মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলছে, তার অভিঘাত ধীরে ধীরে ভারতেও অনুভূত হতে শুরু করেছে।
এক প্রতিবেদনে বিবিসি লিখেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ ভারত একদিকে জ্বালানি নিয়ে মুশকিলে পড়েছে, অন্যদিকে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে প্রবাসী আয়।
ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক এবং এলএনজি ও এলপিজির বড় অংশ পারস্য উপসাগরের সরু জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এখন ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় এক কোটি ভারতীয় কাজ করেন। তারা দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স পাঠান, যা লাখো পরিবারের জীবিকা এবং ভারতের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে বড় অবদান রাখে।
আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর। ব্রোকারেজ হাউস জেফারিজের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের মোট রপ্তানির ১৭ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই যায়। সেখান থেকেই আসে ৫৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং মোট রেমিটেন্সের ৩৮ শতাংশ।
ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় ভারতের ওপর প্রভাব পড়বে বিভিন্ন দিক থেকে। ওয়াশিংটন, তেহরান ও আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দিল্লির সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্যও ঝুঁকিতে পড়বে।
থিংক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হার্শ ভি পান্ত বলেন, বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারত আপাতত অপেক্ষা করছে ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোকে নিশানা করেছে। তাতে দিল্লিরও উদ্বেগ বেড়েছে।
পান্তের মতে, আরব বিশ্বের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর। তাই সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে ভারতের উদ্বেগও বেশি।
পান্ত সতর্ক করে বলেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা ওই অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ভারত-ইরান সম্পর্ক নিয়ে যত কথাই বলা হোক, পান্তের মতে, বাস্তবে সেই সম্পর্ক বহুদিন ধরেই সীমিত। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইরানের কোণঠাসা অবস্থা এর বড় কারণ।
ইরানের এই বাস্তবতা ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে বাধ্য করেছে। ফলে সেখানে যখন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, দিল্লিরও স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই।
কূটনৈতিকভাবেও ভারত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন ইরানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত কে সি সিং।
তিনি 'দ্য ট্রিবিউন'-এ লিখেছেন, "হামলার কয়েক দিন আগে ইসরায়েলকে সমালোচনা না করার যে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিয়েছিলেন, তা ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করেছে। ইরান বিষয়টি ভুলবে না।"
তবে ভারতের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ হয়তো অপরিশোধিত তেল নয়।
মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া বলেন, "হরমুজ ঘিরে ঝুঁকি অবশ্যই উদ্বেগজনক। কিন্তু আমি অপরিশোধিত তেলের চেয়ে এলপিজি ও এলএনজি নিয়ে বেশি চিন্তিত।"
এর কারণ ভারত বিগত বছরগুলোতে জ্বালানি ব্যবহারে এক ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির ফলে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে, যা জৈব জ্বালানিকে অনেকটাই প্রতিস্থাপন করেছে।
ভারতের ব্যবহৃত এলপিজির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। চীনের পর তারাই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলপিজি আমদানিকারক।
এই সরবরাহের প্রায় পুরোটাই উপসাগরীয় দেশ—বিশেষ করে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে আসে এবং প্রায় সব জাহাজই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়।
এলএনজির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি মোটামুটি একই রকম।
ভারতের নিজস্ব গ্যাস চাহিদার খুব সামান্যই মেটাতে পারে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার, রান্নার জ্বালানি, পরিবহন ও শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।
গত বছর ভারত প্রায় ২৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছে, যার প্রায় ১৪ মিলিয়ন টন এসেছে হরমুজ হয়ে। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বিশ্বের বড় ক্রেতাদের তালিকায় রয়েছে ভারত।
এলপিজির ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হওয়ার আরেকটি কারণ হলো মজুদের ঘাটতি।
অপরিশোধিত তেলের মতো ভারতের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি মজুদ নেই, সংরক্ষণ ক্ষমতাও সীমিত। আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে রিফাইনারি ও পরিবেশকদের হাতে থাকা মজুদ দিয়ে মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের চাহিদা মেটানো যাবে।
অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ।
ভারতের রিফাইনারি ও বাণিজ্যিক মজুদে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য। তা দিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে রিতোলিয়া জানান।
ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির বড় রপ্তানিকারক হওয়ায় প্রয়োজনে দেশটি এসব পণ্যের রপ্তানি কমিয়েও সরবরাহ ধরে রাখতে পারবে।
বিকল্প উৎসও আছে। ভারত রাশিয়া বা আটলান্টিক অঞ্চলের দেশ যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে তেল আমদানি বাড়াতে পারে।
তবে সেসব জায়গা থেকে তেল পৌঁছাতে ২৫ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে, যেখানে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে লাগে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন। ফলে সরবরাহে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রয়োজন হলে ভারত আবারও রাশিয়ার তেলের দিকে বেশি মাত্রায় ঝুঁকে যাবে।
রিতোলিয়া বলেন, "এই মুহূর্তে ভারত মহাসাগরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ ভাসছে। ভারত ও চীনই এর প্রধান ক্রেতা হওয়ায় এগুলো সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে রয়েছে।"
বিশ্লেষকদের ধারণা, জ্বালানি সরবরাহের কারণে নয়, প্রথম ধাক্কাটি আসবে খরচের দিক দিয়ে।
ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম, জাহাজ ভাড়া এবং ঝুঁকি বিমার খরচ বাড়তে পারে। ফলে সরবরাহ বজায় থাকলেও ভারতের আমদানি বিল বাড়বে।
তবে ক্লেপারের ধারণা, হরমুজ দীর্ঘ সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না। হয়তো সাময়িক ধীরগতি চলবে, জাহাজের পথ পরিবর্তন বা নিরাপত্তা তল্লাশিও বাড়তে পারে।
জেফারিজের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, স্বল্পমেয়াদে তেল ও এলএনজির দাম অনেকটা বাড়তে পারে। তবে অচলাবস্থা খুব বেশি দীর্ঘ হবে না।
প্রবাসী আয়
ভারতের প্রবাসী জনসংখ্যা গত কয়েক দশকে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
১৯৯০ সালে প্রায় ৬৬ লাখ ভারতীয় বিদেশে থাকতেন। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় এক কোটি ৮৫ লাখে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রবাসী জনগোষ্ঠী।
এর মধ্যে প্রায় এক কোটি ভারতীয় উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয়টি দেশে—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে কাজ করেন। তারা ভারতের মোট প্রবাসী জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
কয়েক দশক আগে এই ভারতীয়রা অস্থায়ী শ্রমিকের কাজ নিয়ে সেখানে গেলেও এখন অনেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
২০২৫ সালে শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতেই দুই লাখ ৪৭ হাজারের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যা শিক্ষার্থী। এতে বোঝা যায় অনেক ভারতীয় পরিবার এখন স্থায়ীভাবে সেসব দেশে বসবাস শুরু করেছে।
ভারত সরকারের জন্য এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ১৩৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পেয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই অর্থপ্রবাহ দিয়ে ভারত তার পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতির প্রায় অর্ধেক মেটাতে পারে। রেমিটেন্সের এই অর্থ বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভকেও শক্তিশালী করেছে। আর তাতে বড় ভূমিকা রাখছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকরা।
তারা নির্মাণ, সেবা, জ্বালানি খাতের পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক বিভিন্ন পেশায় কাজ করেন এবং প্রতি বছর বিপুল অর্থ দেশে পাঠান। শুধু কেরালা রাজ্যই ভারতের মোট রেমিটেন্সের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পায়।
ওই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সংকট দেখা দিলে প্রবাসীদের সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হতে পারে এবং দেশে অর্থপ্রবাহ কমে যেতে পারে।
দিল্লির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল শুধু তেল আমদানির জায়গা নয়; জীবিকা, পারিবারিক আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস।
তিরুবনন্তপুরমভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এস ইরুদায়া রাজন বলেন, "উপসাগরীয় অঞ্চল নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে যে ধারণা ছিল, তা এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে। যুদ্ধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তাদের ওপর পড়ছে। বিদেশে থাকা সন্তানদের নিয়ে ভারতীয় অভিভাবকরাও উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে দেশে ফেরার কথা ভাবছেন অনেক অভিবাসী।"
চাবাহার বন্দর
ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য ছিল পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার। সেই বন্দর এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে।
২০১৬ সালে ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দিল্লি এই বন্দরকে আঞ্চলিক যোগাযোগ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবেই দেখে আসছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত এই বন্দর ব্যবহার করে আফগানিস্তানে গম ও মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। পাশাপাশি বন্দরের শহীদ বেহেশতি টার্মিনাল উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে।
কিন্তু ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ভারতের জন্যও পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
পরে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ভারতকে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের ছাড় দেয়, যাতে ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত টার্মিনালের কার্যক্রম চালু রাখা যায়। তাতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ।
পান্তের মতে, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা কমলে তবেই ভারত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চাবাহার প্রকল্পে ফিরে যেতে পারবে। ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাত চলতে থাকলে বাস্তব ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে ওই বন্দরের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা সীমিতই থাকবে।
ভারত সংলাপ ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে যাবে। তবে আরব বিশ্বে যা ঘটছে—তা নিয়ে দিল্লি এখন অনেক বেশি উদ্বিগ্ন বলে মনে করেন পান্ত।
২০২৫ সালে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে ভারত, যার মধ্যে সার, পেট্রোকেমিক্যাল থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে। কৃষি, প্লাস্টিক, নির্মাণ ও হীরাকাটার মতো খাতগুলো এই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
ভারতের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা এবং গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রধান অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, হরমুজ প্রণালির সংকট এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে এর প্রভাব জ্বালানি বাজার ছাড়াও বিভিন্ন খাতে পড়বে। আর সেটা হবে ভারতের অর্থনীতির জন্য বড় মাথাব্যথা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখতে পাকিস্তান তার ‘আন্তরিক ও সৎ প্রচেষ্টা’ অব্যাহত রাখবে বলে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। শনিবার এক ফোনালাপে দুই দেশের শীর্ষ নেতা চলমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। শেহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্টকে জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সংঘাত নিরসনে ইসলামাবাদ সব সময় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চলমান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পাঠানোর জন্য ইরান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ইরানের এই উদ্যোগ শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। উল্লেখ্য, ইরানের এই প্রতিনিধিদলটি শনিবারই ইসলামাবাদ ত্যাগ করে ওমানের মাসকাটে পৌঁছেছে, যেখানে তারা আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবে। ইরানি প্রতিনিধিদলের এই সফরের মধ্যেই শনিবার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের এই সফর বাতিল করেন। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তাতে সাময়িক ভাটা পড়লেও পাকিস্তান ও ইরান নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন সফর বাতিল হওয়া সত্ত্বেও তেহরান ও ইসলামাবাদের এই আলাপচারিতা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সূত্র: সিএনএন
ফক্স নিউজের এক জরিপ অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশেরও অধিকাংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন সরকার পরিচালনায় দক্ষ ছিল না। বুধবার জরিপটি প্রকাশ পায়। প্রতি ১০ জন রিপাবলিকানের মধ্যে ২ জন এই মতের সঙ্গে একমত। অন্যদিকে, স্বতন্ত্রদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে ৭ জন এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে ৯ জন একই মত পোষণ করেন। এ ছাড়া, নন-ম্যাগা রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে ৪ জনও এই মতের পক্ষে রয়েছেন। সার্বিকভাবে, ৪৩ শতাংশ মানুষের মতে, হোয়াইট হাউস সরকার পরিচালনায় দক্ষতা দেখিয়েছে। এই ধরনের পরিসংখ্যানকে অস্বাভাবিক বলা যায় না। ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর এই মূল্যায়ন ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যখন সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশ মানুষ সরকারকে দক্ষ বলেছিল। একইভাবে, জো বাইডেন প্রশাসনের সাম্প্রতিক মূল্যায়নের সঙ্গেও এটি মিলে যায়, ২০২২ সালে ৩৮ শতাংশ এটিকে দক্ষ বলেছিল, যেটি ২০২১ সালের ৫১ শতাংশ থেকে কম। রিপাবলিকান জরিপকারী ড্যারন বলেন, ‘এটি হোয়াইট হাউসের জন্য খুব সান্ত্বনাদায়ক নাও হতে পারে, তবে ভোটারদের মধ্যে সব প্রেসিডেন্টের প্রতিই কঠোর হওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই পরিসংখ্যান দেখায়, একজন রাষ্ট্রপতির জন্য স্বতন্ত্র ভোটার এবং নিজ দলের সমর্থকদের কাছ থেকেও সমর্থন পাওয়া কতটা কঠিন।’ অভিবাসন ইস্যুতে ৪৬ শতাংশ সমর্থন এবং ৫৪ শতাংশ অসমর্থন পেয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া চীন নীতিতে (৪২ শতাংশ সমর্থন, ৫৭ শতাংশ অসমর্থন), পররাষ্ট্রনীতিতে (৪০-৬০), ইরান ইস্যুতে (৩৭-৬৩), অর্থনীতিতে (৩৪-৬৬), সরকারি ব্যয়ে (৩৩-৬৭) এবং মুদ্রাস্ফীতিতে (২৮-৭২) তিনি নেতিবাচক রেটিং পেয়েছেন। তার একমাত্র ইতিবাচক রেটিং এসেছে সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে, যেখানে ৫৩ শতাংশ সমর্থন এবং ৪৭ শতাংশ অসমর্থন রয়েছে। এই রেটিংগুলোর বেশির ভাগই তার সামগ্রিক কর্মক্ষমতার চেয়ে কম। সামগ্রিকভাবে ৪২ শতাংশ ভোটার তার কাজকে সমর্থন করেন, আর ৫৮ শতাংশ অসমর্থন করেন। গত মাসে (২০-২৩ মার্চ, ২০২৬) এই অনুপাত ছিল ৪১ শতাংশ সমর্থন বনাম ৫৯ শতাংশ অসমর্থন। এ ছাড়াও, মন্ত্রিসভার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও নেতিবাচক রেটিং পেয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাজের অনুমোদন ১১ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৪৪ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ৫৫ শতাংশ অসমর্থন করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর অনুমোদন ১২ পয়েন্ট কমে ৪৪-৫৬ হয়েছে এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অনুমোদন ১৭ পয়েন্ট কমে ৪১-৫৮ হয়েছে। নতুন এই জরিপে ভোটারদের প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন গুণের ওপর মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে এবং এক্ষেত্রেও ইতিবাচক ফলাফলের চেয়ে নেতিবাচক ফলাফলই বেশি। অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বলেছেন, ট্রাম্প তাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা ভাবেন না এবং দেশের নেতা হিসেবে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য তার যথাযথ বিচারবুদ্ধি, মানসিক সুস্থতা ও মেজাজের অভাব রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মানুষের মতে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঠিক মেজাজের অভাব রয়েছে। এটি ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঠিক আগের সময়ের ৫২ শতাংশ থেকে বেড়েছে, তবে ২০১৬ সালের তার নির্বাচনী প্রচারণার সময়কার অবস্থার সঙ্গে প্রায় মিল রয়েছে। একইভাবে, ৫৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন তার সঠিক বিচারবুদ্ধির অভাব রয়েছে। বিপরীতে, প্রায় ৪২ শতাংশ বিশ্বাস করেন তার যথেষ্ট বিচারবুদ্ধি আছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় অপরিবর্তিত এবং ২০১৬ সালের সর্বনিম্ন ৩৬ শতাংশ থেকে কিছুটা উন্নত। দশজনের মধ্যে ছয়জনেরও বেশি বলেছেন, ট্রাম্প সাধারণ মানুষের মতো মানুষদের নিয়ে চিন্তা করেন না। মাত্র ৩৭ শতাংশ মনে করেন তিনি পরোয়া করেন, যা ২০২৪ সালের সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশ থেকে কমেছে। এ ছাড়া, ৫৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, দায়িত্ব পালনের জন্য তার মানসিক সুস্থতা পর্যাপ্ত নয়। ২০২৪ সালের শেষের দিক থেকে এই হার ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে এবং ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ ৫৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তুলনামূলকভাবে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন জো বাইডেন তার পুনর্নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ করেন, তখন ৬৫ শতাংশ মানুষ বলেছিলেন, তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা নেই। দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন বা তারও বেশি মনে করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য ট্রাম্পের প্রয়োজনীয় গুণাবলীর অভাব রয়েছে। বিপরীতে, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (এমএজিএ)’ রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে অন্তত ৯ জন মনে করেন তার যথাযথ গুণাবলী রয়েছে। তবে এমএজিএ-এর বিরোধী রিপাবলিকানদের মধ্যে এই সমর্থন কমে প্রতি ১০ জনে প্রায় ৬ জন বা তারও কমে নেমে আসে। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র ভোটাররা ট্রাম্পকে বিচারবুদ্ধি, মেজাজ, মানসিক সুস্থতা এবং সহানুভূতির ক্ষেত্রে ঘাটতিযুক্ত হিসেবে দেখার প্রবণতা বেশি।
বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী যৌন অপরাধী ও অর্থদাতা জেফরি এপস্টেইনের অপকর্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে নারী পাচার ও নির্যাতন কার্যক্রম চালিয়েছিলেন এপস্টেইন। বিবিসির এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারির দাবি সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে কেনসিংটন এবং চেলসির মতো এলাকায় নারী ও তরুণীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন এই মার্কিন ধনকুবের। এমনকি ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরও সেখানকার পুলিশ তদন্ত না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার পরবর্তী সময়েও এপস্টেইন নির্বিঘ্নে এসব ফ্ল্যাটে ভুক্তভোগীদের নিয়ে যাতায়াত করেছিলেন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এপস্টাইন ফাইলসের রশিদ, ইমেইল ও ব্যাংক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে চারটি বিশেষ ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে বিবিসি। এসব ফ্ল্যাটে অবস্থান করা নারীদের মধ্যে অন্তত ছয়জন ইতোমধ্যে এপস্টেইনের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এপস্টেইনের অপকর্মের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ২০১৫ সালে যখন লন্ডনে পাচার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন, মেট্রোপলিটন পুলিশ তখন বিষয়টি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তারপরেই এই ৬ নারীকে লন্ডনে নেওয়া হয়েছিল। যদিও লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবি, তারা সেই সময়ে তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছিল। জিউফ্রের অভিযোগের পর তারা কয়েক দফায় তার সাক্ষাৎকার নেয় এবং মার্কিন তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে। ফাইলগুলোতে থাকা ইমেইল অনুসারে, নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টেইন কেবল তাদের নির্যাতনই করতেন না, বরং লন্ডনের ফ্ল্যাটে থাকা কিছু নারীকে তার চক্রের জন্য নতুন নারী সংগ্রহ ও নিয়োগ দিতে বাধ্য করতেন। তাদের নিয়মিত ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে প্যারিসে তার সঙ্গে দেখা করতে পাঠানো হতো। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এপস্টেইন অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। নারীদের যুক্তরাজ্যে আনা-নেওয়ার জন্য ইউরোস্টার ব্যবহার করতেন। জীবনের শেষ কয়েক বছরে তরুণীদের জন্য তার ট্রেনের টিকিট কেনার পরিমাণ বেড়েছিল। বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এপস্টেইন ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে নারীদের যাতায়াতের জন্য অন্তত ৫৩টি টিকিট কিনেছিলেন, যার অধিকাংশ ছিল ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণীদের জন্য। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ২৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইউরোস্টারের ‘ইউথ ফেয়ার’ বা কম ভাড়ার সুবিধা নিতেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ব্রিটিশ পুলিশ বারবার দাবি করেছে, তারা তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ২০২০ সালেও এক নারী লন্ডনে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না তা জানতে পারেনি বিবিসি। তবে একটি নথি অনুযায়ী বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালেই জানতো—এপস্টেইন লন্ডনে অন্তত একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন। মানবাধিকার আইনজীবী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পুলিশের এই উদাসীনতাকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। হিউম্যান রাইটস আইনজীবী টেসা গ্রেগরি বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মানবপাচারের মতো গুরুতর ও নির্ভরযোগ্য অভিযোগ থাকার পরও রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল দ্রুত তদন্ত শুরু করা। যুক্তরাজ্যের প্রথম স্বতন্ত্র দাসত্ববিরোধী কমিশনার কেভিন হিল্যান্ড সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার সিদ্ধান্তে এই তদন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, লন্ডনের ফ্ল্যাটগুলোতে নারীদের রাখা এবং যাতায়াতের প্রমাণ একটি অপরাধী চক্র শনাক্ত করার জন্য যথেষ্টর চেয়েও বেশি ছিল। এপস্টেইন গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক মাস আগেও লন্ডনে অবস্থানরত এক রুশ তরুণীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নথিতে দেখা যায়, তিনি নিজেকে ওই নারীর ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এপস্টেইন লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে থাকা ওই রুশ তরুণীর সঙ্গে স্কাইপিতে মেসেজ আদান-প্রদান করেছিলেন। এপস্টেইন তাকে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন এবং নিজেকে তার ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি রসিকতা করে বলেন, সাধারণ বাড়িওয়ালারা ভাড়া নিলেও তিনি উল্টো ভাড়া দিয়ে দেন। পরবর্তীতে ওই নারী এপস্টেইনের কাছে লন্ডনে ইংরেজি শেখার ক্লাসের খরচ এবং আসবাবপত্র কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি অন্য এক রুশ নারীর ভিসার বিষয়েও পরামর্শ চেয়েছিলেন। ২০১৯ সালের এই কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, এপস্টেইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লন্ডনে থাকা নারীদের সঙ্গে কতটা নিবিড় যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়েও জড়িত ছিলেন। মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের বাধ্যবাধকতা পালনের দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের জড়িত থাকার আশঙ্কায় পুলিশ হয়তো এই বিশাল অপকর্মের দিকে চোখ বন্ধ করে ছিল। সেন্টার ফর উইমেন’স জাস্টিস-এর প্রতিষ্ঠাতা হ্যারিয়েট উইস্ট্রিচ বলেন, ‘এপস্টেইনের এমন কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয়—ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের মধ্যে এক ধরনের ‘‘ভয়’’ কাজ করছিল।’ সব মিলিয়ে, লন্ডনকে কেন্দ্র করে এপস্টেইনের যে গোপন অপরাধ জগৎ বিস্তৃত ছিল, তা ব্রিটিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও সদিচ্ছাকেই এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।