময়টিতে তেলের দাম বাড়িয়ে টিকে গ্রুপের কম্পানি শবনম অয়েল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে। এ ছাড়া শুধু ৫০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করে। যার পুরোটাই সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা। সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি দিয়ে সরকারকে জিম্মি করে মানুষের পকেট কেটে মুনাফা করে টিকে গ্রুপ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন একটি অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখানে কম্পানির কাছে লিখিত জবাব জানতে চায় কমিশন। এ ছাড়া শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থাপিত যুক্তি তর্ক এবং আইনের বিশ্লেষণ করে কমিশন কম্পানিটির কারসাজির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। অভিযোগ ও জরিমানাসহ তেল সিন্ডিকেটের সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে টিকে গ্রুপের ডিরেক্টর মোস্তফা হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে এনপিবি নিউজ। তার ব্যক্তিগত নাম্বারে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পাশাপাশি তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে মেসেজ করা হলেও তিনি তার রিপ্লাই দেননি। পরবর্তীতে টিকে গ্রুপের হেড অব ব্রান্ডের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। এ বিষয়ে টিকে গ্রুপের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় কম্পানিটির এমডি মো. আবুল কালামের সঙ্গে। প্রতিযোগিতা কমিশন কর্তৃক তেল সিন্ডিকেটের অভিযোগে জরিমানার প্রসঙ্গটি তুলতেই ‘আমি জানি না’ বলে ফোন কেটে দেন তিনি। এরপরে একাধিকবার ফোন দিয়েও তার বক্তব্য জানা যায়নি। পরবর্তীতে তার ব্যক্তিগত নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে কম্পানি সূত্রে জানা গেছে, জরিমানার বিষয়টি এমডি আবুল কালামসহ কম্পানির ঊর্ধ্বতন সবাই জানেন। এ বিষয়ে তাদের আলোচনাও হয়েছে। তারা হাইকোর্টে প্রতিযোগিতা কমিশনের রায়কে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মুনাফা ৫০০ কোটির বিপরীতে জরিমানা মাত্র ৩২ কোটি বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের আইনে জরিমানা করার নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কোনো কম্পানির কারসাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে কম্পানির বার্ষিক টার্নওভারের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যায়, শবনম ভেজিটেবল অয়েল কম্পানির ২০২২ সালের বার্ষিক টার্নওভার ছিল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সেখানে কমিশন জরিমানা করেছে মাত্র ৩২ কোটি টাকা। যেখানে তেল সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করায় শুধু লাভই হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ জরিমানা করার সর্বোচ্চ সীমার মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে কম্পানিটিকে। জরিমানা করার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসনের সঙ্গে। তিনি এ বিষয়ে কমিশনের সদস্য আফরোজা বিলকিসের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে কমিশনের আইন শাখার সদস্য আফরোজা বিলকিস বলেন, ‘এই কম্পানির বিরুদ্ধে কমিশনে এইটাই প্রথম মামলা। তাই আমরা সর্বোচ্চ জরিমানা না করে একটা অংকের জরিমানা করেছি। সবাইকেই তো আসলে রিফর্মের সুযোগ দিতে হয়। আমরাও তাই দিয়েছি। যদি এরপরে আরো কোনো মামলা হয় তবে আরো বেশি জরিমানা করা হবে। এ ছাড়া কম্পানিটি একা এই অপরাধ করেনি। আরো চার-পাঁচটি কম্পানি জড়িত ছিল। সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব তানভীর আহমেদ বলেন, ‘প্রতিযোগিতা কমিশন যেহেতু মামলায় রায় দিয়েছে এতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ ব্যাপারে যদি বাণিজ্যমন্ত্রী মনে করেন কম্পানির কাছ থেকে ব্যাখ্যা নেবেন তবে মন্ত্রণালয় থেকে আমরা চিঠি দেব।’ এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক যুগ্মসচিব সেবাস্টিন রেমা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। উল্লেখ্য, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে সরকার এখনো কাউকে নিয়োগ দেয়নি। এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি নাজের হোসাইন বলেন, ‘জরিমানা যত টাকাই করুক, এক টাকাও শেষমেশ আদায় হয় না। শুরুর দিকে একটু হইচই হয়, পরবর্তী বাণিজ্য সচিবের কাছে গেলেই মাফ হয়ে যায়। এটাই সমস্যা। আপিল অথরিটি সম্পূর্ণ জরিমানা মাফ করে দিতে পারে। আমরা এই আইনের সংশোধন চেয়েছি।’
সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে গত বছর বাংলাদেশিদের টাকা জমার পরিমাণ নজিরবিহীন বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত বার্ষিক এক নথিতে এই তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশিরা যে হারে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংক অর্থ জমা করেছেন, তা ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (এসএনবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সুইস বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিক ও ব্যাংকগুলোর জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ আমানতের পরিমাণ বেড়ে ৮৩৪.২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছে; যা বাংলাদেশি ১২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে এক সুইস ফ্রাঁ বাংলাদেশি ১৫২ টাকার বেশি। এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর টাকা জমার এই হার ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের শতাধিক ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছায়। যা দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ জমা করা অর্থ। কিন্তু গত বছর আমানতের উল্লম্ফনে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি গ্রাহকদের মোট তহবিলের পরিমাণ ২০২১ সালের সর্বকালের সর্বোচ্চ ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁর ঠিক নিচে অবস্থান করছে। এসএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উল্লম্ফনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর ৪৩ শতাংশ আমানত বৃদ্ধি; যা এক বছর আগের ৫৭৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৮২২.৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া গত বছর সুইস বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর। যেখানে তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ; যা ২০২৩ সালের ২০ শতাংশ এবং ২০২১ সালের ৩৫ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। তবে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত গ্রাহক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জমা রাখা আমানতের পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় কমেছে। ২০২৪ সালের ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ কমে গত বছর বাংলাদেশি ব্যক্তিগত গ্রাহক অ্যাকাউন্টের আমানত ১১.৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে নেমেছে। • সুইস ব্যাংকে টাকা জমায় দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বাংলাদেশ এসএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ আমানত নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারতীয় নাগরিক ও দেশটির ব্যাংকগুলো। যদিও আগের বছরের তুলনায় তাদের আমানত ৮ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং ভারতের বিপরীতে বাংলাদেশের আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ। এছাড়া সুইস ব্যাংকে আমানতের উল্লম্ফন দেখা গেছে আফগানিস্তানের নাগরিক ও ব্যাংকগুলোর। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর দেশটি থেকে সুইস ব্যাংকে অর্থ আমানতের হার প্রায় ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। সুইস ব্যাংকে আফগানিস্তানের নাগরিক ও ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ মাত্র ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। • অতীতের রেকর্ড কী বলছে? প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছায়। যা দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা। তবে ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ তার আগের বছরের তুলনায় কম ছিল। ওই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকার বেশি। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্রাঁ। ২০১৮ সালে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। আর ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের ‘মোট দায়ের’ মধ্যে ব্যক্তিগত, ব্যাংক এবং অন্যান্য উদ্যোগের আমানতসহ সব ধরনের তহবিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার মানুষ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বৈধ-অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ গচ্ছিত রাখেন। দেশটির কঠোর গোপনীয় ব্যাংকিং নীতির কারণে সারা দুনিয়ার মানুষ সেখানে অর্থ জমা রাখেন। সুইজারল্যান্ডের আইনে গ্রাহকদের গোপনীয়তা দৃঢ়ভাবে রক্ষার নিয়ম রয়েছে। এ আইনের ফলে দেশটির ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের তথ্য কারও কাছে প্রকাশে বাধ্য নয়। ফলে কারা, কেন অথবা কীভাবে অর্থ ব্যাংকে রাখছেন, সে সম্পর্কে ব্যাংকগুলো কাউকে কোনো তথ্য দেয় না। তবে সম্প্রতি গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ও সমালোচনা দেখা দেওয়ায় সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশগুলোর অনুরোধের ভিত্তিতে সরকারকে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ করে। যে কারণে অনেকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তাদের অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন। সূত্র: এসএনবি।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে সচল রাখতে এবং এর ২৬,৬০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ—যৌথভাবে পুনর্গঠনের কথা বিবেচনা করছে দুটি বিদেশি ব্যাংকসহ মোট ৩৬টি ব্যাংক। বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই শিল্পগোষ্ঠী। এই সিন্ডিকেটেড পুনর্গঠন কাঠামো চূড়ান্ত করতে ব্যাংকগুলোর আজ হোটেল সোনারগাঁওয়ে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রুপটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের প্রভিশনিংয়ের (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) চাপ এড়ানো। ব্যাংকিং খাতের সূত্রগুলো জানায়, ঋণগুলোকে এখনই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করে—এই প্রস্তাবের আওতায় তা পুনর্গঠন করা হবে এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হবে। সিটি গ্রুপের এই ঋণগুলো এখনও শ্রেণীকৃত করা হয়নি। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা আজকের বৈঠকের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পগোষ্ঠীটির বার্ষিক আয় প্রায় ৩২,০০০ কোটি টাকা এবং এখানে প্রায় ২৫,০০০ কর্মী কর্মরত আছেন। অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে খরচ হচ্ছে এবং কী পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে—সেসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিটি গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড) ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা থাকবেন। যদি ৩৬টি ব্যাংকই একমত হয়, তবে তারা পর্ষদে বসার জন্য দুই বা তিনজন প্রতিনিধি মনোনীত করবে। এটি মূলত বৈশ্বিক ঋণ পুনর্গঠন মডেল এবং 'ওয়াটারফল মেকানিজম' অনুসরণ করে করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ৩৬টি ব্যাংকের যৌথ মালিকানায় একটি কেন্দ্রীয় এসক্রো অ্যাকাউন্ট থাকবে। ওয়াটারফল মেকানিজমের আওতায়, সমস্ত নগদ অর্থ বা ক্যাশ ফ্লো এই অ্যাকাউন্টে জমা হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়, তবে সেই টাকা প্রথমে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এরপর সেই ১০০ টাকা থেকে ৮০ টাকা সিটি গ্রুপকে চলতি মূলধন হিসেবে ফেরত দেওয়া হবে এবং বাকি ২০ টাকা ঋণ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হবে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের উদ্যোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানও এই প্রস্তাবিত সমাধানের সাথে একমত পোষণ করেছেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মাসরুর আরেফিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এর আগে মে মাসে বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান, ব্যাংকিং খাতের সংকটের কারণে চলতি মূলধনের অপ্রাপ্যতা এবং গ্যাস সংযোগে বিলম্বের কারণে ছয়টি প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ায়—তীব্র আর্থিক চাপের মুখে পড়ে সিটি গ্রুপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিগত সহায়তা চেয়েছিল। এরপর গ্রুপটিকে সচল রাখার একটি সমাধান বের করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেন গভর্নর, যাতে ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়তি প্রভিশনের বোঝা না চাপে। উদ্ধার পরিকল্পনার রোডম্যাপ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সুবিধাগুলো চালু রাখতে এবং ব্যাংকগুলোকে ঋণের প্রভিশনের বোঝা থেকে বাঁচাতে চলতি বছরের ডিসেম্বর বা তার পরবর্তী সময় পর্যন্ত ঋণগুলো খেলাপি না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ অনুমোদন চাওয়া হবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি স্বতন্ত্র মনিটরিং কমিটি গঠন করা হবে এবং এতে বাইরের পুনর্গঠন বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে। কৌশলগত রোডম্যাপের মধ্যে রয়েছে, নন-কোর (মূল ব্যবসার বাইরে) ব্যবসা এবং সম্পদ বিক্রি করা। কারণ এর মধ্যে কিছু সম্পদ ব্যালেন্স শিটের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এগুলো থেকে কোনো রিটার্ন বা আয় আসছে না। গ্রুপটির অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) এবং হাই-টেক পার্ক প্রকল্পগুলোও বিক্রি করে দেওয়া হতে পারে। ব্যাংকাররা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, তারা এগুলোর জন্য ক্রেতা খুঁজবেন। ক্রেতারা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কিছু বিষয়ে নিশ্চয়তা চাইতে পারে এবং ব্যাংক সেই অনুরোধগুলো মূল্যায়ন করবে। তারা জানান, বাংলাদেশে এই প্রথম ব্যাংকগুলো একটি সংকটাপন্ন করপোরেট অ্যাকাউন্টকে এসক্রো ব্যবস্থা এবং সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে যৌথভাবে পুনর্গঠন করছে। একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, "শেষ পর্যন্ত ফলাফল কী হবে আমরা জানি না, তবে আমরা এই পদ্ধতিতেই এগোচ্ছি। কোনো একটি ব্যাংক যদি এককভাবে পদক্ষেপ নেয়, তবে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিন্তু সব ব্যাংক একসাথে কাজ করলে সফলতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।" যে কারণে আর্থিক সংকটে সিটি গ্রুপ ২০২৩ সালে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর সমস্যার শুরু হয়। ব্যবস্থাপনায় একক নিয়ন্ত্রণের অভাবে গ্রুপটি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মূলধন ঘাটতি এবং একীভূতকরণসহ (মার্জার) ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকটের কারণে অধিকাংশ ব্যাংক গ্রুপটিকে চলতি মূলধন জোগাতে অপারগতা দেখায়, যা কাঁচামাল আমদানিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং বিক্রি এক-তৃতীয়াংশের নিচে নামিয়ে আনে। তদুপরি, গ্রুপটি বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার লোকসানের সম্মুখীন হয় এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে তাদের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সীমাও কমে যায়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাথে আলাপকালে ফজলুর রহমানের ছেলে ও গ্রুপটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাসান আর্থিক সংকটের জন্য মূলত বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান, ব্যাংকের সমর্থন কমে যাওয়া এবং টাকার তীব্র অবমূল্যায়নকে দায়ী করেন, যা তাদের আমদানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, "২০২২ সাল থেকে আমরা ২,৫০০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান দিয়েছি, যা আমাদের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।" তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতের সংকট তাদের কার্যক্রমকে আরও সংকুচিত করেছে, কারণ বেশ কয়েকটি ব্যাংক তাদের সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে বা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি সরবরাহকারীরা কিছু স্থানীয় ব্যাংকের ইস্যু করা এলসি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। তাঁর মতে, টাকার অবমূল্যায়ন এবং ঋণের সীমা সংকুচিত হওয়ায়, গ্রুপটির ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৯০ কোটি (৯০০ মিলিয়ন) ডলার কমে গেছে। "কার্যত আমরা প্রায় ৯০ কোটি ডলারের আমদানি সক্ষমতা হারিয়েছি" –বলেন তিনি। তিনি বলেন, যখন ডলারের দাম বেড়ে গেল এবং ব্যাংকগুলো ঋণের সীমা কমিয়ে দিল, তখন গ্রুপের আমদানি সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। "পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন বেশ কয়েকটি ব্যাংক বড় করপোরেট গ্রাহকদের সহায়তা দিতে কার্যত অক্ষম হয়ে পড়ে। এক্সিম ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা ফেরত পাওয়ার পরও আগের মতো সহায়তা দেয়নি।" "যেমন ইসলামী ব্যাংকের সাথে আমাদের প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার একটি রিভলভিং ক্রেডিট লিমিট ছিল। ৫ আগস্টের পর সেই সুবিধা কার্যত ভেঙে পড়ে। বিদেশি সরবরাহকারী এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো কিছু স্থানীয় ব্যাংকের ইস্যু করা এলসি গ্রহণ করতে রাজি ছিল না, কারণ ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।" "আমরা এক্সিম ব্যাংককেও প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি, কিন্তু আগে যে সমর্থন পেতাম তা আর পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশি ব্যাংকের এলসি কনফার্ম করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যার ফলে কাগজে-কলমে একটি ঋণ সুবিধা থাকলেও, বাস্তবে তার কোনো কার্যকর মূল্য ছিল না। কারণ আমাদের সাপ্লায়াররা (সরবরাহকারীরা) সেটা গ্রহণ করত না।" মো. হাসান বলেন, "এক সময় ব্যাংকগুলোতে আমাদের প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকার ঋণ সীমা বা ব্যাংকিং লিমিট ছিল। ডলারের বিনিময় হার যখন ৮৫ টাকা ছিল, তখন এর ক্রয়ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। কিন্তু ডলারের দাম ১২৫ টাকা হওয়ায়, সেই ক্রয়ক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে ২১০ কোটি ডলারে। এর মানে আমরা প্রায় ৯০ কোটি ডলারের আমদানি সক্ষমতা হারিয়েছি।" তিনি জানান, বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১২টি ব্যাংক কার্যকর সহায়তা দিতে সক্ষম এবং তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। "আমরা ব্যাংকের অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে জিরো-কুপন বন্ড ছাড়ার পথও খুঁজেছিলাম। আমরা প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকার একটি বন্ডের জন্য আবেদন করেছিলাম, কিন্তু অনুমোদন পেতেই প্রায় ১৪ মাস সময় লেগে যায়। এই ধরনের বিলম্ব আর্থিক পরিকল্পনাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। অনুমোদন যখন আসে ততক্ষণে বাজারের পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং সুদের হার অনেক বেড়ে গেছে।" "শুরুতে আমরা অর্থায়নের খরচ ১০ শতাংশের কাছাকাছি আশা করেছিলাম, কিন্তু বন্ড অনুমোদিত হওয়ার সময় বাজারের সুদের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশে উঠে যায়। যেহেতু সরকারি সিকিউরিটিজগুলোতেই ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ রিটার্ন দেওয়া হচ্ছিল, তাই বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে একটি করপোরেট বন্ডের প্রায় ১৫ শতাংশ রেট অফার করার প্রয়োজন হতো। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই ধরনের অর্থায়নের খরচ মোটেও টেকসই নয়। আমাদের এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চলতি মূলধন।" সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, মুন্সীগঞ্জে ছয়টি শিল্প প্রকল্পের গ্যাস সংযোগে বিলম্বের কারণে সিটি গ্রুপের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর ফলে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে রয়েছে, অথচ এর বিপরীতে অর্থায়নের খরচ বা সুদ ক্রমাগত জমা হচ্ছে। "গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিন্তু চালু করা যাচ্ছে না এমন প্রকল্পগুলোর কারণে সুদ, স্থায়ী খরচ, বেতন এবং অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে আমাদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।" "আমরা সিকিউরিটি ডিপোজিট বা জামানত হিসেবে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা জমা দিয়েছি এবং গ্যাস অবকাঠামো তৈরিতে নিজেরাই বিপুল বিনিয়োগ করেছি। আইডিয়ালি সরকারের এই অবকাঠামোর বেশিরভাগ তৈরি করার কথা ছিল। প্রক্রিয়াটিকে দ্রুততর করতে আমরা নিজস্ব খরচে পাইপলাইন ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা নির্মাণ করেছি, কিন্তু তবুও আমরা গ্যাস পাইনি" –তিনি যোগ করেন। তিনি আরও বলেন, "আমরা যখন এই বিনিয়োগগুলোর পরিকল্পনা করেছিলাম, তখন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশসহ সরকারি বিভিন্ন প্রণোদনা চালু ছিল। কিন্তু আমরা বিনিয়োগ করার পর নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে চিনি, ভোজ্যতেল, সিমেন্ট এবং স্টিলের মতো খাতগুলোকে সেই সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ধরনের নীতিগত অসঙ্গতি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে।" "এই প্রকল্পগুলোতে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও যুক্ত আছেন। যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একটি অংশীদারের সিমেন্ট ও কাগজ প্রকল্পসহ দুটি যৌথ উদ্যোগে ৪০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে। এসব বিনিয়োগকারী কিছু প্রতিশ্রুতি এবং প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কার্যক্রম শুরু না হওয়ায়, তারা স্বাভাবিকভাবেই এখন বিকল্প হিসেবে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (এক্সিট অপশন) বিষয়ে আলোচনা করছেন।" হাসান বলেন, গ্রুপটি ব্যাংকগুলোর কাছে ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে, তবে কেবল পুনর্গঠনই কোনো সমাধান নয়। "কারখানাগুলো অবশ্যই চালু হতে হবে। চলতি মূলধন এবং জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া— ঋণ পুনর্গঠন করা হলেও টাকা পরিশোধ করা অসম্ভব।" গ্রুপটি এখন অভ্যন্তরীণভাবে তহবিল সংগ্রহের জন্য শুরুতে তাদের নন-কোর সম্পদ, যেমন জমি এবং অন্যান্য আয়হীন সম্পদ বিক্রির কথা বিবেচনা করছে। "তবে আমাদের ব্যবসাগুলো যেহেতু আমদানিনির্ভর, তাই ব্যাংকের সমর্থন অপরিহার্য" –বলেন তিনি। "উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ে বা খেলাপি হয়ে যায়, তবে এর প্রভাব কেবল ওই কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, আন্তর্জাতিক সুনাম, সার্বভৌম ঝুঁকির ধারণা এবং ভবিষ্যতের অর্থায়নের খরচকে প্রভাবিত করে। দেশের ঝুঁকি বেড়ে গেলে বিদেশি সরবরাহকারী ও ঋণদাতারা উচ্চ প্রিমিয়াম দাবি করে, যার ফলে আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের খরচ বেড়ে যায়।" "সামগ্রিকভাবে আমাদের বার্তা একদম পরিষ্কার: প্রকল্পগুলো প্রায় সম্পন্ন, কারখানাগুলো তৈরি, বাজারও রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরাও প্রস্তুত। এখন যা প্রয়োজন তা হলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, পর্যাপ্ত চলতি মূলধন সহায়তা এবং নীতিমালার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন" —তিনি যোগ করেন।