রূপচর্চায় তরমুজ

0
15

খবর৭১ঃ গরমকালে শুধু প্রাণের আরামের জন্যই নয়, রূপচর্চায় সতেজতা আনতেও তরমুজের জুড়ি মেলা ভার। ত্বক থেকে চুলের ভোলবদল ঘটাতে রূপচর্চার লিস্টে এই ফল সামিল করতেই হবে।

গরমকালে প্রাণ ঠান্ডা করার কথা মাথায় আসলেই যে ফলগুলোর ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাতে তরমুজের নাম একদম উপরের সারিতেই থাকবে। সদ্য ফ্রিজ থেকে বের করা টুকটুকে লাল একফালি তরমুজ, গরমের দুপুরগুলোয় যে কী পরম উপাদেয়, তা সবাই জানেন। তবে শুধু তো জিভের আরামে নজর দিলে চলবে না। শরীর এবং সৌন্দর্য— এই দু’টো দিকেও তো খেয়াল রাখতে হবে। এই দু’টি বিষয়েও তরমুজ একশোয় একশো। স্বাস্থ্যের জন্য যেমন উপকারী, তেমনই কাজে লাগে রূপচর্চাতেও। আর শুধু ফল নয়, বীজও ত্বক এবং চুলের জন্য ভীষণ উপকারী। অনেকেই হয়তো তরমুজের এই দিকটা সম্পর্কে অবগত নন। চলুন, সেই দিকে মনোনিবেশ করা যাক। এমন সব টিপস দেব, তরমুজকে রূপচর্চার লিস্টে সামিল না করে পারবেন না।

টোনারঃ

রূপচর্চায় তরমুজের অন্যতম ব্যবহার টোনার হিসেবে। তরমুজ প্রাকৃতিক টোনার হিসেবে দারুণ কার্যকরী। তরমুজের রস এক ধরনের প্রাকৃতিক অ্যাস্ট্রিনজেন্ট এবং ত্বক ভাল রাখতে অব্যর্থ। এটি ত্বক আর্দ্র রাখে। সরাসরি মুখে তরমুজের টুকরো ঘষে নিতে পারেন। এছাড়া এতে সামান্য হেজ়েলনাটগুঁড়ো মিশিয়েও ব্যবহার করতে পারেন। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য খুব উপকারী। আবার শুধু তরমুজের রসও মুখে এবং গলায় লাগাতে পারেন। পরিষ্কার মুখে তুলোয় করে তরমুজের রস লাগিয়ে ১৫ মিনিট রেখে দিন। এরপর ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

মসৃণ এবং আর্দ্র ত্বকের জন্যঃ

ত্বকের আর্দ্রতা সঠিক না থাকলে, ত্বক নিষ্প্রাণ দেখাতে পারে। তরমুজ এক্ষেত্রে খুব ভাল অপশন। প্রতিদিন মুখে তরমুজের রস ব্যবহার করতে পারলে ত্বক অনেক বেশি মসৃণ, উজ্জ্বল এবং কোমল থাকে। শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে সামান্য মধুর সঙ্গে তরমুজের রস মিশিয়ে মুখে লাগাতে পারেন। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকে সজীবতা আসবে। ক্লান্ত এবং নির্জীব ত্বক নিমেষে দূর হবে।

ফেস ক্রিমঃ

তরমুজের রসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ থাকায়, এটি ত্বকের রন্ধ্র ছোট করতে সাহায্য করে। ফলে তৈলাক্ত ত্বকের জন্যও খুব ভাল। যাঁরা তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারী, তাঁরা গরমে তরমুজকে সঙ্গী করুন। সামান্য মধু, টকদই এবং তরমুজের রস মিশিয়ে ক্রিম হিসেবে পুরো মুখে ব্যবহার করুন। খানিকক্ষণ রেখে ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

স্কিন লাইটেনিং প্যাকঃ

প্রতিদিন তরমুজের রস ত্বকে ব্যবহার করলে ট্যানিংয়ের হাত থেকেও রক্ষা পাবেন। এতে ত্বকও উজ্জ্বল থাকে। শুধু ত্বকেই ব্যবহার করবেন, তা নয়। প্রতিদিন এক গ্লাস করে তরমুজের রস খেতে পারেন। অথবা একটি ফেস প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। সম পরিমাণে তরমুজ এবং শসার পাল্প মিশিয়ে পুরো মুখে সমানভাবে লাগান। ২০ মিনিট রেখে, ধুয়ে ফেলুন। শুধু যে ট্যানিং কমাতে এই প্যাক সাহায্য করবে, তা নয়। সানবার্নেও খুব ভাল ফল দেয় এবং ত্বকের স্বাভাবিক কমপ্লেকশন বজায় রাখতেও সাহায্য করে।

দাগহীন ত্বকের জন্যঃ

প্রতিদিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে, তরমুজ থেঁতো করে ত্বকে লাগালে, আপনার ত্বকের অনেক সমস্যা কমে যাবে গ্যারান্টি দিলাম। ত্বকের নানা ধরনের র‌্যাশ, কাটা-ছেড়া, ফোস্কা ইত্যাদিও কমে যাবে। ফাঁটা ঠোঁটের জন্যও খুব ভাল।

সুন্দর ত্বকের জন্যঃ

প্রতিদিনের ধোঁয়া, ধুলো, দূষণের মুখে পড়ে, ত্বকের উজ্জ্বলতা এবং লাবণ্য কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তরমুজ কিন্তু এই সমস্যা থেকে ত্বককে বাঁচাবে। শুধু দূষণ নয়, সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মির হাত থেকেও ত্বককে সুরক্ষা দেয় তরমুজ। ত্বক মসৃণ হয় এবং প্রাণ ফিরে পায়। আইস ট্রেতে তরমুজের টুকরো রেখে ডিপ ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন। জমে গেলে তা পুরো মুখে বরফের পরিবর্তে ব্যবহার করুন। এর সঙ্গে পুদিনা পাতাও মিশিয়ে রাখতে পারেন। ত্বক মসৃণ, সজীব এবং কোমল থাকবে।

অ্যান্টি এজিংঃ

তরমুজে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন, লাইকোপেন, ভিটামিন এ এবং সি থাকে। শরীরে থাকা ফ্রি র‌্যাডিকাল ত্বকে ফাইন লাইনস, বলিরেখা, দাগ-ছোপ ইত্যাদি সৃষ্টি করে। তরমুজে থাকা এইসব অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরে ফ্রি র‌্যাডিকালের পরিমাণ কমিয়ে বার্ধক্যের ছাপও কমায়। মাখন এবং তরমুজের রস একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান। এতে ত্বক টানটান থাকবে। অথবা, তরমুজের ক্বাথ এবং অ্যাভোকাডো একসঙ্গে মিশিয়ে মাস্ক হিসেবে মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে উষ্ণ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। গরমকালে অ্যান্টি-এজিং মাস্ক হিসেবে এটি খুব উপকারী।

অ্যাকনে প্রতিরোধেঃ

অ্যাকনে প্রতিরোধেও তরমুজের ভূমিকা রয়েছে। প্রথমে জমানো তরমুজের টুকরো মুখে ঘষে নিন। এতে ত্বকের রন্ধ্রে জমে থাকা ময়লা দূর হয়। এরপর পাকা কলা এবং তরমুজের ক্বাথ একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান। এই প্যাক ত্বকের দৃঢ়তা বজায় রাখে এবং ত্বকে কোনও জ্বালাভাব থাকলে তাও কমায়। এতে ত্বকের তৈলাক্তভাবও নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে অ্যাকনেও ধীরে ধীরে কমে আসে।

স্ক্রাব হিসেবেঃ

তরমুজে থাকা অ্যাসিড ত্বকের মৃত কোশ দূর করে, ত্বককে মসৃণ, প্রাণবন্ত এবং উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে। সামান্য পরিমাণে তরমুজের রস এবং বেসন একসঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। পুরো মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর ভিজে হাত দিয়ে ভালভাবে মাসাজ করে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

চুলের গ্রোথের জন্যঃ

আর্জিনিন আমাদের শরীরের অতিপ্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলোর মধ্যে অন্যতম। চুলের জন্য তো খুবই ভাল। চুল ঘন, চকচকে এবং মজবুত রাখতে, স্ক্যাল্পে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কিংবা চুলের গ্রোথ স্বাভাবিক রাখতে এই অ্যামাইনো অ্যাসিড খুব উপকারী। তরমুজে রয়েছে সাইট্রুলিন যা, এই অ্যামাইনো অ্যাসিডকে শরীরে শোষিত হতে সাহায্য করে। ফলে চুলের স্বাস্থ্যের জন্যও এই ফল কার্যকরী। প্রতিদিন ডায়েটে তরমুজ রাখুন। উপকার পাবেন।

চুল পড়া কমাতেঃ

প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকায়, তরমুজ শরীরকে নন-হিম আয়রন ব্যবহার করতে সাহায্য করে। এতে আমাদের লোহিত কণিকা বেশি পরিমাণে আয়রন শোষণ করে এবং রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। চুলের প্রতিটি কোশে এই অক্সিজেন পৌঁছলে চুল হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। এছাড়া চুল ভাল রাখতে কোলাজেনও প্রয়োদন হয় এবং তরমুজ কোলাজেন তৈরিতেও সাহায্য করে।

এ তো গেল তরমুজ ফলের কথা। আগেই বলেছি, শুধু ফল নয়, এর বীজও একইরকম উপকারী। চলুন, এবার তাহলে, বীজের গুণাবলী জেনে নিই।

১। তরমুজের বীজের তেল শুধু চুল বা ত্বকের পক্ষেই নয়, বরং পুরো শরীরের জন্যই খুব উপকারী। স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বক পেতে প্রতিদিন এই তেল ব্যবহার করা শুরু করুন। বাজারে খুব সহজেই এই তেল কিনতে পাবেন। এই তেলে রয়েছে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, যা ত্বককে টোনড, ময়শ্চারাইজ়ড এবং আর্দ্র রাখতে অব্যর্থ। এছাড়া ত্বকের যাবতীয় সমস্যা সমাধানেও এই তেল উপকারী।

২। শুধু ফলেই নয়, তরমুজের বীজেও রয়েছে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা বার্ধক্যের ছাপ কমাতে পারে। প্রতিদিন শুতে যাওয়ার আগে এই তেল মুখে মাসাজ করতে পারেন। ত্বকের দৃঢ়তা বজায় রাখতেও এই তেল সাহায্য করবে।

৩। এই তেল খুব হালকা এবং ত্বকও সহজেই এই তেল টেনে নেয়। এতে ত্বকের রন্ধ্রের মুখও আটকে থাকে না। ত্বক আর্দ্র রাখতে, ময়শ্চারাইজ়ার হিসেবেও এই তেল ব্যবহার করতে পারেন, আবার কোনও ফেস প্যাকে মিশিয়েও ব্যবহার করতে পারে। তৈলাক্ত, শুষ্ক অথবা পরিণত, সব ধরনের ত্বকের জন্যই এই তেল উপকারী।

৪। ফলের মতোই অ্যাকনে প্রতিরোধেও এই তেল কার্যকরী।

৫। ত্বকের জটিল সমস্যা, যেমন স্কিন ক্যানসার বা কোনও ইনফেকশন প্রতিরোধেও এই তেল ভাল।

৬। হালকা হওয়ার, চুলের জন্যও এই তেল উপকারী। নানা ধরনের উপকারী উপাদান তো রয়েইছে, তবে এই তেল কিন্তু স্ক্যাল্পের পক্ষেও বেশ ভাল। এতে স্ক্যাল্প তেলতেলে হয় না, ফলে ধুলোময়লা জমারও আশঙ্কা নেই। স্ক্যাল্পে রক্ত চলাচলও স্বাভাবিক থাকে, চুল পড়ও কমে। এতে থাকা এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড চুলকে আর্দ্র রাখে। এর পাশাপাশিই এই তেলে থাকে কপার, পটাশিয়াম ইত্যাদির মতো উল্লেখযোগ্য মিনারেল। কপার চুল কালো রাখতে সাহায্য করে এবং পটাশিয়াম কোশের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সপ্তাহে একদিন এই তেল ভালভাবে স্ক্যাল্পে এবং চুলে মাসাজ করুন। নিয়মিত ব্যবহারে খুব অল্পসময়েই চুলের চেহারায় পার্থক্য আসবে।

তাহলে, আর দেরী কীসের? বাজার থেকে তরমুজ কিনে আজই লেগে পড়ুন রূপচর্চায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here