পশ্চিমে হেলে পড়েছে লাল সূর্য। সাগরের বালুচরে বসানো চেয়ারে বসে (কিটকট) সেই সূর্যের অপরূপ রূপ উদাস দৃষ্টিতে দেখছেন কেউ। আবার কেউ বালুচরে দাঁড়িয়ে সূর্যকে পেছনে রেখে ছবি তোলায় ব্যস্ত। সবমিলিয়ে বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখতে সমুদ্রসৈকতে ছিল পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। আজ বুধবার বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দেখা গেছে এমন চিত্র।
তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক পালনের অংশ হিসেবে তারকামানের হোটেলগুলো তাদের থার্টি ফার্স্ট নাইটের আয়োজন বাতিল করেছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বাসসকে জানান, থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্যাপন উপলক্ষে কক্সবাজার শহর এলাকাসহ সমুদ্র সৈকতে আতশবাজি, পটকা ও ফানুস ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে আতশবাজি ও ফটকা বিক্রি ও বিপণন কেন্দ্র বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলার উন্মুক্ত স্থান ও রাস্তায় প্রকাশ্যে কোনো ধরনের কনসার্ট, নাচ কিংবা গানের অনুষ্ঠান আয়োজন না করারও জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কক্সবাজার জেলার সকল বার ও মদের দোকানে মদ ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার ও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, নাশকতা, সহিংসতা কিংবা বোমা হামলাসহ যেকোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানান অলক বিশ্বাস।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আরো নিষিদ্ধ করা হয়েছে উচ্চ শব্দে গাড়ির হর্ন বাজানো, প্রতিযোগিতা, জয় রাইড এবং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানো। থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন উপলক্ষে আগত নারী পর্যটকদের কোনো ধরনের ইভটিজিং বা উত্ত্যক্ত না করার বিষয়েও কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হোটেল ও মোটেলসমূহে ইনডোরে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে সে বিষয়ে এবং আগত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্য ডিএসবি (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ)কে অবহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে বিকেল ৪টায় সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, এক কিলোমিটার সৈকতে অন্তত ৫০ হাজার পর্যটকের সমাগম হয়েছে। ভাটার কারণে পানি নেমে যাওয়ায় দেখা দেয় বিশাল বালুচর। সেখানে প্রিয়জনদের নিয়ে বছরের শেষ সূর্যাস্তের মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দী করতে পর্যটকেরা ব্যস্ত রয়েছেন। সবারই যেন চোখ ডুবন্ত সূর্যের দিকে। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ডুবে যায় সূর্য। পর্যটকদের অনেকেই তখন হইহুল্লোড় শুরু করে দেন। অনেকে হাত তুলে বিদায় জানান সূর্যকে। উচ্চ স্বরে অনেককে বলতে শোনা যায়, বিদায় ২০২৫।
ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে আসা স্কুল শিক্ষক মোনালিসার (৩০) সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কক্সবাজার সৈকতের মূল আকর্ষণ সূর্যাস্ত উপভোগ করা। বছরের শেষ সূর্যের লাল আভায় সাগরের পানি যেন রঙিন হয়ে উঠে। এমন দৃশ্য দেখতে খুবই ভালো লাগে।
সৈকতের কলাতলী, সীগাল ও লাবণী পয়েন্টে দাঁড়িয়েও লাখো পর্যটক বছরের শেষ সূর্যকে বিদায় জানান। তবে সমুদ্রসৈকতের উন্মুক্ত স্থানে হয়নি বর্ষবিদায়ের কোনো অনুষ্ঠান। এতে অনেক পর্যটক হতাশা প্রকাশ করেন।
হোটেল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের শেষ সূর্যকে বিদায় জানাতে আজ বুধবার সৈকতে অন্তত দেড় লক্ষাধিক পর্যটকের সমাগম হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে গত আট বছরের মতো এ বছরও সৈকতে বর্ষবিদায় অনুষ্ঠান হয়নি।
তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার সাধারণ ছুটি।
বর্তমানে কক্সবাজার শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও কটেজের প্রায় ৯০ শতাংশ রুম পর্যটককে ভরা রয়েছে। হোটেলগুলোর দৈনিক ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার। পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর—এই সাত দিনে অন্তত সাড়ে আট লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন।
তারকা হোটেল ওশ্যান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বাসসকে বলেন, ‘কক্সবাজারে বিশ্বমানের পর্যটন বিকাশে আমরা শুরু থেকেই বাংলা নববর্ষ, থার্টিফার্স্ট নাইটসহ নানা দিবসকে পর্যটকদের কাছে উপভোগ্য করে তুলি। পর্যটক চাহিদার কারণে এবছরও বলরুমে ইনহাউজ গেস্টদের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ডিজে পার্টির আয়োজন ছিল। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আয়োজন সীমিত করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তারকা হোটেল গুলোতে থার্টি ফাস্ট নাইটের আয়োজন বন্ধ রাখা হয়েছে জানিয়ে কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বাসসকে বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখে পুরোনো বছরকে বিদায় জানান। তবে ঘন কুয়াশা থাকায় এবার সূর্যাস্ত ভালোভাবে দেখা যায়নি। সৈকত ও উন্মুক্ত স্থানে কোনো আয়োজন না থাকলেও পর্যটকের আগমন থেমে নেই।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম বাসসকে বলেন, থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে সৈকতের কোথাও উন্মুক্ত স্থানে কনসার্ট কিংবা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। সৈকতে আতশবাজি, পটকা ফুটানো নিষিদ্ধ। তবে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে একাধিক তারকা হোটেল কনসার্টের আয়োজন করলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সরকারিভাবে তিনদিনের শোক ঘোষণা করায় তা হোটেল কর্তৃপক্ষরা বন্ধ রেখেছেন।
তিনি বলেন, কোন ধরনের হয়রানি কিংবা প্রতারণার শিকার না হয়ে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে কক্সবাজার ভ্রমণ করতে পারেন, তার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম মাঠে রয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জাতীয় ঐক্যের এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আজ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি)-এ সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুরা শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে একত্রিত হয়। 'শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করি” এই বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (MoLE), চাইল্ড লেবার এলিমিনেশন প্ল্যাটফর্ম (CLEP) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব আরিফুল হক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব মো. আব্দুর রহমান তারফদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইএলও বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব ম্যাক্স টুনন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে শিশুশ্রম পরিস্থিতির একটি সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করা হয়, যেখানে এ খাতে দেশের অর্জনের পাশাপাশি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোও তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে শিশুরা শিশু অধিকারবিষয়ক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করে এবং দুইজন শিশু প্রতিনিধি তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সকলকে শিশুশ্রম নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিজ বক্তব্যে এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল হামিদ শিশুশ্রম নিরসনে খাতভিত্তিক (Sector-based) পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এ বিষয়ে সিএলইপি-এর যৌথ উদ্যোগসমূহ তুলে ধরেন। মাননীয় মন্ত্রী অংশগ্রহণকারীদের আশ্বস্ত করেন যে, শিশুশ্রম নিরসনে সরকার আরও পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, “সচেতনতার অভাবও শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ। তাই আমাদের তৃণমূল পর্যায় থেকে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব, যা বাংলাদেশ থেকে শিশুশ্রম দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” তিনি আরও ব্যক্ত করেন যে, অধিকতর কার্যকর প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতামূলক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনায় সবসময় উন্মুক্ত। অন্যদিকে, বিশেষ অতিথি, আইএলও বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব ম্যাক্স টুনন শিশুশ্রম নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এরপর, “বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ ও সবার যৌথ দায়িত্ব” শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং আইএলও-এর প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় শিশুশ্রম নিরসনে বাস্তবসম্মত সমাধান এবং অংশীজনদের যৌথ দায়িত্ব ও করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে সকল অংশীজন অংশীদারিত্ব আরও সুদৃঢ় করার এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন, যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু নিরাপদ শৈশব, মানসম্মত শিক্ষা এবং নিজেদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিতভাবে লাভ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গত সরকারের সময় গৃহীত অপরিকল্পিত ও লোকদেখানো ‘ভ্যানিটি প্রজেক্ট’র কারণে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ এখন জাতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি। সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছিলাম। দুর্নীতি, লুটপাট এবং ভুল নীতির কারণে অর্থনৈতিক খাত সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপ হয়ে গিয়েছিল। অহেতুক দেশি-বিদেশি ঋণ নিয়ে এমন কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল যা থেকে কোনো রেভিনিউ আসে না। ফলে এখন বাড়তি টাকা দিয়ে সেই ঋণ শোধ করতে হচ্ছে এবং আগামী লম্বা সময় ধরে জাতিকে এই বোঝা টানতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, বিগত সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। পুঁজিবাজারে মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছিল। টাকার মান ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। এই যে সংকট, এটি আমরা অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু একই সাথে সংকটকে আমরা অজুহাতও বানাতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে সাথে নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমেই আমরা এই সফলভাবে সংকট মোকাবিলা করতে চাই। আমাদের দর্শন হলো, দেশের স্বার্থ রক্ষায় সবার আগে বাংলাদেশ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সবার জন্য বাংলাদেশ। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন মানে শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়। উন্নয়ন তখনই হবে যখন সাধারণ মানুষের ঘরে স্বস্তি আসবে, তরুণরা কর্মসংস্থান পাবে এবং কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে উদ্যোক্তারা হয়রানি ছাড়া ব্যবসা করতে পারবেন এবং আমানতকারীরা তাদের অর্থের নিরাপত্তা পাবেন।
বিগত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসের সব কার্যক্রমও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, "আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে লুণ্ঠন, দুর্নীতি ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের (স্বজনতোষী পুঁজিবাদ) একটি অর্থনীতি পেয়েছি।" তাঁর দাবি, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। ১৫ বছরে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজনৈতিক চাঁদাবাজির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা (২৪ বিলিয়ন ডলার)। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে যে লুটপাট হয়েছে, সেই অর্থ দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল ও ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ‘লেজিসলেটিভ ম্যানিপুলেটেড করাপশন’, অর্থাৎ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়া। কুইক রেন্টাল, ইনডেমনিটি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের অর্থ অপচয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নিজেদের সরকারের স্বচ্ছতা প্রমাণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কারা করেছে—সবই তদন্ত হওয়া উচিত। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি, দুর্নীতি দমন কমিশনকে এ সময়ের সব কর্মকাণ্ড তদন্তের নির্দেশ দিন। আমরা কোনো ধরনের কলঙ্ক নিয়ে এগোতে চাই না।” জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ সাহেব তাঁর বিরুদ্ধে আপসের অভিযোগ তুলেছেন। তবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই জুলাই সনদে সমঝোতা ও স্বাক্ষর করা হয়েছে। তিনি বলেন, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে অনেক সময় সব বিষয়ে একমত না হয়েও রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হয়। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে ‘নিউ ইকোনমিক অর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি শুধু একটি প্রচলিত বাজেট নয়; বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ার রূপরেখা। তাঁর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “আওয়ার প্রাইম মিনিস্টার ইজ অলওয়েজ ওয়েল অ্যাহেড অব টাইম।” ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার সাহসী বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর মতে, দারিদ্র্য বিমোচন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং একটি স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে এ বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।