মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় প্রদর্শিত দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র নিয়ে আপত্তি জানান ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা।
ঢাকায় আয়োজিত একটি সেমিনারে উপস্থাপিত ভারতের মানচিত্র নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ভারতীয় হাইকমিশনের একজন কূটনীতিক। তার আপত্তির মুখে বিষয়টি ননিভুক্ত করা হয়।
সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) ‘বিশ্বাস পুনঃস্থাপন ও আঞ্চলিক সংহতি নবায়ন: সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার পথ’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় প্রদর্শিত দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র নিয়ে আপত্তি জানান ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা।
তিনি বলেন, এখানে ভারতের যে মানচিত্র দেখানো হয়েছে, তা সঠিক নয়। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জবাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম বলেন, মানচিত্রটি শুধু উপস্থাপনার সুবিধার্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এটি প্রকৃত সীমারেখা নির্দেশ করে না।
পরে পূজা কুমারী ঝা বলেন, আমি বুঝতে পারছি, স্যার। কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরকে আমরা ভারতের অংশ হিসেবে দেখি এবং এখানে সেটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই বিষয়টি শুধু উল্লেখ করতে চেয়েছি। এর জবাবে তারিক করিম বলেন, বিষয়টি নথিভুক্ত করা হলো।
উল্লেখ্য, তারিক এ করিম ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজের বিশিষ্ট ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো। তিনি এক সময় দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট আগামী সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশের লক্ষ্যে জোর প্রস্তুতি চলছে। সব প্রক্রিয়া ঠিকঠাক এগোলে অক্টোবর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন। এর আগে জুলাইয়ে, পরে আগস্টের মধ্যে গেজেট প্রকাশের আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বেতন বৃদ্ধির হার, বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা, জুডিসিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনার কারণে গেজেট প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মন্ত্রিসভায় যাবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকেই নবম পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। চূড়ান্ত সুপারিশের আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে আরও একটি বৈঠক হতে পারে। ওই বৈঠকে অবশিষ্ট বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে সুপারিশ চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বেতন-ভাতা নিয়ে যেসব বিষয় পর্যালোচনা হচ্ছে সচিব কমিটির আলোচনায় বেতন কমিশনের সুপারিশ, গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল উঠে এসেছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় কমিশনের পূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়নে কিছুটা কাটছাঁটের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে মূল বেতন বৃদ্ধির হার এবং কয়েকটি ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রধান জানিয়েছিলেন, ওই সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। পরে বিষয়টি সচিব কমিটির মাধ্যমে আরও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়। প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার কথা জানালেন উপদেষ্টা গত বৃহস্পতিবার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনে ঋণ নেওয়া হবে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তবে এটি কবে থেকে এবং কত ধাপে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে। ‘নতুন পে-স্কেলের অর্থের সংস্থান করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণও নেওয়া হবে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ১ জুলাই থেকে কার্যকর, অক্টোবরে নতুন বেতন সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন। তবে নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বেতন নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করে বকেয়া হিসেবে সমন্বয় করা হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মূল্যস্ফীতির চাপ ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় বকেয়া অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ না করে কয়েক ধাপে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারের ওপর এককালীন বড় আর্থিক চাপ কমবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অক্টোবর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন পে-স্কেলে বেতন পাবেন। এর আগে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ করা হবে। সচিব কমিটির আরেকটি বৈঠকের পরই পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। দ্রুত জটিলতা নিষ্পত্তির তাগিদ জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকেও বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগেই জানিয়েছেন, ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে এবং চলতি অর্থবছর থেকেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের বর্তমান আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মূল বেতন কার্যকর করে পরে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এদিকে, গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগের বেতন কাঠামো অনুযায়ীই বেতন পাচ্ছেন। নতুন গেজেট প্রকাশের পর ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং ওই সময়ের বকেয়া অর্থ সমন্বয় করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘সরকারের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আরো সৃজনশীল হতে হবে। একই সঙ্গে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপতথ্য মোকাবেলা করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’ রবিবার (২৩ আগস্ট) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মন্ত্রীর মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সময়ে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বেড়েছে। সরকারের বার্তা জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পৌঁছে দিতে মন্ত্রণালয়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। নতুন মন্ত্রী হিসেবে আন্দালিব রহমান পার্থকে এ দায়িত্বের জন্য সঠিক ব্যক্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অতীতে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বাস্তবায়নে দেরি হয়েছে। এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনসহ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম দ্রুত আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানো গেলে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মান ও সুনাম বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের কর্মকাণ্ডও জনগণের কাছে আরো সুন্দরভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি। মতবিনিময় সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানাসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
দিল্লিতে আশ্রিত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত ৫ আগস্টের বক্তব্যকে ঘিরে বাংলাদেশের জনমনে তৈরি ক্ষোভের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ঢাকা-দিল্লি কূটনীতিতেও। এর জেরে স্থগিত হয়ে যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্ধারিত ভারত সফর। তবে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগে বরফ গলার ইঙ্গিত মিলছে। সব ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে হোক কিংবা দ্বিপক্ষীয় সফর- সম্ভাব্য এই সফরকে দুই দেশের টানাপোড়েন কমিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য যে বাংলাদেশের জনমনে এত বিস্ফোরণ ঘটাবে তা ভারত সরকার আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি। ফলে দুপক্ষ প্রস্তুতি নিলেও গত ২১ থেকে ২৫ আগস্ট তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর পণ্ড হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যকার এই টানাপোড়েনকে কাজে লাগাতে ব্যাপক সোচ্চার ছিল দেশের বিরোধী দল। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি বিরোধী দলকে সেই সুযোগ দেয়নি। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফেরতের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর বাতিল করে ঢাকা। শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং রাজনৈতিকভাবে বার্তা দিয়েছে। গত শনিবার সকালেও এই সফর নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক বার্তার আদান-প্রদান হয়। উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে কাজ করছে। তাদের বার্তা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে, এ বিষয়ে আপাতত উভয়পক্ষই নীতিগতভাবে সম্মত। তবে এ সফর কী ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে হবে, নাকি সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় হবে এখন তা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে যে উদ্দেশ্যেই সফর হোক না কেন সেখানে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, এটা চূড়ান্ত, যাতে দুপক্ষই সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই টানাপোড়েন কমাতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী উভয়পক্ষের সঙ্গে অবিরাম আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলস্বরূপ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে শিগগিরই ‘ত্রিবেদী চমক’ দেখা যেতে পারে। শনিবার নয়াদিল্লিতে ইকোনমিক টাইমস ওয়ার্ল্ড লিডার্স ফোরামে অংশ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক প্রসঙ্গে বলেন, যেকোনো সম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে হলে তাকে পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষা পাস করতে হবে। উভয়পক্ষকেই এটা করতে হবে। একে অপরের স্বার্থকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সম্মান করা একান্ত জরুরি। বিহারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও জলসম্পদ মন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী শনিবার ভারতীয় একটি সংবাদ মাধ্যমে জানান, গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিহারের ফারাক্কা ব্যারাজ ও ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন চুক্তি সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। চুক্তিটি বছরের শেষে নবায়ন হওয়ার কথা এবং বিহারের স্বার্থ যেন উপেক্ষিত না হয় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনও উপস্থিত ছিলেন। সদ্য নিয়োগ পাওয়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হব। আমরা একটি ইতিবাচক সম্পর্ক চাই। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তা করতে হবে। আমরা যদি আগামীকালও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারি, তা হলে আগামী সপ্তাহে যেতে পারি, অথবা পরের সপ্তাহেও যেতে পারি। এখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই। এখানে আলোচনার বিষয় আছে, প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয় আছে। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফর তো এমন নয় যে, হুট করে গিয়ে হয়ে গেল। এটা কোনো খেলার বিষয় নয়। দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের আগে কিছু প্রস্তুতি ও ভিত্তি তৈরি করতে হয়। আমরা সেটিই করছি। সেখান (ভারত) থেকেও ইতিবাচক মনোভাব ও সদিচ্ছার ইঙ্গিত আসছে। তারা স্বীকার করেছে, বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে- বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর পলাতক শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। তারা বিষয়টি লক্ষ করেছে। এখন আমরা দেখি, বাকি আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয় কি না। আলোচনার ভিত্তিতে এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সময় উপযুক্ত হলেই আমরা অবশ্যই ভারত সফরে যাব। ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক রাধা দত্ত সময়ের আলোকে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের একে অপরের প্রয়োজন। তা হলে সম্পর্কগুলো কেন আরও কঠিন হয়ে উঠছে? বলা যেতে পারে, কিছু ক্রমাগত অস্বস্তিকর বিষয় থাকা সত্ত্বেও, ভারত ও বাংলাদেশকে সম্পর্ক ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে করা হচ্ছিল না। বিরোধের প্রধান বিষয়গুলো হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদেরও। হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়াটা বোধগম্য ছিল, কিন্তু বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাকে যে রাজনৈতিক পরিসর দেওয়া হয়েছিল, তা ঢাকায় খুব একটা ভালোভাবে দেখা হয়নি। হাসিনার ৫ আগস্টের ভার্চুয়াল মিডিয়া আলাপচারিতার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যা ঢাকাকে ‘ক্ষুব্ধ’ করেছিল। অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ সত্ত্বেও এটি হয়েছিল। এরপর ঢাকা হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং যুবনেতা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তরের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে- যে বিষয়গুলো এমনিতেও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অংশ হতো। অন্যদিকে নয়াদিল্লি দাবি করে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংস্থা দ্বারা আয়োজিত হয়েছিল এবং ভারত সরকার এটি সমর্থন করেনি বা এতে অংশ নেয়নি। এই ধরনের কূটনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে চলার কৌশল বাংলাদেশে তেমন কোনো সাড়া জাগায়নি। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি মনে করি ভারতের কাছে বাংলাদেশের বার্তাটি খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশের জনমনে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যেভাবে ভারত বিরোধিতা উসকে উঠেছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে আশ্রয় এবং দিল্লিতে বসে বাংলাদেশ নিয়ে বক্তব্য দেওয়া, পাশাপাশি ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী দ্বারা সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে পুশইনের মতো কার্যক্রম চালু রাখা সেই ভারতবিরোধী মনোভাব বরং শক্ত করেছে। ফলে বাংলাদেশের জনগণের কাছে কীভাবে সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে তা ভারতকে পুনরায় ভাবতে হবে। অপরদিকে কঠোর অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে আপাতদৃষ্টিতে কিছু না পেলেও ভারতকে বাংলাদেশের ইস্যুগুলোর আর্জেন্সি ও গুরুত্ব বোঝাতে পারছে। একই সঙ্গে বিএনপি সরকার ভারতবিরোধিতার অজুহাতে সরকারবিরোধীদের কোনো রাজনৈতিক স্পেস দিচ্ছে না। সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, দুই দেশের জনসংখ্যা ১৭০ কোটির কাছাকাছি। পারস্পরিক বৈরিতা এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করবে। আমি মনে করি, এ মুহূর্তে উভয় তরফে কূটনৈতিক পদ্ধতি শক্তিশালী করে বৈরিতা নিরসনের জন্য আশু উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আর এই উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো আমলে নেওয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হতে পারে এমন বক্তব্য না দিতে দুই দেশ সম্মত হতে পারে। ভারত সীমান্ত হত্যা ও পুশইন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারে। একে অপরের মাটি ব্যবহার করে একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনোরূপ প্রচার বা কর্মকাণ্ডের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। তার মানে কী এই যে, আমি প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে না যাওয়া সমর্থন করছি? না, সমর্থন করছি না। কূটনীতি অনেকভাবে করা যায়। আমি এক পা এগিয়ে কূটনীতি পরিচালনার পক্ষে। আমি বৈরী পক্ষের ভেতরে ঢুকে উষ্ণ পরিবেশ তৈরির পক্ষে। গোস্বা করলে, মনোমালিন্য জিইয়ে রাখলে, একগুঁয়েমি বহাল রাখলে, শর্ত দিলে কূটনীতির ক্ষেত্র কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে। আমি একঘরে হয়ে কূটনীতি করতে চাই না। বরং ‘সারা পৃথিবীকে আপন ঘর’ করতে চাই।