সেই দুই শিশু ১৫ দিন মা-বাবার সঙ্গে থাকবে

0
33

খবর৭১ঃ জাপানি মায়ের আলোচিত দুই শিশু আগামী ১৫ দিন রাজধানীর গুলশানের একটি বাসায় মা-বাবার সঙ্গে থাকবে। তাদের বিষয়টি দেখভাল করবেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা। তাদের নিরাপত্তা দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত।

মঙ্গলবার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালত আদেশে বলেন, বাচ্চাসহ সবার কথা শুনেছি। গুলশানের একটি বাসায় বাবা-মাসহ বাচ্চারা ১৫ দিন থাকবেন। ঢাকার সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তদারকি করবেন। পরিবারের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়টি দেখার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে সকালে শুনানির শুরুতে মায়ের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির আদালতকে বলেন, ‘বাচ্চাদের মা ঢাকার বারিধারায় একটি বাসা ভাড়া করেছে। আমরা চাই ওই বাসায় বাচ্চারা মায়ের সাথে থাকুক। বাচ্চাদের বাবাও তার মতো করে ওই বাসায় আসুক-থাকুক। কারণ, এই কয়দিনে বাচ্চাদের মধ্যে যে একটা ট্রমা তৈরি হয়েছে তা কাটুক। তারপর আপনারা এবিষয়ে চূড়ান্ত কোনো আদেশ দেন।’

বাবার পক্ষে আইনজীবী ফাওজিয়া করিম বলেন, ‘বাচ্চারা বাবার বাসায় থাকুন। মা বাচ্চাদের দেখতে আসুক কোনো সমস্যা নেই। মা যে বাসাটার কথা বলছে সে এরিয়ায় বাচ্চাদের থাকার বিষয়ে আমাদের আপত্তি আছে।’

শুনানিতে দুই পক্ষের এমন দ্বিমুখী অবস্থানে প্রেক্ষাপটে আদালত বলেন, ‘আমরা চাই বাচ্চা দুটি পারিবারিক পরিবেশে থাকুক। আপনারা একটু পজিটিভলি ভাবুন।’

এরপর বাবার পক্ষে আইনজীবী আদালতকে বলেন, দু’পক্ষ একটু বসে সিদ্ধান্ত নিই। তারপর জানাই। এরপর আদালত এবিষয়ে আদেশের জন্য বেলা ৩টায় সময় নির্ধারণ করেন। ৩টায় পুনরায় আদালতে বিষয়টি উত্থাপিত হলে দুই পক্ষই ফের একমত হতে পারছিলেন না। পরে আদালত শিশুদের সঙ্গে ১০ মিনিট কথা বলে ওই আদেশ দেন।
গত ২৩ আগস্ট জাপানি মায়ের দুই শিশুকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে উন্নত পরিবেশে রাখার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। জানানো হয়, এই সময়ের মধ্যে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত জাপানি মা এবং বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বাংলাদেশি বাবা শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন।

পূর্ব নির্ধানিত আদেশ অনুযায়ী মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) শিশুদের হাইকোর্টে হাজির করা হয়।

১৯ আগস্ট দুই জাপানি শিশু জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা এবং তাদের বাবা শরীফ ইমরানকে এক মাসের জন্য দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে দুই শিশুকে ৩১ আগস্ট আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ২২ আগস্ট শিশু দুটিকে হেফাজতে নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

২০০৮ সালে জাপানি চিকিৎসক নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক শরীফ ইমরান জাপানি আইন অনুযায়ী বিয়ে করে টোকিওতে বসবাস শুরু করেন। তাদের ১২ বছরের সংসারে তিন কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। তারা তিনজনই টোকিওর চফো সিটিতে অবস্থিত আমেরিকান স্কুল ইন জাপানের শিক্ষার্থী ছিল।

চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি শরীফ ইমরান-এরিকোর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ২১ জানুয়ারি ইমরান আমেরিকান স্কুল ইন জাপান কর্তৃপক্ষের কাছে তার মেয়ে জেসমিন মালিকাকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু এতে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ইমরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপর এক দিন জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা স্কুল বাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপ থেকে ইমরান তাদের অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান।

গত ২৫ জানুয়ারি শরীফ ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছ থেকে মেয়েদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করেন। কিন্তু এরিকো ওই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে মেয়েদের নিজ জিম্মায় পেতে আদেশ চেয়ে গত ২৮ জানুয়ারি টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন।

আদালত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়েদের সঙ্গে এরিকোর সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে আদেশ দেন। কিন্তু ইমরান আদালতের আদেশ ভঙ্গ করে মাত্র একবার মায়ের সঙ্গে দুই মেয়েকে সাক্ষাতের সুযোগ দেন। এরপর গত ৯ ফেব্রুয়ারি ‘মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে’ ইমরান তার মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে নিয়ে তিনি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন।

গত ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে তাদের মা এরিকোর জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেন। তবে দুই মেয়ে বাংলাদেশে থাকায় বিষয়টি নিয়ে তিনি বাংলাদেশের একজন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। এরপর গত ১৮ জুলাই তিনি শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসেন।

বাংলাদেশে এসে এরিকো করোনা পরীক্ষা করালে তার রিপোর্ট নেগেটিভ থাকার পরেও ইমরান ওই রিপোর্ট অবিশ্বাস করে সন্তানদের সঙ্গে তার সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানান। গত ২৭ জুলাই এরিকোর মোবাইল সংযোগ বন্ধ করে চোখ বাঁধা অবস্থায় মেয়েদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। এ অবস্থায় দুই মেয়েকে নিজের জিম্মায় পেতে হাইকোর্টে রিট করেন জাপানি চিকিৎসক নাকানো এরিকো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here