নড়াইলে চলছে পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পের কাজ

0
78

উজ্জ্বল রায়, জেলা প্রতিনিধি নড়াইল থেকে: পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-যশোর রেললাইনের নড়াইল অংশের কাজ শুরু হয়েছে। দেশের বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল, বাণিজ্যিক শহর নওয়াপাড়া ও শিল্পাঞ্চল খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে, এমনকি ভারতের পশ্চিবাংলায় যাতায়াতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে রেল যোগাযোগ। এটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের একটি উপ-রুট। এ প্রকল্পের নড়াইল অংশের কাজ শুরু হওয়ায় কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষের। জানা গেছে, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে নড়াইল অংশের কাজ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণ করে সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে জমি বুঝিয়ে দিয়েছেন জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ হওয়া জমির মালিকেরা জমিসহ সকল স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বুঝে পেয়েছেন।
ওই প্রকল্প সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে যশোর এই ১৭২ কিলোমিটার জুড়ে চলছে রেললাইন নির্মাণ। চীনের ‘চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লি.’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর কাজ করছে। কাজ শেষের মেয়াদ ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এতে মোট রেলস্টেশন থাকবে ২০টি। এর ১৪টি নতুন নির্মাণ করতে হবে। ব্রডগেজ এ রেললাইনে ৬৬টি বড় সেতু ও ২৪৪টি ছোট সেতু নির্মাণ করতে হবে। লেভেলক্রসিং গেট থাকবে ৩০টি। নয় জেলাকে যুক্ত করবে এ রেললাইন। ঢাকা থেকে পদ্মাসেতু হয়ে ভাঙ্গা, নগরকান্দা, মুকসুদপুর, মহেশপুর, কাশিয়ানী, লোহাগড়া, নড়াইল ও জামদিয়া হয়ে যশোরের রুপদিয়ায় রেললাইনে মিশবে। এর মধ্যে ভাঙ্গা, কাশিয়ানী ও যশোরের পদ্মবিলায় রেলওয়ে জংশন হবে। নড়াইল জেলার লোহাগড়া পৌর এলাকার নারানদিয়ায় ও নড়াইল পৌর এলাকার দুর্গাপুরে রেলস্টেশন হবে। ঢাকা থেকে লোহাগড়ার রেলস্টেশনের দূরত্ব ১২৩ ও নড়াইল রেলস্টেশনের দূরত্ব ১৩৮ কিলোমিটার।
নড়াইল জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, নড়াইল জেলায় রেললাইনের মধ্যে পড়েছে ২৮টি মৌজা। এতে ৪০৬ দশমিক ৭১ একর জমি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, লোহাগড়া উপজেলা সদরের নির্ধারিত এলাকা জুড়ে রেললাইন নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। সেখানে ফসলি জমিতে বালু ভরাট করে রোলার দিয়ে সমান করা হচ্ছে। ভাটিয়াপাড়ায় মধুমতীতে এবং লোহাগড়ার নবগঙ্গায় রেলসেতুর প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। এখানে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের সমন্বয়ে চলছে কর্মযজ্ঞ। আশপাশের গ্রামের মানুষ এ কর্মযজ্ঞ দেখতে ভিড় করছেন। এদিকে নড়াইল সদর উপজেলায়ও সমান গতিতে এগিয়ে চলছে এই কাজ। সব মিলিয়ে জেলায় রেললাইনের ২৮টি মৌজার মধ্যে সকল এলাকায় একযোগে এগিয়ে চলছে নড়াইলবাসীর স্বপ্নের এই রেল লাইনের কাজ।
কৃষকরা জানান, তাদের উৎপাদিত ফল, সবজি ও বিভিন্ন প্রকার ফসল পরিবহন জটিলতায় বাজার মূল্য থেকে অনেক কম দামে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে হয়। বছরের পর বছর তারা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রেল লাইনটি চালু হলে তারা তাদের ফসল সহজেই কম সময়ে কম খরচে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়ে নায্য দামে বিক্রি করতে পারবে।
পান চাষি রহমত শেখ জানান, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পান চাষ করছি। ঢাকায় যে পান ২৫০ টাকা পোন (৮০ পিস) বিক্রি হয়, সেই পান নড়াইলে ৫০ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারি না। সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ না থাকায় তার মতো শত শত পান চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ট্রেন লাইন চালু হলে সরাসরি ঢাকাতে নিয়ে পান বিক্রি করতে পারবেন তারা।
মাছ চাষি জিরু জানান, ট্রেন লাইন চালু হলে তার মতো জেলার অন্তত ৬ হাজার মাছ চাষি লাভবান হবেন। তখন ট্রেনে মাছ পরিবহন করে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে নিজেরাই পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। তখন তারা মাছের নায্য মূল্য পাবেন।
লোহাগড়া বাজারের ব্যবসায়ী শাহ জামাল মীর জানান, ঢাকা থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনে কয়েকগুণ বেশি পরিবহন খরচ দিয়ে নড়াইলে আনতে হয়। এতে সময়ও অনেক বেশি লাগে। এতে ঝুঁকিও আছে। ট্রেন লাইন চালু হলে তাদের আর এই সমস্যা থাকবে না। তখন তারা অনেক কম সময়ে এবং কম খরচে বিভিন্ন মালামাল আনা নেয়া করতে পারবেন।
নড়াইল চেম্বর অফ-কমার্সের সভাপতি মো. হাসানউজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে নড়াইল জেলার মানুষ পেতে যাচ্ছে সরাসরি রেল সেবা। জেলায় এখন চলছে রেললাইন নির্মাণের কাজ। রেল লাইন নির্মাণ শুরু হওয়ায় নড়াইলের ব্যবসায়ীদের মাঝে অন্য রকমের আনন্দ বিরাজ করছে। এই লাইন চালু হলে সব থেকে বেশি উপকৃত হবে ব্যবসায়ীরা। তখন ঢাকা, স্থলবন্দর বেনাপোলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অল্প খরচে সহজেই বিভিন্ন পণ্য এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করতে পারবে নড়াইলের ব্যবসায়ীরা। লাইনটি চালু হলে জেলার কয়েক হাজার ব্যবসায়ী উপকৃত হবেন।
নড়াইল উন্নয়ন কমিটির নেতা শরীফ মূনির চৌধুরী জানান, লাইনটি চালু হলে দেশের বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল, বাণিজ্যিক শহর নওয়াপাড়া ও শিল্পাঞ্চল খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে, এমনকি ভারতের পশ্চিবাংলায় যাতায়াতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ রেললাইন। এটি নড়াইলবাসীর জন্য আশীর্বাদ।স্থানীয় দিন মজুুর মামুন শেখ জানান, দেড় বছর পূর্বে থেকে সে এই রেল লাইনে কাজ করছেন। প্রতিদিন সে পাঁচ শত টাকা থেকে ছয় শত টাকা আয় করেন। রেল লাইনের কাজ শুরু হওয়ার পর তার কাজের কোন সমস্য হয় না। তার মতো কয়েক হাজার দিন মজুর এই প্রকল্পে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান প্রিন্স জানান, এই প্রকল্পে তার মতো অসংখ্য ব্যবসায়ী বালু দিচ্ছে। এই প্রকল্প নড়াইলে শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি বালুর ব্যবসা আগের থেকে বড় পরিসরে করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here