ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন অসহনীয় চাঁদাবাজি ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যে হারে চাঁদা দিতে হতো, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ব্যবসায়ীদের একই হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি, এমনকি সরকারি দপ্তরে এক দিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি।
চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাব।
গতকাল সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআইয়ের নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথাগুলো বলেন তিনি। ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবগঠিত সরকারের নিকট প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি সালিম সোলায়মান প্রমুখ।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, নতুন সরকার এমন একসময় ক্ষমতায় এসেছে, যখন অর্থনীতি অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন, বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তলানি ঠেকেছে। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং অস্থিতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও তার সামান্যতম বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার উৎপাদন প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। এখন কারখানায় চাঁদা দেওয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছে এবং আওয়ামী দুঃশাসন পার হলেও তা বন্ধ হয়নি। স্থানীয় শিল্প-কারখানাগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবার আগে উন্নতি করতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন, পুলিশ, রাজস্ব কর্মকর্তাসহ অনেকেই চাঁদাবাজি করেন। কারা চাঁদাবাজি করছে, সেটা সরকারকে বের করতে হবে।
চাঁদাবাজরা এসে বলে, তারা সরকারি দলের লোক। যখনই যে সরকার আসে, তখনই বলে আমরা সরকারি দলের লোক; আমাদের চাঁদা দিতে হবে। আমাদের এই অনুষ্ঠান আছে, পাড়ার এই চাঁদা দিতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাব। তিনি আরো বলেন, কারখানায় ঢুকতেও চাঁদা দিতে হয়। অফিস ও রাস্তায় চাঁদা দিতে হয়। জনগণ ও ব্যবসায়ী মহল চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধে আমরা নতুন সরকারের কাছ থেকে কড়া বার্তা প্রত্যাশা করছি।
এলডিসি উত্তরণ পেছানোর চেষ্টা করায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে তাসকীন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাত থেকে একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও একটি অপ্রকাশিত চুক্তির (এনডিএ) নামে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ববিরোধী একটি চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ মওকুফে সম্মত হলেও এটা এমন নয় যে সম্পূর্ণ শুল্ক মওকুফ করে দিয়েছে। ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিটি এমনভাবে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যা উভয় দেশের জন্য সমানভাবে লাভজনক হয়।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, অপরিবর্তিত নীতি সুদহারের (পলিসি রেট) কারণে ব্যবসায়ীদের ১৬-১৭ শতাংশ হারে ব্যাংকঋণ নিতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং ঋণ শ্রেণীকরণের সীমা ৯ মাস থেকে ৩ মাসে নামিয়ে আনার কারণে আর্থিক খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা তৈরি করেছে। তা ছাড়া শিল্প-কারখানায় চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ না থাকার পাশাপাশি গ্যাসের দাম বাড়ানোয় উৎপাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবনে ৪টি পরামর্শ দেওয়া হয়। এগুলো হলো— আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি চাঁদাবাজি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। সরকারি খাতে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নন, তাদের প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিয়ে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং ঋণের সুদের হারকে যুক্তিসংগত ও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৮ দশমিক ০২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৯৮ হাজার ৯০৩ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার রেমিট্যান্স এসেছে (১ মার্কিন ডলার = প্রায় ১২৩.২৯ টাকা)। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭ দশমিক ০৬৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৩.৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৩ দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ২.১৯৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২ দশমিক ১৬৪ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১.৫ শতাংশ। শুধু ২৩ সেপ্টেম্বর দেশে ৬২ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অপরদিকে টানা সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে এই মুহূর্তে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের মুদ্রা সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ কমেছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ০ দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টাকার মূল্য আরো ০ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে কমে ১২৩ টাকায় নেমে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে সাড়ে পাঁচ বছর ধরে চলা টাকার মূল্যমানের ধারায় পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ডলারের দর ছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে তা ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে সেই প্রবণতা ঘুরতে শুরু করেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনীম ও সাবেক প্রথম সচিব ঈদতাজুল ইসলামের নামে থাকা ২৫টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। দুদকের আইনজীবী তরিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করে তিনি জানান, দুদকের উপপরিচালক মো. সাইদুজ্জামান ২৫টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেন। আদালতে জমা দেওয়া দুদকের আবেদনে বলা হয়, আবু হেনা রহমাতুল মুনীম, ঈদতাজুল ইসলাম ও অন্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এসব ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব ব্যাংক হিসাবে থাকা অস্থাবর সম্পদ বিভিন্ন মাধ্যমে হস্তান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন। অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই এই সম্পদ হস্তান্তর, রূপান্তর বা স্থানান্তর হয়ে গেলে সুষ্ঠু অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অনুসন্ধানের স্বার্থে হিসাবগুলোতে থাকা অস্থাবর সম্পদ অবিলম্বে অবরুদ্ধ করা প্রয়োজন।
টানা সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে এই মুহূর্তে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের মুদ্রা সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ কমেছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ০.০৬ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টাকার মূল্য আরও ০.৭৭ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে কমে ১২৩ টাকায় নেমে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে সাড়ে পাঁচ বছর ধরে চলা টাকার মূল্যমানের ধারায় পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ডলারের দর ছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে তা ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে সেই প্রবণতা ঘুরতে শুরু করেছে। এ বিষয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, ‘রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার পাশাপাশি টাকার শক্তিশালী হওয়া দেশের বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে।’ তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ায় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও বাড়ছে। একই সঙ্গে রিজার্ভ বাড়ায় আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধের দায় মেটাতে দেশের সক্ষমতা বাড়ছে।’ তার মতে, এতে বিদেশি ও আমদানিকারকদের কাছে দেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে’। বিনিময় হার আরও স্থিতিশীল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের আস্থাও বাড়বে। আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, ‘টাকা শক্তিশালী হওয়ায় জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য আমদানি উপকরণের জন্য স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় কমবে। এতে ব্যবসায়ীদের আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যয়ের চাপও কমতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম অস্থির থাকলেও আমদানির ক্ষেত্রে ডলারে পরিশোধ করা অর্থের বিপরীতে তুলনামূলক কম টাকা ব্যয় করতে হলে মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমতে পারে।’ বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা বাড়ায় আমদানিকারকদের বৈধ ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও পরিশোধ করাও সহজ হবে। আগের মতো ডলারের সংকটে বৈদেশিক পরিশোধে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা এড়ানো সম্ভব হবে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি স্থিতিশীল উৎস হিসেবে কাজ করছে এবং লেনদেনের ভারসাম্যকে শক্তিশালী করছে।’ তবে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানো, আমদানি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে নিবিড় নজরদারির ফলে দেশের বৈদেশিক খাতের অবস্থানে উন্নতি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর ফলে বাড়তি ডলারের সরবরাহ যাতে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় এবং বৈধ বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা নির্বিঘ্নে পূরণ হয়, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’ একই সঙ্গে অর্থপাচার, বাণিজ্যভিত্তিক আর্থিক অনিয়ম এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অপব্যবহার ঠেকাতেও লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ব্যাংক ও অনুমোদিত ডিলার শাখাগুলোর নিয়মিত তদারকিও অব্যাহত রয়েছে। রেমিট্যান্স সম্পর্কে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে এবং দেশের বৈদেশিক অবস্থানও শক্তিশালী হচ্ছে।’ আমদানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রকৃত আমদানির প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অনিয়ম বন্ধে আমদানি-সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’ আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বাড়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনেছে। এতে আগের বৈদেশিক মুদ্রার চাপের সময়ে কমে যাওয়া রিজার্ভ পুনর্গঠনেও সহায়তা হয়েছে।’ তার মতে, ‘রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের জন্য ইতিবাচক। একই সঙ্গে আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধের দায় মেটাতে দেশের সক্ষমতাও বাড়িয়েছে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৭.৭০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ বেড়েছে ১৩.৮ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬.৪৪ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যা ছিল ২৪.৮৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই বছরে রিজার্ভ বেড়েছে ৪৬.৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ একই সময়ে ৫৮.৮ শতাংশ বেড়ে ৩১.৫৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির জন্য টাকার সাম্প্রতিক শক্তিশালী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তুলনামূলক শক্তিশালী টাকা থাকলে জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির মতো আমদানি পণ্যের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় কমে। একই সঙ্গে বিদেশি মুদ্রায় নেওয়া দায় পরিশোধের ক্ষেত্রেও টাকার হিসাবে ব্যয়ের চাপ কমে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি ও রিজার্ভ বৃদ্ধির সঙ্গে টাকার সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক খাতের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতাও বাড়ছে।