কোভিড মোকাবেলায় স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য কতদূর

0
108
কোভিডের দ্বিতীয় ধাক্কা কি আসন্ন?
লেখকঃ অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল, চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও অর্থ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

খবর৭১ঃ কোভিড এদেশে প্রথম আসার পর প্রায় কেটে গেছে চারটি মাস। কাজেই কোভিডে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য কতদূর- এ প্রশ্নটি এখন আসতে পারে সঙ্গত কারণেই। আসছেও তাই। ইদানীং যে কোন আলোচনাতেই উঠে আসছে এই প্রশ্নটি। ক’দিন আগেই ‘বাংলাদেশ পোস্ট’-এর একটি রিপোর্টের জন্য টেলিফোনে কথা হচ্ছিল ডাঃ হাসিবের সঙ্গে। ঘুরে ফিরে এই প্রশ্নটিই। একই প্রশ্ন দৈনিক ‘ভোরের পাতা’ সংলাপেও।

সবার জানতে চাওয়া কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা? কেমন চলছে আমাদের স্বাস্থ্য খাত? মাঝে মাঝেই হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে রোগীর মৃত্যু যখন মিডিয়ায় সামনে উঠে আসে, তখন সঙ্গত কারণেই মানুষের মধ্যে একটু হলেও শঙ্কা, কিছুটা আস্থাহীনতা আসতেই পারে এবং তা আসাটা একেবারেই অমূলক নয়। পাশাপাশি আমাদের তথ্য উপস্থাপনায়ও হয়ত একটু ঝামেলা রয়ে যাচ্ছে। আমি নিজে যেহেতু চিকিৎসক, কাজেই আমার লেখাটা অনেকের কাছেই পক্ষপাতদুষ্ট মনে হতেই পারে। সে রকম মনে হওয়াটাই বরং যৌক্তিক। তবে আমার ধারণা, এই লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়লে, এই যৌক্তিকতা আর তত বেশি যৌক্তিক বলে মনে হবে না।

আমার দৃষ্টিতে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যাটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারা। বাংলাদেশে ইদানীং গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজারের মতো কোভিড রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় তিন শ’ কোভিড রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়াটা প্রয়োজন। যদি সত্যি সত্যি তাই হতো, তাহলে কিন্তু আমাদের হাসপাতালগুলোর করিডর উপচে হাসপাতালের আশপাশের রাস্তায় রোগীর বিছানা পাততে হতো। যেমনটি করতে হয়েছিল কোভিড সংক্রমণ যখন পিকে, তখন স্পেন বা ইতালির মতো ইউরোপের আধুনিকতম রাষ্ট্রগুলোতে। অথচ বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতা হচ্ছে কোভিড হাসপাতালে বেড খালি থেকে যাচ্ছে। আমার ধারণা এর মূলে রয়েছে টেলিমেডিসিনের অসম্ভব সাফল্য। শুরুর দিকে কোভিড শনাক্ত হলেই অন্তত সিম্পটোমেটিক প্রতিটি রোগী ছুটতেন হাসপাতালে। এখন কিন্তু পরিস্থিতিটি একদমই উল্টো। এখন রোগীরা কোভিড শনাক্ত হওয়ার পর প্রথম খোঁজেন পরিচিত ডাক্তার। খোঁজেন নিজের পরিচিত কারও কোন ডাক্তার পরিচিত আছেন নাকি; পরিচিত আছেন নাকি কোন চিকিৎসক নিজেদের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে। চিকিৎসকের কাছ থেকে তারা পরামর্শ নিচ্ছেন, বাসায় বসে চিকিৎসা করছেন এবং সুস্থ হচ্ছেন।

সাধারণ ওষুধ তো যেমন- তেমন, এনক্সাপাইরিন বা রিভোরক্সাবিন-এর মতন ওষুধগুলো এখন অনেক সময়েই বাসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি শিরায় দেয়ার যে সমস্ত এ্যান্টিবায়োটিক, কখনও কখনও বাসায় ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোও। অথচ এনক্সাপাইরিনের মতো ওষুধ আজ থেকে আট-নয় মাস আগেও সিসিইউএর বাইরে ব্যবহার করার কথা হয়ত চিন্তাই করা যেত না। এ সমস্ত ওষুধ ব্যবহারের ফলে রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধা বা ডিসেমিনেটেড ইন্ট্রাভাস্কুলার কোয়াগুলেশন আর সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের মতো কমপ্লিকেশনগুলো অনেক কমে আসছে। ফলে রোগীদের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক কম দেখা দিচ্ছে। অনেক বেশি রোগী বাসায় থেকেই হোম আইসোলেশনে সুস্থ হচ্ছেন। আর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হলেও, ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন পড়ছে অনেক কম।

আমার নিজের কথাই বলি। আমার কোভিড শনাক্ত হওয়ার চতুর্থ দিনে হাই রিজ্যুলিউশন সিটি স্ক্যানে ফুসফুসে একটি কনসোলিডেশন ধরা পড়ে। আজকের ইউরোপে কিংবা দু’মাস আগের বাংলাদেশে এ রকম একটি কনসোলিডেশন ধরা পড়লে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াটাই ছিল বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমি চিকিৎসা নিয়েছি আমার ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের রুমমেট, আজকের ঢাকা সিএমএইচের চেস্ট ফিজিশিয়ান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডাঃ ফয়জুল হক (ইমন)-এর কাছ থেকে। আরও পরামর্শ দিয়েছে আমার এক সময়ের ছাত্র, আজকের সহকর্মী কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের লিভার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ আহমেদ লুৎফুল মুবিন। তারা দু’জনেই কোভিড রোগীর চিকিৎসায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। পাশাপাশি আমার স্ত্রী ডাঃ নুজহাত এবং আমাদের ছেলে সূর্য, তারাও বাসাতেই চিকিৎসা নিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই ভাল হয়েছি। আমাদের কারোরই হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়েনি।

কোভিডের শুরুর দিকে বোদ্ধারা অনেক হিসাব কষেছিলেন ভেন্টিলেটরের অভাবে এদেশে মানুষ কিভাবে, কত করুণভাবে মৃত্যুবরণ করবে। সে সব আলোচনায় এক সময় আমাদের অনেক সময় ব্যয় হয়েছে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের হাসপাতালের ভেন্টিলেটরগুলো প্রায়ই খালি পড়ে থাকছে। ফলে কোভিডের ভেন্টিলেটরের সেই হিসাব-নিকেশগুলো এখন অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

তবে কোভিড চিকিৎসায় স্বাস্থ্য খাতের সবচাইতে বড় সাফল্যটি হচ্ছে, দেশে কোভিডে মৃত্যুর হারটি অনেক কমে ধরে রাখতে পারা এবং এটি সম্ভব হয়েছে এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার কারনেই। আজকে বাংলাদেশে কোভিডে মৃত্যুর হার এক দশমিক তিন শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। আজ থেকে সপ্তাহখানেক আগেও এটি এক দশমিক চার শতাংশের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। এ কথা যখন বলছি তখন মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতিবেশী ভারতে কোভিডে মৃত্যুর হার তিন শতাংশের ঘরে। আর কোভিডের সংক্রমণ যখন পিকে গিয়েছিল তখন ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে এটি পনেরো শতাংশ পর্যন্ত হয়েছিল। অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, আমাদের দেশের মানুষের ইমিউনিটি বেশি। তাই এদেশে কোভিডে মৃত্যুর হারটি অনেক কম। অনেকে এমনও বলার চেষ্টা করেন, কোভিড এদেশে এসে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভাইরাসটির সম্ভবত কোন মিউটেশন হয়েছে, যে কারণে এদেশে মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন কম। তাদের আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, দুনিয়ায় হতে পারে না এমন কোন কিছু তো নেই। যে কোন কিছুই হতে পারে। এই কোভিড প্যান্ডেমিকই তার বড় প্রমাণ। কিন্তু আমাদের যে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, তার কোন প্রভাব যদি আমাদের ইমিউনিটির ওপর পড়ে থাকে তার ফলে আমাদের দেশের মানুষের ইমিউনিটি কম হলেও হতে পারে, বেশি হওয়ার কোন কারণ নেই। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কোভিডের ভাইরাসের মিউটেশনের কারণে পৃথিবীর কোথাও এর ইনফেক্টিভিটি বেড়েছে বা কমেছে, এমন কোন বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত কিন্তু এখনও আমাদের সামনে আসেনি।

অবিশ্বাসী আছেন আরও অনেকেই। অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, আসলে মানুষ মারা যাচ্ছেন অনেক বেশি। মানুষ মারা যাচ্ছেন হাজারে হাজারে। তাই-ই যদি হতো, যদি মানুষ মারা যেত কাতারে কাতারে, তবে এটি কখনই লুকানো সম্ভব হতো না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে ইকুয়েডর, যেখানে মানুষ মরে ঘরে পড়ে থেকেছেন, পুলিশ গিয়ে মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করেছে। কোভিডে যখন অসংখ্য অজস্র মানুষ অসহায় ভাবে মৃত্যুবরণ করেন, তখন ইতালির মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, যেখানে কফিনের অভাবে হাসপাতালের মর্গে মর্গে দেখা গিয়েছিল লাশজট, কিংবা নিউইয়র্কের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেখানে নগর প্রশাসনকে আগেভাগেই গণকবর খুঁড়ে মৃতদেহ সৎকারের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল।

আর ওই যে বলছিলাম আমাদের তথ্য-উপাত্তগুলো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু ঝামেলা থেকে যাচ্ছে, তার একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে আমরা সংখ্যাগুলোকে সংখ্যায় প্রকাশ করছি, কখনই শতাংশের হিসাবে যাচ্ছি না। বাংলাদেশের মত বৃহৎ জনসংখ্যার দেশে প্রতিদিন তিন হাজার লোক আক্রান্ত হওয়া মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ আর যখন প্রতিদিন চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জন মৃত্যুবরণ করছেন, তখন সেটি আমাদের আক্রান্ত মানুষের কত শতাংশ। এই সংখ্যাগুলো সংখ্যায় প্রকাশ না করে শতাংশে প্রকাশ করা উচিত। যারা বলেন, বাংলাদেশ নেপাল এবং ভুটানের চেয়ে প্রতিলক্ষ জনসংখ্যার হিসেবে অনেক কম কোভিড পরীক্ষা করছে, তাদেরও মনে করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশ বা ভারতের মতো বৃহৎ জনসংখ্যার দেশগুলোর পক্ষে কখনই ওরকম কম জনসংখ্যার দেশের মতো করে এত কোভিড স্যাম্পল পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। জাপানের মতো এত উন্নত দেশে মোট কোভিড পরীক্ষার সংখ্যা আমাদের দেশের চেয়েও কম।

কোভিডে বাংলাদেশে ইকুয়েডর, ইতালি বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যেতেই পারে তেমনটি হবেও না। কোভিড সহসা যাবে না এটি যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে মানুষের আরও সচেতনতা, চিকিৎসা ব্যবস্থায় আরও দক্ষতা আর সর্বোপরি মানবিক নানা সরকারী উদ্যোগের কারণে কোভিডের সঙ্গে আমাদের বসবাসটা হয়ত আরও অনেক বেশি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। তবে সেটি কত তাড়াতাড়ি আসবে সেটি লাখ টাকা দামের প্রশ্ন! মনে রাখতে হবে, এক রোজার ঈদের পরেই কিন্তু আমরা প্রতিদিন হাজার রোগীর দেশ থেকে প্রতিদিন তিন হাজার রোগীর দেশে আর প্রতিদিন দশের আশপাশের মৃত্যুর দেশ থেকে প্রতিদিন চল্লিশ-পঞ্চাশ মৃত্যুর দেশে পরিণত হয়েছি। সামনে ঈদ-উল-আজহা আসছে। যদি আমরা ঈদটাকে আগের মতো করে উদ্যাপন করি, তাহলে এই সংখ্যাগুলো যে বাড়বেই, এ নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। হয়ত আমরা ছয় হাজার রোগী কিংবা শত মৃত্যুর দেশে রূপান্তরিত হবো। তারপর আবারও সূর্য হাসবে, আবারও হয়ত আমরা মাস তিন-চারেক পরে কোভিডকে একটি সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসতে দেখব। কিন্তু এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করবেন আরও হাজারখানেক মানুষ, আর হয়ত আরও শতাধিক চিকিৎসক। এতগুলো মৃত্যুর বিনিময়ে ঈদের আনন্দটুকু উপভোগ করা কি এত জরুরী?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here