উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ-আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি যন্ত্রের গণউৎপাদন শুরু করেছে চীন। মূলত এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরনের চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। যদিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নতমানের এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র কিনতে পারে না চীন। তাই এবার নিজেরাই সেই প্রযুক্তি উৎপাদন করতে যাচ্ছে দেশটি।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এই পদক্ষেপকে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বেইজিংয়ের বড় অগ্রগতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। খবর রয়টার্সের।
সূত্রটির দাবি, সাংহাইভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই উৎপাদন কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি লিথোগ্রাফি স্টার্টআপের বিশেষজ্ঞ দলকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সংবেদনশীলতার কারণে সূত্রটি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেনি।
এই অগ্রগতি চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জাতীয় কর্মসূচির একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ডাচ প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের বাণিজ্যিক অবস্থানে তাৎক্ষণিক কোনো বড় প্রভাব পড়বে না।
ডিইউভি লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য ধরে রেখেছে এএসএমএল। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইনফরমেশন’ সোমবার প্রথম জানায়, সাংহাইয়ের একটি রাষ্ট্রীয় সমর্থিত প্রতিষ্ঠান এই যন্ত্রের উৎপাদন শুরু করেছে। চলতি বছরে প্রায় পাঁচটি এবং ২০২৭ সালে প্রায় ২০টি যন্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। রয়টার্স প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় প্রকাশ করেছে।
সূত্রটি জানায়, আইশেংনার তৈরি ডিইউভি যন্ত্র এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এটি এএসএমএলের সমমানের নয়। তবে ভবিষ্যতে পশ্চিমা দেশগুলো যদি লিথোগ্রাফি যন্ত্র বা রক্ষণাবেক্ষণ সেবার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে চীনের চিপ নির্মাতারা বিকল্প উৎস হিসেবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।
‘দ্য ইনফরমেশন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরই চীনের শীর্ষ চিপ নির্মাতা সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, হুয়া হং সেমিকন্ডাক্টর এবং মেমোরি চিপ নির্মাতা চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিসের কাছে এই যন্ত্র সরবরাহ করা হবে।
ইমার্শন ডিইউভি প্রযুক্তিতে প্রজেকশন লেন্স ও সিলিকন ওয়েফারের মাঝখানে পানির একটি স্তর ব্যবহার করা হয়, যা প্রচলিত শুষ্ক পদ্ধতির তুলনায় আরও ক্ষুদ্র সার্কিট নকশা তৈরি করতে সক্ষম।
এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ধরনের চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। একই স্তরে বারবার আলোকপ্রক্ষেপণের মাধ্যমে আরও উন্নতমানের সেমিকন্ডাক্টরও তৈরি করা সম্ভব।
এএসএমএল, এসএমআইসি, হুয়া হং এবং চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিস এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
‘দ্য ইনফরমেশন’-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোমবার এএসএমএলের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ কমে যায়। মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৬ মিনিট পর্যন্ত শেয়ারটির দাম আরও ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে। যদিও একই সময়ে ইউরোপের অন্যান্য চিপ খাতের শেয়ারও নিম্নমুখী ছিল, তবু সামগ্রিক ইউরোপীয় শেয়ারবাজার সূচকের তুলনায় এএসএমএলের দরপতন বেশি ছিল।
২০২৩ সালের আগস্টে প্রায় ৭০০ কোটি ইউয়ান নিবন্ধিত মূলধন নিয়ে আইশেংনা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পেছনে রয়েছে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী সাংহাই ইলেকট্রিক হোল্ডিং এবং সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ট্রাস্টের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জনসমক্ষে খুব কম তথ্য রয়েছে। তাদের কোনো ওয়েবসাইট নেই এবং কার্যক্রম সম্পর্কেও কিছু প্রকাশ করা হয়নি। সূত্রটি জানায়, ডিইউভি প্রযুক্তির একটি প্রোটোটাইপ নিয়ে গত বছর পরীক্ষা চালানো ইউলিয়াংশেং এবং সাংহাই মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স ইকুইপমেন্টের (এসএমইই) বিশেষজ্ঞদেরও আইশেংনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এসএমইই এবং ইউলিয়াংশেং দুই প্রতিষ্ঠানই চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভরতা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউলিয়াংশেং আবার হুয়াওয়ে-সমর্থিত যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সিক্যারিয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট ও নিয়োগসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, আইশেংনা ও ইউলিয়াংশেং একই ঠিকানা থেকে পরিচালিত হয়।
আইশেংনা, এর বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, এসএমইই এবং ইউলিয়াংশেং কোনো পক্ষই রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন এএসএমএলের সবচেয়ে উন্নত এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র কিনতে পারে না। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ফলে উন্নতমানের কিছু ডিইউভি যন্ত্রের সরবরাহও সীমিত করা হয়েছে।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এএসএমএলের জন্য চীন একটি বড় বাজার। চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রতিষ্ঠানটির মোট নিট বিক্রির প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। উন্নত ইইউভি যন্ত্র না পেলেও চীনের চিপ নির্মাতারা এখনো তুলনামূলক কম উন্নত ডিইউভি যন্ত্র ব্যাপকভাবে কিনছে।
গত ডিসেম্বরে রয়টার্স জানিয়েছিল, চীন নিজস্ব ইইউভি লিথোগ্রাফি যন্ত্রের একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইশেংনার অগ্রগতি তাৎপর্যপূর্ণ হলেও স্বল্পমেয়াদে এএসএমএলের আয় বা বাজার অবস্থানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না।
জেপি মরগান চেজের বিশ্লেষকেরা এক প্রতিবেদনে বলেন, কয়েকটি ইমার্শন ডিইউভি যন্ত্র তৈরি করা আর হাজার হাজার ওয়েফারে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ উৎপাদন সক্ষম, নির্ভুল, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যন্ত্র তৈরি করা এক বিষয় নয়।
সূত্র : রয়টার্স
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হতাশাজনক হারের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে মিশ্র বার্তা দিচ্ছেন। একদিকে তিনি ইরানে হামলার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে আবার যুদ্ধ অবসানের ইঙ্গিতও দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো ইরানের বাকি অংশও ‘ধ্বংস’ করতে হতে পারে। তবে পরদিনই তিনি আবার দাবি করেন, আমরা ইরানের সঙ্গে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছি। পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের করা বেশ কিছু দাবি এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে ট্রাম্প এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে রয়েছেন। তবে এমন পরিস্থিতিতেও সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের কেশম দ্বীপে সামরিক হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে এসব হামলা করেছে। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে যে, তারা কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করেছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাবে? মনে হচ্ছে, তেহরান এ ধরনের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ করছে, যা তেজস্ক্রিয়তা থেকে থাইরয়েড গ্রন্থিকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ট্রাম্পকে আর বিশ্বাস করা যায় না, তিনি এই অপরাধ করতেও পারেন। এ ছাড়া একটি মার্কিন পরমাণু হামলা নিয়ে তেহরান গভীরভাবে চিন্তিত বলে জানা গেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি কর্মসূচির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্যের জন্য দুই কোটি ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ট্রাম্প বর্তমানে দেশে এবং নিজ দলের ভেতরেই যুদ্ধ নিয়ে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছেন। ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ পুনরায় শুরু করে, তবে তারা আরও বড় পরিসরে পাল্টা হামলা চালাবে। তবে এসব উত্তেজনার আড়ালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান একটি নতুন পারমাণবিক ও শান্তি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধ অবসানের চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ‘উপযুক্ত সময়ের’ অপেক্ষা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন কোন পথে হাঁটে। সূত্র: আল জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর দেশটির বিচার বিভাগ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনাকারী দক্ষিণ ফ্লোরিডার মার্কিন অ্যাটর্নি জেসন রেডিং কুইনোনস। শনিবার (৭ নভেম্বর) সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। পদত্যাগ করা অন্য দুজন হলেন বিচার বিভাগের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডিভিশনের প্রধান জন আইজেনবার্গ এবং সিভিল রাইটস ডিভিশনের প্রধান হারমিত ধিলন। আইজেনবার্গ শুক্রবার এবং ধিলন বৃহস্পতিবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচার বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্বের চাপের মুখে পদ ছাড়েন কুইনোনস। ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালালেও প্রত্যাশিত বড় কোনো মামলা করতে না পারায় তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের তদারকি ক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনায় বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ কুইনোনসের বিদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে তার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিনেটের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: সিএনএন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে সাত দফা শর্তসংবলিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় পাঠানো এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর দাবি জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকির মধ্যেই তেহরানের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হলো। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেওয়া সাতটি শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনাতেও বসবে না তেহরান। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের পাঠানো প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো ইরানের সাতটি প্রধান দাবি হলো— ১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ: লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ২. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার: ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা সব ধরনের নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে। ৩. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ৪. জব্দ সম্পদ ফেরত: বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব জব্দ করা আর্থিক সম্পদ মুক্ত করে দিতে হবে। ৫. মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং সেনাসংখ্যা কমাতে হবে। ৬. ক্ষতিপূরণ প্রদান: সংঘাতের কারণে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৭. ভবিষ্যৎ হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা: ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এদিকে ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও দুই দেশের অবস্থানে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যেকোনো প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। পাল্টা জবাবে তেহরান জানিয়েছে, সংঘাত আবার শুরু হলে আরও ব্যাপক ও ভয়াবহ হামলা চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে-এমন আশঙ্কার মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীরা তৎপরতা বাড়িয়েছেন। তবে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান কূটনৈতিক সমাধানের পথকে কঠিন করে তুলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এর জবাবে ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান। পরে সংঘাতের প্রভাব লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েও ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল নিয়ে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরানের সাত দফা প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে অঞ্চলটিতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।