অনুমোদনহীন রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিনে চলছিল লঞ্চটি!

0
187

খবর৭১ঃ লঞ্চডুবিতে যাত্রী মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়৷ কিন্তু লঞ্চে আগুন লেগে যাত্রীদের মৃত্যু হতবাক করেছে দেশের মানুষকে৷ একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ নামে যে লঞ্চটিতে আগুন লাগে সেটি রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন দিয়ে চলছিল৷ এর আগের ইঞ্জিনটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর গত অক্টোবর মাসে এই ইঞ্জিনটি লাগানো হয়৷

তবে বিষয়টি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএকে জানানো হয়নি বলে দাবি কর্তৃপক্ষের৷ আর দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ইঞ্জিন বিস্ফোরণে লঞ্চটিতে আগুন লাগে৷

শুধু অভিযান-১০ই নয়, অনুসন্ধানে জানা গেছে, সমুদ্রগামী জাহাজের রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো ইঞ্জিন লাগিয়েই দেশে অনেক লঞ্চ চালানো হচ্ছে৷ আর এ কারণে ইঞ্জিনে আগুন লাগার ঝুঁকি অনেক বেশি৷ তাছাড়া অনেক যাত্রীবাহী লঞ্চই ফিটনেসবিহীন অবস্থায় চালানো হচ্ছে৷ আর তাই প্রশ্ন উঠেছে সঠিক নজরদারি থাকলে সুগন্ধা নদীতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা কি এড়ানো যেত না?

বিআইডব্লিউটিএ’র ইঞ্জিনিয়ার ও শিপ সার্ভেয়ার মো. মাহবুবুর রশিদ বলেন, ‘নৌযানে নতুন এবং রিকন্ডিশন্ড উভয় ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার করা যায়৷ তবে আমাদের (কর্তৃপক্ষের) অনুমোদন নিতে হবে৷ সাধারণত বড় লঞ্চে আমরা নতুন এবং ছোট লঞ্চে রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিনের অনুমতি দিই৷ তবে পুরোনো ইঞ্জিন ব্যবহার করতে হলে তার ইনস্টলেশন আমরা ঠিক করে দিই৷ তা না হলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে৷’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘যেই লঞ্চটিতে আগুন লেগেছে আমরা জেনেছি তাতে সম্প্রতি রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন লাগানো হয়েছিল৷ এবং তা ছিল অনুমোদিত হর্সপাওয়ারের চেয়ে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন৷ আর এটা আমাদের অনুমোদন ছাড়াই লাগানো হয়৷ রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন ঠিকমত ইনস্টলেশন না হলে তা থেকে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়৷ যার ফলে আগুন লেগে যেতে পারে৷ এক্ষেত্রেও তাই ঘটে থাকতে পারে৷ তবে তদন্ত শেষ হলেই আগুনের আসল কারণ জানা যাবে৷’

নিজেদের কার্যক্রমের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার এরকম আরও একটি নৌযানকে চিহ্নিত করা হয়েছে যা অনুমোদন ছাড়াই রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন দিয়ে চলাচল করছে৷ ওই ইঞ্জিনটি অনুমোদিত মানের নয়৷ নৌযানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছি৷ আরও অনেক নৌযান আছে যা রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন দিয়ে চলছে৷ সেগুলো খুঁজে বের করার কাজও চলছে৷’

এদিকে অনুমোদনহীন ইঞ্জিনে নৌযান চালানোর বিষয়টিই এই খাতের একমাত্র সমস্যা নয়৷ জানা গেছে, সারা দেশে হাজার হাজার নৌযান চলাচল করছে যাদের বেশিরভাগই নিবন্ধিত নয়৷

বিশ্ব্যাংকের হিসাব বলছে, বাংলাদেশের নদ-নদীতে সাত লাখ ৪৫ হাজার ট্রলার, স্পিডবোটসহ যন্ত্রচালিত বিভিন্ন ধরনের নৌযান চলাচল করে৷ তার মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযানের সংখ্যা চার লাখ ৮৪ হাজার৷

কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা বিশ্বব্যাংকের তথ্যের চেয়ে অনেক কম৷ প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে মোট নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা মাত্র ১৪ হাজার৷ এর মধ্যে ফিটনেস আছে মাত্র আট হাজার নৌযানের৷ অর্থাৎ ফিটনেস অনুযায়ীই মাত্র আট হাজার নৌযানের চলাচলের অনুমতি রয়েছে৷

এই কর্মকর্তা আরও জানান, সারাদেশে মাত্র আটশ যাত্রীবাহী নৌযান নিবন্ধিত হয়েছে৷

আর নৌপরিবহন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রশিদ বলেন, ‘অনেক নৌযানই অনুমোদন না নিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজের রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন ব্যবহার করছে৷’

তবে তার দাবি, লঞ্চ মালিকরা বিষয়টি গোপন করায় তাদের কিছু করার থাকে না৷ তবে পরিদর্শনে ধরা পড়লে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেন বলে জানান তিনি৷

এদিকে কী পরিমাণ নৌযান বর্তমানে ফিটনেসবিহীন অবস্থায় চলাচল করছে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র মুখ্য পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান সার্ভার ডাউন থাকার কথা বলে কতগুলো নৌযানের ফিটসেন নেই তা তিনি জানাতে পারেননি৷

তবে অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন নৌযান থাকার কথা স্বীকার তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই৷ প্রতিমাসেই ফিটনেসবিহীন নৌযানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়৷’

এই কর্মকর্তা বলেন, রেজিস্ট্রেশনের বাইরেও নকশার সঙ্গে মূল নৌযানের মিল, ইঞ্চিন, বডি, ফায়ার সেফটি এসব কিছু দেখে ফিটনেস দেওয়া হয়৷ আর প্রতিবছর এটা নবায়ন করতে হয়৷ কিন্তু অনেক নৌযান আছে যা একবার নিবন্ধনের পর আর নবায়ন করা হয় না৷ নৌযানের ইঞ্জিনসহ কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে তারও অনুমোদন নিতে হয়৷’

জানা গেছে, নৌযানের ফিটনেস দেখার জন্য সারাদেশে ৩৩ জন পরিদর্শক নিয়োজিত আছেন৷ আর গত এক বছরে তারা ৭৭০টি নৌযানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন৷

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বছরে ২০-২২টির মতো অভিযান পরিচালনা করি৷ গত অক্টোবরে আমরা ২২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছি৷’

প্রসঙ্গত, ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে, ২০১৬ থেকে ২০২০ এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সব ধরনের নৌপথে তিন হাজার ৪৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ আর তাতে মারা গেছেন তিন হাজার ১১৭ জন৷ আর ‘সেভ দ্য রোডের’ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে ৭১২টি নৌপথ দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন নিহত হয়েছেন৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here