চলতি বছরের মধ্যেই তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছেঃ শ্রিংলা

0
168
চলতি বছরের মধ্যেই তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছেঃ শ্রিংলা
ছবিঃ সংগৃহীত

খবর৭১ঃ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সোমবার (০২ মার্চ) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘বাংলাদেশ এবং ভারত: একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভবিষ্যৎ’-শীর্ষক এক সেমিনারে অংশ নেন হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। সেখানে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিস) এই সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে বক্তব্য রাখেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ, বিসের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক কর্নেল শেখ মাসুদ আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, বিস চেয়ারম্যান এম ফজলুল করিম প্রমুখ।

সেমিনারে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দুই দেশেরই আগ্রহ রয়েছে। এটা নিয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ চলছে। এই বছরের মধ্যেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন- এনআরসি একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে।

শ্রিংলা বলেন, ঢাকায় আসতে পারা আমার জন্য খুবই আনন্দের। কারণ ঢাকা আমার কাছে নিজের শহরের মতোই। ঢাকা ও বাংলাদেশের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। আমি হাই কমিশনার হিসেবে এখানে কাজ করেছি এবং আমার কর্মজীবনের অন্যতম সন্তুষ্টিদায়ক পোস্টিং ছিল এটি। এখানে আসার আগেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে কাজ করার সময়ে অনেকবার আমি এই সুন্দর দেশে এসেছিলাম। সুতরাং পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে ঢাকা আসতে পেরে আমি আনন্দিত।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, আপনারা জানেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে এই মাসে মুজিববর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমরা এই সফরের প্রত্যাশায় রয়েছি। কারণ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সম্পর্কের প্রতি অগ্রাধিকার দেন এবং এর চেয়েও বড় কারণ, বঙ্গবন্ধু একজন বিশ্বনন্দিত নেতা এবং বাংলাদেশ ও আমাদের উপমহাদেশের মুক্তির প্রতীক। ভারতে তার নাম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি বাংলাদেশে যেমন সম্মান লাভ করেন তেমনই ভারতেও সমান শ্রদ্ধার পাত্র। সুতরাং আমি এই জ্ঞানী, নির্ভীক, দৃঢ়প্রত্যয়ী এবং সর্বোপরি এমন একজন বীর যিনি শোষণের হাত থেকে একটি জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন, সেই মহান বঙ্গসন্তানের জন্মশতবর্ষে আপনাদের শুভকামনা জানাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরও জাতীয় বীর। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে যৌথ প্রযোজনায় বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাণসহ জন্মশতবর্ষের বিভিন্ন আয়োজনের অংশীদার হতে পেরে আমরা গর্বিত।

‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শক্তিশালী, সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ এবং সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমাদের পূর্ণ সমর্থন একবারেই ভারতের জাতীয় স্বার্থে। বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সূচক, যেমন- শিশুমৃত্যু থেকে নারী শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য থেকে স্বাক্ষরতা ইত্যাদি উন্নয়নে আপনাদের অভূতপূর্ব সফলতা বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি এনে দিয়েছে। আজকে এশিয়ার উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ, যেটা সত্যিই প্রশংসনীয় অর্জন।’

শ্রিংলা বলেন, আমাদের নেতাদের বিচক্ষণতার কারণেই আমরা সীমান্ত ও জমি বিনিময়সহ অনেক কঠিন সমস্যা যেগুলো প্রতিবেশীদের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট করে, সেগুলো চিহ্নিত করে পরিপক্কতার সঙ্গে সমাধান করতে পেরেছি। আমি বলব যে, বাংলাদেশ এবং ভারত যেভাবে এ ধরনের সমস্যাগুলো সমাধান করেছে তা অন্য দেশের জন্য অনুকরণীয়।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমরা ধারাবাহিক এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ জাতীয় অনেকগুলো সমস্যা সমাধান করেছি। কোনো ধরনের দোষারোপ না করে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের অংশীদারিত্বের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে এসব সমস্যা সমাধান করেছি। তার মানে আমাদের একটা দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা করতে হবে।

শ্রিংলা আরও বলেন, বিগত কয়েক বছরে ভারত ভ্রমণের জন্য যেখানে অনেক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো ভিসার জন্য সেখানে আজকে আমরা এমন পর্যায়ে রয়েছি যেখানে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকেই ভারতে বেশি পর্যটক যাচ্ছে। এছাড়া, ১৯৬৫ সালের আগেকার ৬টি রেল সংযোগ ২০২১ সালনাগাদ আবারো চালু হবে, যার ফলে স্থলপথে যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবেই উন্নত হবে। প্রান্তিক ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস পরিষেবা চালুর ফলে কলকাতা-ঢাকা এবং কলকাতা-খুলনা রুটে মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। আমি জেনে আনন্দিত যে, মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি নতুন পরিষেবা চালুর বিষয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় রয়েছি।

তিনি বলেন, আমরা বাণিজ্য সহজীকরণ ও প্রসারণে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করছি। আরও সহজ বাণিজ্য প্রক্রিয়াগুলো আমাদের উভয় পক্ষের সম্পদ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ করে দেবে। এছাড়াও, আমাদের একে অন্যের বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণেরও অনেক সুযোগ রয়েছে এবং সরকার হিসেবে আমাদের উচিত, ব্যবসায়ীদের ও উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে একে অন্যের দেশে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা।

‘একটা অত্যাবশ্যক বিষয় যেখানে আমাদের আরও বেশি কিছু করার সুযোগ রয়েছে বা করা উচিত সেটি হলো, আমাদের অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা। আমি জানি, আমাদের মতো ঘনবসতির ও জীবিকার জন্য নদীর উপর নির্ভরশীল দেশে এই বিষয়টা কতটা নাজুক। এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত। আমি বলতে পেরে খুশি হচ্ছি যে, আমাদের দুই পক্ষই স্বীকার করে যে, অভিন্ন নদী বিষয়ে আমাদের আরও উন্নতির সুযোগ আছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আগস্ট ২০১৯ থেকেই দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপ শুরু হয়েছে।’

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, শুষ্ক মৌসুমে আমাদের পানিসংকটের সর্বোত্তম সমাধান খুঁজতে এবং আমাদের পানি ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর, যেন এসব নদীগুলো আগামী প্রজন্মেও জীবিকার উৎস হয়ে থাকতে পারে। এজন্য বিভক্তি সৃষ্টি নয় বরং যা আমাদের বন্ধনকে দৃঢ় করবে সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে আমরা বাংলাদেশের উত্তর–দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখা নৌপথগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধিতে একমত হয়েছি। আমরা আশুগঞ্জ ও জকিগঞ্জের মধ্যবর্তী কুশিয়ারা এবং সিরাজগঞ্জ ও দাইখোয়ার মধ্যবর্তী যমুনা নদীর খনন কাজে একমত হয়েছি যার এক তৃতীয়াংশ ব্যয় ভারত বহন করবে। সেইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ নৌ প্রটোকল সম্প্রসারণের পাশাপাশি আশুগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলোর উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করছি আমরা।

সোমবার সকালে বিশেষ বিমানে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। এসময় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ উপস্থিত ছিলেন।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফরের সময় সোমবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি একই দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনেরও সঙ্গেও বৈঠক করবেন।

মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) শ্রিংলা ঢাকা ত্যাগ করবেন। ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে কানেকটিভিটি নিয়ে দুইটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় দেশটির হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি গত বছর জানুয়ারিতে ঢাকার দায়িত্ব পালন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে হাইকমিশনার হিসেবে যোগ দেন। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন শ্রিংলা। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব নিযুক্ত হওয়ার পরে এটাই প্রথম তার বাংলাদেশ সফর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here