পৃথিবীর বাস্তবতায় বাংলাদেশ ভালো আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

0
19
স্পষ্ট বলছি, চাঁদাবাজরা কারওয়ান বাজার ছেড়ে চলে যান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল

খবর ৭১: সারা পৃথিবীর বাস্তবতায় বাংলাদেশ আতঙ্কিত হওয়ার মতো অবস্থায় নেই, বাংলাদেশ ভালো আছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের যুগপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা কঠিন সময় পার করছি। জ্বালানি মূল্য কয়েকগুণ বেড়েছে, এটা সারা পৃথিবীর বাস্তবতা। শিল্পখাতে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গ্যাস আমদানি করতে হয়। যদিও অনেক সময় অনেক কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। পৃথিবীর বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখনও ভালো আছে।

তিনি বলেন, একটা সময় ইন্ডাস্ট্রির পর ইন্ডাস্ট্রি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য আমরা দেখেছি। মালিকদের কেউ কেউ যখন শ্রমিকদের বেতন দিতে পারতেন না তখন বিক্ষোভ, ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও হতো। সে অবস্থা এখন বদলেছে। ব্যবসায়ী নেতাদের পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী শিল্প পুলিশ গঠন করেন।

১৫ বছর আগের পুলিশ ও বর্তমান পুলিশ আলাদা, বর্তমান পুলিশ অনেক দক্ষ ও বিচক্ষণ। তাদের হাতেই আমাদের শিল্প পুলিশের নিয়ন্ত্রণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একসময় আমাদের গার্মেন্টেসের মা-বোনেরা রাতে গার্মেন্টস থেকে বের হলে তার বেতনের টাকা ছিনতাই হতো। এখন শিল্প পুলিশ সেখানে সেতুবন্ধনের মতো কাজ করছে। শিল্প পুলিশ শ্রমিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা, দেনা-পাওনা নিশ্চিত করছেন।

শিল্পখাতে শ্রমিকদের দ্বারা কী হতে পারে, মালিকরা কী করেন পুলিশ সেটা জানে। পুলিশ শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া ও অধিকার আদায়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।

শিল্প পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা শ্রমিক-মালিক সবার সমস্যা শুনুন। বেসরকারি শিল্পখাতে এখন অগ্রগতি হয়েছে। শিল্প পুলিশ কাজ করছে বলেই আজ শিল্প খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে।

ঢাকায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গঠন করার ইচ্ছে নেই উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ঢাকায় আর লোক সংখ্যা বাড়ানো যাবে না। আমরা ঢাকায় বহুল শ্রমের শিল্প গড়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করছি, ঢাকা থেকে বহুল শ্রমের শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রয়োজন হলে শিল্প পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা রেখে বিষয়টি দেখা হবে।

শ্রমিক নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মালিক-শ্রমিক সবাই বাস্তবতার সবকিছুই জানেন। তবে বাংলাদেশ এখনও সেই অবস্থায় যায়নি, যা আতঙ্কিত করার মতো। পৃথিবীর ১০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন হয় ইউক্রেনে, সেখানে যুদ্ধ চলছে। বাস্তব অবস্থাটা পরিষ্কার করে আপনারা সবাইকে জানান দিন।

শিল্প পুলিশ সব সময় শিল্পখাতের নিরাপত্তায় সজাগ আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শিল্প মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ। ১২ বছরে শিল্প পুলিশ যে সুনাম অর্জন করেছে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আরও এগিয়ে যেতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ইন্ডাস্ট্রি। ২০০৯ সালে যদি আমাকে বলা হতো, আগামী ১০-১২ বছর পর দেশের অর্থনীতি এ অবস্থায় যাবে। আমি বলতাম সম্ভব না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী দেখিয়ে দিয়েছেন এটি সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী সব সময় বলতেন, আমাদের সবকিছু আছে, দরকার শুধু একটা অনুকূল পরিবেশ। এ পরিবেশ তৈরির পেছনে অনেকগুলো উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন।

একটা শক্তিশালী শিল্পখাত তৈরির জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। আজকে ইন্ডাস্ট্রিতে যে স্থিতিশীলতা, সেখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ অনেক বেশি কন্ট্রিবিউট করেছে। তারা মালিকদের চেয়ে শ্রমিকদের জন্য বেশি কাজ করছে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ আগে থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে, যার মাধ্যমে আমরা প্রো-অ্যাকটিভভাবে কাজ করতে পারি। পুলিশ সাধারণত ঘটনার পরে রি-অ্যাকটিভ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ দেখিয়েছে তারা প্রো-অ্যাকটিভলি কাজ করে। শুধু শ্রমিক নেতারা নয়, শ্রমিকরাও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের প্রশংসা করছে। এজন্য তাদের সব সদস্যকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাতে চাই।

তিনি বলেন, যে জায়গায় দক্ষ ম্যানেজমেন্ট থাকে শ্রমিকদের সঙ্গে সেখানে সমস্যাটা কম হয়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, শ্রমিকদের সঙ্গে যেখানে সমস্যা হয়, সেখানে ৯০ শতাংশই ম্যানেজমেন্টের ফল্টের কারণে। শ্রমিকদের চাহিদা বেশি না, তাদের যদি আমরা সমানভাবে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারি তাহলে সমস্যা হয় না। আবার দেখা গেছে আমার শ্রমিকদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো। বাইরে থেকে যখন কেউ তাদের ইনফ্লুয়েন্স করার চেষ্টা করে তখন সমস্যা হয়।

আমরা এখন ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক ভালো করছি, এটি সম্ভব হয়েছে শ্রমিকদের জন্য। তারা যদি কাজ না করতেন সম্ভব হতো না। এখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সবাইকে সতর্ক করার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমরা একটা চ্যালেঞ্জিং সময়ে চলে আসতেছি। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের ওপর একটা অর্থনৈতিক চাপ আসছে। এ সুযোগে নানা লোক নানা রকম ষড়যন্ত্র করতে পারে। তাই আমাদের সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি শিল্পখাত। এ খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে উৎপাদন অবব্যাহত রাখা বড় বিষয়, এক্ষেত্রে শিল্প পুলিশ বড় কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে শিল্প পুলিশ কাজ করছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, শৃঙ্খলা-নিরাপত্তায় শ্রমবান্ধব মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ শিল্পবান্ধব নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার ফলে অর্থনীতি একটা ভালো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে মূল রফতানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প খাত থেকে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ বিনিয়োগবান্ধব পরিরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে বিরোধ আলোচনা করে সমাধান করছে। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ।

সংসদ সদস্য মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ অর্গানে পরিণত হয়েছে। পুলিশ যে মানুষকে মেরে-পিটে সমস্যার সমাধান করবে, এ থেকে বেরিয়ে এসে যেখানে সমস্যা সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতনকে অবগত করা, কোনো অঘটনের আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ করছে তারা। শ্রমিকরা ভাবছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ আমার বন্ধু, উদ্যোক্তারাও তেমন ভাবছে। তাদের এ অবদান অব্যাহত থাকুক।

বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, কোভিড থেকে আমরা ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলাম, সে সময় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলো। এ যুদ্ধে সারা বিশ্বে প্রভাব পড়েছে। সে কারণে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে, সেসব মোকাবিলায় আমরা ব্যবসায়ীরা সঙ্গে আছি। যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে শ্রমিক নেতা, শিল্প পুলিশের সবার সহযোগিতা নিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবো। সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা ঘুরে দাঁড়াবো।

বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্প মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন করেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ। বিগত একযুগে শিল্প পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ তোলেনি। তারা প্রমাণ করেছে কীভাবে দেশের উন্নয়নকে বেগবান করা যায়।

বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি নূর কুতুব আলম মান্নান বলেন, মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকপক্ষ যদি সম্মিলিতভাবে কাজ না করলে যতোই শিল্প হোক কাজ হবে না। শ্রমিককে বাদ রেখে শিল্পকে কল্পনা করা সম্ভব নয়। বাইরের দ্বারা যেন শ্রমিকরা প্রভাবিত না হয় কিংবা নেতারা যেন ব্যক্তিগত স্বার্থে শ্রমিকদের ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাহাবুবর রহমান বলেন, আমরা ফিরে তাকাতে চাই ১২ বছর আগে। সে সময় শিল্পাঞ্চলে এক অরাজক পরিস্থিতি ছিল। জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনসহ নানা পরিপ্রেক্ষিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের উদ্ভব।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে অগ্রিম তথ্য পাচ্ছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা বেতন কবে দেওয়ার কথা সেই খবর রাখি, বেতন দিতে সমস্যা হলে মালিককে সংযুক্ত করি, বিজিএমইএ, শ্রমিকপক্ষকে বসিয়ে আলোচনা করি। তেমনি ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালালে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

তিনি বলেন, দেশ যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে, ব্যবসায়ী সমাজের পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সামনের দিনে অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র হলে পুলিশের শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ মাঠে আছে, মাঠে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here