ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় এর প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় দেশ কুয়েতেও। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করছেন।
চলমান পরিস্থিতিতে গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রতিরোধ এবং প্রবাসীদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে কুয়েতে কর্মরত সংবাদকর্মী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভা করেছেন কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন।
রোববার স্থানীয় সময় দুপুরে অনলাইনে অনুষ্ঠিত এই জুম সভায় কুয়েতে বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের নেতা, বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। বৈঠকে প্রবাসীদের ফ্লাইট সমস্যা, ভিসা জটিলতা, পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়সহ চলমান পরিস্থিতিতে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানান এবং সবাইকে নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা হামলা সংক্রান্ত কোনো ছবি, ভিডিও বা লাইভ সম্প্রচার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার জন্য প্রবাসীদের প্রতি অনুরোধ জানান। জরুরি প্রয়োজনে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত আরও জানান, বর্তমানে দেশে অবস্থানরত এবং কুয়েতে ফিরতে না পারা প্রবাসীদের ছুটি, ভিসার মেয়াদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কুয়েত সরকারের সঙ্গে দূতাবাস নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
এ সময় উপস্থিত সংবাদকর্মীরা চলমান পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহে দূতাবাসের সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেন। তারা বলেন, কুয়েতে বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সদস্যরা নিয়মিত জাতীয় গণমাধ্যমে প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট খবর ও সর্বশেষ পরিস্থিতির আপডেট তুলে ধরছেন, যাতে প্রবাসীরা সচেতন ও অবগত থাকতে পারেন।
জুম সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন দূতাবাসের কাউন্সিলর ও দূতালয় প্রধান মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামানসহ অন্যান্য সংবাদকর্মী ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন।
সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান।
পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে।
পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে।
রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন।
এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন।
এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন।
গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন।
এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে।
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে।
গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না।
এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।
সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান।
হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা।
তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে।
সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ।
এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।
মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা ও নিখোঁজের ঘটনায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন প্রসিকিউটররা। নিহত জামিল আহমেদ লিমন (২৭) এবং নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টি (২৭) ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) শিক্ষার্থী ছিলেন।
এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়াহর (২৬) বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
স্থানীয় সময় শনিবার (২৫ এপ্রিল) হিলসবরো কাউন্টি আদালতে উপস্থাপিত নথিতে ঘটনাটির বিস্তারিত টাইমলাইন তুলে ধরা হয়। রোববার (২৬ এপ্রিল) প্রকাশিত এসব নথিতে বলা হয়, জামিল লিমনকে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতে হত্যা করা হয়েছে।
প্রসিকিউটররা জানান, অপরাধের নৃশংসতা বিবেচনায় অভিযুক্তকে জামিন না দিয়ে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়, আসামি সমাজের জন্য হুমকি এবং কোনো শর্তেই তার জামিন দেওয়া উচিত নয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের মরদেহ হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, নাহিদা বৃষ্টিকেও একই এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানায়, ব্রিজটির দক্ষিণের জলাধার থেকে মানবদেহের কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে তা এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তকারীরা লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে বিপুল পরিমাণ রক্তের উপস্থিতির ভিত্তিতে ধারণা করছেন, বৃষ্টিও নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে তার পরিবারকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে।
ফরেনসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিমনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত ছিল। তার পিঠের নিচে গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে, যা লিভার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তদন্তে জানা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল সর্বশেষ লিমন ও বৃষ্টিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশে দেখা যায়। পরদিন থেকেই তারা নিখোঁজ ছিলেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত আবুঘারবিয়াহ দাবি করেন, তিনি ওইদিন লিমন ও বৃষ্টিকে দেখেননি। তবে তদন্তে ক্লিয়ারওয়াটার বিচ এলাকায় তার গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করা হয়, যেখানে লিমনের মোবাইল ফোনের লোকেশনও পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, লিমন তাকে অনুরোধ করেছিলেন তাকে ও তার প্রেমিকাকে ক্লিয়ারওয়াটারে পৌঁছে দিতে।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় গোয়েন্দারা লক্ষ্য করেন, অভিযুক্তের বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ ছিল। তিনি দাবি করেন, পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে আঙুল কেটেছেন। এছাড়া উদ্ধার হওয়া একটি রসিদে দেখা যায়, ১৬ এপ্রিল তিনি ময়লার ব্যাগ, জীবাণুনাশক ওয়াইপস এবং এয়ার ফ্রেশনার কিনেছিলেন।
এর আগে শুক্রবার সকালে পৃথক একটি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে আবুঘারবিয়াহকে গ্রেপ্তার করা হয়। হিলসবরো কাউন্টির শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, মৃতদেহ সরানো, মৃত্যু গোপন এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার তার প্রাক-বিচার আটক শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে তার পক্ষে হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিস থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন এবং নাহিদা বৃষ্টির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহকে ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ শিক্ষার্থী জামিল লিমনের মরদেহ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অপর শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তবে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিপুল রক্তের আলামতের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা আশঙ্কা করছেন, তিনিও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে থাকতে পারেন।
এই ঘটনায় লিমন ও বৃষ্টির রুমমেট ২৬ বছর বয়সী হিশামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ব্যাটারি (শারীরিক হামলা), জোরপূর্বক আটকে রাখা, প্রমাণ নষ্ট করা, মৃত্যুর খবর গোপন রাখা এবং মৃতদেহ সরানোর মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, হিসাম আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। ২০২৩ সালে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার সহিংসতার অভিযোগ ওঠে এবং তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে সেসব মামলা খারিজ হয়ে যায়। এমনকি তার আপন বড় ভাই আদালতে অভিযোগ করেছিলেন যে, হিসাম তাকে ও তাদের মাকে আক্রমণ করেছিলেন। এ ঘটনায় আদালত একসময় তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিল, যাতে হিসাম পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা বা তাদের বাসা-বাড়ি যেতে না পারে।
গ্রেপ্তারের সময়ও নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হিশাম নিজেকে একটি বাড়ির ভেতরে আটকে রাখে, ফলে তাকে বের করে আনতে সোয়াট টিম ও আলোচক দল মোতায়েন করতে হয়। পরে তিনি আত্মসমর্পণ করে।
নিহত জামিল লিমন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের একজন গবেষক। তিনি পরিবেশ ও ভূগোল নিয়ে গবেষণা করছিলেন এবং ভবিষ্যতে দেশে ফিরে শিক্ষকতা করার স্বপ্ন দেখতেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নাহিদা বৃষ্টিকে বিয়ে করার কথাও ভাবছিলেন।
এদিকে, এই মর্মান্তিক ঘটনায় বাংলাদেশ ও প্রবাসী কমিউনিটিতে গভীর শোক নেমে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও শিক্ষার্থীদের পরিবারকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখনো চলছে, এবং নাহিদা বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার শাহেদ হোসেন দুই বছর আগে কাতার গিয়েছিলেন, নিজের চেষ্টায় কাজও পেয়েছেন দোহার একটি রেস্তোরাঁয়। কিন্তু, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তার প্রবাসজীবন এলোমেলো করে দিয়েছে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছিলেন, এখানের অবস্থা মোটেই ভালো না৷ রেস্টুরেন্টে পর্যটক নেই বললেই চলে। ড্রোন আর মিসাইল হামলা শুরুর পর বিপুল সংখ্যক পর্যটক কাতার ছেড়ে চলে গেছেন। যে রেস্টুরেন্টে কাজ করি, এখানে যেসব ফাস্টফুড তৈরি হয় সেগুলোর উপকরণের সরবরাহেও টান পড়েছে।
সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় হতাশা প্রকাশ করে শাহেদ বলেন, সব খাবারের দাম বেড়ে গেছে। আগে যে পেঁয়াজ কিনতেন ১-২ রিয়াল কেজিতে, সেটা দুই তিনগুণ বেড়ে ৫-৬ রিয়াল হয়ে গেছে। একইভাবে ১ রিয়াল কেজি দরের আলু হয়ে গেছে ৪ থেকে ৫ রিয়াল। তেল কিনতেন লিটার ৯-১০ রিয়াল করে, সেই তেল কিনতে হচ্ছে ১৭ থেকে ১৮ রিয়াল দিয়ে।
তিনি বলেন, কিছু কম দামে পাওয়ার আশায় আমরা বেশকিছু সুপারমার্কেটে ঘুরে-ঘুরে কিনি। কিন্তু সব সুপারমার্কেটে একই দাম। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়ে গেছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে প্রবাসীরা যে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন, তা তুলে ধরে শাহেদ বলেন, “এখানে আমাদের যে স্বাভাবিক জীবন ছিল, যুদ্ধ শুরুর পর তা পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে। কাজ নেই। আমরাও শঙ্কায় আছি।
বেতন চাইতে পারি না, কারণ আমরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছি মালিকের বিক্রি কমে গেছে। শত-শত বাংলাদেশি প্রবাসী এক ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন এখানে।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি এলাকার নাসির উদ্দীন থাকেন কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতে, কাজ করেন সেখানকার একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানায়।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এতদিন যা-ই কাজকাম ছিল, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একদম কাজ নেই। এখানে একদিনও মিসাইল আক্রমণ বন্ধ ছিল না। অবিরাম মিসাইল, ড্রোন হামলা হয়েছে।
আমার সামনে ইকামা করতে হবে, নাহলে অবৈধ হয়ে যাব। ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মতো লাগবে। সব মিলিয়ে মারাত্মক মানসিক টেনশনে আছি।
নাসির বলছিলেন, যুদ্ধবিরতির পর এই কয়েকদিন হামলা না হলেও তাদের মনে ভয় আর আতঙ্ক। অনেক লোক সেখানে কাজবিহীন অবস্থায় আছে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যও বেড়ে গেছে। তবে যুদ্ধবিরতির পর ধীরে-ধীরে কিছু জিনিসের দাম কমছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা কুমিল্লার চান্দিনার একজন কাজ করেন দুবাইয়ের একটি পাঁচ-তারকা হোটেলে। কোম্পানির কড়াকড়ির কারণে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না।
এই প্রবাসী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সার্বক্ষণিক একটা ভয় ঢুকে গেছে মনে। যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ড্রোন, মিসাইল হামলা হয়েছে। হামলার আগে এখানে ফোনে সতর্কতামূলক বার্তা পাঠায়। এখন খালি মনে হচ্ছে, একটু পরেই বুঝি হামলা হবে। রীতিমতো ‘ট্রমাটাইজড’ হয়ে গেছি।
যুদ্ধের কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কথা বলেছেন তিনি।
এই প্রবাসী বলছিলেন, হোটেলে কোনো পর্যটক নেই। অথচ, আগে আমরা গাওয়া (এক ধরনের পানীয়) ‘সার্ভ’ করে কূল পেতাম না। কিছু কিছু জিনিসের দাম অনেক দাম বেড়ে গেছে। ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ বাহরাইনের মানামায় থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সাইফুল ইসলাম সম্প্রতি কাজ হারিয়েছেন।
সাইফুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটির বেশ কাছাকাছি থাকতাম আমরা পাঁচজন বাংলাদেশি। এখানে ঘাঁটিতে হামলার পর সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম, একটা সুপারমার্কেট, তারা বলেছে আগামী মাস থেকে কাজ দেখতে। বিরাট টেনশনে আছে। সরকারিভাবে যদি বাহরাইন সরকারের সঙ্গে আলাপ করে একটা ব্যবস্থা হতো, ভালো হতো।
সৌদি আরবের রিয়াদে থাকেন ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর সদরের রঘুনাথপুর গ্রামে। তিনি বলছিলেন, যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ-আদা রসুনের মতো আমদানিনির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
সাখাওয়াত বলেন, সবচেয়ে বড়ো প্রভাব পড়েছে পর্যটনে। কোনো পর্যটক নেই। ফলে, পর্যটননির্ভর কর্মীরা আছেন চূড়ান্ত হতাশায়।
সৌদি আরবে ‘ইভেন্ট মার্কেটিং’ সম্পর্কিত কাজে যুক্ত এই প্রবাসী বলেন, আগে এখানে বড় বড় ব্যবসায়িক ইভেন্টগুলো হতো। যুদ্ধ শুরুর পর সব বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে। ফলে, কাজ কমে গেছে।
এছাড়া, বিদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বরা হিলটন, হলিডে ইনের মতো হোটেলে উঠতেন, সেখানকার অনেক কর্মীর ২৫ শতাংশের মতো বেতন ছাঁটাইয়ের কথা শোনা গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বিদেশি আয়োজকরা না আসায়, তাদের আয় কমে গেছে। এসব ইভেন্ট ঘিরে যারা কাজ করতেন, তাদের একটা বড় অংশেরই হাতে তেমন কাজ নেই।
সৌদি আরবের রিয়াদে থাকা কুমিল্লার দেবিদ্বারের ইউশা খান কাজ করেন সেখানকার একটি বিদেশি রেস্তোরাঁয়। তিনি বলেন, একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ওই রেস্তোরাঁয় কাজ পেয়েছেন। বেতন পাচ্ছেন ১২০০ রিয়াল, আগে ২৫০ রিয়ালের মধ্যেই মোটামুটি পুরো মাসের খাবারের খরচ হয়ে যেত। এখন লাগছে ৩৫০ রিয়াল।
এ ১০০ রিয়াল খরচ বাড়লেও তার বেতন বাড়েনি, এ কথা তুলে ধরে ইউশা বলেন, এই টাকার মধ্যে এখানে থাকা-খাওয়া ছাড়াও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর হাতে কয়টা টাকাই বা থাকে।
তিনি বলছেন, সৌদি আরবের সব খাতে যুদ্ধের প্রভাব পড়েনি। বাজারে সব জিনিসের দাম না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে পেঁয়াজ প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ১ রিয়াল থেকে ১ দশমিক ৭৫ রিয়ালে পাওয়া গেলেও সেটি বেড়ে এখন ২ দশমিক ৫ রিয়ালে ঠেকেছে, কাঁচা মরিচের কেজি আগে ছিল সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ রিয়ালের মধ্যে; এখন সেটি ২৫ রিয়াল, আগে বেগুন ২ রিয়ালে মিললেও এখন গুনতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ রিয়াল। সাধারণ মানের এক কেজি আপেল পাওয়া যেত ৫ থেকে ৭ রিয়ালে, এখন গুনতে হচ্ছে ১০ রিয়াল।
গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলি খামেনিও গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর এসেছে।
হামলার জবাবে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব ও ওমানে হামলা চালায় ইরান। এসব দেশের মধ্যে ওমান ও সৌদি আরবে কম হামলা চালালেও কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায় ইরান।
ইরানের পাল্টা হামলায় বিভিন্ন দেশে মারা যান বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী। এদের মধ্যে অন্তত ছয়জনের লাশ এ পর্যন্ত দেশে এসেছে।
রেমিটেন্সে টান পড়ার শঙ্কা
গেল মার্চে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিটেন্স এসেছে। সে মাসে পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এসেছে ২৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, একই সময়ে মোট রেমিটেন্সের মধ্যে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ (সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান) থেকে এসেছে ১০ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মার্চের প্রথম ২৩ দিনে রেমিটেন্স এসেছিল ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি মাসের এপ্রিলের ২২ তারিখ পর্যন্ত দেশে এসেছে ২ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতে এই ধারা বিঘ্নিত হতে পারে। তারা বলছেন, এই টাকা ছিল অধিকাংশ প্রবাসীদের সঞ্চয় থেকে পাঠানো। কেননা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যেখানে বেতন আটকা, সেখানে রেমিটেন্স বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ এটাই।
বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) কাজ করে প্রবাসীদের নিয়ে। সংস্থাটির চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেতন না পাওয়ার সমস্যা নিয়ে অন্তত ২০০ জন প্রবাসী তাদের কাছে রেজিস্ট্রেশন করেছেন।
তাদের হয়তো কারো কাছে কিছু টাকা ছিল, যেটা দেশে পাঠায় নাই, সেটা তারা খরচ করছে। আবার কিছু আছে যে দেশেও হয়তো তাদের কিছু সঞ্চয় ছিল সেই জায়গাগুলো থেকে খরচ করছে। এখন এটা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে যদি আগামী মাসগুলো বা এই মাস শেষে যদি তারা বেতন না পায়, তাহলে তারা কিন্তু ঋণের মধ্যে চলে যাবে।
এ ছাড়া যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে খরচ বাড়ায় প্রবাসীদের আয় থেকে সাশ্রয় করার পরিমাণও কমবে, যার প্রভাব পড়তে পারে রেমিটেন্সে।
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে। এই ছয়টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, এই ছয়টি দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন।
বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এই দেশগুলোতে শ্রমিক গেছেন ৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৫ জন। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে কাজের উদ্দেশ্যে এই ছয়টি দেশে গেছেন ৩২ লাখ ৮ হাজার ৮৮ জন।
দরকার নানামুখী সহযোগিতা
ওকাপ চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমরা তো নিয়মিত খোঁজখবর রাখি। আমাদের ওকাপের একটা নেটওয়ার্ক আছে সব দেশে। আসলে যেটা হচ্ছে যে, কর্মীরা এখন অনেক আতঙ্কের মধ্যে আছে। কারণ হল, এই যুদ্ধের কারণে এখন সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এটার প্রভাব তো কর্মীদের ওপর পড়ছে।
তিনি বলেন, আর অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে যে কাজও কমে যাচ্ছে। অনেক কর্মী আমাদের ফোন করছে যে, তারা কাজ হারাচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় বেতনও ঠিকমতো দিচ্ছে না। তো এইটা আসলে একটা বড় সংকটের দিকে যাচ্ছে।
শাকিরুল বলেন, আমরা তো সরকারকে বারবার বলছি যে, আমাদের দূতাবাসগুলোকে এখন আরও ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ হতে হবে। কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে যারা কাজ হারাচ্ছে, তাদের জন্য বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করা অথবা তাদের দেশে ফেরত আনার যদি প্রয়োজন হয়, সেই ব্যবস্থা করা। আর আমাদের ওকাপ থেকেও আমরা একটা হটলাইন চালু রাখছি কর্মীদের জন্য। তারা যেকোনো সমস্যায় আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বল্পসুদে ঋণ দেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সেই উদ্যোগকে কাজ হারানো কর্মীদের জন্যও কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন শাকিরুল।
বিভিন্ন দেশে কিছু মানুষের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন তুলে ধরে ওকাপ চেয়ারপারসন বলেন, তারা আমাকে বলেছেন যে আপনারা একটা কাজ করেন, সরকারের কাছে বলেন যে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য আমার ফ্যামিলিগুলাতে। যাতে তারা চলতে পারে।
সরকারের করণীয় নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের তো করণীয় সবচেয়ে বেশি। তারা বলছে যে, তারা খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে বা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এটা আসলে অভিবাসী শ্রমিকদের যে চাহিদা আছে, সেটা পূরণ করে না।
ইসরায়েলের হামলায় লণ্ডভণ্ড লেবাননের উদাহরণ টেনে শাকিরুল বলেন, “লেবাননে আসলে খুবই করুণ অবস্থা বাংলাদেশি প্রবাসীদের। বেশিরভাগ মানুষ যারা লেবাননের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ছিল, তারা সবাই কাজ বাদ দিয়ে, কাজ হারিয়ে বৈরুতে চলে গেছে। কিন্তু বৈরুতেও আক্রমণ হয়েছে।
এবং সেখানে তারা যে ‘শেল্টারে’ থাকে, সেগুলো হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। সেখানে বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্নভাবে সহায়তা দেয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকেও হয়ত তাদেরকে কিছু খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু, সেখানকার কর্মীরা বলেছেন, এটা আসলে পর্যাপ্ত নয়।
ঠিক একইভাবে অন্য দেশ যেমন-কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন যেখানে আক্রমণ হয়েছে, সবগুলো জায়গাতে দূতাবাস এবং সরকারের পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “করোনার সময়ও একই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। অনেকের কাজ নেই, কেউ-কেউ করোনায় আক্রান্ত, মারা যাচ্ছে এমন। তবে এই সময়ের তুলনায় সেটি ছিল বেশি গুরুতর। কিন্তু সেসময়ও রেমিটেন্স কমেনি।
সেসময় দূতাবাসগুলোর উদ্যোগে যাদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, তাদের কিছু আর্থিক সহায়তা এবং কম টাকায় খাদ্যসহ নিত্যপণ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।
সেসময়ের মতো কিছু শর্ত নির্ধারণ করে বিভিন্ন দেশে সংকটে থাকা প্রবাসীদের সহায়তার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যদিও লাখ লাখ মানুষের জন্য সেই ‘সাপোর্ট’ দেওয়াটা কঠিন—কিছু ‘ক্রাইটেরিয়া’ যদি ঠিক করা যায় যে, কারোর একেবারে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের আয়ের নিচে যাদের আয়, অথবা আসলেই কাজ নাই, তারা যদি মিশনে আবেদন করেন, সেরকমভাবে তারা কোনো রকম ওই জীবন নির্বাহের ভাতার মতো সাময়িকভাবে পেতে পারে কিনা।
একটা তহবিল যদি সরকার দিতে পারে, বিশেষ তহবিল, সেটা একটা উপায় হতে পারে।
তিনি বলছিলেন, এখন সংকট যে হবে, সেটা তো আমরা আগেই বুঝতে পারছিলাম। এমনকি যুদ্ধ যদি থেমেও যেত বা এখনো যদি যায়, এটার প্রভাব থাকবে। কারণ, তেলের দাম বেড়ে গেছে, তো দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে, এটা তো স্বাভাবিক। আমাদের দেশেও আমরা কিছুটা ‘ফিল’ করছি, ওখানে তো তারা আরও বেশি করবে।
সরকার কী বলছে?
প্রবাসীকল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (কর্মসংস্থান অনুবিভাগ) মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রবাসীরা যে সমস্যায় আছে, এটা তো সারা পৃথিবীতেই আছে। বাংলাদেশেও তো সমস্যা। এই যে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমরাও তো এক ঘণ্টা অফিস আওয়ার কমিয়ে দিছি। আমাদের সমস্যা হচ্ছে না?
এটা স্বাভাবিক একটা বিষয় যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যেহেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে কর্মীরা বেশি থাকে, সেখানে কিছু কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমরা আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে বহু ব্যবস্থা নিয়েছি।
তিনি বলেন, এখানে একটা হটলাইন চালু করা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টা প্রবাসীদের অভিযোগগুলো নেওয়া হয়। তারা কী সমস্যায় আছে, তাদের জন্য কী সহযোগিতা প্রয়োজন—এগুলো কিন্তু এখান থেকে মনিটর করা হচ্ছে। এবং কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে, ২৪ ঘণ্টা তারা ডিউটি করে এখানে।
সরকার প্রবাসীদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ আন্তরিক মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যে তথ্যগুলো আমরা পাই, সাথে সাথে আমাদের ওই দূতাবাসে জানানো হয় যে, তাদেরকে যেন ‘প্রপারলি’ সহযোগিতা করা হয়। এটুকু আমরা করছি।
এবং কেউ মারা গেলে তাদেরকে আমরা যথারীতি সহায়তা দিচ্ছি। বিষয়টি সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী, আমাদের মন্ত্রী সংসদে বলেছেন যে প্রবাসীদের পাশে আমরা সবসময় আছি। এবং যেকোনো সহযোগিতার জন্য আমরা প্রস্তুত। প্রস্তুত না শুধু, আমরা করছি। খুব বেশি প্রবলেম হলে সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে সরকার তার সহযোগিতা আরও বাড়াবে।
We use cookies to improve your experience, deliver personalized content and ads, and analyze our traffic. By continuing to browse our site, you agree to our use of cookies.