অর্থনীতি

ব্রিটিশ আমলের বাণিজ্যনীতির ছায়া এখনো বাংলাদেশে

মোঃ ইমরান হোসেন সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিটিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন), বিজনেস আইডেন্টিটিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন), ভ্যাট, কাস্টমস নিবন্ধনসহ ধাপে ধাপে নানা প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা পার হতে হয়।

 

এত সব কাগজপত্রের ঝামেলাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) নিতে হচ্ছে। এসবই মূলত ব্রিটিশ আমলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান অর্থনীতিতে এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই।

 

এই ব্যবস্থার শেকড় প্রোথিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে। বিশ্বযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ায় যুদ্ধ সরঞ্জাম ও জরুরি পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ১৯৩৯ সালে ডিফেন্স অভ ইন্ডিয়া রুলস বা ভারত প্রতিরক্ষা বিধি জারি করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। 

 

দেশভাগের পর নবগঠিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বৈদেশিক মুদ্রার মারাত্মক অভাব দেখা দিলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে ব্রিটিশদের জারি করা বিধি আরও বিস্তৃত করে ১৯৫০ সালে আমদানি-রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করে পাকিস্তান সরকার।

প্রায় আট দশক পরও সেই পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোরই বড় একটি অংশ বহন করছে বাংলাদেশ। 

 

ওই আইনের আওতায় এখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করতে ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে আইআরসি ও ইআরসি নিতে হচ্ছে। আগে এই সনদ প্রতিবছর নবায়ন করতে হতো, এখন পাঁচ বছর মেয়াদে নবায়ন করা যায়। এ সনদ ইস্যু ও নবায়নের জন্য ঢাকায় আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ সারা দেশে মোট ১৪টি আঞ্চলিক দপ্তর রয়েছে।

 

মজার বিষয় হলো, যে পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সালে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আইন প্রণয়ন করেছিল, তারাই ২০০২ সালে আইনটি বাতিল করে দিয়েছে। ফলে পাকিস্তানে আমদানি-রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের আইআরসি-ইআরসির মতো আলাদা সনদ নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। দেশটির ব্যবসায়ীদের কাস্টমসের ওয়েবভিত্তিক ট্রেডার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হয়।

 

এ অবস্থায় আইআরসি ও ইআরসি সনদ গ্রহণ ও তা নবায়নের প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান এ সনদগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

 

তিনি টিবিএসকে বলেন, 'যে আইনের আওতায় বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানি সনদ ইস্যু করা হয়, সেই আইন দুই যুগ আগে পাকিস্তান বাতিল করেছে। শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের কোনো সনদ নিতে হয় না। ভারতে স্থায়ীভাবে একবার সনদ নিতে হয়, তা আর নবায়ন করতে হয় না। 

 

'বাংলাদেশে ডি-রেগুলেশনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাই ইআরসি ও আইআরসি সনদ নেওয়া ও তা নবায়নের বদলে বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নাম্বার ব্যবহারের মাধ্যমেই আমদানি-রপ্তানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।'

 

আইআরসি ও ইআরসির খরচ

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের এক গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে অন্তত ৪৯ ধরনের সনদ ও অনুমতিপত্র নিতে হয়।

 

আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য আমদানির জন্য আইআরসি ফি শুরু হয় ৫ হাজার টাকা থেকে, এর নবায়ন ফি ৩ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ ক্যাটাগরিতে এই আইআরসি ফি বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি হয় ৩২ হাজার টাকা।

 

রপ্তানিকারকদের জন্য রয়েছে ছয় ধরনের নিবন্ধন সনদ। এর প্রতিটির প্রাথমিক ফি শুরু হয় ১০ হাজার টাকা থেকে, নবায়ন ফি ৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে ইনডেনটিং সেবার ইআরসি নেওয়ার ফি ৫০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি ২৫ হাজার টাকা।

 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ঝামেলা কেবল সনদ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, নির্ধারিত ফি দিয়ে এসব সনদ নবায়নের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও পরিচালন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

 

তারা বলছেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই চাপ আরও বেশি। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে নিজস্ব কমপ্লায়েন্স ও প্রশাসনিক টিম রাখতে পারে, সেখানে ছোট ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিতে হয়। এতে আমদানি-রপ্তানির প্রকৃত খরচের বাইরে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় তৈরি হয়।

 

সনদ নেওয়া যেখানে বাধ্যতামূলক, সেখানে এগুলো ইস্যু ও নবায়নের জন্য সারা দেশে প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের আঞ্চলিক দপ্তর আছে মাত্র ১৪টি। ফলে বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের সনদ-সংক্রান্ত কাজের প্রয়োজনে অন্য এলাকায় ছুটতে হয়, যা তাদের বাড়তি সময় ও ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন চিত্র

এশিয়ার বৃহৎ ও উন্নত দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে সাধারণত এ ধরনের সনদ নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক চীনেও বাংলাদেশের আইআরসি ও ইআরসির মতো সনদের ব্যবস্থা নেই। কেবল কাস্টমস নিবন্ধনের মাধ্যমেই দেশটির ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 ভিয়েতনামেও সাধারণ পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো পৃথক সনদের বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতেও বাংলাদেশের মতো পৃথক আইআরসি-ইআরসি নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

 

ফেডারেশন অভ বাংলাদেশ চেম্বারস অভ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, এখনকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় আইআরসি ও ইআরসি সনদের কোনো প্রয়োজন নেই। 

 

ব্যবসা-বিনিয়োগ ও দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের ডি-রেগুলেশনে জোর দিতে হবে এবং পৃথিবীর বেস্ট প্র্যাকটিসগুলোকে অনুসরণ করতে হবে। সেটা না পারলেও অন্তত এই অঞ্চলের বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করা জরুরি,' টিবিএসকে বলেন তিনি।

 

ফজলুল হক জানান, বাংলাদেশে কোন কোন পণ্য আমদানি করা যাবে না এবং কোন পণ্য আমদানি করতে হলে সরকারের কোন দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হবে, তা আমদানি নীতি আদেশে উল্লেখ আছে। 'কাস্টমস প্রসিডিউর অনুসরণ করেই আমদানি করতে হয়। তাই আমদানি করার জন্য পৃথক আমদানি সনদ গ্রহণের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।'

 

'একইভাবে, যেসব পণ্য রপ্তানি করা নিষিদ্ধ, তার তালিকা রপ্তানি নীতি আদেশে রয়েছে এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এক্ষেত্রে পুরো দায়িত্ব পালন করতে পারে। তাই পৃথকভাবে রপ্তানি সনদ নেওয়া বা আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রয়োজন নেই,' বলেন তিনি।

ব্যয়বহুল বোঝা

আইআরসি ও ইআরসি ব্যবস্থা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছিল, যখন বৈদেশিক বাণিজ্য ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয়। কিন্তু বর্তমানের ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস প্রক্রিয়া, ব্যাংকিং নজরদারি এবং কর ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীর পরিচয় ও লেনদেন সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য সংগ্রহের অনেক বেশি কার্যকর উপায় রয়েছে।

 

এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, আইআরসি ও ইআরসি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তুলে দিলে ব্যবসায়ী ও সরকার—উভয়েরই সুবিধা হবে। 'ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে রক্ষা পাবেন, অন্যদিকে এই সনদ ইস্যু ও নবায়নের জন্য সরকার যে বিরাট দপ্তর পরিচালনা করছে, তারও প্রয়োজন হবে না।'

 

অপ্রয়োজনীয় বিধিবিধান পর্যালোচনা করছে সরকার

বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান টিবিএসকে জানান, ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুবিধার্থে সরকার ডিরেগুলেশনের উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি পর্যালোচনা করছে কোন কোন ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজ করা যায়।

 

তিনি বলেন, '১৯৫০ সালের আমদানি-রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইনও আইনও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে একটি বৈঠক করেছি। প্রথম ধাপে আমরা খতিয়ে দেখব এই আইনের অধীনে যেসব সনদ নিতে হয়, সেগুলোর কোনগুলোর এখন আর প্রয়োজন নেই। সেই বাধ্যবাধকতাগুলো তুলে দেওয়া হবে।'

 

বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, 'যদি দেখা যায়, এই আইনেরই কোনো প্রয়োজন নেই, তবে সরকার অবশ্যই বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করবে। আর যদি আইনটি রাখা প্রয়োজনীয় মনে হয়, তবে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি সংশোধন ও সহজ করা হবে।

Popular post
হাইকোর্টের রুল জারি, কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতি কেন অবৈধ নয়

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে। 

কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতি বিতর্ক : উদ্বেগে দুই শতাধিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।   

কৃষি ব্যাংকের ‘ভুয়া সিবিএ সভা’ ঘিরে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না প্যাথলজি-রেডিওলজি রিপোর্টে সরাসরি চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহে ভাটা

পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না।   একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।   এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন।   গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে।   জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।   সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে।   কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে।   প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।   আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’   সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না।   এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।

অর্থনীতি

আরও দেখুন
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে আসার প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দিনের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। তবে সৌদি আরবে হুথিদের নতুন হামলায় পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।   বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ সময় সাড়ে ১০টার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ ডলার বা শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ কমে যায়। এতে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১১৪ দশমিক ৮১ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৮৮ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ৮৮ ডলারে নেমে আসে। দিনের শুরুতে উভয় ধরনের তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছিল।   এরআগে, সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তেহরানে বৈঠক করেন। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো এবং শান্তি ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদার করাই ছিল আলোচনার মূল লক্ষ্য। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চার দেশ আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে।   নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসএস ওয়েলথস্ট্রিটের প্রতিষ্ঠাতা সুগন্ধা সচদেব বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠা তেলের বাজারে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।   গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির আশপাশে তেলবাহী জাহাজে ইরানের ধারাবাহিক হামলার পর ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়। গত এপ্রিলের পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ দাম। সোমবারও দাম ১১৭ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে সৌদি আরবে হুথিদের নতুন হামলায় শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে এই নৌপথ দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে।   এএনজেড রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহ, পরিবহন, মজুত ও তেল পরিশোধন খাতে চাপের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি টানা চতুর্থ সপ্তাহের মতো কমেছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে পরিশোধিত জ্বালানির মজুত গত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম রয়েছে।

মো: দেলোয়ার হোসাইন অক্টোবর ২৭, ২০২৬

বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায় জাপান

সংগৃহীত ছবি

বিশ্বজুড়ে আগামী বছরেও কাটবে না জ্বালানি সংকট: আইইএ প্রধান

সংগৃহীত ছবি

আগামী ১৫ বছরে এশিয়ার জ্বালানিতে প্রয়োজন ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ

ছবি: সংগৃহীত
এক দশকে ধাপে ধাপে পতন, অবশেষে বন্ধ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স

ব্যবসায়িক মন্দায় বন্ধ হয়ে গেছে বহু বছরের পুরনো রাজধানীর শান্তিনগরের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স।   শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত এই মার্কেটটি এক সময়ে রাজধানীর অভিজাত শপিং মলগুলোর একটি ছিল। কিন্তু নানা কারণে ক্রমেই মার্কেটটি ব্যবসায়ীকভাবে পিছিয়ে পড়ে। লোকসান দিতে দিতে আর উপায় না দেখে অক্টোবরের প্রথম দিন থেকে পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এ বিপণি বিতান।   মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক দশকের ধাপে ধাপে পতন হয়েছে এই শপিং মলের। মোটা দাগে এর জন্য ৪টি কারণ দায়ি বলে মনে করছেন তারা। এক শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মানকালীন সময়ে ক্রেতা কমে আসা। দুই কোভিডকালীন ব্যবসায়ীক মন্দা। তিন ভালো ব্যবসায়ীরা চলে যাওয়া ও চতুর্থ কিছু অসৎ ব্যবসায়ীর প্রতারণা।   যে ভবনে কর্ণফুলী গার্ডেন শপিং কমপ্লেক্স অবস্থিত সেটি ২০ তলা। এর নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল শপিং মল এবং উপরের তলাগুলো আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।   ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই শপিং মলে পোশাক, জুতো, প্রসাধনী, গিফট আইটেম এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুম ছিল। চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট ও বাগান। চালুর সময় মার্কেটিতে ১৯৮টি দোকান ছিল। কিন্তু গত অক্টোবরে যখন মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন মাত্র ২০ থেকে ২৫টি দোকান চালু ছিল বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।   ফলে ক্রেতা কমে যাওয়া, সার্ভিস চার্জ না পাওয়া এবং বিদ্যুৎ বিল ৫০ লাখ টাকার বেশি বকেয়া পড়ার পর টানা লোকসানের মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। অবশেষে দোকান মালিক সমিতি সম্মিলিতভাবে পুরো মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রোববার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটে প্রবেশের প্রধান ফটকের সাটার নামানো। উপরে ঝুলছে বন্ধের ব্যানার; তাতে লেখা, ‘১/১০/২০২৬ ইং তারিখ হতে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকিবে।”   তবে মুল গেটের বামপাশে কাচ্ছি ডাইন, হটকেক, ডানপাশে পোষাকের ব্রান্ড রেমন্ড, মেজবান ডাইনসহ কিছু খাবারের দোকান খোলা রয়েছে। এই মার্কেটে ২০১৭ সাল থেকে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল ঘড়ি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এক্কোচি’। মার্কেটের নিচ তলায় ছিল তাদের দোকান। দীর্ঘদিন সরাসরি ক্রেতার উপস্থিতি না থাকায় তারা মূলত অনলাইন গ্রাহকদের ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসা পরিচালনা করত। মার্কেটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেইলি রোডের ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টারে দোকান স্থানান্তর করে প্রতিষ্ঠানটি।   এক্কোচি এর দায়িত্বে থাকা মো. শফিউল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মার্কেট বিক্রি হয়ে গেছে। এটা একটা পার্টি কিনে নিচ্ছে। হয়ত হাসপাতাল বা অন্য কিছু করবে। মার্কেট তো আর করবে না।” কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবাল বলেন, “এটা আমরা বিক্রি করে দিচ্ছি। সব মালিকরা মিলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। এটা হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার হতে পারে। হতে পারে টিভি সেন্টার বা অন্য যে কোনো অফিস।”   বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ও অনিয়মিত সার্ভিস চার্জ প্রসঙ্গে মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী (আনন্দ শাহ) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সার্ভিস চার্জ আসতেছিল না, কারেন্ট বিল ডিউ হয়ে গেছে প্রায় ৫০ লাখ। যার কারণে সব মালিকরা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিয়ে মার্কেট বন্ধ রেখেছে।”   তবে মার্কেটের নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মচারীদের বেতন এবং দৈনন্দিন সামান্য খরচ তোলার জন্য গেইটের মুখে কিছু দোকান খোলা রাখা হয়েছে বলে তথ্য দেন বাকীবিল্লাহ। তিনি বলেন, “এই কয়েকটা দোকানের ভাড়া উঠায় সিকিউরিটি, একজন ম্যানেজার এদের বেতনটা যাতে দেওয়া। কিছুটা ঋণ করে হলেও এটার জন্য শুধু এই কয়েকটা দোকান খোলা রাখা হয়েছে।”   এদিকে মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হলেও ভবনের ওপরের অংশের আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টগুলো পুরোপুরি আলাদা। এগুলো বন্ধের সিদ্বান্তের আওতামুক্ত বলে জানিয়েছে মার্কেট কর্তৃপক্ষ। কর্ণফুলী গ্রুপের হাত ধরে তৈরি হওয়া এই মার্কেটটির অধিকাংশ দোকান অনেক আগেই ব্যক্তিগত মালিকানায় রেজিস্ট্রি করে বিক্রি করে দেয় ওই কোম্পানি। বর্তমানে বন্ধ হওয়া মার্কেট ভবনে হাসপাতাল, করপোরেট অফিস বা ব্যাংক করার উদ্দেশ্যে একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা চলছে বলে জানিয়েছেন বাকীবিল্লাহ।   তিনি বলেন, “কয়েকটা পার্টির সাথে আমাদের কথা হচ্ছে। কারো সাথে ফাইনাল কিছু হয় নাই। কোন চুক্তিও হয় নাই। অনেকগুলা কোম্পানি; হসপিটাল আছে, করপোরেট কোম্পানি আছে, ব্যাংক আছে।”   চার কারণে মার্কেটে ‘ধস’ বিগত এক দশক ধরে ধাপে ধাপে মার্কেটটির পতন ঘটেছে বলে দাবি করেছেন কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ীরা। বন্ধ ঘোষণার আগের ব্যবসায়িক অবস্থা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে একোচ্চির মো. শফিউল বলেন, “মার্কেটে কাস্টমার ছিল না, একদম ডাউন ছিল। অনলাইন গ্রাহকদের ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসা পরিচালনা করতাম। ধারাবাহিকভাবে মার্কেটটা বন্ধ হইছে। বিগত প্রায় ১০ বছর মিলায়ে আস্তে আস্তে এই মার্কেটটা ফল করেছে।”   মার্কেটটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কিছু ব্যবসায়ী বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের দীর্ঘ সময় রাস্তাঘাট বন্ধ ও সংস্কার কাজের কারণে ক্রেতারা মার্কেটে আসা বন্ধ করে দেন। এতে ভালো ব্যবসায়ীরা অন্য মার্কেটে চলে যান এবং আর ফিরে আসেননি। এরপর কোভিডের সময় দীর্ঘ লকডাউনে ব্যবসায় ধস নামলে অবশিষ্ট ভালো ব্যবসায়ীরাও চলে যান। সে সময় কিছু অসাধু ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ী জিনজিরা ও চকবাজারের তৈরি নিম্নমানের পণ্য এনে বিদেশি বলে বিক্রি করায় অভিজাত ও বিশ্বস্ত ক্রেতারা মার্কেটের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেন। এর মধ্যই ই-কমার্স ও ফেইসবুক কেন্দ্রিক কেনাকাটা বাড়ার পাশাপাশি বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্কের মত বিশাল শপিং মলের সঙ্গে ছোট এই মার্কেটটি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি।   দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী বলেন, “ফ্লাইওভারটা তৈরির সময় থেকে সংস্কারের কাজের জন্য লোকজন এই মার্কেটে ঢুকত না। তখন ভালো কিছু ব্যবসায়ী এই মার্কেট থেকে চলে যায়। অন্যান্য মার্কেটে গিয়ে তারা টেম্পোরারি চিন্তা করছিল আবার রাস্তাঘাট ঠিক হলে … কিন্তু সেই ব্যবসায়ীরা তারা আর ফেরত আসে নাই। কোভিডের সময় যে মার্কেটটা বন্ধ হল, কিছু দোকানদার ভালো ভালো ব্যবসায়ী চলে গেল, তারাও আর রিটার্ন করে নাই।   “এটা ইন্টারনেটের যুগ। আমরা ঘরে বসেই সবকিছু অর্ডার করি। জুতা হতে শুরু করে বাচ্চার টুপিটা পর্যন্ত সেখানে পাওয়া যায়। বড় সুপার মার্কেটগুলোর চেয়ে যেমন বসুন্ধরা, যমুনা আমার এখানে দোকান কম। একটা কাস্টমার আসলে শার্ট পেলে প্যান্ট খুঁজে পায় না। যার কারণে আমার এইখানে আর ঢোকে না।”   অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেন বাকীবিল্লাহ। তিনি বলেন, “কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তারা পণ্য আনত জিঞ্জিরা, চকবাজার থেকে। কিন্তু বলত দুবাই থেকে আনছে। ফলে প্রিমিয়াম ও বিশ্বস্ত কাস্টমারগুলা এখান থেকে ছুটে গেছে।”

মো: দেলোয়ার হোসাইন অক্টোবর ২৬, ২০২৬

ঢাকায় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা দুই সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে বড় চ্যালেঞ্জ: সড়ক মন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ, পঞ্চগড়ে যমুনা ব্যাংকের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শুরু

বাংলাদেশে ৬৩৫ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্যোগ জাপানের

বিশ্ববাজারে ডানা মেলতে প্রস্তুত ঢাকাই মসলিন

সরকারের দূরদর্শী উদ্যোগ, বিজ্ঞানীদের নিরলস জিনোম গবেষণা ও প্রান্তিক নারী কারিগরদের আঙুলের জাদুতে কিংবদন্তীর ‘বোনা বাতাস’ বা ‘হাওয়াই কাপড়’ ঢাকাই মসলিন রূপকথার পাতা থেকে বাস্তবে ফিরে এসেছে। সুতা তৈরির আদি প্রযুক্তি ও কাঁচামাল পুনরুদ্ধার করে মসলিন এখন বাণিজ্যিকভাবে বিশ্ববাজারে ডানা মেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েছে।   এক খণ্ড সাদা মেঘের মতো স্বচ্ছ, ভোরের শিশিরের মতো স্নিগ্ধ আর বাতাসে ওড়ানো সুতোর মতো হালকা ঢাকাই মসলিন খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকেই বিশ্বের প্রথম সারির লাক্সারি ব্র্যান্ড হিসেবে রোমান, গ্রিক ও আরব সাম্রাজ্যে সমাদৃত ছিল।   মুঘল আমলে এর আভিজাত্য এমন শিখরে পৌঁছায় যে মসলিনের শ্রেষ্ঠ সংস্করণ ‘মলমল খাস’ শুধু সম্রাটদের পরিধানের জন্য সংরক্ষিত থাকত।   নকশা ও গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে বাঙালির শৈল্পিক অহংকার ও বুননশিল্পের পরম পরাকাষ্ঠা মসলিনের ছিল বিভিন্ন কাব্যিক নাম। যেমন: আবে-রওয়ান (প্রবাহিত পানি) ও শবনম (ভোরের শিশির)।   একটি আস্ত শাড়ি দিয়াশলাইয়ের বাক্সে এঁটে যাওয়া কিংবা একটি ছোট আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে পার করে দেওয়ার গল্পগুলো মসলিনের অকল্পনীয় সূক্ষ্মতার ঐতিহাসিক প্রমাণ দেয়।   প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮শ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ম্যানচেস্টারের মিলের তৈরি সস্তা কাপড়ের আগ্রাসন, দেশীয় তাঁতিদের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন (যেমন বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দেওয়া) ও শাস্তিমূলক উচ্চ শুল্ক আরোপ এই শিল্পের টুঁটি চেপে ধরে।   মসলিন তৈরির একমাত্র বিশেষ কাঁচামাল— মেঘনা নদীর অববাহিকায় জন্মানো ‘ফুটি কার্পাস’ তুলা গাছটি একপর্যায়ে প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, যা এই শিল্পের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। ১৮৫০ সালে লন্ডনের মহাপ্রদর্শনীতে শেষবারের মতো আদি ঢাকাই মসলিন প্রদর্শিত হয়েছিল, এরপর এটি কেবলই ইতিহাস হয়ে যায়।   ঢাকাই মসলিন বুনন শুধু একটি সাধারণ কায়িক শ্রম ছিল না, এটি ছিল আবহাওয়ার সাথে জড়িত এক জটিল লোকজ বিজ্ঞান। ফুটি কার্পাসের অতি-মিহি সুতা শুকনো বাতাসে ভেঙে যায়। তাই মসলিনের সুতা কাটার জন্য ভোরের সূর্য ওঠার আগের ও সন্ধ্যার পরের আর্দ্র আবহাওয়া বেছে নেওয়া হতো।   বিশেষ করে, শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকার স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা এই সুতা কাটার জন্য প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ ছিল। তুলা মাঠ থেকে সংগ্রহ করা, আঁশ ছাড়ানো, বিশেষ বোয়ালের চোয়ালের হাড় দিয়ে তুলা পরিষ্কার করা, অতি-সূক্ষ্ম তকলি ও চরকায় সুতা কাটা, সুতা ধোয়া ও বিশেষ নকশায় তাঁতে বুনন পর্যন্ত মোট ১৬টি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ধাপ পার করে তবেই একটি আসল ঢাকাই মসলিন তৈরি হতো।   ২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড মসলিন পুনরুদ্ধারে একটি উচ্চপর্যায়ের গবেষক দল গঠন করে। গবেষক দলটির এই দীর্ঘ যাত্রা ছিল কোনো বৈজ্ঞানিক থ্রিলার উপন্যাসের মতোই রোমাঞ্চকর।   ১৭৮৮ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের লেখা বইয়ের স্কেচ ও ঐতিহাসিক সূত্র ধরে গবেষকেরা কাপাসিয়া, গাজীপুর, বাঘাবাড়ী ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে ৩৯টি বন্য তুলার জাত সংগ্রহ করেন।   লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আদি মসলিনের সুতার নমুনার সাথে সংগৃহীত তুলার ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ও জিনোম ম্যাচিং করে অবশেষে শতভাগ খাঁটি ‘ফুটি কার্পাস’ শনাক্ত ও চাষ করা হয়। মসলিন বোনার জন্য আদি ৫০টিরও বেশি বিশেষ তৈরি যন্ত্রপাতি আবার নতুন করে প্রস্তুত করতে হয়েছে।   সাধারণ সুতির কাপড়ের কাউন্ট যেখানে ৪০ থেকে ৮০ হয়, সেখানে পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিনের সুতা ৭৩১ থেকে ৭৫০ মেট্রিক কাউন্ট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে, যা কাপড়টিকে শিশিরের মতো স্বচ্ছতা দেয়।   ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে, যা আন্তর্জাতিক মহলে এর একক মালিকানা ও স্বত্ব নিশ্চিত করেছে।   মসলিন এখন গবেষণাগারের বা প্রদর্শনীর বস্তু থেকে জীবন্ত বাণিজ্যিক শিল্পে রূপ লাভ করছে। প্রথম ধাপের সফলতার পর সরকার বর্তমানে ১৮.৫ কোটি টাকার (১৮৫ মিলিয়ন বিডিটি) দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।   এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সামাজিক দিক হলো, মসলিনের এই অতি-সূক্ষ্ম সুতা কাটার জন্য ৩শরও বেশি প্রান্তিক নারীকে সুনিপুণভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ স্পিনারে রূপান্তর করা হয়েছে, যারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছেন।   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো বড় দেশগুলোর লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলো এই পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিন ক্রয়ে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের একটি বড় অর্ডারও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।   নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে নির্মিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’-কে কেন্দ্র করে বর্তমানে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।   সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক সেমিনারে ফুটি কার্পাসের জাত আরও উন্নত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কাঁচামালের ঘাটতি মেটাতে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার গ্রামীণ চাষিদের সাথে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।   প্রথম দিকে একটি শাড়ির উৎপাদন খরচ ৩.৬০ লাখ টাকা হলেও ব্যাপকভিত্তিক উৎপাদনের মাধ্যমে তা ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একটি সুনিপুণ মসলিন শাড়ি বুনতে ২ থেকে ৪ জন তাঁতির কয়েক মাস সময় লাগে।   তাই এটি মূলত বিশ্ববাজারের উচ্চবিত্তদের জন্য একটি প্রিমিয়াম লাক্সারি ফ্যাশন হিসেবে স্থান করে নেবে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের ফলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তৈরি পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে উচ্চ-মূল্যের আন্তর্জাতিক লাক্সারি রপ্তানি খাতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।   বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি হলেও, বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের পর এবং ব্যাপকভিত্তিক চাষাবাদ শুরু হলে শাড়ির বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি অক্টোবর ২৬, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

সোনার দাম কেন বাড়ে-কমে, কীভাবে নির্ধারিত হয় মূল্য

ছবি: সংগৃহীত

শেয়ারবাজারের অনিয়ম তদন্তে ডিএসইকে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ

ছবি: সংগৃহীত

মালয়েশিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ, গুরুত্ব পাবে বাজার ও ব্যবসায়িক সুবিধা

0 Comments