প্রতিবেশী দেশ থেকে আসে সব ধরনের মাদক: আইজিপি

0
21

খবর৭১ঃ মাদকের চাহিদা বন্ধ না করা গেলে কোনোভাবেই দেশে এর সরবরাহ বন্ধ করা যাবে না জানিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘কোনো মাদকই দেশে তৈরি হয় না। ফেনসিডিল আসে প্রতিবেশি এক দেশ থেকে, জনপ্রিয় মাদক ইয়াবা আসে প্রতিবেশি আরেক দেশ থেকে। এখন আবার আসছে আইস যা প্রতিবেশি এক দেশসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকে।’

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে মাদকাসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্রের (ওয়েসিস) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আইজিপি বলেন, ‘সব মাদকের কোনটাই কিন্তু বাংলাদেশে অভ্যন্তরে তৈরি হয় না। আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে আমরা যে কাজটা করার চেষ্টা করি সেটা হচ্ছে মাদকের সাপ্লাই কামানো। এসব দমনের জন্য ছয় থেকে সাতটা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে।’

পুলিশ প্রধান বলেন, ‘কাস্টমস বিভিন্ন পোর্টে মাদক দমনে কাজ করে। কিন্তু যদি ডিমান্ড থাকে, কোনো না কোনোভাবে দেশে মাদকের সাপ্লাই হবেই। আর সেটা যদি হয় ১ কোটি, ৮০ লাখ ও ৩৬ লাখ তাহলে প্রত্যেক দিন এই মাদক কোনো না কোনোভাবে দেশে প্রবেশের চেষ্টা হবেই। সে কারণে অবশ্যই আমাদের মাদকের ডিমান্ড কমাতে করতে হবে। ডিমান্ড কমাতে হলে যারা মাদকাসক্ত আছে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেক্ষেত্রে ওয়েসিস আমাদের অতি ক্ষুদ্র একটি উদ্যোগ।’

ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘পুলিশে চাকরি করার সুবাদে গরিব বা ধনী পরিবারের কেউ যদি মাদকাসক্ত হয়ে তাহলে পরিবারটির কি অবস্থা তা দেখার দুর্ভাগ্য আমার অনেক বার হয়েছে। এই সমাজের অনেক সম্মানি ব্যক্তির নিরব কান্না দেখতে হয়েছে আমাকে। এই গোপন কান্না এত কষ্টের যা কারও সঙ্গে শেয়ারও করা যায় না সামাজিক মর্যাদার কারণে। কিন্তু আমার কাছে এসে শেয়ার করেছেন। এমন ঘটনা একটা না অহরহ অহরহ ঘটনা আছে। এ রকম ঘটনা হয়েছে যে, তার ছেলে, স্ত্রী কিংবা মেয়েকে গোপনে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। কারণ সমাজে তার সম্মান রয়েছে তাই কেউ জানতে পারবে না। এছাড়া প্রচলিত মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে নাম পরিচয় দিতে হয় বলে অনেকেই ছেলে মেয়েদের চিকিৎসা দিতে আগ্রহী হন না। আবার যাকে চিকিৎসা করবে সে চিকিৎসা নেবে না। পরিবার চায় ধরে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে, যা অনেক সময় আইনসম্মত নাও হতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধান রয়েছে- এ দেশের মানুষ স্বাধীন ও মুক্ত। তাই কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোথায় নিয়ে যাওয়া যায় না। এই রকম অনেক সমস্যা আমি দেখেছি।

আইজিপি আরও বলেন, এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখ, আবার কেউ কেউ বলেন ১ কোটি ছাড়িয়ে গেছে ও ২০১৮ সালে জনস্বার্থ ইনস্টিটিউটের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাংলাদেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৩৬ লাখ। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে মোট বেড আছে মাত্র ৭ হাজার। তাহলে এতো সংখ্যক মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের আমরা কত বছরে চিকিৎসা দিব?

পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের আরেকটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণের কথা উল্লেখ করে পুলিশ প্রধান বলেন, আমরা মানিকগঞ্জের কালিগাঙ্গা নদীর তৈরি মনোরম পরিবেশে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র বা হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছি। সেখানে আমরা ইতোমধ্যে নদীর তীরে ২০ বিঘা জমি কিনেছি। পারলে ১০০ বিঘা জমি কিনতে চাই। সেখানের পরিবেশে ঢুকলে মানুষের মন যেন ভালো হয়ে যায়। আমরা সুন্দর একটি পরিবেশে ৫০০ থেকে ১ হাজার বেডের হাসপাতাল তৈরি করতে চাই। এটাকে আমরা মাদক চিকিৎসার ক্ষেত্রে রিজনাল হাব করতে চাই।

বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অনেক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উল্লেখ করে ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে মাদকাসক্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলে মডলে হতে পারি। ২০৪১ সালে দেশে আধুনিক দেশে পরিণত হবে। সে দেশের নেতৃত্ব দিবে কারা যদি আমাদের তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যায়। সেই ধনী দেশে বসবাস করবে কারা। সে কারণে আমাদের এই বর্তমান প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। সে কারণে আমি মনে করি এই উদ্যোগ আমরা নিয়েছে, এমন উদ্যোগ আরও অনেকে নিবেন। যারা মনে করেন ঝামেলায় যাবেন না নিজেরা উদ্যোগ গ্রহণ করে তারা চাইলে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।

মেডিকেল ট্যুরিজম নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, ‘বলা হয়ে থাকে আমাদের দেশ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার মেডিকেল ট্যুরিজম হয়ে থাকে। পার্শ্ববর্তী দেশ, সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে আমাদের দেশের মানুষ যায় মেডিকেল ট্যুরিজমের জন্য। যাদের আরও ভালো সামর্থ্য আছে তারা আরও উন্নত দেশে যায়। এধরনের মোস্ট আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও কিন্তু আমাদের দেশে গড়ে তোলা সম্ভব। সেক্ষেত্রে ভালো যন্ত্রাংশ কেনা বিষয় না, বিষয় হচ্ছে বেস্ট বিশেষজ্ঞ। যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অন্তত ৫০ শতাংশ বিদেশি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে কাজ করার অনুমতি দেন তাহলে বিশ্বমানের হাসপাতাল বাংলাদেশেও গড়া সম্ভব। যদিও বর্তমান আইন অনুযায়ী এটা সম্ভব নয়। তাহলে মেডিকেল ট্যুরিজমের নামে এতো টাকা দেশ থেকে বাইরে যাবে না। তাছাড়া ধীরে ধীরে এর মাধ্যমে আমাদের দেশেও বিশেষজ্ঞ তৈরি হবে। এ ধরনের হাসপাতাল নির্মাণে বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টও এগিয়ে আসতে পারে। না-হলে এই টাকার পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তে থাকবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে পুলিশ হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিটের দাবি জানিয়ে আইজিপি বলেন, ‘আমাদের পুলিশের যে ধরনের কাজ তাতে করে আমরা কমন কিছু রোগে আক্রান্ত হই। এর মধ্যে একটা হচ্ছে কিডনির সমস্যা। পুলিশ হাসপাতালে আমরা ইতোমধ্যে ৩৪টি কিডনি ডায়ালিসিস ইউনিট স্থাপন করেছি। অন্যতম আরেকটি রোগ হচ্ছে হার্টের সমস্যা। আমাদের জব স্ট্রেস থেকে আরেকটা রোগ হয় ক্যান্সার। আমাদের প্রচুর লোক আছে যারা ক্যান্সারে আক্রান্ত। আমরা চেষ্টা করি তাদের সাধ্যমতো সাহায্য করার জন্য। ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। একজন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী মৃত্যুবরণ করার আগে তার পরিবারকে রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে যায়। এজন্য পুলিশ হাসপাতালে আমরা একটি ক্যানসার ইউনিট করতে চাই। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাবো আগামী বছরের মধ্যে ইউনিট করে দেওয়ার জন্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এটি উদ্বোধন করবেন বলে আশা রাখি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here