মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হচ্ছে লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ

0
222

অ আ আবীর আকাশ, জেলা প্রতিনিধিঃ লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। এমন পরিস্থিতিতে ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, বাজারসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা। এছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের বড়খেরী ইউনিয়নের কোরেশবাড়ি এলাকায় বিবিরহাট-রামগতিরহাট সড়কের অংশ মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হওয়ার পথে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশী ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে রামগতির বড়খেরী, চররমিজ, মধ্য আলগী, গাবতলী, আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বাংলাবাজার, সুজনগ্রাম এলাকা ও কমলনগরের পাটওয়ারীর হাট, লুধুয়া, নাসিরগঞ্জ, নবীগঞ্জ, মতিরহাট, বুড়িরঘাট, মজুচৌধুরী ঘাট এলাকা ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। এসব এলাকার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা, হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়িসহ বিস্তীর্ন জনপদ মেঘনার তীব্র ভাঙনের মুখে রয়েছে। এছাড়া ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে রামগতির চররমিজ দক্ষিণ-পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ চরআলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য চরআলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাটাবনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বালুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম বালুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালুরচর উচ্চ বিদ্যালয়, বিবিরহাট বাজার, মুন্সীরহাট, বাংলাবাজার ও জনতা বাজার।
ইতোমধ্যে কমলনগরের লুধুয়া বাজার, নাসিরগঞ্জ বাজার, চৌধুরী বাজার, পন্ডিতের হাট বাজার মেঘনায় বিলিন হয়ে গেছে। বিলিন হওয়ার পথে মতিরহাট বাজার, নবীগঞ্জ বাজার, জনতা বাজার সহ আরো কয়েকটি ছোটখাটো হাট।

স্থানীয়রা জানান, মেঘনা নদীর অব্যহত ভাঙ্গনে ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে এলাকার বিভিন্ন স্থাপনাসহ ফসলী জমি এবং গৃহহীন হয়ে পড়েছে কয়েকশ পরিবার। এমন ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে কয়েকটি সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা। ইতোমধ্যে চরপোড়াগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভাঙ্গনের কবলে পড়ায় অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে।

মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গন থেকে বড়খেরি বাজার, আলেকজান্ডার উপজেলা বাজার ইউনিয়নকে রক্ষার দাবিতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন রামগতি ও কমলনগরবাসী। ভাঙ্গনরোধে বাস্তবমুখি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে চলতি মৌসুমেই এগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আলেকজান্ডার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা সুমন হাওলাদার জানান, তাদের সুজনগ্রামে ৩০ একর জমির উপর একশ বছরের পুরানো বাড়িটি মসজিদ মাদ্রাসাসহ ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। এছাড়া এই এলাকাটি সবচেয়ে বেশি ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কয়েক দিনের ভাঙনে অন্তত দেড় হাজার পরিবার ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। সব হারিয়ে মানবেতর দিন যাপন করছে বসতভিটাহারা এসব পরিবারগুলো। এ পরিস্থিতিতে এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে এখন ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

আলেকজান্ডার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বালুরচর, সুজনগ্রাম, জনতা বাজার ও মুন্সীরহাটসহ কয়েকটি এলাকায় মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়ে ইতোমধ্যে সরকারি-বেসকারি বিভিন্ন স্থাপনাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছে জনতা বাজার, মুন্সীরহাট বাংলাবাজার, বালুরচর উচ্চবিদ্যালয়, বালুরচর সিনিয়র মাদ্রাসা, আলেকজান্ডার ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ও পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনা। ভাঙনরোধে এখনই যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়া হলে অচিরেই এগুলো নদীতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কমলনগর রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ ইছমাইল হোছাইন বিপ্লব বলেন- ‘প্রায় ৩১’শ কোটি টাকার মেঘা প্রকল্পে আলেকজান্ডার থেকে উত্তর দিকে ৩১ কিলোমিটার মেঘনা নদী তীর রক্ষা বাঁধ। সামান্য কিছু কাজ করেই নানা জটিলতা দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু নদী ভাঙন বন্ধ না থাকায় নদী গর্ভে বিলিন হচ্ছে সাধারণ অসহায় মানুষের ঘর বাড়ী, ফসলী জমি, ভিটে সহায় সম্ভল। পায়ের তলার মাটি হারিয়ে দিনকেদিন উদ্বাস্তু পরিবারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যদি নদী ভাঙন রক্ষা বাঁধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে না দিয়ে সেনাবাহিনীকে দিয়ে করাতো তাহলে আলেকজান্ডারের মতো একটা টেকসই বেড়িবাঁধ হতো। রামগতি ও কমলনগর রক্ষা হতো।’

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ জানান, মেঘনার ভাঙনের তীব্রতা ঠেকাতে আলেকজান্ডার ইউনিয়নের সুজনগ্রামে ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় ২শ মিটারের মধ্যে তিনটি স্পটে জিও টিউব ব্যাগে অস্থায়ী স্পার নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে আপদকালীন বরাদ্দে এ কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া আসলপাড়া এলাকা থেকে উত্তর দিকে ৭শ মিটার সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিকল্প ধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব) আবদুল মান্নান জানান, মেঘনার ভাঙনরোধে রামগতি ও কমলনগর উপজেলা এবং তৎসংলগ্ন এলাকাকে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গন হতে রক্ষাকল্পে নদীর তীর সংরক্ষণ একটি প্রকল্প রয়েছে। এ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের নতুন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল-ডিপিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন ঠেকাতে আপদকালীন বরাদ্দে আলেকজান্ডার ইউনিয়নের সুজনগ্রামের ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় স্পার নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here