প্রায় ১০ বছর পর সরকারি চাকরিজীবিদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ দিয়েছিল জাতীয় বেতন কমিশন। কমিশন প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সব স্তরে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
তবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। মঙ্গলবার (২৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে তিনি এই তথ্য জানান।
ফাওজুল কবির বলেন, “পে-স্কেল নিয়ে পে কমিশন শুধু রিপোর্ট দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এটি বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। সরকার একটি কমিটি করে দিয়েছে সুপারিশ পর্যালোচনা করার জন্য। এ ধরনের পে কমিশন একবারে বাস্তবায়ন হয় না; ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে। পে কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে, আগামী সরকারের জন্য সুবিধা হবে।”
তিনি আরও জানান, “জিনিসপত্রের দামে পে কমিশনের প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই, কারণ সরকার এটি বাস্তবায়ন করছে না। ডিফেন্স জোন করা হচ্ছে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর জন্য। এর জন্য অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা চলছে; প্রাথমিকভাবে শুধু জমি বরাদ্দ করা হচ্ছে।” ফাওজুল কবির বলেন, চীন ও পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান, ড্রোন কেনা বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশ অনৈতিক কিছু করছে না। বাংলাদেশ শুধুমাত্র বিকল্প ভেন্যু চেয়েছে। ভারত তো দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে খেলেনি। আমরা তো বিশ্বকাপে অংশ নিতে চাই।”
২০১৫ সালের বেতনকাঠামো অনুসারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। দীর্ঘ ১০ বছরে নতুন পে-স্কেল না হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিলেন। অবশেষে গত বছর জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গঠন করে।
গত ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি করার সুপারিশ করা হয়। গ্রেড সংখ্যা আগের মতোই ২০টি রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম ধাপে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বেশ বৈরী পরিবেশে। এবার প্রতিটি নাগরিক একসঙ্গে দুটি ভোট দেবেন। তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিলে কী হবে সে বিষয়ে অধিকাংশ ভোটারের স্পষ্ট ধারণা নেই। চারটি বিষয়ে কেউ একমত হলে ‘হ্যাঁ’, আর একমত না হলে ‘না’ ভোট দেওয়া হবে। কেউ সব বিষয়ে একমত না হলে ভোটদানেই বিরত থাকতে পারেন বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকার। সরকারের সঙ্গে ১১ দলীয় জোট প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি বিষয়টি নেতাকর্মীদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। জাতীয় পার্টি ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ গণভোটে কোনো ভূমিকা রাখছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চারটি প্রশ্নের ওপর ভোটদান করতে ভোটকেন্দ্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ভোটারের সংখ্যা খুব কম। সরকার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরকেন্দ্রিক বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। ভোটার সচেতনতার জন্য সরকার ভিডিও কন্টেন্ট, ফটো কার্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠানো এবং গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করছে। বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য দেশের জন্য একটি ‘ম্যান্ডেট’ তৈরি করা। ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, চায়ের দোকান থেকে পাড়া-মহল্লায় ভোট নিয়ে আলোচনা থাকলেও গণভোটের বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা কম। নিম্ন আয়ের মানুষের আগ্রহও কম। স্থানীয়রা বলছেন, দলীয় ভোটের পাশাপাশি গণভোট সম্পর্কে জানা যাচ্ছে অল্প। একজন রিকশাচালক বলেন, আমি লেখাপড়া জানি না। আগে প্রতীক দেখে ভোট দিয়েছি। এবার ভোট দিতে হলে পড়তে হবে, এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ খেতে-বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছে। মহিলারা বলছেন, কোনো কিছু পড়তে হবে না, শুধু প্রতীকে টিপ বা সিল দিলে হবে। তিনি মনে করেন, নির্বাচন আগে সবাই এমনই বলে, পরে আর খোঁজ নেয় না। কুড়িগ্রামে সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ থাকলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট সম্পর্কে ধারণা অস্পষ্ট। সরকারি প্রচার থাকলেও গ্রাম ও চরাঞ্চলে কার্যক্রম নেই। ফলে ভোটারদের বিভ্রান্তি রয়েছে। সংসদ নির্বাচনের দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে অভ্যস্ত ভোটাররা গণভোটের ব্যালট পেপারকে নতুন ও অপরিচিত মনে করছেন। পর্যাপ্ত প্রচার না হলে ভোটগ্রহণের দিন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কুড়িগ্রামের চারটি আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ৭৬ হাজার ৫৫৫ জন। পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৩১ হাজার ৭২৭ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৮০৭ জন। অনেক ভোটার গণভোটের বিষয়ে কিছুই জানেন না। তাঁরা দলীয় প্রতীক ছাড়া ভোট দেওয়ার পদ্ধতি বোঝেন না। বাগেরহাটে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচার চালাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ দলীয় ভোটের ব্যাপারে জানলেও গণভোটের বিষয়ে তাদের ধারণা অস্পষ্ট। স্থানীয় নেতারা সংক্ষিপ্তভাবে গণভোটের বিষয় তুলে ধরছেন, তবে অধিকাংশ মানুষ বুঝতে পারছে না। শেরপুরে শহরের মানুষ কিছুটা ধারণা পেলেও গ্রামে গণভোট সম্পর্কে অজানা। অনেক ভোটার জানেন না হ্যাঁ দিলে বা না দিলে কী হবে। শেরপুর সদর উপজেলার শিক্ষকেরা বলেন, গ্রামে পৌঁছে জনসচেতনতা তৈরি করতে প্রচার কার্যক্রম প্রয়োজন। কুমিল্লায় শিক্ষিত ও নিম্ন আয়ের মানুষরা জানেন না গণভোটের বিষয়টি কী। কেউ হ্যাঁ দিলে কী হবে, না দিলে কী হবে, তা বুঝতে পারছেন না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জানেন না ভোটের বিস্তারিত। সুশাসনের জন্য নাগরিকরা বলেন, সাধারণ মানুষ গণভোট সম্পর্কে সচেতন নয়। কিছু শিক্ষিত মানুষ ছাড়া অধিকাংশ ভোটার জানেন না হ্যাঁ-না ভোট কী। সরকারের উচিত সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। একটি কমিটি গ্রামে গ্রামে গিয়ে উঠান বৈঠকসহ প্রচার করছে। সরকারি কর্মকর্তারা হ্যাঁ-তে প্রচারণা চালাতে বাধা নেই। জাতীয় পার্টি ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে আগামী ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সুবিধার্থে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস/প্রতিষ্ঠান/সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারী, পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ ও ভোটগ্রহণের সুবিধার জন্য সারাদেশে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই কারণে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির অনুমোদনক্রমে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগও একই দিন দুটি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এর আগে, গত ২৫ জানুয়ারি সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে সারাদেশে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি দুই দিনের নির্বাচনকালীন সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। এছাড়া শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ঢাকার গণপরিবহন-ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছিল মেট্রোরেল। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এর পাশাপাশি মনোরেল চালুর কথা বলেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মোহাম্মদপুর, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মনোরেলকে মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। ২০ জানুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বনানী সোসাইটি আয়োজিত দোয়া মাহফিল ও মতবিনিময় সভায় মনোরেলের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান। এর আগে গত জুনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর চট্টগ্রামেও মনোরেল চালুর উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সাড়ে ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি রুটে মনোরেল নির্মাণ করতে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন ও আরব কন্ট্রাক্টরস—এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়। চট্টগ্রামে মনোরেলের সম্ভাব্য রুটগুলো হচ্ছে—কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার, সিটি গেট থেকে শহীদ বশিরুজ্জামান চত্বর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং অক্সিজেন থেকে ফিরিঙ্গিবাজার পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার। ঢাকার পাশের নগর নারায়ণগঞ্জেও মনোরেল নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০০৫ সালে ঢাকার ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করে সরকার। পরে জাপানের অর্থায়নে এবং জাপানের পরামর্শকদের সহায়তায় ২০১৪ সালে এসটিপি সংশোধন করে আরএসটিপি তৈরি করা হয়। এর আলোকেই ঢাকার গণপরিবহন উন্নয়নে নানা প্রকল্প নেয় এবং বাস্তবায়ন করে বিগত সরকার। এসটিপি প্রণয়নের সময়ই কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ঢাকায় মনোরেল চালুর পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে এসটিপিতে উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল (উড়াল ও পাতাল পথে) এবং বাসের জন্য বিশেষ লেন (বিআরটি) চালুর সুপারিশ করা হয়। এর ভিত্তিতেই ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত একটি মেট্রোরেল লাইন চালু হয়েছে। মনোরেল কী মনোরেল হচ্ছে একটি মাত্র লাইনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী গণপরিবহন ব্যবস্থা। একটি মাত্র বিমের ওপর ট্রেন চলে। প্রচলিত রেল বা মেট্রোরেলের মতো আলাদা দুটি লাইন প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলমান মেট্রোরেলের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় বড় খুঁটির ওপর তার টানতে হয়েছে। কিন্তু মনোরেলে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা লাইনের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। ফলে খুঁটি বা তারের জন্য বাড়তি ভার বহনের কাঠামোর প্রয়োজন হয় না। মনোরেল চলাচল ও অবকাঠামো নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম জায়গার প্রয়োজন হয়। সরু পথ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সহজেই এটি নির্মাণ করা যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—মেট্রোরেলের তুলনায় মনোরেলের নির্মাণ ব্যয় কম। এ ছাড়া মনোরেল আঁকাবাঁকা পথে চলতে পারে। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে লাইন বাঁকা হলে গতি কমাতে হয় এবং নির্মাণে বাড়তি খরচ পড়ে। বিশ্বের বড় বড় শহরে মেট্রোরেল জনপ্রিয় গণপরিবহন। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মেট্রোরেল বেশি চলে পাতাল পথে। জাপান, চীন, ভারতসহ অনেক দেশে উড়ালপথে মেট্রোরেল চলাচল করে। চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বহু দেশেই মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চালু রয়েছে। মিসরের কায়রো ও চীনের গুইলিনে মনোরেল নির্মাণকাজ চলমান। তবে মনোরেলের যাত্রী পরিবহনক্ষমতা মেট্রোরেলের তুলনায় কম। মেট্রোরেলের পরিপূরক মেট্রোরেল ও মনোরেল—দুটিই গণপরিবহন। প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকায় মনোরেলের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? ঢাকার জনঘনত্ব বেশি এবং শহরটি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে সব এলাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ সম্ভব নয়। যেমন পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় সড়ক এতটাই সরু যে সেখানে বাস চলাচলও সম্ভব নয়। একই অবস্থা খিলগাঁও, গোড়ান, বাসাবোসহ কিছু এলাকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব এলাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ করতে হলে পাতাল পথে যেতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে এসব এলাকায় মনোরেল সহজে নির্মাণ করা যায়। আঁকাবাঁকা পথ হলেও তাতে সমস্যা হয় না। তবে মনোরেল সব শহর বা সব এলাকার জন্য উপযোগী নাও হতে পারে। যেমন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা শহরের মনোরেল প্রকল্প বাতিল করা হয়েছিল। বড় শহরে যাত্রীচাপ মনোরেল সামাল দিতে পারবে কি না—সেই প্রশ্নও ওঠে। আবার বিশ্বে বহু শহরে মনোরেল সফলভাবে চলছে। ফলে অনেক দেশেই মেট্রোরেল, মনোরেল, উড়ালসড়ক ও বিআরটি মিলিয়ে বহুমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতের মুম্বাই শহরে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেলও রয়েছে। গণপরিবহন-বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেলের জন্য ঢাকার সবচেয়ে উপযোগী ও যাত্রীঘন পথ হচ্ছে উত্তরা-মতিঝিল রুট। এরপরও উচ্চ ব্যয়ের কারণে ভাড়া তুলনামূলক বেশি নির্ধারণ করতে হয়েছে। পরবর্তী মেট্রোরেল লাইনগুলোর বড় অংশই পাতাল পথে নির্মিত হবে, এতে ব্যয় আরও বাড়বে। তখন ভাড়া আরও বাড়াতে হলে সেটি আর প্রকৃত অর্থে গণপরিবহন থাকবে না। তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে মনোরেল নিয়ে ভাবতে হবে। তুলনামূলক সরু ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে এতে যুক্ত করা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমান মেট্রোরেল বিজয় সরণি থেকে খামারবাড়িতে এসে বড় মোড় নেয়। মনোরেল হলে বাঁকা করেই মূল সড়ক দিয়ে চালানো যেত, এতে খরচও কম হতো। মেট্রো ও মনোরেল—ব্যয় বড় প্রশ্ন উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল চালু হলেও এটি কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এই লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। পুরো লাইনটি উড়ালপথে নির্মিত। বর্তমানে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এবং নর্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত আরেকটি মেট্রোরেল প্রকল্প (এমআরটি লাইন-১) চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব লাইনের কিছু অংশ উড়াল এবং কিছু অংশ পাতাল পথে হবে। ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসব মেট্রোরেল লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। ভারতের মুম্বাই শহরে ২০ কিলোমিটার মনোরেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা। সেখানে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটার ব্যয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে। মুম্বাইয়ের মনোরেলের একাংশ চালু হয় ২০১৪ সালে এবং বাকি অংশ ২০১৯ সালে। মুম্বাইয়ের মনোরেল দৈনিক দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারে। বিপরীতে ঢাকার মেট্রোরেল দিনে গড়ে প্রায় ৪ লাখ যাত্রী বহন করছে। এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। মিসরের ৯৬ কিলোমিটার মনোরেল প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকার সমান। এ প্রকল্পে নির্মাণের পাশাপাশি ৩০ বছর পর্যন্ত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। আশপাশের দেশের তুলনায় এখানে ব্যয় বেশি হওয়ায় গণপরিবহন অবকাঠামোর বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছেই।