অ্যান্টিবডিতে ঝিমিয়ে পড়েছে প্লাজমা থেরাপি

0
52
অ্যান্টিবডিতে ঝিমিয়ে পড়েছে প্লাজমা থেরাপি

খবর৭১ঃ করোনাভাইরাসে গুরুতর আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠা ব্যক্তির রক্তরস অর্থাৎ প্লাজমা দেয়ায় গ্রাহক-দাতা উভয়েরই আগ্রহ কমেছে। দেশে করোনা মহামারী শুরুর কয়েক মাস পর প্লাজমা থেরাপি নিয়ে অনেকেই সুস্থ হওয়ার খবরে এই প্রক্রিয়া একসময় বেশ সাড়া ফেলেছিল। রোগীদের জীবন বাঁচাতে স্বজনদেরও ছিল বেশ তৎপরতা। অন্যের জীবন রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন প্লাজমা দিতে আগ্রহীরাও। কিন্তু দিনে দিনে পাল্টেছে চিত্র। অ্যান্টিবডি টেস্টের সহজ সুযোগ না থাকায় প্লাজমা থেরাপি থেকে বিরত থাকছেন চিকিৎসকরাও।

চিকিৎসকরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এন্টিবডি পরীক্ষার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। প্লাজমা দেয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু এন্ডিবডি পরীক্ষার ফলাফল বাধ্যতামূলক তাই এখন প্লাজমা দেয়া ও গ্রহণে মানুষকে তারা একরকম নিরুৎসাহিত করছেন। ফলে করোনার প্রকোপের মধ্যে প্লাজমা সংগ্রহ ও সরবারহ করতে শুরু করা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও আগের মতো প্লাজমা পেতে সহযোগিতা চাওয়ার চাপ নেই।

বাংলাদেশে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান (এম এ খান) ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘প্লাজমা দেয়া ও নেয়ার ক্ষেত্রে চাহিদা এখন একেবারেই কম। আমরাও রোগীদের সেইভাবে বলি না। কারণ যেহেতু আমাদের এখানে এন্টিবডি টেস্টের অফিসিয়াললি ব্যবস্থা নেই। সরকারও এটা শুরু করছে না। তাই আপাতত একরকমের নিরুৎসাহিত করছি।’

গত মার্চে দেশে করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিনিয়ত হাজারের ওপরে মানুষ ভাইরাসটিতে সংক্রমিত হচ্ছেন। মৃত্যুর হারও দুই অংকের কোটায়। শুরুতে গুরুতর অসুস্থদের প্রাণ বাঁচাতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন স্বজনরা তখন অনেকটা আশার আলো দেখাচ্ছিল প্লাজমা থেরাপি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজির অধ্যাপক ডা. এম এ খানকে সভাপতি করে গত ১৯ এপ্রিল ৪ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই কমিটির অধীনে প্লাজমা থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুর হয়। গত ১৬ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়।

করোনা বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটিও শুরু থেকে পিসিআর পরীক্ষার পাশাপাশি অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছিল। পরে গত জুনে দেশে এন্টিবডি পরীক্ষার নীতিমালা চূড়ান্ত করার কথা জানায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। পরবর্তিতে গত ১৭ সেপ্টেম্বর করোনার নমুনা পরীক্ষায় সরকার অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমতি দিয়েছে।

অনুমতির নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রস্তাবনা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে দেশের সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, সরকারি পিসিআর ল্যাব এবং সব স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে অ্যান্টিজেনভিত্তিক টেস্ট চালুর দেয়া হলো। কিন্তু কিট নেই সেই অজুহাতে দেশে এখনো এন্ডিবডি পরীক্ষা শুরু হয়নি।

এ বিষয়ে ডা. এম এ খান বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই এন্ডিবডি পরীক্ষার সঙ্গে প্লাজমার বিষয়েও সরকারকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছিল। কিন্তু সরকার এখনো কেন শুরু করছে না বোধগম্য নয়। দেশে যদি ডেঙ্গু রোগীর এন্ডিবডি পরীক্ষা হতে পারে করোনায় সমস্যা কোথায় জানি না। তবে এই টেস্ট করার সুযোগ করে দিতে হবে। পরীক্ষার ফিও সহনীয় রাখতে হবে।’

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের রক্তের জলীয় অংশকে বলা হয় প্লাজমা বা রক্তরস। রক্তের মধ্যে প্রায় ৫৫ ভাগই থাকে হলুদাভ রঙের এই প্লাজমা। করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরে যারা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাদের শরীরে এক ধরণের অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার তৈরি হয়। তাদের শরীর থেকে প্লাজমার মাধ্যমে সংগ্রহ করা এই অ্যান্টিবডি যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোন ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করা হয়, তখন তার শরীরের সেই অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তখন তিনিও সুস্থ হয়ে ওঠেন।

দেশে শুরুতে প্লাজমার জন্য খুব চাপ থাকলেও এখন সেই অর্থে নেই বললেই চলে- এমন মন্তব্য করেছেন ‘প্লাজমা ব্যাংকের’ উদ্যোক্তা করোনাজয়ী সাংবাদিক শাহাদাত হোসেন। এপ্রিলের শেষের দিকে করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পর অন্যদের সহযোগিতার জন্য শুরু করেন প্লাজমা ব্যাংক। এতে ৩৬ হাজার মানুষ যুক্ত রয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘শুরুতে গ্রুপে ৫০ থেকে ৬০টিরও বেশি প্লাজমা চেয়ে রিকোয়েস্ট আসত। এখন দিনে দুইটা বা তিনটার মতো অনুরোধ আসে। মাঝে মধ্যে চাহিদা আসেও না। শুরুতে প্লাজমা দেয়ার আগ্রহীদের অনেকটা ভীড় ছিল। এখন সেটা নেই বললেই চলে।’ ২ শতাধিক লোককে প্লাজমা ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্লাজমার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান শাহাদাত।

একই কথা বললেন গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্যাথলজি ডিপার্টমেন্টের প্রধান গোলাম মোহাম্মদ কোরাইশি। তিনি বলেন, ‘প্লাজমার জন্য আগে অনেক ফোন আসত। কিন্তু এখন মাঝে মাঝে ফোন আসে। গত এক সপ্তাহে প্লাজমার দুটি চাহিদা ছিল।

অক্টোবর মাসে ২৮জনের চাহিদা ছিল জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, দিনে দিনে রোগী কম হওয়ায় চাহিদাও কমছে। এন্ডিবডি টেস্ট করার সুযোগ না থাকাও একটা কারণ হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here