রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ভারতের কাছে হার বাংলাদেশের

0
23

খবর ৭১: অ্যাডিলেড ওভালে বৃষ্টির আগে রীতিমতো রূপকথার জন্ম দিচ্ছিল লিটন দাসের যাদুকরী ব্যাটিং। বৃষ্টি শেষে কনকনে হিমেল হাওয়ায় নতুন লক্ষ্যে লড়াইটাও সহজ ছিল না। ৫৪ বলে ৮৫। হাতে দশ উইকেট। তেমন একটা মঞ্চ পেয়েও হয়নি। খেলাটা শেষ ওভার অব্দি উত্তেজনার তুঙ্গে থাকল। জয়ের স্বপ্ন বেঁচে থাকল শেষ বলটি পর্যন্ত। কিন্তু মিলল না সমীকরণ!

২০১৫ সালে যে মাঠে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ সেখানে এবার হাত ফসকে গেল একটা জয়, একটা ঐতিহাসিক জয়! তবে নিশ্চিত করেই পয়সা উসুল এক ম্যাচ। যেখানে জয় ক্রিকেটেরই!

শেষ ওভারে এসে ফয়সালা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার ম্যাচে ডাকওয়ার্থ লুইস স্টার্ন মেথডে ভারত জিতল ৫ রানে। এই হারে সেমির দরজা এক প্রকার বন্ধই হয়ে গেল বাংলাদেশের। হারলেও লড়েছে এই শান্তনাটুকু শুধু সঙ্গী। এই অ্যাডিলেড ওভালেই ৬ নভেম্বর টাইগাররা লড়বে পাকিস্তানের সঙ্গে!

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে জয়টা জরুরী ছিল দুই দলেরই। সেমি-ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এই ম্যাচে হাসিমুখ বাংলাদেশেরই। দিন-রাতের এই ম্যাচে বুধবার টস জিতে ভারতকেই প্রথমে ব্যাটিংয়ে পাঠায় বাংলাদেশ। বিরাট কোহলির হাফসেঞ্চুরিতে তারা ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে তুলে ১৮৪ রান। জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশ ৭ ওভারে বিনা উইকেটে ৬৬ রান তুলতেই ওভালে নেমে আসে বৃষ্টি! মাঠে হাজির প্রায় হার চল্লিশেক দর্শকের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেন অনাকাংখিত সেই অতিথি। তারপর তো সর্বনাশ বাংলাদেশের।

বৃষ্টিতে কমে চার ওভার। এ অবস্থায় ১৬ ওভারে বাংলাদেশের দরকার ছিল ১৫১ রান। মানে শেষ ৯ ওভারে সাকিবদের চাই ৮৫ রান। ঠিক এমন সময়ে ১০ উইকেট হাতে নিয়ে খেলতে নামে বাংলাদেশ। কিন্তু বৃষ্টির পর প্রথম ওভারে উইকেট হারায় বাংলাদেশ। রান আউট লিটন দাস। লোকেশ রাহুলের সরাসরি থ্রোতে সর্বনাশ। ২৭ বলে তিন ছক্কা ও সাত চারে ৬০ রান তুলে ফেরেন লিটন। তার আগে ২২ বলে ফিফটি তুলে নেন যা কি-না এবারের বিশ্বকাপের দ্বিতীয় দ্রুতগতির ফিফটি।

লিটনের পর নাজমুল হোসেন শান্তও আটকে যান। তিনি ফেরেন ২৫ বলে ২১ রানে। এখানেই যেন ম্যাচটাও হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। শেষ কেউ আর লিটনের লড়াইটাকে পূর্ণতা দিতে পারলেন না। ১৬ ওভারে ৬ উইকেটে ১৪৫ রানে আটকে গেল বাংলাদেশ। শেষ ওভারে জিততে ২০ রান প্রয়োজন থাকলেও সেটি আর করা হয়ে উঠল না! কিন্তু কাছে গিয়ে হারল দল। শেষ বলে প্রয়োজন ছিল ৭ রান। হলো ১ রান।

অথচ পুরোটাই লেখা হতে পারতো বাংলাদেশের গল্প। কারণ একজন লিটন লড়ছিলেন একা! মনে হচ্ছিল ভারতের ছুঁড়ে দেওয়া ১৮৪ কোন ব্যাপারই নয়। তার ব্যাটে একেকটা শট শিল্পীর তুলির আঁচড় যেন। লিটন দাস যেদিন খেলেন সেদিনই সবুজ মাঠের ক্যানভাসে এমনই মায়াজাল ছড়িয়ে পড়ে! বুধবার ভারতকে পেয়ে শুরু থেকেই ভিন্ন এক মেজাজে। প্রিয় পজিশন ওপেনিংয়ে নেমে সেই সহজাত ব্যাটিং, চার ছক্কা ফোয়ারা। তাকে আটকাতে কতো কী যে করলেন রোহিত শর্মা। বোলিংয়ে একের পর এক পরিবর্তন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। বাংলাদেশের এই ওপেনার উড়লেন। তাণ্ডব চালালেন। ঝড় বইয়ে দিলেন অ্যাডিলেড ওভালে।

কিন্তু শীতের বিদায় লগ্নে এখানে বৃষ্টি বড্ড বেরসিক। লিটন-ঝড়ের পর বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ। যখন ভারতের কোন বোলারই আটকাতে পারছিলেন না তাকে, তখন কিন্তু বৃষ্টি থমকে দিল লিটনকে। তখন ৭ ওভারে বাংলাদেশ তুলে বিনা উইকেটে ৬৬ রান। ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে তখন জিততে বাংলাদেশের প্রয়োজন ৪৯ রান। মানে তখন সাকিব আল হাসানের দল ১৭ রানে এগিয়ে। বৃষ্টি না হলে জিততো বাংলাদেশই।

তবে সেই বৃষ্টি থেমেছে কিছু পরেই। এরপরই খেলার মোমেন্টাম হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। খেলা শুরু হতেই নতুন লক্ষ্যের সঙ্গে আর কুলিয়ে উঠা হয়নি।

এর আগে অ্যাডিলেড ওভালে টস জিতে প্রথমে ব্যাট রোহিত শর্মাদের ব্যাট করতে পাঠান সাকিব আল হাসান। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কতোটা যৌক্তিক ছিল সেই প্রশ্নটা উঠবেই। কারণ বোলাররা ঠিকঠাক কাজটুকু করতে পারেন নি। সঙ্গে ফিল্ডিংটাও যুতসই মতো হলো না! এদিনও প্রথম উইকেটটা পেতে পারতেন তাসকিন আহমেদ। একদম ম্যাচের শুরুতেই। তাসকিন আহমেদের কৌশলে বোকা বনে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন রোহিত শর্মা। সীমানায় সামনে হাসান মাহমুদের হাতে পড়েছিল একেবারে সহজ ক্যাচ। কিন্তু সেটিও হাতে জমাতে পারেন নি তিনি। ১ রানে জীবন পান ভারতীয় অধিনায়ক। তখন ভারতের ছিল ১০ রান!

তবে প্রায়শ্চিত্ত করতে দেরি করেন নি হাসান। ক্যাচ হাতছাড়া করার পরের ওভারে বোলিংয়ে এসেই সেই রোহিতকেই দেখিয়ে দেন সাজঘরের পথ। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খেলতে না পেরে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ তুলে দেন ইয়াসির রাব্বির হাতে। ২ রানে ফেরেন রোহিত। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন হাসান!

এরমধ্যে সাকিব একটা সাহসী সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। কোন বিরতি ছাড়াই সেরা অস্ত্র তাসকিনের বোলিং একটানা শেষ করে দেন। এক স্পেলে এই পেসার চার ওভার করে দেন মাত্র ১৫ রান। রোহিতের ক্যাচটা হাসান না ফেললে একটা উইকেটও পেতে পারতেন তিনি! এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এবারই প্রথমবার কোন ম্যাচে উইকেটশূন্য থাকলেন তাসকিন।

তাসকিন রান না দিলেও থেমে থাকেনি ভারত। রান উৎসব চলেই তাদের। গ্যালারির গর্জন বাড়িয়ে খেলতে থাকেন লোকেশ রাহুল। তবে ফিফটি করতেই তাকে তুলে নেন সাকিব। জোরে হাঁকাতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচ তুলেন মুস্তাফিজুর রহমানের হাতে। তাতেই ভাঙে লোকেশ-বিরাট কোহলির ৩৭ বলে ৬৭ রানের জুটি। আর তিনি বিদায় নেন ৩২ বলে ৫০ রানে। ইনিংসে ছিল চার ছক্কা ও তিন চার। ভারত তখন ১০ ওভারে ২ উইকেটে ৮৬।

তারপরই ম্যাচের লাগামটা বাংলাদেশের হাতে এসেই যেতে পারতো। ১১তম ওভারে মুস্তাফিজুর রহমানের ওভারের সময় বিরাট কোহলি হতে পারতেন রান আউট। পরের ওভারে সাকিব আসেন তখন শর্ট ফাইন লেগে সূর্যকুমার যাদবের ক্যাচটা জমাতে পারেন নি মুস্তাফিজ।

কিন্তু সূর্যকুমার ঠিকই ফাঁদে পড়েন। তাকে বোল্ড করেন সাকিব। সাকিবের সোজা আসা বলে কাট করতে চেয়েছিলেন সূর্যকুমার। লাইন মিস করে বোল্ড হয়ে তিনি। তার আগে খেলে যাচ্ছেন ‘ইম্প্যাক্ট’ময় এক ইনিংস। ১৬ বলে চারটি চারে ৩০। এই উইকেটটা তুলে নিয়ে নতুন উচ্চতায় পা রাখেন সাকিব। টিম সাউদির সঙ্গে যৌথভাবে এখন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তিনিই সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। ১২৭ উইকেটের মালিক বাংলাদেশ অধিনায়ক। এদিন সাকিব ৪ ওভারে ৩৩ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট।

তবে তখনও অপ্রতিরোধ্য বিরাট কোহলি। দুঃসময়টা ফের পেছনেই ফেলে এসেছেন তিনি। সেটি আরও একবার বুঝিয়ে তুলে হাফসেঞ্চুরি। এবারের বিশ্বকাপে দুইশর বেশি রান তুলে শীর্ষে তিনিই। এদিন কোহলি খেললেন ৪৪ বলে হার না মানা ৬৪ রানের ইনিংস। ৬ বলে ১৩ রবিচন্দ্রন অশ্বিনের। ভারত উঠে যায় চূড়ায়, ১৮৪! হাসান ৪ ওভারে ৪৭ রানে তুলেন ৩ উইকেট। সৌম্য সরকারের জায়গায় ফেরা শরিফুল ইসলাম খরুচে ৪ ওভারে কোন উইকেট না নিয়ে ৫৭!

সুখস্মৃতির মাঠে ইতিহাসটাই বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দিল ভারত। টি-টোয়েন্টির দ্বৈরথে ১২ লড়াইয়ে ১১টিতেই হার বাংলাদেশের। কিন্তু অনাহুত বৃষ্টিতেই আজ সর্বনাশ! না হলে ভারত বধের গল্পটা লেখা হয়ে যেতে পারতো অ্যাডিলেড ওভালে। যেখানে রূপকথার গল্প লেখার কথা সেখানে বৃষ্টি শেষে কাঁদল বাংলাদেশ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here