পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেন তিনি।
সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়েছে।
বেশ কদিন ধরেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন চলছিল। গত সপ্তাহের শেষ দিকে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন বলে বঙ্গভবন সূত্র জানিয়েছে। পদত্যাগপত্রও লেখা হয়। তবে, স্পিকার দেশে না থাকায় তিনি তা জমা দিতে পারেননি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে।
বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি, যিনি সময়ের ব্যবধানে তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। বিভিন্ন মহলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি ওঠে। গণ-অভ্যুত্থানের পর তার অপসারণ চেয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। তবে, সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও তাকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটল। একই সঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রথমবারের মতো নিজেদের পছন্দের কাউকে রাষ্ট্রপতি করার সুযোগ পেল।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে জেলা ও দায়রা জজ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তিনি পাবনা জেলার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এর আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল তিনি ভারতে যান এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে পাবনা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
আধিপত্যবাদবিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি মাতারবাড়ী বিষয়ে সরকারের ভূমিকা জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে সংস্কার বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় মেনে চলা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগের সমালোচনা করেছেন তিনি। মাতারবাড়ী নিয়ে সরকারের অবস্থান কী, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সরকারকে ভুল পথ থেকে সরে আসতে হবে। মুখে আধিপত্যবাদবিরোধী বক্তব্য দিলেও মাতারবাড়ী বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জাতির সামনে পরিষ্কার করা জরুরি। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জাতীয় বিপ্লবী ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আধিপত্যবাদী কোনো শক্তির সঙ্গে এমন চুক্তি করা যাবে না, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশকে কারও হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ নেই। দেশের জনগণ ও তরুণ সমাজ আর আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, আধিপত্যবাদের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন জাতি গঠন, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দূর করার লক্ষ্যে তাঁদের রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত থাকবে। মানবতার মুক্তি ও প্রকৃত স্বাধীন জাতি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রাম চলবে বলেও জানান তিনি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, গণভোটে যে রায় আসবে তা মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু এখন সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে না কেন, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, দেশে আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছে এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে আলোচনার ২০টি বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় গ্রহণ করা হলে দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ বন্ধ করা সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনকে বসানো হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন দক্ষ, স্বচ্ছ ও সৎ ব্যক্তিকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জাতি ইতোমধ্যে জানতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, এমন ব্যক্তির মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কতটা সম্ভব হবে। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) নিয়েও সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিলেন। তাঁদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে নিয়োগব্যবস্থায় মেধার অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। কিন্তু পিএসসির চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্যকে বিদায় করা হয়েছে। অন্য সদস্যদেরও ডাকা হচ্ছে বলে তিনি শুনেছেন। শফিকুর রহমানের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁদের আন্দোলনের পথ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে, যাতে তাঁরা আর এ বিষয়ে সোচ্চার হতে না পারেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দলের নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, তাঁদের কর্মীরা গত ১৭ বছর নির্যাতিত ও বঞ্চিত ছিলেন, তাই এখন তাঁদের মূল্যায়ন করতে হবে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কর্মীদের শুধু পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেছেন, বাকিটা তাঁরা দেখবেন বলে মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের বক্তব্যকে জাতি ও তরুণ সমাজের প্রতি উপহাস বলে উল্লেখ করেন তিনি। জামায়াত আমির বলেন, দলটি এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে বারবার বিপ্লব ফিরে আসার নজির রয়েছে। জাতির প্রয়োজনে বিপ্লব আবারও ফিরে আসতে পারে। সংসদের ভূমিকা নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, তাঁরা সংসদকে অর্থবহ, কার্যকর ও প্রাণবন্ত দেখতে চেয়েছিলেন। প্রথম দিন থেকেই সব বিষয়ে বিরোধিতা করে সংসদ অচল করার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। যৌক্তিক বিষয়ে সহযোগিতা ও সমর্থন এবং অন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নীতিতে তাঁরা চলতে চেয়েছিলেন। তবে সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, সংসদকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেওয়ার আগ্রহ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে বিভিন্ন বিষয় দ্রুত পাস করা হচ্ছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনি ইশতেহার ও সংস্কার প্রস্তাবে ক্ষমতায় গেলে র্যাব বিলুপ্ত করার কথা বলেছিল। কিন্তু বাহিনীটি বিলুপ্ত না করে সংসদে বিল আনা হয়েছে এবং স্পেশাল রেসপন্সিবিলিটি বাহিনী (এসআরবি) গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, র্যাবের কাঠামো ও জনবল আগের মতো রেখেই শুধু নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। পিয়ন থেকে কমান্ডার পর্যন্ত সবাইকে একই জায়গায় রাখা হয়েছে; পোশাক ও লোগোও অপরিবর্তিত রয়েছে। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতন ও অপরাধের অভিযোগের বিচার কীভাবে হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। আগের সদস্যদের একই দায়িত্বে রাখলে তাঁরা প্রমাণ ও আলামত নষ্ট করতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি জানান, তাঁদের প্রস্তাব ছিল র্যাব বিলুপ্ত করে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আলোচনা ও সময় নিয়ে নতুনভাবে বাহিনী গঠন করা। বিভিন্ন বাহিনী থেকে প্রেষণে আসা সদস্যদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সৎ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন বাহিনী গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন তাঁরা। এই প্রস্তাব অযৌক্তিক ছিল কি না, সে প্রশ্ন রাখেন তিনি। সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন ও সংবিধান সংস্কারের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছিল। কিন্তু সরকার এখন সংস্কারের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে। জনগণ সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য তাঁদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এবং নানা প্রস্তাব দিচ্ছে বলেও জানান জামায়াত আমির। তবে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে এসব প্রস্তাবে অংশ নেওয়ার প্রশ্ন আসে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে নতুন দায়িত্ব পালনের জন্য সময় প্রয়োজন—এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণ কোনো শিশুকে ভোট দেয়নি; ভোট দিয়েছে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাদের। ক্ষমতাসীনরা অতীতে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন। তাহলে দায়িত্ব পাওয়ার পর এত অল্প সময়ে এত পরিবর্তন কেন আনা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিরোধী দলের দায়িত্বের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের পক্ষে কথা বলা এবং অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবাদ করা তাঁদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এ কারণেই তাঁদের রাজপথে নামতে হয়েছে। সাত দফা দাবি নিয়ে তাঁদের আন্দোলন চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব দাবি কোনো দলের একক দাবি নয়, বরং জনগণের দাবি। তিনি আরও বলেন, সংস্কার বাস্তবায়ন করতেই হবে। কেউ সমর্থন করুক বা না করুক, জনগণের মুক্তির জন্য সংস্কারের বিকল্প নেই। ২০২৪ সালের আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা প্রসঙ্গে দলটির আমির বলেন, ওই আন্দোলনে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলের নেতাদের হত্যা, বাড়িঘর ভাঙচুর, কার্যালয় বন্ধ, নিবন্ধন বাতিল, প্রতীক বাতিল এবং দল নিষিদ্ধ করার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এত নির্যাতনের পরও ২০২৪ সালের আন্দোলনের কৃতিত্ব জামায়াতে ইসলামী দাবি করেনি বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা কখনো বলেননি যে এই আন্দোলনের কারিগর বা মূল পরিকল্পনাকারী তাঁরাই। ২০২৪ সালের আন্দোলনকে দেশের মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত হিসেবে দেখেন বলে জানান তিনি। এ জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি নিজেদের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনার কথাও বলেন। আন্দোলনে শহীদদের পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, দেশে ও বিদেশে যাঁদের যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, তা দিয়ে শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং আহত ব্যক্তিদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চলমান আন্দোলনে সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি বলেছে, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলন চলাকালে সহিংসতায় জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে কারখানার মালিকপক্ষ এবং রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র সমর্থকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, কারখানায় ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এইচআরডব্লিউর মতে, আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় যতটুকু বলপ্রয়োগ অপরিহার্য, ততটুকুই করতে পারে। প্রতিবেদনে গত ৩ নভেম্বর তৌফিক হোসেন নামে এক পোশাকশ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। নিহতের এক সহকর্মীর বরাতে সংস্থাটি জানায়, দুপুরের খাবারের পর কারখানায় ফেরার পথে তৌফিক আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া একটি দলের সামনে পড়েন। পরে ওই সহকর্মী তাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তার অভিযোগ, ভাড়া করা ব্যক্তিরা তৌফিককে মারধর করেছিলেন। বর্তমানে আন্দোলনরত শ্রমিকরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে গত ১ নভেম্বর সরকার নতুন একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। ৩১ বছর বয়সী এক নারী সেলাই মেশিন অপারেটর নিজের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে জানান, তার মাসিক বাসাভাড়া ৬ হাজার টাকা এবং রান্নার গ্যাসের খরচ ২ হাজার ৩০০ টাকা। অথচ মাসে তার আয় মাত্র ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাভাবে চলতি বছর সন্তানদের স্কুলেও পাঠাতে পারছেন না তিনি। এইচআরডব্লিউ বলছে, শ্রমিকদের মজুরি ও জীবিকা নির্বাহের সংকট সমাধানের পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উসকানির অভিযোগ তুলছে। গত ৩ নভেম্বর ঢাকা পুলিশ নাশকতার অভিযোগে আওয়ামী লীগের ৩৩ জন সমর্থককে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। অন্যদিকে, আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর বিএনপির যুব সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগও উঠেছে। এ ছাড়া উসকানি দেওয়ার অভিযোগে একই দিন আশুলিয়া থেকে তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করা হয়। পুলিশ হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাও করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া এক শ্রমিকের ২৮ বছর বয়সী স্ত্রী এইচআরডব্লিউকে জানান, তার স্বামী অল্প সময়ের জন্য আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তবে কোনো ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন ওই নারী। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি সরকার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এপ্রিলে শ্রম আইনের সংশোধনীতে প্রতি তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্মূল্যায়নের বিধান যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের কালোতালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে তাদের চাকরিচ্যুত করা বা অন্য কারখানায় চাকরি পাওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত করার বিষয়টিও নিষিদ্ধ করা হয়। এইচআরডব্লিউ মনে করে, মজুরি নিয়ে আলোচনা ও শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চলমান সহিংসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে কারখানার মালিকদের এমন কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি করা উচিত নয়, যার ফলে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন বাড়ে কিংবা ন্যায্য মজুরি প্রদানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।
একদিকে শ্রমিক অসন্তোষে কয়েক দিন ধরে উৎপাদন ব্যাহত, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য রফতানির চাপ। এর সঙ্গে রয়েছে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার উদ্বেগ। সাভার-আশুলিয়ার পোশাক কারখানাগুলোতে সাম্প্রতিক শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং রফতানি কার্যক্রম সচল রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্পমালিকদের সামনে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক দিনের উৎপাদন বিঘ্নের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি। এমনিতেই বৈশ্বিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে আসা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো চাপে রয়েছে এই খাত। সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ৩১ অক্টোবর থেকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি ও ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে, যা ৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলে। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ৩১ অক্টোবর অন্তত ২৫টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ২ নভেম্বর শিল্প পুলিশের হিসাবে প্রায় ৪০টি কারখানা বন্ধ ছিল। পরদিন ৩ নভেম্বর শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ৪ নভেম্বর এ সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়ায়। ৫ নভেম্বর অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও এদিন অন্তত ৭০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ছিল। সংঘর্ষে পুলিশের অন্তত ৫০ সদস্য আহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম। আহতদের মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ ও সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম রয়েছেন। আহত হয়েছেন শ্রমিকেরাও। এ ছাড়া ৪ নভেম্বর হেমায়েতপুরে সংবাদ সংগ্রহের সময় পাঁচ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হামলার শিকার হন। কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় কয়েক দিনে আশুলিয়া থানা ও সাভার মডেল থানায় মোট আটটি মামলা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তফিজুর রহমান। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। প্রথমে ১১ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানায় পুলিশ। পরে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে এক দিনে ৪০ জনকে গ্রেফতারের কথা জানান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও আটকের তথ্য পাওয়া যায়। ৫ নভেম্বর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে শ্রমিকদের মজুরি, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শ্রমিকদের দাবির সমাধানের পাশাপাশি কারখানায় নিরাপদ ও স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন ব্যাহত হলে চাপ বাড়বে শিপমেন্টে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু মনে করেন, কয়েক দিনের উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব পড়বে রফতানি পণ্য পাঠানোর সময়সূচিতে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের বড়দিন সামনে রেখে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে অধিকাংশ রফতানি কার্যক্রম শেষ করার চাপ থাকে। খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘আন্দোলনের কারণে পোশাক কারখানাগুলো প্রায় কয়েক দিন বন্ধ থাকায় শিপমেন্ট নিয়ে চাপে পড়েছেন মালিকেরা। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরের বড়দিনকে কেন্দ্র করে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে অধিকাংশ রফতানি কার্যক্রম শেষ করার কথা থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় সময়মতো পণ্য পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’ শ্রমিকদের দাবি ও মজুরি নিয়ে অসন্তোষ নিরসনে কারখানায় কার্যকর ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনার সুযোগ থাকলে পরিস্থিতি সহিংস পর্যায়ে যাওয়ার আগেই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারতো। তিনি বলেন, কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিকদের দাবি ও মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা দেওয়া সম্ভব হতো। এতে শ্রমিকেরা আইন অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে পারতেন। কিন্তু কারখানায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার না থাকায় পরিস্থিতি সহিংস পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও সরকারের প্রশাসনেরও ব্যর্থতা রয়েছে। এমনিতেই বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে পোশাকশিল্পে ক্রয়াদেশ কমে আসা এবং দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিছু কারখানা আগে থেকেই বন্ধ। এর মধ্যে আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ও শিপমেন্ট ব্যাহত হওয়ায় শিল্পের সংকট আরও বাড়ছে। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ে পণ্য রফতানি করতে না পারলে মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ তার মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার এবং কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মালিকেরা যাতে নিরাপদে উৎপাদন চালিয়ে পণ্য রফতানি করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, পোশাকশিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লে এর প্রভাব শ্রমিকদের ওপরও পড়বে। বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই শিল্পে কাজ করছেন। নতুন করে কারখানা বন্ধ হলে আরও অনেক শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন খাইরুল মামুন মিন্টু। তিনি আরও বলেন, ‘মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের দাবি ও অসন্তোষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের আপাতত কর্মস্থলে ফিরে উৎপাদন সচল রাখা প্রয়োজন। তবে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলে কাজে ফেরা কঠিন হবে। তাই শ্রমিকদের বাড়িতে গিয়ে পুলিশি তল্লাশি বা হয়রানির অভিযোগের মতো পরিস্থিতি বন্ধ করে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’ আন্দোলনে ভাঙচুরের দায় নিয়ে প্রশ্ন শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে শ্রম আইন বাস্তবায়ন না হওয়া এবং মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্বকে দায়ী করছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন। তার অভিযোগ, মালিকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রভাবের কারণে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের মধ্যে ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনাকে শ্রমিকদের কর্মকাণ্ড বলে মানতে নারাজ তিনি। রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন সময় একদল ক্ষমতায় আসে, অন্য দল ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে শিল্পের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। ‘মে মাসে মজুরি বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও বিজিএমইএকে বিষয়টি জানিয়ে আসছি। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন-সংগ্রাম চালানোর পরও মালিকপক্ষ দাবি না শোনায় শ্রমিকেরা মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তবে আন্দোলনের মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। এসব কর্মকাণ্ড শ্রমিকদের নয়। শ্রমিকেরা কখনো নিজেদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত কারখানার মেশিনের একটি সুতা পর্যন্ত ছিঁড়তে চান না’, যোগ করেন তিনি। মজুরি বৃদ্ধির দাবির পক্ষে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অবস্থান তুলে ধরে রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, তাদের দাবি ৩০০ ডলার বা প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মজুরি বৃদ্ধির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৩৫টি শ্রমিক ফেডারেশন মিলে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০০ ডলার বা প্রায় ৩৬ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোয় একজন পিয়নের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৩৮ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকে আমরা দেখছি, যখনই পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধির সময় আসে, তখনই মালিকদের একাংশ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিকদের বেশি মজুরি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি থেকে বঞ্চিত করতে কিছু সুবিধাভোগী মালিকের উসকানিতেও ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।’ শুধু বেতন বাড়ালেই জীবনমানের উন্নতি হবে না শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাভারের ওডিসি ক্রাফট প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক খান। তার মতে, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে বেতন বৃদ্ধির সুফল শ্রমিকেরা পুরোপুরি পাবেন না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। আবু বকর সিদ্দিক খান বলেন, ‘গার্মেন্টসশিল্পে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শুধু বেতন বাড়িয়ে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বর্ধিত বেতনের সুফল শ্রমিকেরা পুরোপুরি পাচ্ছেন না। ‘একজন নতুন শ্রমিকের মূল বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা হলেও বাধ্যতামূলক দুই ঘণ্টা ওভারটাইমসহ মাস শেষে তিনি ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা পান। এর সঙ্গে হাজিরা বোনাসও যুক্ত হয়। তবে একজন নতুন শ্রমিককে কাজে দক্ষ করে তুলতে প্রথম তিন মাস প্রশিক্ষণ দিতে হয়। এ সময় তার পেছনে অতিরিক্ত জনবল ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। অন্যদিকে, দেশের বাইরে অনেক প্রতিযোগী দেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশের শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।’ কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন না হলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হয় বলে জানান এই উদ্যোক্তা। তাঁর মতে, ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য তৈরি ও রফতানি করতে হয়। ফলে কয়েক দিনের উৎপাদন বন্ধও শিপমেন্টের সময়সূচিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তিনি বলেন, ‘বছরে যে কয় দিন কারখানা বন্ধ থাকে, তার মধ্যেও শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধা দিতে হয়। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকলে সেই খরচ পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে পোশাকশিল্পে ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য তৈরি ও রফতানি করতে হয়। সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে শিপমেন্ট সম্পন্ন করার চাপ থাকে। এর মধ্যে আট দিন কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ও শিপমেন্টের সময়সূচিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। এতে ক্রেতার আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ে। ‘আন্দোলনের কারণে কারখানায় ভাঙচুর ও সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি কিংবা অন্য কোনো দাবি থাকলে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। এ ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে কোনো আলোচনার ঘাটতি নেই। বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে’, যোগ করেন তিনি। শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া নির্ধারণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন আবু বকর সিদ্দিক খান। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বাড়ির ধরন অনুযায়ী প্রতি বর্গফুটের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।’ ‘পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে কাঁচামাল আমদানি, পরিবহন, কাস্টমস ও ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের মতো সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। শিল্পের টিকে থাকার স্বার্থে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো, উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন’, বলেন তিনি। দেরিতে পণ্য পাঠালে আর্থিক ক্ষতির বাইরেও প্রভাব শ্রমিক অসন্তোষে উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো পণ্য আকাশপথে পাঠাতে না পারা কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করেন আশুলিয়ার প্রিজন সোয়েটারের পরিচালক গোলাম মুর্তুজা। তিনি বলেন, ‘একটি পণ্য এয়ার শিপমেন্ট করতে না পারলে কিংবা অর্ডার বাতিল হলে ন্যূনতম দুই কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।’ এদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু কারখানার দৈনিক উৎপাদন বা রফতানির অঙ্ক দিয়ে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল। তার মতে, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, ক্রয়াদেশ নিয়ে জটিলতা এবং দেরিতে পণ্য পাঠানোর কারণে ছাড় দিতে হওয়ার মতো বিষয়গুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করার কথা। প্রতিমাসে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। প্রতিদিন কত? প্রতিদিন কয়েকশ গার্মেন্টস উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। সেই হিসাবে সবমিলিয়ে ধরেন ৫০০ গার্মেন্টস, এগুলোর প্রতি দিন উৎপাদন আমরা হারিয়েছি। রফতানি হারিয়েছি। তিনি বলেন, ‘আর্থিকের বাইরে যে ক্ষতিটা হচ্ছে, সে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হচ্ছে, ক্রয়াদেশে যে জটিলতা হচ্ছে, যদি কারো হয়ে থাকে, দেরিতে শিপমেন্ট হলে ডিসকাউন্ট দিতে হয়। এগুলো আর্থিকভাবে বিবেচনা করা যাবে না। এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে।’