বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চার স্বতন্ত্র পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির আগের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে নতুন পর্ষদ গঠন করেছিল, ওই চারজন সেই পর্ষদের সদস্য ছিলেন।
পদত্যাগ করা চার পরিচালক হলেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. শাহীন উল ইসলাম, এনআরবি ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. আব্দুল ওয়াদুদ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মোহাম্মদ আশরাফুল হাসান (এফসিএ) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম আবু ইউসুফ।
২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা শাহরিয়ারকে চেয়ারম্যান করে পাঁচ স্বতন্ত্র পরিচালকের সমন্বয়ে ব্যাংকটির নতুন পর্ষদ গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে ওই পাঁচজনের মধ্যে খাজা শাহরিয়ারই শুধু স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগেই ওই স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পুরোনো মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনা হলে আগের স্বতন্ত্র পরিচালকদের পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, চলতি বছরের ১৫ জুলাই পুরোনো মালিকপক্ষের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে নতুন পর্ষদ গঠনের পর স্বতন্ত্র পরিচালকেরা বিভিন্ন বিষয়ে অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন।
গত ১৫ জুলাই আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের জন্য ১৩ সদস্যের নতুন পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন পরিচালকদের মধ্যে পাঁচজন চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ভাই আব্দুস সামাদ লাবু। নতুন পর্ষদে যুক্ত হওয়া কয়েকজন পরিচালক আগের পর্ষদেও ছিলেন।
নতুন পর্ষদে বদিউর রহমানকে চেয়ারম্যান এবং লিয়াকত আলী চৌধুরীকে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, তাঁর ছেলে সেলিম রহমান, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি মাহবুব আহমেদ, মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, নাজমুল আহসান খালেদ, মো. এনায়েত উল্লা, আহামেদুল হক, মোহাম্মদ ইমাদুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম, আনোয়ার হোসাইন ও মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ।
এনায়েত উল্লা সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পর চার স্বতন্ত্র পরিচালকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ব্যাংকটির পরিচালনা কাঠামোয় আরও একটি পরিবর্তন এলো।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)। একই সময় পেয়েছে নেপালও। উত্তরণের আগে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ ও নেপাল সরকার অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল। নিউইয়র্কে আজ অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের দুই দিনের মাথায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএনসিডিপি) কাছে চিঠি দিয়ে উত্তরণের সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সামনে থাকা গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলোর কথা স্বীকার করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি বলেছে, সাম্প্রতিক সংঘাত এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে অনিশ্চিত মাত্রার ঝুঁকি বেড়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, সাম্প্রতিক অভিঘাতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ আরও উল্লেখ করেছে, ইউএনসিডিপির মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিদ্যমান এলডিসি উত্তরণ কাঠামোয় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের জটিলতা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিবেচনার দাবি রাখে। সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় বহিরাগত অভিঘাতের প্রভাব বাড়িয়ে দেয় এবং এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে বর্ধিত প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া ও অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ কৌশল বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে ইউএনসিডিপির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদনে নিয়মিত তথ্য দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের চিঠি পাওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইউএনসিডিপির ২৮তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে এ অনুরোধ মূল্যায়নের জন্য একটি প্যানেল গঠন করা হয়। পরে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনার জন্য সাধারণ পরিষদে সুপারিশ করে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি জানান, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। জি-৭৭ভুক্ত দেশগুলো এ আবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) বাংলাদেশের অনুরোধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিন বছর সময় বাড়ানোর ফলে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিতে গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আশঙ্কা থেকে আপাতত স্বস্তি মিলবে। উত্তরণের প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করা এবং প্রক্রিয়াটি মসৃণ করতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সরকারকে সময় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের পণ্য প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিকারকেরা ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্য জোটে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছেন। দেশের মোট রপ্তানির ৭৩ শতাংশ এলডিসিভিত্তিক বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার আওতায় রয়েছে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ইভিআই)—এই তিনটি মানদণ্ড পূরণ করায় চলতি বছর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা ছিল। ২০১৮ সালের পর জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশ তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে। এর আগে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বাংলাদেশকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য দুই বছর অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) উত্তরণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৩০৭ ডলার। ওই সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ছিল ২ হাজার ৬৮৪ ডলার। একই পর্যালোচনায় এলডিসি উত্তরণের জন্য মানবসম্পদ সূচকের (এইচএআই) ন্যূনতম মান নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৯ দশমিক ৬। বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৭ দশমিক ৫। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের (ইভিআই) সীমা ছিল ৪০ দশমিক ৬। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২১ দশমিক ৯। সব কটি মানদণ্ড পূরণ করলেও উত্তরণ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অর্জিত উন্নয়ন ধরে রাখাই বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বৃহত্তম এলডিসি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে জটিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হচ্ছে, যা কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রগতিকে চাপে ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউএনসিডিপির দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো দেশটি উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করেছিল। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য একটি দেশকে অন্তত দুটি মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করেছে। তবে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের পরও পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এ অবস্থান ধরে রাখতে হয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার, যা জাতিসংঘ নির্ধারিত ১ হাজার ২২২ ডলারের সীমার চেয়ে বেশি। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৫ দশমিক ৩, যেখানে জাতিসংঘের নির্ধারিত সীমা ছিল ৬৬। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৭ দশমিক ৩, যা উত্তরণের জন্য নির্ধারিত ৩২-এর সীমার নিচে।
বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, বকেয়া পরিশোধ, সুদ পরিশোধের ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার। পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও পুনঃঅর্থায়নে ব্যয়ের সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের তুলনায় পরিশোধ বেশি হওয়ায় সরকারের অর্থের চাহিদা বেড়েছে। এজন্য ব্যাংক খাত থেকে ব্যয়ের অর্থ সংগ্রহ প্রতি মাসেই বাড়ছে সরকারের। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। তবে ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত তারল্য থাকায় এ ঋণের কারণে সুদহারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে না। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমাতে হবে। সরকার যদি ব্যাংক ঋণের বড় অংশই নিয়ে নেয় তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ সংকটে পড়বে। বর্তমানে ট্রেজারি বন্ড ও বিলের সুদহার অনেক বেশি। যদি সরকারকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ ব্যাংকগুলোর বেশি থাকে, তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থ বছরের শুরু প্রথম দুই মাসে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলেও সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করে। তবে সেপ্টেম্বরে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নতুন করে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা নেয় সরকার। চলতি মাসের শুরুতে বন্ড নিলামে সরকার ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে তিন বছর মেয়াদি বন্ডে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ সুদে ৮০০ কোটি এবং দুই বছর মেয়াদি বন্ডে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়। এর আগে বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলামে ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে সরকার। এ ছাড়া চলতি মাসে মাসে বিলের মাধ্যমে আরও ৩৫ হাজার কোটি এবং বন্ডের মাধ্যমে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৩ হাজার ৮০০ কোটি এবং ডিসেম্বর মাসে ৩৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর আগে জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিলামের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে সরকারের মোট ব্যাংকঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ৩ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা কমে ৯০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকায় নেমেছে। বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) আয়করসংক্রান্ত নথি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত এ আদেশ দেন। দুদকের জনসংযোগ দপ্তর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ, কর ফাঁকি ও ৪৩৯ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও সিআরআইয়ের চেয়ারম্যান সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল। দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান সিআরআইয়ের অনুকূলে ২৩টি কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ কোটি ৩৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা অবৈধভাবে অনুদান হিসেবে সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৩–১৪ অর্থবছর থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সিআরআই মোট ১০০ কোটি ৩১ লাখ ৪০ হাজার ৪৮৬ টাকা আয় করে। অনুসন্ধানে সিআরআইয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও অসংগতি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় দেখানো হয় ২৯ কোটি ৫০ লাখ ৯৮ হাজার ৯৬ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ৭০ কোটি ৮০ লাখ ৪২ হাজার ৩৯০ টাকা থাকার কথা থাকলেও স্থিতি পাওয়া যায় ৫৫ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৬ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫২১ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে অনুসন্ধানকারী সংস্থা। এ ছাড়া সিআরআইয়ের নামে পরিচালিত ২৫টি ব্যাংক হিসাবে ২৪৭ কোটি ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭০ টাকা জমা এবং ১৯১ কোটি ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৩০৯ টাকা উত্তোলন করা হয়। এসব হিসাবে মোট ৪৩৯ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইন লঙ্ঘন করে ৩৬ লাখ ৫২ হাজার ৭৪২ টাকা আয়কর পরিশোধ না করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তর ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।