ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই রাজনৈতিক মাঠে জোট পুনর্গঠন ও মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন জোটের সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এনসিপি, এবি পার্টিসহ সাতটি দল নতুন জোটের আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। সব মিলিয়ে তফসিলের আগেই অন্তত তিন ধরনের জোটের আকার ফুটে উঠছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর জোট, জামায়াতের সমন্বয়ে ইসলামি ধ্যানধারার জোট এবং বাম ঘরানার আলাদা উদ্যোগ।
ভোট যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পৃথক পৃথক নির্বাচনি জোট গঠনের তৎপরতাও তত বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।
সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় ছিল, বিএনপি হয়তো জামায়াতকে আসন ছাড় দিতে পারে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতই বিএনপির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে। তবুও বৃহত্তর জোট গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের পাশাপাশি অন্যান্য বাম-ডান, মধ্যমপন্থি ও ইসলামপন্থি অনেক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। অন্যদিকে জামায়াতও সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে নির্বাচনি সমঝোতার পথে এগোচ্ছে। পাশাপাশি বামঘরানার কয়েকটি দলের সমন্বয়ে নতুন একটি জোট গঠনের কথাও শোনা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জোটই হতে পারে ফল নির্ধারণের প্রধান উপাদান। ছোট দলগুলোর কিছু ভোটই অনেক আসনে জয়–পরাজয়ের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। তাই কারা কার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, কত আসনে ছাড় পাওয়া যাবে এসব প্রশ্ন এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে একটি বৃহৎ জোট গঠনের চেষ্টা চলছে। যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো ছাড়াও সরকারবিরোধী অন্যান্য দলকে অন্তর্ভুক্ত করতে আলোচনা চলছে। তরুণদের দল এনসিপির সঙ্গেও আসন সমঝোতা নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। তবে বিষয়টি কতদূর অগ্রসর হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। এনসিপির অংশ কিছু নেতা জোটে আসার প্রতি আগ্রহ দেখালেও দলগতভাবে তারা সংস্কারভিত্তিক অ্যালায়েন্সের কথাই বলছে।
অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে প্রথমে এনসিপির নানান কর্মসূচিতে মিল দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত এনসিপি তাদের সঙ্গে জোটে যাচ্ছে না। বরং জামায়াত এখন ইসলামি সাতটি দলকে নিয়ে একটি আটদলীয় সমন্বয় গড়ে তুলেছে। তারা ‘এক আসনে এক প্রার্থী’ নীতির ওপর ভিত্তি করে জরিপ চালিয়ে প্রার্থী মনোনয়নের পরিকল্পনা করছে।
জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব জানিয়েছে, তারা আনুষ্ঠানিক জোট গঠন করবে না; বরং নির্বাচনি সমঝোতার মধ্য দিয়েই এগোবে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে বিভিন্ন ইসলামপন্থি ও দেশপ্রেমিক দল। বর্তমানের আটদলীয় সমন্বয় ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
এদিকে এবি পার্টি, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, আপ বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে নতুন একটি জোট ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। সবদল সম্মত হলে তফসিল ঘোষণার আগেই এই জোট আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
বিএনপিও তাদের বৃহৎ জোটে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় বিভিন্ন ইসলামপন্থি দল, বাম শক্তি, উদার গণতান্ত্রিক দল, পেশাজীবী সংগঠন এবং আলেম সমাজের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এজন্য দলটির নেতারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
বাম ঘরানার দলগুলোর মধ্যেও জোট পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ছয়টি বাম দল বাম গণতান্ত্রিক জোটের বিস্তৃতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি নতুন করে বাম শক্তির আরেকটি জোট গঠনেরও উদ্যোগ রয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার জোটের প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন হবে, কারণ সব দলকেই নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে হবে। ফলে বড় দলগুলোকে শরিকদের আসন ছাড় এবং জোট গঠনের ব্যাপারে আরও সতর্ক ও সময়সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ‘বিতর্কিত কর্মকাণ্ড’ ও শিক্ষার্থীদের ‘হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত ও একজনকে সাময়িকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে আলোচিত আরেক শিক্ষককে শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার (২২ জুন) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীন, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত–উল–ইসলাম। উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমল হোসেন ভূঁইয়াকে সাময়িকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আইন উপদেষ্টার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রথম আলোকে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি আরও জানান, সেই চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে অধিকতর তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া একই অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা লাভলু মোল্লা শিশিরকেও (মুহাম্মদ লাভলু মোল্লা) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক–ই–হাবিবকে বিভাগের একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ অনুয়ায়ী একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে ভাইরাল হয়েছিলেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনের সময় সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত গোলাম রাব্বানীর ছাত্রত্ব না থাকায় তাঁর ডাকসুর পদও বাতিল করার সিদ্ধান্ত আইন উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে ছাত্রলীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর এমফিল প্রোগ্রামে ভর্তি যথাযথ প্রক্রিয়ায় না হওয়ায় তা বাতিল এবং একই সঙ্গে ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে তাঁর জিএস পদ অবৈধ ঘোষণার সুপারিশ করেছিল একাডেমিক কাউন্সিল। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) শিক্ষক ওয়াসেল বিন সাদাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এরশাদ হালিম—এ দুজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের আগেই সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। এই সিন্ডিকেট সভায় তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)–এর সহযোগী ও সুখাদা প্রোপার্টিজ লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অভিজিত অধিকারী তির্থকে দুই ধারায় মোট ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২২ জুন) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এর বিচারক মুহা. হাসানুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তাকে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫ হাজার ২৮৪ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে আরও ৩০ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। দুদকের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন দুদক পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান দোলন। রায়ের আদেশে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের ২৬(২) ধারায় অভিজিত অধিকারী তির্থকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই আইনের ২৭(১) ধারায় আরও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে উভয় সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে অর্জিত সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব দে জানান, মামলার শুরু থেকেই আসামি পলাতক রয়েছেন। রায় ঘোষণার পর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৬ মার্চ দুদকের সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাস বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিজিত অধিকারীর বিরুদ্ধে ১ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলের অভিযোগ আনা হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে সম্পদের বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৫ মে দুদকের উপপরিচালক নাজমুল হুসাইন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫ হাজার ২৮৪ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ আদালত অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচারকাজ শুরু করেন। বিচার চলাকালে আদালত পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত এ রায় প্রদান করেন।
ঢাকার অভিজাত গুলশান-২ এলাকার ১০৪ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাড়ি। রাজধানীর অন্যতম মূল্যবান এই সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে আসছেন সাবেক জাতীয় ফুটবলার, ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী। তবে প্রায় দুই দশক ধরে মালিকানা পরিবর্তনের নানা প্রক্রিয়া পেরিয়ে আসা বাড়িটি শেষ পর্যন্ত সরকারের সম্পত্তি বলেই ঘোষণা দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে বাড়িটি সরকারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ে আদালত বলেন, গুলশানের সিইএন (ডি)-২৭ নম্বর বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল এবং আইনগতভাবে অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এর সেই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পত্তিটি হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তা বৈধ নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে মালিকানা পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিবর্তন সম্পত্তির আইনগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেনি। ফলে বর্তমানে সম্পত্তিটি সরকারের মালিকানাধীন বলেই গণ্য হবে। মামলার নথি ও আদালতে দাখিল করা অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসা এ বাড়িটি ঘিরে পরবর্তী সময়ে একাধিক ব্যক্তি মালিকানা দাবি করেন। বিভিন্ন দলিল, নামজারি ও মালিকানা হস্তান্তরের নথির মাধ্যমে সম্পত্তির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয়। পরে এসব প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক একটি রিট আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত একটি বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে ভোগদখল করা হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট বাড়ি-সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করেন এবং পরে বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে দুদক অনুসন্ধান চালিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করে। অনুসন্ধানে সম্পত্তিটির মালিকানা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা, সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, নামজারি ও দখল-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। তদন্তে সম্পত্তিটির মালিকানা পরিবর্তনের বিভিন্ন ধাপে অসংগতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুদকের প্রতিবেদনের পর আদালত সম্পত্তিটির চেইন অব টাইটেল বা মালিকানা হস্তান্তরের পূর্ণ ইতিহাস, দখল-সংক্রান্ত নথি এবং অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পক্ষগুলোকে হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দেন। পরে চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত বলেন, সম্পত্তিটি বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরবর্তীতে আবদুস সালাম মুর্শেদীর নামে হস্তান্তর হয়েছে বলে নথিতে প্রতীয়মান হলেও এর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে আইনগত অবস্থান কখনো পরিবর্তিত হয়নি। যথাযথ আদালতের মাধ্যমে অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তিই থাকবে। ফলে পরবর্তী সময়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়া বেআইনি। হাইকোর্ট তিন মাসের মধ্যে সম্পত্তিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির মাধ্যমে সরকারের কাছে বুঝিয়ে দিতে সালাম মুর্শেদীকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্পত্তির দখল বুঝে পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবকে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত অভিযোগে ইতোমধ্যে দুদকের মামলা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এ কারণে তদন্ত অব্যাহত রাখতে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জালিয়াতি বা সহযোগিতার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, সালাম মুর্শেদীর পক্ষে আদালতে দাবি করা হয়, তিনি ১৯৯৭ সালে রাজউকের অনুমতি নিয়ে দুই ভাইয়ের কাছ থেকে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন এবং তখন থেকেই ভোগদখলে আছেন। তার আইনজীবীরা বলেছেন, হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে। তবে আদালতের রায়ের পর গুলশানের বহুল আলোচিত এ সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন মোড় নিল। একদিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত একটি বাড়ির মালিকানা পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে তদন্তে জড়িত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।