সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠকে সরকার পরিচালনা, শরিকদের সঙ্গে সমন্বয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার পরিচালনায় শরিকদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোটকে আরও সুসংহত করতেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। নির্বাচনের আগে বিএনপি ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারে মাত্র তিনটি শরিক দলের তিনজন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করায় কয়েকটি দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটেও বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া আন্দালিভ রহমান পার্থ, সাইফুল হক, রফিকুল ইসলাম বাবলু, শাহাদাত হোসেন সেলিম, ফরিদুজ্জামান ফরহাদসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অংশ নেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) বৈঠকে অংশ নেয়নি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দলটি কৌশলগত কারণে অংশ নেয়নি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েই যাইনি। তবে কেন যাইনি, সে বিষয়ে আমরা বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে একটি চিঠি দিয়েছি।’
জানা গেছে, চিঠিতে জেএসডি বলেছে, জুলাই সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ দলের নীতিগত অবস্থান ও জনগণের প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই জেএসডি এই মুহূর্তে প্রস্তাবিত বৈঠকে অংশ নিচ্ছে না। তবে রাষ্ট্র বা সরকারের উদ্যোগে সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণে জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হলে জেএসডি তাতে গঠনমূলকভাবে অংশগ্রহণ করবে।
নির্বাচনের পর শরিকদের অবস্থান
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শরিক দলগুলোর জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দেয়। এর মধ্যে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া পাঁচটি দলের জন্য ছিল আটটি আসন। নির্বাচনে জয়ী হন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক। পরে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক ও ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আন্দালিভ রহমান পার্থকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়।
এ ছাড়া কয়েকটি শরিক দলের নেতা নিজ নিজ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। তাঁদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খাঁনকে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর এ বৈঠকে ধর্মভিত্তিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও জমিয়ত যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত ছিল না। পরে বিএনপির সঙ্গে তাদের নির্বাচনী সমঝোতা হয়। কিন্তু দলটি বৈঠকে অংশ নেয়নি। গত জাতীয় নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে সর্বোচ্চ চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। তবে দলটির সভাপতি-মহাসচিবসহ কোনো প্রার্থীই জয়ী হননি। এই চার আসনের একটিতে খেলাফত মজলিস, একটিতে বিএনপির বিদ্রোহী, একটিতে জামায়াতে ইসলামী ও একটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জয়ী হন।
নির্বাচনের পর থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে কওমি মাদ্রাসা ও জামায়াত ধারার আলেমদের মধ্যে নানা বিষয়ে বিতর্ক চলছে। তাঁদের মধ্যে জমিয়তের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক জামায়াতের আদর্শিক ও রাজনৈতিক ধারার সমালোচনা করছেন।
জানা গেছে, বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের জানিয়েই জমিয়ত প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকে কৌশলগত কারণে বিরত থেকেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দাওয়াত পেয়েছি। কিন্তু আমরা এটাতে (বৈঠকে) যাব না, এটা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। কারণটা আমরা আপাতত বলছি না।’
যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির অন্যতম শরিক জোটের একটি হচ্ছে গণতন্ত্র মঞ্চ। সে জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, তাঁর দল নাগরিক ঐক্য। বিএনপি তাঁকে প্রার্থী করেনি। এ নিয়ে নির্বাচনের আগমুহূর্তে কিছুটা তিক্ততাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে কোনো পক্ষই বিষয়টি নিয়ে এগোয়নি। তবে মাহমুদুর রহমান মান্না গতকালের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বৈঠকে দ্বিমত, হাস্যরস
বৈঠকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আলোচনায় একজন শরিক নেতা বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বৈঠকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণপত্র মুখ্য সচিবের কার্যালয় থেকে পাঠানো হলেও পরে গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত রাজনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।
আলোচনায় সরকার গঠনের পর বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কয়েকজন নেতা বলেন, সরকারে আসার পর বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে গত পাঁচ মাসে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি সমালোচনার মুখে পড়েছে বলেও মত দেন তাঁরা।
বৈঠকে শরিকদের মধ্যে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা হয়। একজন নেতা বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচন, স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল না। এতে বিএনপি ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। এতে শরিকদের মধ্যে দূরত্ব ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বৈঠকের শেষ দিকে পরিবেশ কিছুটা হালকা করতে একজন নেতা রসিকতার সুরে প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই নৈশভোজ কি ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’? জবাবে প্রধানমন্ত্রী হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, ‘না, এটি ওয়েলকাম ডিনার।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার জনগণের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তিনি কৃষিঋণ, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় নেতা ও খেলোয়াড়দের ভাতা, খাল পুনঃখননসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকার একটি ‘ধ্বংসস্তূপ’ থেকে কাজ শুরু করেছে এবং ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আরও নিয়মিত মতবিনিময় এবং আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
মির্জা ফখরুলের প্রতিক্রিয়া
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর এ বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তিনি জানান, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের আন্দোলন, কারাবরণ, মামলা, গুম ও হত্যার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে বৈঠকে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। শরিক দলগুলোর নেতারা সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান আইনে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নৈশভোজে অংশ নেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের মাঠ এবং ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় এসব বিস্ফোরণ ঘটে। সিনেট ভবন গেটে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে সিনেট ভবনের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এর পরপরই অল্প সময়ের ব্যবধানে মুহসীন হলের মাঠের দিক থেকে দ্বিতীয় ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর মাত্র এক থেকে দুই মিনিট পর টিএসসি এলাকায় আরো একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রথম ককটেল বিস্ফোরণের সময় এই প্রতিবেদক সিনেট ভবন এলাকায় উপস্থিত ছিলেন এবং তিনিও বিকট শব্দ শুনতে পান। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কারা এসব ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, সে বিষয়েও প্রাথমিকভাবে কিছু জানা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত মাসের শেষ সপ্তাহে টোকিও সফরে গিয়েছিলেন, সেখানে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন করে উঠে এসেছে জাপানের বিগ-বি প্রকল্প। সফরে জাপান এবং বাংলাদেশের ফ্ল্যাগশিপ এই প্রকল্প নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে। যেটাকে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে ‘বিগ-বি ফর শেয়ারড প্রসপ্যারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি উদ্যোগ। কিন্তু এই বিগ-বিকে ঘিরে দুটো বিষয় নিয়ে বিশেষ আলোচনা হচ্ছে। একটি হচ্ছে, যৌথ ঘোষণায় কানেক্টিভিটির প্রসঙ্গ। আরেকটি হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের উল্লেখ এবং এর গুরুত্ব স্বীকার করে নেওয়া। বিশেষত কানেক্টিভিটির নামে ভারতকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। দেশটির প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ঢাকায় এক জনসভায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও সরকার জানাচ্ছে, এ ধরনের কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু বিগ-বি উদ্যোগকে ঘিরে বাংলাদেশের মাতারবাড়িতে আসলে কী হচ্ছে? বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনা থেকে যেভাবে গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ি হচ্ছে বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী কক্সবাজার জেলার একটি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে বাংলাদেশ-জাপান প্রথমে একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল। সেটাও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আমলে। সেই সময় চুক্তি হওয়ার পর এর কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। সরাসরি সমুদ্রের তীরে না করে সমুদ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার ভেতরে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজ শুরু হয়। যেহেতু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লাভিত্তিক ফলে কেন্দ্রে কয়লা আনা-নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয় নৌ-চ্যানেল। সমুদ্রের তীর থেকে মাটি কেটে সার্বক্ষণিক কয়লা পরিবহনের জন্য ২৫০ মিটার চওড়া এবং ১৪ কিলোমিটার লম্বা চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু হয়। তবে ২০১৭ সালে জাইকা যে প্রাক-সমীক্ষা করে, সেখানে নতুন আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে আসে সংস্থাটি। ঐ সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চ্যানেলের সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে চ্যানেলের দক্ষিণ দিকে বাণিজ্যিক বন্দর স্থাপন করা সম্ভব। প্রস্তাব করা হয়, যেই চ্যানেলটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে সেই চ্যানেলের ওপরই একটি বাণিজ্যিক বন্দর হতে পারে। একই চ্যানেল ব্যবহার করে দুটি প্রকল্পের কার্যক্রম করা হলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার যেমন হবে, তেমনই ব্যয় সাশ্রয়ী হবে। পরবতীকালে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলাদেশ। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র শেষপর্যন্ত গিয়ে ঠেকে গভীর সমুদ্র বন্দরে। চ্যানেলের গভীরতা এবং প্রশস্ততাও বাড়ানো হয়। আর এখন সেই গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ও রফতানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ। এখন মাতারবাড়িতে বিগ-বি’র আওতায় কী হচ্ছে? ‘বিগ-বি’র পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ।’ এটি বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে ঘিরে জাপানের একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা। জাপান মাতারবাড়ীতে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এ কারণে গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও পণ্য সরবরাহের জন্য সেখানকার সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে দেশটি। এর আওতায় সেখানে ইতোমধ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়েছে। আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রও স্থাপন হচ্ছে। এরপর হবে এলএনজি টার্মিনাল, হবে গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল। বিগ বি নিয়ে জাপান-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণায় মূলত চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঐ অঞ্চলে কানেক্টিভিটি তৈরি করা, যার মূল ভিত্তি হবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, যার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ছয় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জাপানি বিনিয়োগ আসবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পাবে বাংলাদেশ। জানতে চাইলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, তারা মূলত বাংলাদেশকে একটি রফতানি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তিনি বলেন, ‘মাতার বাড়িতে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে গভীর সমুদ্র বন্দর এবং তাকে কেন্দ্র করে জ্বালানি, লজিস্টিকস, তারপরে অর্থনৈতিক এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। এখানে আমরা কিন্তু পরিকল্পিত নগরও গড়ছি, যাতে করে এটা একটা গ্লোবাল রফতানির কেন্দ্র হতে পারে। আমরা চেষ্টা করব সেটাকে পূর্ব এশিয়ার দেশ হোক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হোক, ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে কিংবা আফ্রিকা -সব জায়গায় এটাকে নিয়ে যেতে।’ ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক রফতানির কেন্দ্র হওয়ার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, শিল্পকলকারখানা, সমুদ্রবন্দর এবং যোগাযোগব্যবস্থাসহ যা যা অবকাঠামো দরকার, তার সবই করা হচ্ছে মাতারবাড়িতে। এর জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ দরকার, সেটাও দেবে মূলত জাপান। কিন্তু এর ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, জাপানের আগ্রহ বিশেষত মাতারবাড়িকে ঘিরে যে বিপুল বিনিয়োগ, তাতে বাংলাদেশ শেষপর্যন্ত কতটা লাভববান হবে? বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই প্রকল্পে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে বাংলাদেশের। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন ‘বলা হচ্ছে যে এখানে প্রায় ষাট থেকে পঁয়ষট্টি বিলিয়ন ডলারের একটা বিনিয়োগ হবে এবং এই বিনিয়োগের মধ্যে আটচল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারই বেসরকারি বিনিয়োগ হবে। যেই বিনিয়োগগুলো মূলত জাপানিজ বিনিয়োগকারীরা নিয়ে আসবে’। তার মতে, জাপানি বিনিয়োগের পথ ধরেই উন্নতি হবে অর্থনীতিতে। তিনি বলেন, ‘জাপানের মত বড় বিনিয়োগকারীরা যদি তাদের বিনিয়োগ নিয়ে আসেন তাহলে একই সাথে তো শুধু তার পণ্য আসবে না। এখানে একই সাথে তাদের একটা প্রযুক্তিও আসবে। তখন সেটা আমাদের লোকাল বিনিনিয়োগকেও আরো বেশি উৎসাহিত করবে জয়েন্ট ভেঞ্চারে যাওয়ার। কারণ এগুলোর সঙ্গে যে সাপ্লাই চেইনগুলো গড়ে উঠবে, সেই সাপ্লাই চেইনগুলো তখন এখানে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। বলা হচ্ছে, এর ফলে প্রায় আটাশ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে সেই জায়গা জুড়ে। এটা ঘটবে কয়েক দশক ধরে।’ ভারত নিয়ে সংশয় কেন? বাংলাদেশে মাতারবাড়ি প্রকল্পের চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৪ সালে। চুক্তিটি হয়েছিলো জাপানের সঙ্গে। তখন প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে মিলিয়ে একটি বৃহৎ বাজারের ধারণাকে মাথায় রেখে এই পরিকল্পনা সামনে নিয়ে এসেছিল জাপান। ২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দেশটির তখনকার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ‘বিগ-বি’ ধারণাটি প্রথমে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। শিনজো আবে বিগ-বি ধারণাটি সামনে আনার পর ২০১৪ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে এই ধারণাটির আনুষ্ঠানিক একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তখনকার জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকা’র প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা। তিনি বলেছিলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়টি এই ধারণার মূল ভিত্তি। আর এর দ্বিতীয় ভিত্তি হবে জ্বালানি এবং তৃতীয়টি হলো পরিবহন ব্যবস্থা। অর্থাৎ গভীর সমুদ্র বন্দরটির মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যের একটি বৈশ্বিক হাব হবে মাতারবাড়ী এবং সেখানকার বিদ্যুৎ দিয়েই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। আর পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত। পরে শেখ হাসিনা ঢাকায় মাতারবাড়ীকে নিয়ে বিস্তৃত পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বিশেষ পরিকল্পনা হিসেবেও গৃহীত হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই শিল্পাঞ্চলের প্রস্তাব উঠে আসে। অর্থাৎ বিগ-বি উদ্যোগ এবং একে ঘিরে মাতারবাড়ি প্রকল্পে সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ছিলো ভারত। কিন্তু এখন ২০২৬ সালে যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি, তখন বিগ-বি উদ্যোগ নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত হয়েছে জাপান-বাংলাদেশ দুই দেশই। অর্থাৎ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা আরো জোরদার হয়েছে। যদিও তারেক রহমানের জাপান সফরে যে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিগ-বি নিয়ে সরাসরি ভারত বা অন্য কোন দেশের নাম উল্লেখ নেই। কিন্তু ঘোষণায় কানেক্টিভিটি প্রসঙ্গ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে মাতারবাড়িকে গড়ে তোলার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটাতেই স্পষ্ট এই প্রকল্প শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। এবং এখানে প্রতিবেশি দেশগুলো বিশেষত ভারত প্রাসঙ্গিক। ফলে এই প্রকল্পে কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ভারতকে সুবিধা দেওয়া হবে, এমন সন্দেহ করছেন কেউ কেউ। আর এই সন্দেহ দেখা যাচ্ছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, যেখানে ভারত সবসময়ই একটি স্পর্শকারতর ইস্যু। গত ৩১শে অক্টোবর ঢাকায় এক সমাবেশে ভারতের নাম উল্লেখ না করেই মাতারবাড়ি প্রকল্পে কৌশলে ভারতকে কানেক্টিভিটি দেয়া হচ্ছে কিনা- সেই প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে। মাতারবাড়ি গভীর বন্দর নিয়ে কোনো লোকচুরি হচ্ছে কিনা, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারো কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না বলে হুশিয়ারি দেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মাতারবাড়িতে কানেক্টিভিটি নিয়ে জামায়াতের যে উদ্বেগ, সেটা ঠিক কী কারণে? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে দলটির পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জাপানের সঙ্গে যৌথ ঘোষণা বা যেসব অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে, সেগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে তারা পরে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করবেন। তবে বিস্তারিত না জানলেও জামায়াতসহ কোনো কোনো রাজনৈতিক দল যে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট তাদের উদ্বেগ মূলত এই প্রকল্পে ভারতের সম্পৃক্ততা বিশেষকরে এর মাধ্যমে ভারত করিডোর বা ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা পাচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে। জানতে চাইলে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, বিগ-বি’র অর্থনৈতিক মডেল চমৎকার। তবে এখানে ভারতের মতো দেশকেও যদি সুবিধা দিতে হয়, তাহলে সেটা করার আগে বাংলাদেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য লাগবে। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে বলা হচ্ছে ইন্ডিয়ার সাথে কানেক্টিভিটি করে আমরা একটা একত্রিত বা একিভূত মার্কেট তৈরি করতে পারি কিনা। এই অর্থনৈতিক চিন্তা ভালো চিন্তা। কিন্তু এই চিন্তার আগে যে রাজনৈতিক যে ঐকমত্য লাগে, সেই রাজনৈতিক ঐকমত্য হয় নাই। আমি মনে করি আগে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি রাজনৈতিক ঐকমত্য হয় তাহলে আমরা অর্থনৈতিক একীভূতকরণের দিকে যেতে পারি। আর যদি আমরা রাজনৈতিক সমঝোতা না করি, তাহলে আমি মনে করি আমরা বিরাট সমস্যার মধ্যে পড়বো এবং এটা তখন বাস্তবায়ন হবে না।’ ভূ-রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন কিন্তু সমস্যা শুধু ভারতকে নিয়ে নয়। একইসঙ্গে চীন এই বিগ-বি প্রকল্পকে কীভাবে দেখবে, সেই প্রসঙ্গও উঠছে। কারণ বিগ-বির দ্বৈত ঘোষণায় জাপান বলেছে মুক্ত, স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা। এই ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্যোগ। যেটাকে চীন দেখে থাকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাকে ঘিরে ফেলার মার্কিন চেষ্টা হিসেবে। জাপান হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, জাপান বিগ-বি ধারণায় ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ধাপে ধাপে আঞ্চলিক আরও দেশগুলোর সাথে বিগ-বির বিষয়টি সামনে আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘এখানে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় আছে। কারণ জাপান পুরো অঞ্চলকে ঘিরেই কাজ করছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলটিকে বড় শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে রেখে জাপানি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা।’ এছাড়া বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতে জাপান দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এমন ধারণাও আছে। ফলে এমন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, বাংলাদেশকে মূল ফোকাস দিতে হবে অর্থনীতিতে। তিনি বলেন, ‘পার্টিকুলারলি আমাদের জন্য চাইনিজ বিনিয়োগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একইসঙ্গে কৌশলগতভাবে চায়নার সম্পর্কটাও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক একইভাবে আমরা আঞ্চলিক পার্টনার হিসেবে ভারতের সঙ্গে যে একটা বড় বাজার রয়েছে সেটিকেও গুরুত্বের সাথে দেখার দরকার আছে। সুতরাং এই জায়গাটিতে দুটো সম্পর্ককে পাশাপাশি রেখে কোন জোটেই খুব বড়ভাবে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত না হয়ে কীভাবে বাংলাদেশ তার ইকোনমিক মাইলেজ (অর্থনৈতিক সুবিধা) নিতে পারে সেরকম কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন’। একইরকম মত দেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে জাপানের সাথেও থাকতে হবে। আমেরিকার সাথেও থাকতে হবে। একই সঙ্গে চায়নার সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এটা বলা যতটা সহজ করা ততটা সহজ না। কিন্তু আমার মনে হয় এইটাই হচ্ছে পথ।’ কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে কী করবে? জানতে চাইলে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন ভারসাম্যের কথা। তিনি বলেন, ‘সকল দেশের সাথেই আমরা বিনিয়োগে উৎসাহী এবং সেভাবেই কিন্তু সব হচ্ছে। যেমন ইতিমধ্যেই চীন থেকে চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দরে অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ হচ্ছে। একই সঙ্গে যদি আমরা চট্টগ্রামের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখব সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ আছে, ঠিক একই সাথে ইউরোপের দেশও আছে।’ মাতারবাড়ি সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে বলে যোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এটা সকলের জন্যেই কিন্তু অবারিত যে আমাদের সাথে তারা প্রস্তাব দিতে পারে এবং প্রস্তাবের যৌক্তিক ভিত্তি বিবেচনা করে, বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে তারপর তাদের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা হবে।’
দিনের বেলায় রোদের প্রখরতা এখনো সেভাবে কমেনি। তবে মাঝরাতে ফ্যানের গতি কমিয়ে আনা কিংবা শেষরাতে গায়ে জড়িয়ে নেওয়া কাঁথা জানান দিচ্ছে, শীত কড়া নাড়ছে দুয়ারে। কংক্রিটের শহরে শীতের পদধ্বনি কিছুটা ধীর হলেও উত্তরের গ্রামগুলোতে বইতে শুরু করেছে হিমেল হাওয়া। সেখানকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর নদীতীর এরই মধ্যে ঢাকতে শুরু করেছে ভোরের স্নিগ্ধ কুয়াশায়। প্রকৃতির এই শান্ত পালাবদলের মাঝেই শীত নিয়ে বড় বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। জানানো হয়েছে, আগামী ৩ মাসে দেশের ওপর দিয়ে ৪ থেকে ৬টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। চলতি নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শীত মৌসুমে দেশে কয়েক দফা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে কুয়াশা, লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছে। অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ৪ থেকে ৬টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩টি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মাঝারি এবং ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নামলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রির নিচে নেমে এলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। শৈত্যপ্রবাহ কখন ও কোথায় বেশি হতে পারে, জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বাসসকে বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর মাসে এক থেকে দুটি মৃদু ধরনের শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে, অর্থাৎ রাজশাহী, রংপুর এবং খুলনা বিভাগের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসতে পারে। সেই সব জায়গায় মৃদু ধরনের শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। তবে জানুয়ারিতে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় কখনো কখনো একটি বা দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে, যেখানে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকবে বলে জানান তিনি। তিন মাসের এই সময়ে শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও এবং নদ-নদীর অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। দেশের অন্যান্য এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঘন কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে আসতে পারে। এতে শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে এ সময়ে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, যেহেতু এল নিনো সক্রিয় এবং পৃথিবী উষ্ণ হয়ে আছে, ফলে এর ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। শুধু তাই নয় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এর প্রভাব থাকবে। ফলে গড় তাপমাত্রা একটু বেশি থাকবে। এজন্য আমরা বলছি, এবার শীতকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি থাকবে। তবে কখনো কখনো তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে এসে শৈত্যপ্রবাহ থাকবে। তিনি বলেন, শৈত্যপ্রবাহ থাকবে, কিন্তু অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের দিনক্ষণ, সংখ্যা ও ব্যাপ্তি অনেকটাই কম থাকবে। এজন্য আমরা বলছি, এবারের শীতকাল কিছুটা ‘উষ্ণ’ থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকার কারণে শৈত্যপ্রবাহ কয়দিন থাকবে, কয়বার হবে, এসব বিষয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেই কারণে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তবে এবার সার্বিকভাবে কিছুটা উষ্ণ শীতকাল পাবো বলে আমরা আশা করছি। শীতের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে পূর্বাভাসে। এতে বলা হয়, আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে ২ থেকে ৪টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে এক থেকে দুটি লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। এ বিষয়ে ড. আবুল কালাম মল্লিক বাসস’কে বলেন, আমাদের দেশে অক্টোবর ও নভেম্বর মাস ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। প্রতিবছরই এ সময়টাতে লঘুচাপ তৈরি হয়। কখনো কখনো এটি শক্তি অর্জন করে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। তিনি বলেন, এ সময় সূর্যের দক্ষিণায়ন থাকে। ক্রমশ দিনের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে, রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ে এবং বঙ্গোপসাগর বরাবর সূর্যের আলোর প্রাপ্যতা বেশি থাকে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ে। তিনি আরও বলেন, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সব বছর ঘটে না, মাঝে মাঝে ঘটে। এজন্য একে বলা হয় ট্রানজিয়েন্ট (ক্ষণস্থায়ী) সিস্টেম। বৃষ্টিপাতের বিষয়ে বলা হয়েছে, এই তিন মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভাগভিত্তিক পূর্বাভাসে দেখা যায়, নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার। বরিশাল বিভাগে ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ১৫ থেকে ২৫ মিলিমিটার, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং রংপুর বিভাগে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বৃষ্টি আরও কমে আসবে। ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগে ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার এবং সিলেট বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। জানুয়ারিতে খুলনা বিভাগে ১০ থেকে ১৪ মিলিমিটার এবং ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগে ৬ থেকে ১০ মিলিমিটারের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়া বিন্যাস, জলবায়ু মডেল এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের মডেল পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। এল নিনো ও লা নিনা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস কীভাবে তৈরি হয়, তা ব্যাখ্যা করে ড. মল্লিক বলেন, ১৯৪৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে কতটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়, তার তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, এ সময় গড়ে এক থেকে তিনটি লঘুচাপ থাকে। এর কোনো কোনোটি কখনো কখনো শক্তি সঞ্চয় করে। দীর্ঘ সময়ের এমন গড় চিত্রের ভিত্তিতেই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তবে এ ধরনের পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তার মাত্রা অনেক বেশি থাকে বলে মনে করিয়ে দেন এই আবহাওয়াবিদ। তাই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের পাশাপাশি নিয়মিত দৈনন্দিন পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এদিকে, গত অক্টোবর মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৮ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। অক্টোবরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় সিলেটে ৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৭ অক্টোবর। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২৭ অক্টোবর। গত মাসে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে ১.৮, ০.৪ ও ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।