ক্রুড অয়েল সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল) প্রায় বন্ধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে গেছে।
অচিরেই ক্রুড অয়েলের চালান না এলে সাময়িক সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনকারী এ প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ক্রুড অয়েলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কতটা বিঘ্ন ঘটবে, সেই শঙ্কা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তরফে বলা হচ্ছে, দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার খুব কম পরিমাণই ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে আসে। চাহিদার বড় অংশ মেটানো হয় আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানি তেল দিয়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ‘নিয়মিত’ পরিশোধিত তেল আমদানি হচ্ছে। এ কারণে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলেও আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি ছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো সংকট হবে না বলে তাদের ভাষ্য।
জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর চাপ পড়বে এবং বেশি দামে এসব তেল কিনতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটা সরকারের জন্য বাড়তি ‘চাপ’ হবে। এছাড়া তেল পরিশোধন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি যে আয় করত, সেটি তারা পাবে না।
এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত ইস্টার্ন রিফাইনারির নতুন ইউনিট চালুর উদ্যোগ নিতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সাগরপথে জাহাজে করে এনে পরিশোধন করা হয় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে। এ রিফাইনারির বার্ষিক শোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন।
ক্রুড অয়েল শোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, ন্যাপথা, বিটুমিন, এলপিজিসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন করছে ইস্টার্ন রিফাইনারি। তবে ডিজেলই উৎপাদন করে সবচেয়ে বেশি।
বিপিসির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের বার্ষিক উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ টন। এর মধ্যে ডিজেল উৎপাদন হয়েছে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১২ টন।
দেশে ডিজেলের চাহিদা বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ লাখ টন। চাহিদার বাকি অংশ মেটানো হয় পরিশোধিত তেল আমদানি করে।
গত অর্থবছরে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পেট্রোল মিলেছে ৫৯ হাজার ১৫০ টন (চাহিদা ৪৫ লাখ টনের মত), ফার্নেস অয়েল ৩৭ হাজার ১৪৭ টন (চাহিদা ৪৫ লাখ টন), ন্যাপথা ১ লাখ ৫৩ হাজার ২০৩ টন। তবে অকটেন উৎপাদন হয়নি।
শোধনের পর বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল বিপিসির তেল বিপণনকারী সংস্থার মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। উপজাত হিসেবে পাওয়া ন্যাপথা দেশের কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কিনে নিয়ে ব্যবহার করে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থ বছরে (২০২৪-২৫) দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল ৬৭ দশমিক ৬১ লাখ টন।
ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশই ছিল ডিজেল। এছাড়া ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ পেট্রোল, ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ অকটেন, ৮ দশমিক ০১ শতাংশ জেট ফুয়েল, প্রায় ১ শতাংশ কেরোসিন ও বাকি ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ অন্যান্য জ্বালানি তেল। বিপিসির হিসাবে, গত অর্থবছরে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় ৪৬ লাখ ৭ হাজার ৮৮১ টন। এর মধ্যে ডিজেল আনা হয়েছে ৩৩ লাখ ৮ হাজার ৫০৬ টন, অকটেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮২ টন, ফার্নেস অয়েল ৫ লাখ ১৬ হাজার ৩৬ টন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতে ক্রুড অয়েলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন কার্যক্রম গত সোমবার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। সেদিন পাঁচটি ইউনিটের দুটি বন্ধ হয়ে যায়। বাকি তিনটি ইউনিটে ‘ডেড স্টক’ দিয়ে শোধন কার্যক্রম চালু রাখার কথা বলা হচ্ছে।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ডেড স্টকে থাকা কিছু ক্রুড অয়েল এবং ন্যাপথা দিয়ে এ কার্যক্রম চলছে। এসব ইউনিট থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০ টন পেট্রোল ও ১০০ টন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে থাকা ক্রুড অয়েল দিয়ে উৎপাদন আরও কিছুদিন চলবে বলে তিনি জানান।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে এসেছিল। মার্চ মাসে সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আসার কথা থাকলেও আসতে পারেনি।
সরকার বিকল্প উপায়ে সৌদি আরামকোর কাছ থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল কেনার জন্য চুক্তি করেছে। আগামী মাসে তা দেশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।
ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের সংকট হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বলেন, এটি দেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। বাকি চাহিদা মেটানো হয় ফিনিশড প্রডাক্ট বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেল আমদানি প্রক্রিয়া এখনো সচল আছে। দেশে এখনো জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলেও চলমান তেল আমদানি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসে কোনো সংকট হবে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে সাময়িকভাবে চাপ বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। তবে বড় ধরনের সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ক্রুড অয়েল সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল) প্রায় বন্ধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে গেছে। অচিরেই ক্রুড অয়েলের চালান না এলে সাময়িক সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনকারী এ প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ক্রুড অয়েলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কতটা বিঘ্ন ঘটবে, সেই শঙ্কা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তরফে বলা হচ্ছে, দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার খুব কম পরিমাণই ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে আসে। চাহিদার বড় অংশ মেটানো হয় আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানি তেল দিয়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ‘নিয়মিত’ পরিশোধিত তেল আমদানি হচ্ছে। এ কারণে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলেও আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি ছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো সংকট হবে না বলে তাদের ভাষ্য। জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর চাপ পড়বে এবং বেশি দামে এসব তেল কিনতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটা সরকারের জন্য বাড়তি ‘চাপ’ হবে। এছাড়া তেল পরিশোধন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি যে আয় করত, সেটি তারা পাবে না। এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত ইস্টার্ন রিফাইনারির নতুন ইউনিট চালুর উদ্যোগ নিতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সাগরপথে জাহাজে করে এনে পরিশোধন করা হয় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে। এ রিফাইনারির বার্ষিক শোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। ক্রুড অয়েল শোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, ন্যাপথা, বিটুমিন, এলপিজিসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন করছে ইস্টার্ন রিফাইনারি। তবে ডিজেলই উৎপাদন করে সবচেয়ে বেশি। বিপিসির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের বার্ষিক উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ টন। এর মধ্যে ডিজেল উৎপাদন হয়েছে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১২ টন। দেশে ডিজেলের চাহিদা বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ লাখ টন। চাহিদার বাকি অংশ মেটানো হয় পরিশোধিত তেল আমদানি করে। গত অর্থবছরে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পেট্রোল মিলেছে ৫৯ হাজার ১৫০ টন (চাহিদা ৪৫ লাখ টনের মত), ফার্নেস অয়েল ৩৭ হাজার ১৪৭ টন (চাহিদা ৪৫ লাখ টন), ন্যাপথা ১ লাখ ৫৩ হাজার ২০৩ টন। তবে অকটেন উৎপাদন হয়নি। শোধনের পর বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল বিপিসির তেল বিপণনকারী সংস্থার মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। উপজাত হিসেবে পাওয়া ন্যাপথা দেশের কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কিনে নিয়ে ব্যবহার করে। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থ বছরে (২০২৪-২৫) দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল ৬৭ দশমিক ৬১ লাখ টন। ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশই ছিল ডিজেল। এছাড়া ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ পেট্রোল, ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ অকটেন, ৮ দশমিক ০১ শতাংশ জেট ফুয়েল, প্রায় ১ শতাংশ কেরোসিন ও বাকি ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ অন্যান্য জ্বালানি তেল। বিপিসির হিসাবে, গত অর্থবছরে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় ৪৬ লাখ ৭ হাজার ৮৮১ টন। এর মধ্যে ডিজেল আনা হয়েছে ৩৩ লাখ ৮ হাজার ৫০৬ টন, অকটেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮২ টন, ফার্নেস অয়েল ৫ লাখ ১৬ হাজার ৩৬ টন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতে ক্রুড অয়েলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন কার্যক্রম গত সোমবার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। সেদিন পাঁচটি ইউনিটের দুটি বন্ধ হয়ে যায়। বাকি তিনটি ইউনিটে ‘ডেড স্টক’ দিয়ে শোধন কার্যক্রম চালু রাখার কথা বলা হচ্ছে। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ডেড স্টকে থাকা কিছু ক্রুড অয়েল এবং ন্যাপথা দিয়ে এ কার্যক্রম চলছে। এসব ইউনিট থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০ টন পেট্রোল ও ১০০ টন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে থাকা ক্রুড অয়েল দিয়ে উৎপাদন আরও কিছুদিন চলবে বলে তিনি জানান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে এসেছিল। মার্চ মাসে সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আসার কথা থাকলেও আসতে পারেনি। সরকার বিকল্প উপায়ে সৌদি আরামকোর কাছ থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল কেনার জন্য চুক্তি করেছে। আগামী মাসে তা দেশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা। ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের সংকট হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বলেন, এটি দেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। বাকি চাহিদা মেটানো হয় ফিনিশড প্রডাক্ট বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেল আমদানি প্রক্রিয়া এখনো সচল আছে। দেশে এখনো জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলেও চলমান তেল আমদানি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসে কোনো সংকট হবে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে সাময়িকভাবে চাপ বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। তবে বড় ধরনের সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সাফল্যের ৪৫ বছর পূর্ণ করে আজ ৪৬তম বছরে পদার্পণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এ প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অনন্য অবদান রেখে আসছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্তে আশির দশকের শুরুতে বেপজার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল খুবই সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশেকে রপ্তানীমুখী শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। এরপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ১৯৮০ সালে ‘বেপজা আইন’ পাস হয়। এরপর ১৫ এপ্রিল, ১৯৮১ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৮৩ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের প্রথম ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী উৎপাদনের বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ইপিজেড কার্যক্রম দেশজুড়ে সম্প্রসারিত হয়। ১৯৯৩ সালে ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার ফলে সাভার-আশুলিয়া অঞ্চল একটি প্রাণবন্ত শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়। এছাড়া আদমজী জুট মিলস ও কর্ণফুলী স্টিল মিলসকে ইপিজেডে রূপান্তরের কৌশলগত সিদ্ধান্ত দেশের শিল্পখাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে- মোংলা, কুমিল্লা, উত্তরা ও ঈশ্বরদীসহ মোট ৮টি ইপিজেড সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপনের কাজ শুরু হয়, যেখান থেকে ইতোমধ্যে পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে। এই অঞ্চলে ৮টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেছে এবং আরও ৫টি পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়া ৩৪টি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ বছরেই পটুয়াখালী ও যশোর ইপিজেডের প্লট বরাদ্দ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বেপজার অধীনে ৮টি ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট আয়তন মাত্র ৩ হাজার ৫৫০.৩৩ একর (১৪.৩৭ বর্গ কিলোমিটার), যা দেশের মোট আয়তনের ০.০০১ শতাংশেরও কম। তবে এই ক্ষুদ্র এলাকা থেকেই দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৫-২০ শতাংশ আসছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান ছিল ১৭.০৩ শতাংশ। বিগত ৪৫ বছরে বেপজা ৭২৯ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এসব জোনে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার বড় একটি অংশই নারী। এই কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, সামাজিক পরিবর্তন ও নারী ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইপিজেডের প্রতি একর জমি থেকে বছরে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় অর্থনীতিতে বেপজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান ছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। বেপজাধীন জোনসমূহে বর্তমানে ৪৫০টি চালু কারখানার মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশ তৈরি পোশাক উৎপাদন করে। বাকি ৬৮ শতাংশে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ক্যামেরা লেন্স, প্রিন্টারের টোনার, বাইসাইকেল, চশমার ফ্রেম, উইগ, জুতা এমনকি কফিনও তৈরি হচ্ছে। বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ড্রোন কারখানা। ২০২৫ সালের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বেপজা দেশি-বিদেশি ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৩০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, যেখানে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬৩ কোটি মার্কিন ডলার। এতে প্রায় ৬৪ হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং সবুজ শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে বেপজা ২০৩০ সালের মধ্যে তার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ সৌর শক্তি থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া শ্রমিকদের কল্যাণে প্রতিটি ইপিজেডে হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার রয়েছে যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ দেওয়া হয়। এছাড়া, ডে-কেয়ার সেন্টারও স্থাপন করা হয়েছে। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য রয়েছে ‘বেপজা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ’, যেখানে তারা ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে পড়াশোনার সুযোগ পায়। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইএলও-র সঙ্গে ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম’ চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে বেপজা। সাফল্যের ৪৫ বছর পেরিয়ে ৪৬তম বছরে পদার্পণ করা বেপজা আজ এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) তীব্র সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড (ইআরএল) বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গত দুই মাস ধরে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ থাকায় রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে শোধনাগারটির পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে কারখানাটিতে শেষ পরিশোধন কার্যক্রম সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির দুজন কর্মকর্তা। এদিকে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়বে না। ইআরএল কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা প্রায় ৫ হাজার টন অপরিশোধিত তেল এবং চারটি ট্যাংকের ডেড স্টক ব্যবহার করে শেষ পর্যায়ে পরিশোধন কার্যক্রম চালানো হয়। কর্মকর্তারা আরও জানান, ইআরএল সাধারণত দৈনিক গড়ে ৪ হাজার ৫০০ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করে। তবে সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টনে নামানো হয়েছিল। ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুত ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে।