লন্ডনের অভিজাত আকাশচুম্বী অট্টালিকার ছায়াতলে থাকা বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে শিশু দারিদ্র্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটস, হ্যাকনি ও নিউহ্যাম—এই তিন এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলো উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকটে চরম বিপর্যস্ত।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, টাওয়ার হ্যামলেটসে শিশু দারিদ্র্যের হার ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ। এরপরেই রয়েছে হ্যাকনি (৫০ দশমিক ১ শতাংশ) এবং নিউহ্যাম (৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ)।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব এলাকায় দারিদ্র্য এতটাই প্রকট যে অনেক পরিবারের ঘরে সচল ফ্রিজ পর্যন্ত নেই। শীতকালে নষ্ট হয়ে যাওয়া ফ্রিজ মেরামতের সামর্থ্য না থাকায় অনেক পরিবারকে ব্যালকনিতে খাবার সংরক্ষণ করতে দেখা গেছে।
হ্যাকনি ফুডব্যাংকের এক কর্মী সাংবাদিকদের জানান, মহামারির পর থেকে তাদের সেবার চাহিদা প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। তিনি বলেন, উচ্চ ভাড়া ও অপর্যাপ্ত সরকারি ভাতার কারণে মানুষ মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারছে না। অনেক সময় বাবা-মা নিজেরা না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
নিউহ্যাম ও টাওয়ার হ্যামলেটসের বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী বর্তমানে এই সংকটের প্রধান ভুক্তভোগী। টাওয়ার হ্যামলেটসের জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নিউহ্যামের ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বাংলাদেশি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আয় অনুযায়ী অতিরিক্ত ঘরভাড়া ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে তারা এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন।
হ্যাকনির মেয়র ক্যারোলিন উডলি জানিয়েছেন, কাউন্সিল দারিদ্র্যের মূল কারণগুলো মোকাবিলায় কাজ করছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রতিনিধি ও দাতব্য সংস্থাগুলোর মতে, এই সংকট নিরসনে আরও বড় পরিসরে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যার মাধ্যমে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সোমবার দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরানের বাহিনী সত্যের পথে থাকা যোদ্ধা ও আত্মত্যাগী সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী ও গভীরভাবে প্রোথিত ফ্রন্ট, যাদের মনোবল ভাঙা যাবে না। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির গোয়েন্দাপ্রধান মাজিদ খাদেমি নিহত হওয়ার পর এই মন্তব্য করেন তিনি। খামেনি বলেন, মাজিদ খাদেমি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা খাতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। এদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা আইআরজিসির কুদস ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের কমান্ডার আসগর বাঘেরিকে হত্যা করেছে। তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের একাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তথ্যসূত্র : সিএনএন
হরমুজ প্রণালি নিয়ে জাতিসংঘে ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে আজ। প্রণালিতে সংকটি নিয়ে একটি সংশোধিত প্রস্তাবের ওপর আজ ভোটের আয়োজন করা হয়েছে। ইরানের হুমকির প্রেক্ষিতে এই প্রস্তাব আনা হয়েছে। প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (০৭ এপ্রিল) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করে। প্রাথমিক খসড়ায় হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের জন্য স্পষ্ট জাতিসংঘ ম্যান্ডেট দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে সম্ভাব্য ভেটোর কারণে সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে প্রস্তাবটি অনেকটাই নমনীয় করা হয়েছে। নতুন খসড়ায় ইরানকে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বা নৌ-স্বাধীনতায় কোনো বাধা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। যদিও এতে সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিরক্ষামূলক ও সমন্বিত পদক্ষেপ’ নেওয়ার জন্য জোরালোভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বাধা দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিরোধে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে পরিষদ। আলজাজিরা জানিয়েছে, গ্রিনিচ সময় বিকাল ৩টায় এই ভোটটি অনুষ্ঠিত হবে। যা ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারিত সময়সীমার প্রায় নয় ঘণ্টা আগে। ট্রাম্প ইরানকে একটি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার জন্য সময় বেঁধে দিয়েছেন। অন্যথায় দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। এদিকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক সামরিক হুমকির জবাবে তীব্র ব্যঙ্গ করেছে ইরান। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রসিক ভঙ্গিতে ইরান জানিয়েছে, প্রণালির ‘চাবি নাকি হারিয়ে গেছে’। সোমবার (০৬ এপ্রিল) ইরানের জিম্বাবুয়েতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেছে। কেবল জিম্বাবুয়ে দূতাবাস নয়, একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইরানের মিশনও ব্যঙ্গ করেছে। তারা লিখেছে, ‘চাবিটা ফুলের টবের নিচে রাখা আছে। তবে এটি শুধু বন্ধুদের জন্য।’ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার যে হুঁশিয়ারি ট্রাম্প দিয়েছিলেন। তার প্রতিক্রিয়াতেই তেহরানের পক্ষ থেকে এমন বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য এসেছে। এর আগে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রণালি চালু না করা হলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হতে পারে। এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
মার্কিন আইনপ্রণেতা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গড়া দ্বিদলীয় একটি কমিশন ২০০৫ সালে তাদের প্রতিবেদনের উপসংহারে লেখে, ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার গোয়েন্দা তথ্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভুল। মার্কিন গোয়েন্দারা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বলেছিলেন, সাদ্দাম হোসেন নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করেছেন এবং ইরাকের কাছে প্রাণঘাতী রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। এসব গোয়েন্দা তথ্যই ছিল ইরাক যুদ্ধ ও দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের আট বছরের দখলদারিত্বের মূল ভিত্তি। কিন্তু দ্বিদলীয় কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর একটি তথ্যও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি ছিল বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা। যদি একই ধরনের একটি কমিশন বর্তমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে পর্যালোচনা করত, তাদের মূল্যায়নে সম্ভবত বলা হতো¬–তেহরানের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সম্পূর্ণ সঠিক ছিল; কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তা গ্রাহ্য করেননি। ইরানে যুদ্ধ বাধানোর বৈধতা অর্জনে ট্রাম্প বলছেন, তেহরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে, যেটা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দারা বলেছেন, ইরানের শাসক গোষ্ঠী পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল না; তাদের কাছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ছিল না, যেটা দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, সেই আভাসও ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা। উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার শঙ্কাও প্রেসিডেন্টের কানে দিয়েছিলেন তারা। আর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী কী সংকট দেখা দিতে পারে, সে পূর্বাভাসও ছিল মার্কিন গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে। দ্য আটলান্টিকের বিশ্লেষণী একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যগত জায়গা থেকে এবার মার্কিন গোয়েন্দারা সাফল্য দেখিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের এই যুদ্ধ একের পর এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। ইরান এখন হরমুজ প্রণালি তাদের মতো করে চালাচ্ছে। এমনকি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায়ের কথাও বলছে যুদ্ধের শিকার হওয়া দেশটি। ফলে ইরানের শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাতের কথা ট্রাম্প বললেও বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। এখন থেকে দুই দশক আগে একজন প্রেসিডেন্ট ভুল তথ্যকে গ্রহণ করেছিলেন, যা বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। আর এখন একজন প্রেসিডেন্ট সঠিক গোয়েন্দা মূল্যায়নগুলো উপেক্ষা করছেন। সেই উপেক্ষা করার ফলে অনুমিত পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। ইরাক যুদ্ধ নিয়ে গোয়েন্দা ব্যর্থতার পর যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, এমন ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। বহু দিক থেকে সেই সংস্কারগুলো কার্যকর হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের মতো ব্যক্তি সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে আসবে, সেই হিসাব হয়ত যুক্তরাষ্ট্র করেনি। হোয়াইট হাউজের কেউ কেউ অবশ্য ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন, যেমনটা দুই দশক আগে বুশ প্রশাসনেও হয়েছিল। অনেকেই বলছেন, ট্রাম্প যদি গোয়েন্দা তথ্য ঠিকঠাক তুলে ধরতেন, তবে তা ইরানে যুদ্ধ বাধানোর বিপক্ষেই যেত; কিংবা যুদ্ধ শুরুর আগে অন্তত সব ধরনের কূটনৈতিক চেষ্টা চালানোর কথা বলা হতো। সম্ভবত এ কারণেই প্রেসিডেন্ট তার উপদেষ্টাদের কথা উপেক্ষা করেছেন; কোথাও কোথাও ভুলভাবেও উপস্থাপন করেছেন। ইরানে হামলা শুরুর দুদিন পর গত ২ মার্চ হোয়াইট হাউজের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইউরোপ ও দেশ-বিদেশে থাকা আমাদের ঘাঁটিগুলোতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম। এছাড়া শিগগিরই তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্রের মালিক হবে, যেটা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও আঘাত হানতে পারবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির’ উপসংহারে বলা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে ইরানের ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। আর এটি কেবল তখনই সম্ভব হবে, যদি তারা এটা তৈরির ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়। কয়েক সপ্তাহ পর ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে বলেন, ইরানের কাছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি রয়েছে, যা ব্যবহার করে তারা ২০৩৫ সালের আগেই আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি শুরু করতে পারবে। ট্রাম্প অনুগত এ উপদেষ্টা অবশ্য এটা বলেননি যে, ইরান ইতোমধ্যে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বানানো শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প জোর দিয়ে বলে আসছেন, এই হুমকি খুব বেশি দূরের বিষয় নয়। গত ১৬ মার্চ ওভাল অফিসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ইরান মধ্যপ্রাচ্য দখল করে নিত; তারা পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দিত।” বাস্তবতা হল- ইরানের হাতে যে ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা আরও সমৃদ্ধ করা হলে একসময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু গত বছরের জুনে মার্কিন বিমান হামলায় পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইরান আর নতুন করে সেই চেষ্টায় যায়নি। এ তথ্য গ্যাবার্ডও কংগ্রেসে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর প্রবেশপথ মাটি দিয়ে ঢেকে সিমেন্টের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প শুধু গোয়েন্দা তথ্যই ভুলভাবে উপস্থাপন করেননি, তিনি ইরানের পাল্টা হামলায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালানোকে তিনি অপ্রত্যাশিত বলেছেন। তবে ট্রাম্পকে তার উপদেষ্টারা এসব আশঙ্কার কথা আগেই বলেছিলেন। তারা জানতেন, এই নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি বেকায়দায় পড়ে যাবে। এই অনুমান এতটাই সহজ যে, পেন্টাগন তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনাতে আগেই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ট্রাম্পের সামরিক উপদেষ্টারা যখন তাকে এই আশঙ্কার কথা শোনান, তিনি গুরুত্ব দেননি। ট্রাম্প হয়ত ভেবেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার আগেই ইরান নতি স্বীকার করবে; আর অন্য কিছু ঘটলে তার সামরিক বাহিনী সামলে নেবে। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর সেটি খুলে দিতে ইরানকে বোমা মারার হুমকি দেন ট্রাম্প। তাতে কাজ না হওয়ায় এখন তিনি বলছেন, নৌপথটি খুলে দেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের একার নয়। গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় কোনো তেলই আমদানি করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। আমাদের এটি প্রয়োজন নেই। তার এ বক্তব্যের পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরো বেড়ে যায়। ট্রাম্প সেদিন একথাও বলেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার কিংবা অন্যান্য মার্কিন মিত্রকে লক্ষ্য করে ইরান যে হামলা চালাতে পারে, সে আভাস কেউ তাকে দেননি। হোয়াইট হাউজের অনুষ্ঠানে গত ১৬ মার্চ তিনি বলেন, তাদের তো মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশের পেছনে লাগার কথা ছিল না। কেউ এটা আশা করেনি; আমরা হতবাক হয়েছি। কিন্তু হামলার শিকার হওয়া দেশগুলো অবাক হয়নি। ২০২৫ সালে মার্কিন গোয়েন্দারা প্রকাশ্যে বলেছিল, ইরানের সামরিক বাহিনী প্রতিপক্ষের ব্যাপক ক্ষতি করার সামর্থ্য রাখে। তারা জ্বালানি সরবরাহসহ জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম, বিশেষত হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও শেষমেশ স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ইরানের আঞ্চলিক পাল্টা আঘাত একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। গত ১০ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তারা এভাবে জবাব দেবে, সেই ধারণা আমাদের ছিল না। কিন্তু আঘাত আসার একটা আশঙ্কা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলেটিকোর খবর অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে দুটি আরব দেশের কর্মকর্তারা ট্রাম্প ও তার শীর্ষ সহকারীদের কাছে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া; এর ফলে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়া এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের কথাও তুলে ধরেছিলেন তারা। গত মাসে তুলসি গ্যাবার্ড যখন সেনেটের গোয়েন্দা বিষয়ক কমিটির মুখোমুখি হন, তখন সেনেটররা ক্ষোভ জানান। সেনেটর অ্যাঙ্গাস কিং তাকে প্রশ্ন করেন, ইরান নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের মধ্যে যে ফারাক, সে বিষয়টি কি আপনি তাকে বলেছিলেন? গ্যাবার্ড হ্যাঁ-না উত্তর এড়িয়ে বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্পকে ইরানের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে তথ্য সরবরাহ করেছে। সেখানে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি কয়েক ডজন ব্রিফিংয়ে অংশ নিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনা ইরানের ছিল। গ্যাবার্ড তখন সুর মিলিয়ে বলেন, গোয়েন্দাদের দীর্ঘদিনের মূল্যায়ন ছিল যে, ইরান সম্ভবত হরমুজ প্রণালিকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। প্রেসিডেন্টের যুদ্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সম্প্রতি চাকরি ছাড়েন গ্যাবার্ডের শীর্ষ উপ-সহকারী জো কেন্ট। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ মুহূর্তে ইরান কোনো হুমকি ছিল না। কেন্টকে ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের প্রধান হিসেবে ট্রাম্পই মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ফলে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে থাকা এমন কর্মকর্তার বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তবে র্যাটক্লিফ সেনেট কমিটির সামনে বলেন, তিনি কেন্টের সঙ্গে একমত নন, কারণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষা ইরান ত্যাগ করেনি। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, আকাঙ্ক্ষা থাকা আর বাস্তবে সেটি বানিয়ে ফেলার কাছাকাছি থাকা এক কথা নয়। জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সেনেটর জন ওসফ যুদ্ধ শুরুর পরের দিন হোয়াইট হাউজের দেওয়া এক বিবৃতি পড়ে শোনান। ওই বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, এটি ইরানি শাসনব্যবস্থার সৃষ্ট আশু পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করার সামরিক অভিযান। ওই সেনেটর গ্যাবার্ডকে জিজ্ঞাসা করেন, গোয়েন্দারা কি এটাকে আশু হুমকি বলেছিল? জবাবে গ্যাবার্ড বলেন, “কোনটি আশু হুমকি এবং কোনটি নয়, তা নির্ধারণ করতে পারেন একমাত্র প্রেসিডেন্ট। এটি গোয়েন্দাদের কাজ নয়।” যদিও বাস্তবতা হলো, এটা নির্ধারণ করা গোয়েন্দাদেরই কাজ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্টই গোয়েন্দাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন, কেউ কেউ শোনার প্রয়োজনও মনে করেননি। কিন্তু গোয়েন্দাদের সঙ্গে ট্রাম্পের মতো এতটা দূরত্ব আর কোনো প্রেসিডেন্টের ছিল না। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী থাকার সময় তিনি ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে ভুল মূল্যায়নের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। ট্রাম্প বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, তিনি নিজের অন্তর্দৃষ্টিকে ভরসা করেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ইরান যুদ্ধ শেষ হয়েছে কিনা, তা তখনই বুঝব, যখন আমি তা অনুভব করব, হাড়ে হাড়ে অনুভব করব।” যুক্তরাষ্ট্রে গোয়েন্দা বাহিনীর যে কাঠামো, তাতে আবেগতাড়িত ও ব্যক্তিগত মতামতের ওপর পরিচালিত কোনো প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তারা কেবল তথ্য সরবরাহ করতে পারে। প্রেসিডেন্ট যদি সেসব তথ্য উপেক্ষা করেন বা বিকৃত করেন, সেই ব্যর্থতার দায় একান্তই তার।