বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইছে বাংলাদেশ সরকার।
বর্তমানে স্থানীয় উৎপাদন থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসছে ৯৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৫৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, যার প্রায় ৩৬ শতাংশের সঙ্গে জড়িত রয়েছে এই বহুজাতিক কোম্পানিটি।
বর্তমানে দেশে মোট ২০টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড থেকে আসছে মোট উৎপাদনের প্রায় ৪৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডই দীর্ঘদিন ধরে দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে ফিল্ডটির মজুদ এখন শেষ পর্যায়ে এবং উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে। ফলে ভবিষ্যতে বড় আকারে উৎপাদন কমে গেলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত তীব্র ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মার্কিন কোম্পানি শেভরন ১৯৯৫ সালে প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) চুক্তির আওতায় অনশোর ব্লক-১২ এ কাজ শুরু করে। ১৯৯৮ সালে আবিষ্কৃত হয় বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড এবং ২০০৭ সালে এখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। টানা ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে এই ফিল্ড থেকে গ্যাস উৎপাদন চলছে। বিবিয়ানা ছাড়াও শেভরন জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে, যেখানে দৈনিক উৎপাদন যথাক্রমে ১৩১ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ১০ মিলিয়ন ঘনফুট।
দেশের গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। দেশে এলএনজি আমদানির জন্য নির্মিত প্রথম টার্মিনালটিও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় স্থাপন করা হয়। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট থেকে এ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতার মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সাত বছরের বেশি সময় ধরে কোম্পানিটি পেট্রোবাংলার সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ করছে। পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও পেট্রোবাংলাকে এলএনজি সরবরাহ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই চুক্তির অংশ হিসেবে মার্কিন এলএনজির জন্য দীর্ঘমেয়াদি অগ্রিম ক্রয়চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ফলে জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ঢাকা সফররত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। পরে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তিনি বলেন, “যেসব সরবরাহের প্রতিশ্রুতি ছিল, সেগুলোর কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি সংকটকালে তারা কীভাবে আমাদের সহায়তা করতে পারে। আমরা দীর্ঘমেয়াদে তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী এবং বর্তমান সংকটেও সহযোগিতা চেয়েছি।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি। ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ যেকোনো উৎস থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন এ
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)’র নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ১৯টি সুপারিশ করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে-পরে সারা দেশে দুই মাসব্যাপী পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিস্তারিত মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক শাসন ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, এ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অংশীদারদের অভিন্ন প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হয়েছে এবং নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়েছে। মিশন বেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা বলেছে, এ নির্বাচন আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনী মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছে, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছে এবং প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার প্রবাসী ভোটারের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবেদনে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকরে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচার কমিটির সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধে গৃহীত উদ্যোগ এবং নাগরিক পরিসর পুনরুজ্জীবিত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইভার্স ইজাবস বলেন, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির আলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এসব প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। মিশন ছয়টি অগ্রাধিকার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনের আইনি কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার, নির্বাচনী প্রচারণার অর্থায়ন সংক্রান্ত বিধানগুলো আরও শক্তিশালী করা, নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে ইতিবাচক পদক্ষেপ, ডিজিটাল পরিসর অধিকতর নিরাপদ করার লক্ষ্যে সংস্কার, ভোট গণনায় অধিক স্বচ্ছতা এবং পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের আওতা সম্প্রসারণ। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করে। এ সময় ইইউ সদস্যভুক্ত রাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ড থেকে আসা ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দেশের ৬৪ জেলায় মোতায়েন ছিলেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক বলেছেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক আরও গভীর, বিস্তৃত ও কৌশলগত হয়েছে, যা এখন বাণিজ্য, জলবায়ু, নিরাপত্তা, অভিবাসন ও গণতান্ত্রিক সহযোগিতাসহ নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত। তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটি অংশীদারিত্ব দেখতে পাচ্ছি, যা আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে, অধিকতর কৌশলগত ও ভবিষ্যতমুখী হয়েছে। এটি বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উভয় দেশের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।’ জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ফ্ল্যাগশিপ ‘ডিক্যাব টক’-এ আজ মঙ্গলবার তিনি এসব কথা বলেন। সারা কুক বলেন, ঐতিহ্যগত উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে দুই দেশের সম্পর্ক এখন আধুনিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে। এর আওতায় রাজনৈতিক সংলাপ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জলবায়ু নেতৃত্ব, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো আঞ্চলিক ইস্যুতে সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাজ্য ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে, যাতে সংস্কার, স্থিতিশীলতা ও নির্বাচনের পথ সুগম হয়। বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে উভয় দেশের জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিন্ন অগ্রাধিকার বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে যুক্তরাজ্য আগ্রহী। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রসঙ্গে কুক বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার। তিনি বলেন, ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো অর্থনীতি, পোশাকশিল্প, শিক্ষা ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। হাইকমিশনার জানান, ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের আওতায় বর্তমানে বাংলাদেশের ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরও তিন বছরের রূপান্তরকালীন সময়ে তৈরি পোশাকসহ ৯২ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংস্কার, কাস্টমস আধুনিকায়ন ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা জোরদারে সহায়তা করছে। সারা কুক আরও জানান, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশে ৪৫ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিমান চলাচল খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইউকে এক্সপোর্ট ফাইন্যান্সের মাধ্যমে ২০০ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত সহায়তার সুযোগ রয়েছে। জলবায়ু সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারিতে রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে সহনশীলতা বৃদ্ধি, বন্যা পূর্বাভাস উন্নয়ন ও জলবায়ু অর্থায়ন জোরদারে যুক্তরাজ্য যৌথভাবে কাজ করছে। তিনি বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সাবেক এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ জরিপ জাহাজ বাংলাদেশে হস্তান্তরের সাম্প্রতিক সরকার-টু-সরকার চুক্তিসহ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরেন। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে কুক বলেন, ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাজ্য ৪৫ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডের বেশি মানবিক সহায়তা দিয়েছে এবং টেকসই সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব রয়েছে, যা অভিন্ন মূল্যবোধ, জনগণের সঙ্গে জনগণের দৃঢ় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। কুক উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সাড়ে ছয় লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী ব্রিটিশ অর্থনীতি, সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ব্রিটিশ এই কূটনীতিক পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের চলমান রূপান্তর প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবেই পাশে থাকবে। অনুষ্ঠানে ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েসও বক্তব্য দেন।
পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ‘ফুয়েল লোডিং’ শুরু হয়েছে আজ। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বেলা আড়াইটায় পাবনার ঈশ্বরদীতে এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে (ইউনিট-১) ফুয়েল লোডিং হয়। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালন পর্বে প্রবেশ করে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ফুয়েল লোডিং কি এবং কিভাবে এটি কাজ করে। ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে? ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ছোট ছোট পেলেট ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবের ভেতর সাজিয়ে ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়। এই অ্যাসেম্বলিগুলোকে রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। এটি সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন (চুল্লিতে তাপ উৎপাদন) শুরু করা সম্ভব হয়। ফুয়েল লোডিং একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ‘ফুয়েল লোডিং মেশিন’ বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করা হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। ফুয়েল লোডিংয়ের সময় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ বা রিঅ্যাক্টর ভ্যাসেল পানিতে পূর্ণ রাখা হয়। কারণ পানি বিকিরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এরপর রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিঅ্যাক্টর কোরের ভেতর নির্ধারিত স্থানে বসানো হবে। প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কোথায় বসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে। ফুয়েল বসানোর পর কন্ট্রোল রড (যা ফিশন রিয়্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করে) সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে সফলভাবে লোড করার পর কেন্দ্রটিকে ‘মিনিমাম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায়’ আনা হবে। এই পর্যায়টিকে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি বলা হয়, যেখান থেকে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হবে। তবে আজ জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হলেও বিদ্যুৎ পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও ৩ মাস। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে আজ জ্বালানি লোডিংয়ের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শুরুর তিন মাসের মধ্যে অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।