দিনদুপুরে এক যুবককে ধাওয়া করছে একদল কিশোর। তাদের হাতে চাপাতিসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র, কয়েকজনের কোমরে ছিল ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র। প্রাণভয়ে ওই যুবক ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি তিনি। কিশোর সন্ত্রাসীরা তাঁকে ধরে প্রকাশ্যেই কুপিয়ে হত্যা করে।
গত শুক্রবার পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকায় ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তথ্য পুলিশের নথিতেও উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাজিয়া মিছিল থেকে ধাওয়া করে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী জাকির হোসেনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ধরনের প্রকাশ্য সহিংসতা এখন প্রায়ই ঘটছে। জনাকীর্ণ সড়ক, বাজার কিংবা মহল্লায় সংঘটিত এসব অপরাধে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন কিশোর গ্যাংয়ের একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করেছে।
র্যাবের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর আগে বিগত সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে সারা দেশে ২৩৭টি কিশোর গ্যাংয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ নতুন তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও ১০২টি গ্যাং।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, নতুন-পুরোনো মিলিয়ে সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে। হালনাগাদ তালিকার ভিত্তিতে অভিযান চলছে এবং ইতোমধ্যে অনেক সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তবে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান নয়, সামাজিকভাবেও এদের নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিতে হবে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, একই পাড়া-মহল্লার বখে যাওয়া কিশোর-তরুণরা দলবদ্ধ হয়ে গ্যাং তৈরি করছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীও এসব দলে জড়িয়ে পড়ছে। বাহারি ও চটকদার নাম ব্যবহার করে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচার করে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি। সাধারণত একটি গ্যাংয়ে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য থাকে। তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত এবং ধারালো অস্ত্র, চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে এবং ধীরে ধীরে ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
মোহাম্মদপুরে স্টার বন্ড, লাড়া দে, গ্রুপ টোয়েন্টি, ফিল্ম ঝিরঝির, দেখে ল, চিনে ল, লেভেল হাই ও কোপাইয়া দের মতো গ্যাংয়ের নাম পাওয়া গেছে। ধানমণ্ডিতে নাইন এমএম, একে ৪৭, ফাইভ স্টার, ইলেভেন স্টার ও সেভেন স্টারসহ একাধিক গ্রুপ সক্রিয়। তেজগাঁওয়ে জুম্মন গ্যাং ও পাংকু গ্যাংয়ের নাম রয়েছে।
উত্তরায় একসময় বিল বস, নাইন স্টার, পাওয়ার বয়েজ, সুজন ফাইটার, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, আলতাফ জিরো, ত্রিগোল, তুফান ও নাইন এমএম গ্রুপের দাপট ছিল। বর্তমানে সেখানে নতুন আরও কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় হওয়ার তথ্য মিলেছে। মিরপুরে বিচ্ছু বাহিনী, রিপন গ্যাং ও সুমন গ্যাংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন নামে নতুন গ্যাং গড়ে উঠছে। পুরান ঢাকায় কোবরা গ্যাং, জুম্মন গ্যাং ও বড় পোলা গ্যাংসহ আরও কয়েকটি গ্রুপের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলায় প্রকাশ্যে সিগারেট খেতে বারণ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে একদল কিশোর ছয়জনকে গুলি করে বলে অভিযোগ ওঠে। গুলিবিদ্ধরা সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর কয়েক দিন আগে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, হামলা ও হত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের অনেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সমাজে নানা ধরনের অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। এদের দমনে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের নেপথ্যে বড় ভাই ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে গ্যাং সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও তাদের পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদাররা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
প্রতিবেদনে এসব গ্যাংয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ও নেপথ্যের শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিশোরদের মধ্যে ‘হিরোইজমের’ চিন্তা-ভাবনা থেকেই গ্যাং কালচারের শুরু হয়।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী থেকেই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক তৎপরতা বেশি ছড়িয়েছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে তৈরি পুলিশের এক প্রতিবেদনে রাজধানীসহ সারা দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে ঢাকায় ছিল ৬৬টি এবং চট্টগ্রামে ৫৭টি।
পুলিশের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনের বিভিন্ন থানা এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে রাজধানীতে সংঘটিত বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাং সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত আছে।
গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মাদকে আসক্ত হয়ে তারা ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতেও জড়িয়ে পড়ছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে সন্তানদের পড়াশোনার পাশাপাশি সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর অ্যাপ ও অনলাইন কনটেন্ট চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণের সুপারিশও করা হয়েছে।
এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরি করে কিশোর গ্যাংয়ের হটস্পট শনাক্ত, নিয়মিত টহল, বিশেষ অভিযান এবং পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ভারতে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তি চেয়ে দেওয়া ফেসবুক পোস্ট ভারতে নিষিদ্ধ (ব্যান) করা হয়েছে। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টুইটারে (বর্তমানে এক্স) একটি ভারতীয় রাজনৈতিক দলের বটরা গালাগাল করছে বলেও অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে করা পোস্টে তিনি এই অভিযোগ তুলেন। পোস্টে তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পাঠানো নোটিশের একটি স্ক্রিনশটও সংযুক্ত করেছেন। আসিফ মাহমুদ তার পোস্টে লিখেছেন, ‘ভারতে আন্দোলনকারীদের মুক্তি চেয়ে দেওয়া একটা পোস্ট ইন্ডিয়াতে ব্যান করা হয়েছে।’ টুইটারে ভারতীয় একটি দলের বটরা (স্বয়ংক্রিয় বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট) তাকে টার্গেট করে আপত্তিকর মন্তব্য করছে জানিয়ে এনসিপি মুখপাত্র যোগ করেন, ‘টুইটারে ভারতীয় একটা দলের বটরা গালাগাল করছে।’ এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ভারতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসিফ মাহমুদ পোস্টে তির্যক মন্তব্য করেন, ‘গণতন্ত্র দেশে দেশে!’ তার শেয়ার করা স্ক্রিনশট থেকে জানা যায়, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ধারা ৭৯(৩)(বি) অনুযায়ী ভারত সরকার বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দেওয়া নোটিশের প্রেক্ষিতে মেটা (ফেসবুক) ওই নির্দিষ্ট পোস্টটির অ্যাক্সেস ভারতের ব্যবহারকারীদের জন্য সীমাবদ্ধ বা জিও-ব্লক করেছে।
প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর আগের এক আদি মানুষের মুখচ্ছবি পুনর্গঠন করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, আধুনিক পোশাক পরিয়ে ওই মানুষকে আজকের মানুষের ভিড়ে দাঁড় করালে প্রথম দেখায় আলাদা করে চেনা কঠিন হতো। ১৯৬০-এর দশকে মরক্কোর জেবেল ইরহুদ এলাকায় একটি জীবাশ্ম খুলি আবিষ্কৃত হয়। প্রথমে এটিকে নিয়ান্ডারথাল মানুষের খুলি মনে করা হলেও ২০১৭ সালে গবেষকেরা নিশ্চিত হন, এটি প্রাচীন হোমো স্যাপিয়েন্সের নিদর্শন। এর বয়স প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর। খুলিটির ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল এবং আফ্রিকার মানুষের শারীরিক গঠনের তথ্য ব্যবহার করে মুখচ্ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, আধুনিক মানুষের সঙ্গে তার চেহারার বেশ মিল থাকলেও ভ্রূরেখা ছিল বেশি দৃঢ় এবং মুখমণ্ডলের গঠনে কিছুটা পার্থক্য ছিল। গবেষণায় ওই মানুষের মস্তিষ্কের আয়তন পাওয়া গেছে প্রায় ১ হাজার ২৩০ ঘন সেন্টিমিটার। আধুনিক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের গড় আয়তন প্রায় ১ হাজার ২৩৪ ঘন সেন্টিমিটার। অর্থাৎ দুই সময়ের মানুষের মস্তিষ্কের আয়তনে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তবে ওই মানুষের ত্বক, চুল ও চোখের রং সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। গবেষকরা সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে মুখচ্ছবিতে কালো চুল ও দাড়ি যুক্ত করেছেন। জেবেল ইরহুদ এলাকায় এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচজন হোমো স্যাপিয়েন্সের ২২টি জীবাশ্ম হাড় পাওয়া গেছে। পাশাপাশি মিলেছে পাথরের হাতিয়ার, আগুন ব্যবহারের প্রমাণ এবং শিকার করা প্রাণীর হাড়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে হেরিটেজ সাময়িকীতে। সূত্র: ইয়াহু
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি শুধু নবায়ন করলেই হবে না, নতুন করে চুক্তি করতে হবে বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, এই চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজসহ বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে সমান অংশীদার করতে হবে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে পলাশী চত্বরে শহীদ আবরার ফাহাদের ৭ম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন অনেকগুলো নদী রয়েছে। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুসারেও এই নদীর ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশে পাওয়ার কথা থাকলেও গত ৫০ বছরেও বাংলাদেশ সেই ন্যায্য হিস্যা পায়নি। ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে গঙ্গার পানি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। সেটা শুধু পানি নিয়ন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশের জনগণকে শোষণ করার একটি পরিকল্পনা, একটি হাতিয়ার। তিনি বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে আমাদের ১৯৭৭ সালে চুক্তি করার কথা ছিল। মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক লংমার্চ করেছিলেন। অবশেষে ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হয়। সেই পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। সেই মেয়াদ শেষ হওয়াকে ঘিরে আমাদের কাছে নতুন প্রশ্ন এসেছে। আবরার ফাহাদ যেটা চেয়েছিলেন, সেটা বাস্তবায়ন করার সময় এখন এসেছে। তিনি আরও বলেন, সরকার, বিরোধী দল এবং ভারত যে ৫ আগস্টের পর থেকে বলে আসছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সম্পর্ক চায়, বাংলাদেশকে তারা প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চায়, সেটা প্রমাণ করতে হবে। ভারত-বাংলাদেশের এই নতুন গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি আবার কীভাবে হচ্ছে, সেটা প্রমাণ করতে হবে। নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের আজকের সময়ের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, এটা শুধু নবায়ন করলেই হবে না। এই পানি বণ্টন চুক্তি নতুন করে স্বাক্ষরিত করতে হবে। শুধু পানি নয়, বরং নদীর যৌথ হিসাবের প্রশ্নে, নদী ব্যবস্থাপনাতেও বাংলাদেশকে অংশীদারিত্ব দিতে হবে। আমাদের দেশের নদী এই গঙ্গা, পদ্মা অথচ আমরা জানি না, এই নদীতে কত পরিমাণ, কত কিউসেক পানি আসলে প্রবাহিত হয়। এই তথ্য পর্যন্ত আমাদের সরবরাহ করা হয় না। তিনি বলেন, যে গ্যারান্টি ক্লজের কথা বাংলাদেশ বলছে, ন্যূনতম প্রবাহ সবসময় নাব্যতা বজায় রাখার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। যদি শুষ্ক মৌসুম আসে, যদি কোনো ঘাটতি হয়, সেই ঘাটতি ভারত-বাংলাদেশ সমানভাবে নিতে হবে। এই গ্যারান্টি ক্লজসহ এই চুক্তি নতুন করে করতে হবে। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আবরার ফাহাদের চেতনাকে আমরা সমুন্নত করতে চাই, তাহলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক সমতার ভিত্তিতে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে পুনঃস্থাপন করতে হবে। ভারত যদি সত্যিকার অর্থেই চায় প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক, তাহলেই শুধু তিস্তাসহ যেসব অভিন্ন নদী রয়েছে, সেসব অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন চুক্তি সমভাবে এবং ন্যায্যভাবে সম্পাদন করতে হবে। তিনি বলেন, আবরার ফাহাদের শাহাদাতকালে আমরা ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান দিয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম, দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তথা যে সার্বভৌমত্ব, সেটি আমরা অক্ষুণ্ন রাখব। বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গকে বুঝতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি-সমৃদ্ধি যতটা দিল্লির ওপর নির্ভরশীল, তার চেয়ে বেশি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা বাংলাদেশের আশপাশের সব অঞ্চলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কোনোভাবে কম্প্রোমাইজ করব না। আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যায় আমরা একবিন্দু পরিমাণ ছাড় দেব না। এ বছর যে গঙ্গা চুক্তি হবে, সেখানে ন্যায্য হিস্যা আমাদের আদায় করতে হবে। পাশাপাশি তিস্তাসহ সব নদীর পানি বণ্টন প্রক্রিয়া, নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ যাতে সমান অংশীদারিত্ব পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা গত দুই বছরেও আবরার ফাহাদের হত্যার বিচারের রায় কার্যকর করতে পারিনি। আমরা ওসমান হাদির বিচারের রায় কার্যকর করতে পারিনি। আমরা জুলাই গণহত্যাকারীদের বিচারের রায় এখনো কার্যকর করতে পারিনি। আমাদের এই তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। এই তালিকা দীর্ঘ হওয়ার আগেই আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের রায় অবিলম্বে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পাদন করে কার্যকর করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা খুনিদের যেই রায় হয়েছে, ফাঁসির দণ্ড, সেই রায় আমরা অবিলম্বে কার্যকর দেখতে চাই। বাংলাদেশ যদি সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে, আমরা মনে করি, তাহলে আবরার ফাহাদের আত্মা শান্তি পাবে। বাংলাদেশের জনগণ যে সার্বভৌমত্ব এবং মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লড়াই করেছিল, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা আট স্তম্ভ এই পলাশীর মোড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, আমাদের গণতন্ত্র, প্রতিরক্ষা, সার্বভৌমত্ব, আমাদের জাতীয় সম্পদ, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষার জন্য, সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব এখন আমাদের, আপনাদের সবার। সরকারের উদ্দেশ্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারকে বলব, আমরা এখানে আগ্রাসন বিরোধী আট স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, যা কেবল ভারতবিরোধিতা নয়, বরং যেকোনো আগ্রাসী শক্তির বিরোধিতা করে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার, মর্যাদা এবং স্বার্থ সুরক্ষা করা। তিনি বলেন, শুধু বোয়িং বিমান কিনলেই চলবে না। আমরা দেখতে চাই, সরকার এই পানি, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন বা নতুন চুক্তি কীভাবে সম্পাদন করে, বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা আদায় করতে পারে। আমরা সেটা দেখতে চাই। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিলেও আমরা দেখছি, বাংলাদেশের স্বার্থ সরকার কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারছে না। সরকার চীন যাচ্ছে, জাতিসংঘে যাচ্ছে, সব জায়গায় গিয়ে শুধু বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলছে, বৈঠকের কথা শুনছি। কিন্তু বাংলাদেশ গত সাত মাসে কী অর্জন করতে পেরেছে, এটা বাংলাদেশের জনগণের কাছে পরিষ্কার নয়। তিনি বলেন, অবিলম্বে বাংলাদেশের জনগণের সামনে এটা পরিষ্কার করতে হবে। এই গঙ্গা চুক্তিসহ যত আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে, সেগুলো সংসদে আলোচনা করতে হবে। জনগণের স্বার্থ সুরক্ষার কথাটি মাথায় রেখেই আমরা সেই চুক্তির পক্ষ বা বিপক্ষ নেব।