ঢাকায় বাস্তব তাপমাত্রার চেয়ে অনুভূত তাপ বেশি

0
31

খবর৭১ঃ
ঢাকার বাসিন্দা মুশফিকুর রহমান এবারের গ্রীষ্মে অদ্ভুত এক বিষয় লক্ষ্য করেছেন। সাধারণত শীতকালে ঠোঁট ফাটলেও এ বছর গরমেও ঠোঁট ফেটে যাচ্ছে। আবার ঢাকার তাপমাত্রা আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যা দেখাচ্ছে তার চেয়ে কয়েক ডিগ্রি বেশি অনুভূত হচ্ছে।

তার মতো অনেকেই এসব সমস্যায় ভুগছেন। তবে এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়। ঠোঁট ফাটা এবং আসল তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপ অনুভবের ঘটনা দেশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে অধিক ঘটেছে। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ঢাকায়ই এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।

অনুভূত তাপমাত্রা কেনো বাস্তব তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হচ্ছে তার কারণ খুঁজতে শুরু করে ইত্তেফাক অনলাইন। জানা গেছে, ভূমি থেকে তাপ বিকিরণই এর পেছনে দায়ী। ঢাকার রাস্তার বিটুমিন গরম হয়ে নিচ থেকে তাপ ছাড়ছে। অন্যদিকে শহর বোঝাই বহুতল ভবনের কারণে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার স্থান কমে গেছে। এসব বিল্ডিংও তাপ বিকিরণ করছে।

এদিকে গত বছরের তুলনায় এবার বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি কম থাকায় তা বেশ শুষ্ক। ফলে মানবদেহের ত্বক থেকে বাষ্পায়ন দ্রুত হয়েছে এবং ফেটেছে ঠোঁট।

অনুভূত তাপ বেশি কেন এই প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদরা উপরোক্ত কারণের সঙ্গে আরও দুইটি বিষয় তুলে ধরেছেন। এক) ঢাকায় জলাশয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কমে গেছে। একারণে বাড়ছে তাপ। দুই) ঢাকার আশেপাশে বহু কলকারখানা আছে। এসব থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও মিথেন গ্যাস নিঃসরিত হচ্ছে। মিথেন অনেক তাপ ধরে রাখে এবং বায়ুমণ্ডলে অধিক সময় থাকে। ফলে নিচের দিকে ভূমির কাছাকাছি জায়গায় তাপ সরে যেতে না পেরে জমে থাকছে।

কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের আকাশে অস্বাভাবিক মিথেনের উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ। তাদের দাবি ছিল- ধানক্ষেত, ময়লা আবর্জনার ভাগাড় বা ল্যান্ডফিল, কয়লার মজুদ, পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস বের হয়ে আসা ইত্যাদি থেকে বেড়েছে মিথেন।

স্যাটেলাইট ফটো বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ব্লুমবার্গের সেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তখন দেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এ প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এখনো প্রতিবেদনটি তর্কাতীতভাবে প্রমাণিত নয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, এবছর এখন পর্যন্ত অন্তত সাতটি তাপ প্রবাহ বা হিট ওয়েভ বয়ে গেছে দেশের ওপর দিয়ে। জানা গেছে, হিট ওয়েভ প্রতিবছর সমান সংখ্যায় হয় না, কম-বেশি হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবছর হিট ওয়েভের সংখ্যা অস্বাভাবিক নয়।

জানা গেছে মার্চ, এপ্রিল এবং মে মাসে সূর্যকিরণ উল্লম্বভাবে বাংলাদেশের ওপর পড়ে। এতে গরমের পরিমাণটা বাড়ে। অনেকসময় বৃষ্টিপাত কম থাকলে জুনের প্রথমার্ধেও হিট ওয়েভ হয়। পাশাপাশি এসময় ভারতের থর মরুভূমি, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে গরম বাতাসের প্রবাহ বাংলাদেশের দিকে আসে। পাশাপাশি উল্লম্ব সূর্যকিরণ এবং কম বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হয় হিট ওয়েভ।

বাস্তবের চেয়ে অনুভূত তাপ কতটা বেশি হতে পারে সে প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘এই অনুভূত তাপ কী পরিমাণ উঠানামা করে তা লম্বা গবেষণার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে এমন গবেষণা হয়েছে। আমরা হিট ওয়েভ নিয়ে কাজ করছি। এখানেও এ ধরনের গবেষণা হয়ে যেতে পারে। তবে আসল তাপের চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেশি হবে।’

তার মতে, ভূমি থেকে তাপ ওপরের দিকে বিকিরণ হয়। বিল্ডিং থেকে, রাস্তার বিটুমিন থেকে। ঢাকায় জলাশয় কম, গাছপালা কম গ্রামাঞ্চলের তুলনায়। উঁচু বিল্ডিং বেশি। ফলে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার জায়গা নেই। ফলে তাপ বিকিরিত হয়ে পরিবেশটাকে আরও গরম করে তোলে। এর বাইরেও অনুভূত তাপ বেশির জন্য দায়ী ঢাকার আশপাশের কলকারখানা। এগুলো থেকে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড ও মিথেনের পরিমাণ বাড়ে। মিথেন তাপ ধরে রাখে। ফলে ভূমির কাছাকাছি তাপ বেড়ে যায়।

গ্রাম ও শহরে অনুভূত তাপের পার্থক্য নিয়ে এই আবহাওয়াবিদ ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘ধরুন তাপমাত্রা উঠেছে ৩৬। গ্রামে একটা মানুষ ৩৬ ডিগ্রি তেমন অনুভব করবে না। সেখানে গাছপালা ও জলাশয় অনেক। কিন্তু ঢাকা শহরে আপনি ফিল করবেন। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটবেন তখন দেখবেন যে চারদিক থেকে একটা গরম ভাপ লাগছে।’

জানা গেছে, যখন বাতাস বেশি শুষ্ক থাকে তখন ঘাম কম হয়, ত্বক থেকে বাষ্পায়ন হয়ে যায় দ্রুত। যখন বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকে তখন বাষ্পায়নটা ধীরগতির হয়। তখন অস্বস্তি বেশি লাগে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর হচ্ছে বর্ষাকাল। এসময় জলীয়বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এসময় অস্বস্তির পরিমাণও বেশি।

আফতাব উদ্দিন ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার বাতাস বেশি ড্রাই ছিল। এতে একদিক থেকে উপকারই হয়েছে। ঢাকায় তাপমাত্রা ৩৬, ৩৭ এমনকি ৩৮ পর্যন্ত উঠেছে কিন্তু অস্বস্তি তেমন হয়নি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here