যানজটে বাড়ে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি

0
41

খবর৭১ঃ দীর্ঘ যানজটে সময় ও আর্থিক ক্ষতি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত ক্ষতি কম নয়। দীর্ঘক্ষণ যানজটে পড়ে নাগরিকদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে ও উদ্বেগ বাড়ছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুস ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও প্রজননতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজধানীতে যানজটের তীব্রতা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। মারাত্মকভাবে শব্দ ও বায়ুদূষণও হচ্ছে। এতে যাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নিয়মিত যানজটের বিরক্তি থেকে মানুষের সংসার ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ এবং স্নায়বিক ক্ষতির অন্যতম কারণও অতিরিক্ত যানজট বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, যানজট রোধে এখনই দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি চরমে পৌঁছবে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা যুগান্তরকে জানান, স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কারণে অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি কিনছেন। এ মুহূর্তে রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ৭৬ শতাংশের বেশি। অধিকাংশ সড়ক ব্যক্তিগত গাড়ি দখল করে থাকে। ঢাকায় যানজটে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এখানকার যানবাহনের চলার গতি বর্তমানে মানুষের হাঁটার গতির সমান বলে একটি গবেষণায় উঠে এসছে। অথচ এক দশক আগেও ঢাকায় যানবাহনের চলার গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। সেখান থেকে নামতে নামতে এখন ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে সদরঘাটগামী একাধিক গণপরিবহণ চালক বলেন, আগে এ রুটে যানজটে আটকে পড়ার গড় হিসাব ছিল ১ থেকে দেড় ঘণ্টার মতো। এখন সেটি বেড়ে ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মতো হচ্ছে। মঙ্গলবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে সাভার থেকে বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে আসেন আমেনা জামান। কিন্তু নিউমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের জেরে মিরপুরগামী রাস্তায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। ফলে গাবতলী থেকে কলেজ গেট পর্যন্ত আসতে তাদের দুই ঘণ্টা লেগে যায়। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৯টায় বাসা থেকে বের হয়ে দুপুর সোয়া ১২টায়ও তারা হাসপাতালে পৌঁছতে পারেননি। তিনি বলেন, গাড়ির অনেক যাত্রী হেঁটে রওয়ানা দিলেও অসুস্থ বাবাকে নিয়ে তাকে বাসের ভেতর থাকতে হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, যানজটে পড়ে সময় ও আর্থিক ক্ষতির চিন্তায় অনেক যাত্রী চালক-হেলপারের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এতে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হলেও তারা তা বুঝতে পারেন না। কাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে যানজটে সৃষ্ট মানসিক চাপে অনেকের হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত রাস্তায় আটকে থাকায় রোগী ও অভিভাবকদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, রাজধানীতে মানুষ সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছেন রান্নাঘরের ধোঁয়ায়। এরপর যানজটে আটকা পড়ে মানুষ ধোঁয়াদূষণের শিকার হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের শরীরে প্রতি মিটার কিউবে গড়ে ১০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত দূষণ সহনীয়। রাজধানীর বাসিন্দাদের গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ মাইক্রোগ্রাম বায়ুদূষণ সহ্য করতে হচ্ছে। আর যানজটে আটকা পড়লে সেটি প্রতি মিটার কিউবে ৬০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ডব্লিউএইচের বর্তমান গাইডলাইনের চেয়ে ঢাকা নগরবাসীকে ৬০ শতাংশের বেশি দূষণ সহ্য করতে হচ্ছে। এতে ফুসফুস ও প্রস্টেটগ্রন্থির ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা জিপজোটের গবেষণা অনুযায়ী-বিশ্বে মানসিক চাপের শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান সপ্তম। এর প্রধান কারণ হিসাবে যানজটকে দেখানো হয়েছে। একইভাবে কানাডার সেন্টার ফর ড্রাগ অ্যাডিকশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ (সিডিএএমএইচ) এক গবেষণা বলেছে-যানজটের মানসিক চাপ নিয়মিত গ্রহণ করলে মানসিক অস্থিরতা তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ। নিয়মিত যানজটের বিরক্তি থেকে মানুষের সংসার ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here