নাগরিকত্ব ও স্বীকৃতিসহ পাঁচটি শর্ত পূরণ না হলে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফিরতে অনিচ্ছুক ৮৭ শতাংশ রোহিঙ্গা। তাদের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক তদারকি, জমি-ঘর ফিরিয়ে দেওয়া ও পুনর্বাসন, অবাধ চলাচল এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিচার ও জবাবদিহির নিশ্চয়তাও চান তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকার; ৫৬ শতাংশ রোহিঙ্গা এমন মত দিয়েছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাবির নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে‘অনিশ্চিত ঘরে ফেরা: উখিয়ার ক্যাম্প থেকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাবনা’ (দ্য আনসার্টেইন রিটার্ন টু হোম: রোহিঙ্গা ভয়েসেস অন সেফ, ভলান্টারি অ্যান্ড ডিগনিফায়েড রিপ্যাট্রিয়েশন ফ্রম দ্য ক্যাম্পস অব উখিয়া) শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে দিনব্যাপী প্যানেল আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়।
মূল পর্বে গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা গত ২ আগস্ট থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়ার ১৭টি শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের মতামত নেয়। জরিপে অংশ নেয় ৮১৬ জন রোহিঙ্গা। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ পুরুষ ও ৩৫ শতাংশ নারী। পাশাপাশি ৭২ জনের বিশদ সাক্ষাৎকার, হেড মাঝি ফোকাসড গ্রুপ আলোচনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় ৩৬টি বিষয় বা থিম ধরে গুণগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণার তথ্য অনুসারে, অংশগ্রহণকারী ৮১৬ জনের মধ্যে ৭১৩ জন অর্থাৎ ৮৭ শতাংশের বেশি জানিয়েছে, তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা একেবারেই ফিরতে চায় না। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিজেদের জমি ও বাড়িঘর ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক তদারকিসহ নির্দিষ্ট শর্তগুলো পূরণ হলে ফিরে যেতে চায় তারা। তাদের মতে, মিয়ানমারে তারা যে সহিংসতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, তাতে এই শর্তগুলো পূরণ না হলে তাদের প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ২০ শতাংশ মিয়ানমারে তাদের সম্পত্তির মালিকানা থাকার কথা বলেছে।
গবেষণায় বলা হয়, দেশে বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গা বাস করছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে এসেছে দেড় লাখের মতো। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানামারে সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি শিবিরে একটা ঘেরাটোপের মধ্যে থাকা, রেশন কমে যাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সনদ না থাকা, কাজের অনিশ্চয়তা, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও শিবিরে সশস্ত্র দলের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে রোহিঙ্গাদের কথায়।
প্রত্যাবাসন হতে হবে টেকসই
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গত ৬ মে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, রোহিঙ্গা নাগরিকদের আশা, হতাশা ও অনিশ্চয়তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতার বোঝা তরুণী ও কন্যাশিশুদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি বলছে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারকে তাদের নিজভূমি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছে না। তারা প্রত্যাখ্যান করছে সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে, যে পরিস্থিতি তাদের পালাতে বাধ্য করেছিল। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু একটি সীমান্ত পার হয়ে গেলেই প্রত্যাবাসন সফল হয়েছে—এমনটা বলা যায় না। বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো যদি সমাধান না হয়, অধিকার সুরক্ষিত না থাকে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে আবারও মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই সরকার সহানুভূতির সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল কারণগুলো সমাধানের দিকে জোর দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক–উর–রহমান বলেন, টেকসই প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। এই গবেষণা থেকে নীতিনির্ধারকেরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল সমস্যাগুলোর সমাধানে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। রোহিঙ্গারা দীর্ঘ সময় ধরে থাকার কারণে তহবিল সংকটসহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোকে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে কনভেনর হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। এই গবেষণায় উঠে এসেছে তাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাপ্রাপ্তির ঘাটতি ও অপহরণ–চাঁদাবাজি–শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার বিষয়টি। এ বিষয়গুলো প্রকাশ করা উচিত, যাতে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হয় ও সমাধানের ব্যবস্থা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (নিরোধ শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকাশনা অধিশাখা) মো. রাজীব আহসান।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধি হিসেবে অনুষ্ঠানে মো. শফিক বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব, ভূমির অধিকার, নিরাপত্তা ছাড়া আমাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন হলে তা টেকসই হবে না। আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোকে এ দিকে নজর দিতে হবে। আমরা প্রতিশোধ চাই না, ন্যায়বিচার চাই।’
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান গবেষণা ফোরামের (ডিইউসিআরএফ) সভাপতি সাফায়েত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আদৃতা আরিফ।
মূল পর্বের আগে সকালে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (নিরোধ শিক্ষা) শামীম আহম্মেদ। এই পর্ব সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহারিয়া আফরিন। বক্তারা বলেন, নিয়ন্ত্রিত চলাচলে বাধ্যবাধকতার কারণে ও জীবিকার ঘাটতিতে অনেক রোহিঙ্গা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
গবেষণায় আরও যা এসেছে
জরিপে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ সরকারকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ হার প্রায় ৫৬ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে জাতিসংঘ, প্রায় ২১ শতাংশ রোহিঙ্গা জাতিসংঘের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে। তবে ৪ শতাংশ এমন মতও দিয়েছে যে তারা মিয়ানমার সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। প্রায় ১৬ শতাংশ জানিয়েছে, তারা কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বিশ্বাস করে না।
বিশদ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, শিবিরের জীবনও প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। রোহিঙ্গারা এমন এক অবস্থায়, যেখানে একদিকে তাদের বিতাড়িত করা দেশ (মিয়ানমার), অন্যদিকে তাদের স্থায়ীভাবে একীভূত না করা আশ্রয়দাতা দেশ (বাংলাদেশ)। জরুরি সহায়তা কমছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানও শুরু হয়নি। ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের অর্থায়ন কমে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। রেশন মাথাপিছু ১২ মার্কিন ডলার (১৪৭৪ টাকা বর্তমান ডলার মূল্যে) থেকে কমে ৭ ডলার (৮৫৯ টাকা) হয়েছে। রেশন কমে যাওয়ায় কিছু পুরুষ শিবিরের বাইরে অনানুষ্ঠানিক কাজে যাচ্ছে এবং এতে অপহরণ ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। কর্মহীনতা থেকে জুয়া, জুয়া থেকে পারিবারিক সহিংসতা ও ঋণগ্রস্ততা, মানব পাচারের মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।
শিবিরে ১০ ফুট বাই ১৫ ফুটের ঘরে ছয় থেকে ১০ জনের থাকার কথাও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে। শিক্ষাব্যবস্থা সনদপ্রাপ্ত নয়, স্বাস্থ্যসেবা সীমিত, চলাচল নিয়ন্ত্রিত এবং আইনগতভাবে চাকরি করার সুযোগ নেই। জরিপে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা এমন অভিযোগও করেছে যে, বিকেল থেকে শিবিরগুলো ৫ থেকে ৬টি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়। ২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণও দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি অব্যাহত রাখতে ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের অনমনীয় বা কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সূত্রের বরাতে টিবিএস এ খবর জানিয়েছে। বুধবার (৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন (এসসিএনসিএল) কমিটির সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রের বরাতে টিবিএস জানিয়েছে, অনুমোদিত মোট অর্থের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের একটি নতুন প্রকল্পের জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি খাতের জরুরি আমদানির জন্য ভূতাপেক্ষ অনুমোদনে ৩.১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ রয়েছে। ইআরডির কর্মকর্তারা জানায়, বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) হতে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার গ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কমিটি। সভার জন্য তৈরি করা ইআরডির কার্যপত্রে বলা হয়েছে, এডিবির এই ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (এসওএফআর)-এর সাথে ০.৫০% স্প্রেড যুক্ত করে। ২৫ বছর মেয়াদি এ ঋণে ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড এবং ০.১০% ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম ও ০.১৫% কমিটমেন্ট চার্জ রয়েছে। এডিবি থেকে প্রাপ্ত খসড়া চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর গ্রান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৫.৭০%, যা ২৫% এর নিচে হওয়ায় এটি কঠিন শর্তের বা অনমনীয় ঋণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, অনুমোদিত ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রধান লক্ষ্য হলো ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের জুলাই মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন ও বিদ্যমান উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ, আন্ডারগ্রাউন্ড ও ওভারহেড লাইন নির্মাণ, ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন এবং ডিজিটাল মনিটরিং ও ফল্ট লোকেটর প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। এর ফলে কারিগরি লোকসান (সিস্টেম লস) কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নতমানের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে ও নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখতে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্বল্পমেয়াদী অনমনীয় ঋণ ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে এসসিএনসিএল। এই ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ২.৫ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) এলএনজি আমদানির জন্য ৬০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ৬ মাস মেয়াদি এই ঋণের সুদের হার ধরা হয়েছে ৬ মাসের টার্ম এসওএফআর-এর সাথে ১.৭০% যোগ করে, যা বিগত বছরের বার্ষিক হারের তুলনায় কিছুটা কম। এই ৩.১ বিলিয়ন ডলার ঋণ সুবিধার মধ্যে আইটিএফসি তাদের নিজস্ব উৎস থেকে সংস্থান করবে ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং অবশিষ্ট ২.৫ বিলিয়ন ডলারের সংস্থান হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কো-ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে। জরুরিভিত্তিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল অটুট রাখতে কমিটি নথিতে অনুমোদিত এই ঋণ প্রস্তাবের অনুমোদন নিশ্চিত করেছে। ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনমনীয় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসরণের বিষয়টি সভায় গুরুত্ব পায়। নিয়ম অনুযায়ী, বৈদেশিক অনমনীয় ঋণের দায় পরিশোধ (ডেবট সার্ভিসিং) ব্যয় যেন কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের ১০% বা রাজস্ব আয়ের ১৫%-এর বেশি না হয় এবং মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি (ডেবট স্টক) যেন জিডিপির ১০%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা নিশ্চিত করার শর্ত রয়েছে। সার্বিক অর্থনৈতিক বিবেচনা, নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই এই বিশাল অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করা হয়।
ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি-পেশা ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের কল্যাণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-পরিচয় কোনো কিছুই মানুষের অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাড়ানোয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসবের আনন্দ আরো বাড়িয়েছে। মতবিনিময়কালে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা, প্রয়োজন ও দাবিদাওয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বলেন, সরকার সব সম্প্রদায়ের মানুষের কল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু করা সম্ভব, আমরা সর্বোচ্চটুকু করার চেষ্টা করব। আপনাদের যৌক্তিক দাবি ও সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এ সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাইকে শুভেচ্ছা জানান একই সঙ্গে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সবাইকে কঠিন চীবরদান উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানান এবং দেশের সব নাগরিকের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন। একইসঙ্গে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও প্রধানমন্ত্রীকে তাদের ধর্মীয় উৎসবের শুভেচ্ছা জানান। পরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে ৫ কোটি টাকা এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দের চেক হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী।
উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা ‘পরিদর্শন কক্ষ’ শুধুমাত্র সংসদ সদস্যদের জন্য সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বুধবার (৭ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-২ শাখা থেকে দেশের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসকের কাছে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. মোজাম্মেল হক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮-এর ২৫ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ সংসদ সদস্যের উপদেশ গ্রহণ করবে। চিঠিতে বলা হয়, সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ-সংক্রান্ত উপদেশমূলক কার্যক্রম পরিচালনা ও তদারকির সুবিধার্থে উপজেলা পরিষদে তাদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নির্মাণ ও বরাদ্দ করা হয়েছে। এ অবস্থায় সংসদ সদস্যদের নামে বরাদ্দ করা এসব পরিদর্শন কক্ষ অন্য কারও ব্যবহারের জন্য না দিয়ে শুধু সংসদ সদস্যদের জন্য সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে কক্ষগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৮ সালের উপজেলা পরিষদ আইনটি ২০০৯ ও ২০২৬ সালে সংশোধন করা হয়েছে।