সিনহা হত্যা: কক্সবাজারের এসপিকে আসামির করার আবেদনে আদালতের না

0
53
সিনহা হত্যা: ফের ৪ দিনের রিমান্ড পুলিশের করা মামলার সেই তিন সাক্ষীর

খবর৭১ঃ অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনকেও আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেছেন মামলার বাদি সিনহার বড়ো বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম (কক্সবাজার সদর-৪) তামান্না ফারাহর আদালতে তিনি এই আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিকেলে আবেদনটি না মঞ্জুর করেছেন বিজ্ঞ বিচারক। এর একটি অবজারভেশনও দিয়েছেন বিচারক তামান্না ফারাহ, এমনটি জানিয়েছেন জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম।

বাদিপক্ষের আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন মেজর সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত কাজে ব্যাঘাত সৃৃষ্টি করেই চলেছেন। তিনি সিনহা হত্যা মামলার আসামি বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকতকে কারাগারে ডিভিশন দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছেন। আসামিদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। অর্থাৎ এসপি এবিএম মাসুদ হোসেন তার দাপ্তরিক কার্যক্ষমতা আসামিদের পক্ষে কাজে লাগাচ্ছেন। তাই তাকে মেজর সিনহার হত্যা মামলার আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি ফৌজদারি আবেদন করেছি। সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার স্বার্থে তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

মামলার বাদি ও মেজর সিনহার বড়ো বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস জানান, এসপি এবিএম মাসুদ হোসেন ঘটনার শুরু থেকেই আসামিদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। উনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মেজর সিনহার মানহানি করেছেন। ঘটনার পরদিন তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, মেজর সিনহার গাড়িতে তিনি ইযাবা ও মাদকদ্রব্য পেয়েছিলেন। একজন পুলিশ সুপার হিসেবে তিনি এটি বলতে পারেন না। তিনি তদন্ত কাজে প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করে চলেছেন।

মেজর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস আদালতে ১০টি অভিযোগ এনে নতুন করে আবেদন দেন। সেসব অভিযোগ গুলো হলো:

১. অবমাননাকর প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন।

২. গুরুত্বপূর্ণ অফিসে ক্ষমতাসমূহ অপব্যবহার।

৩. হত্যার পর ইন্সপেক্টর লিয়াকতকে মামলার দায়ভার থেকে মুক্তি পাওয়ার পন্থাসমূহ শিখিয়ে দেওয়া।

৪. আহত অবস্থায় মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে চিকিৎসা প্রদানে অনীহা ও কোনো ভূমিকা না রাখা।

৫. পুলিশের মামলার সাক্ষীদের আসামি করে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করার পর অজ্ঞাতনামা অপহরণ মামলা দায়ের করা।

৬. অত্র মামলার আসামি প্রদীপ কুমার দাশকে মেডিকেল লিভ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া।

৭. আসামি প্রদীপ দাশকে কারাগারে ডিভিশন দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া।

৮. আসামি প্রদীপ কুমার দাশের সঙ্গে কারা ছিল, র‌্যাব তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে আসামি পাঠাতে গড়িমসি করে জটিলতা সৃষ্টি করা, সংশ্লিষ্ট অনেককে অন্যত্র বদলি করে দেওয়া।

৯. অত্র মামলার ঘটনার পর পুলিশের করা মিথ্যা মামলা অনুযায়ী মিডিয়াতে আসামিদের পক্ষে বক্তব্য প্রদান করে নিহত মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে একজন মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে বক্তব্য প্রচার করে মানহানি ও অপদস্থ করা। ও

১০. ঘটনার পর পাশে লিখিত আসামি (এ বি এম মাসুদ হোসেন) মিডিয়াকে মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে শামলাপুরের লোকজন গাড়ির আরোহীদের ডাকাত সন্দেহ করে খবর দেন। এই সময়ে তল্লাশি চেকপোস্টে গাড়িটি থামানোর চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু মিথ্যাভাবে বলেন যে, গাড়ির আরোহী পিস্তল বের করে পুলিশকে গুলি করার চেষ্টা করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়। আরও জানান যে, গাড়িটি তল্লাশি করে ৫০টি ইয়াবা বড়ি, কিছু গাঁজা, দুটি বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার করে, যা আদৌ সত্য নয়। এতে নিহত মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের অবমাননাকর বিধায় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন।
পুলিশ সুপারকে আসামি করার কারণ সম্পর্কে বাদি শারমিন ফেরদৌস বলেছিলেন, কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে মামলার আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে ন্যায় বিচার পাবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আদালতের কাছে আমার প্রত্যাশা, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এসপি মাসুদকে উক্ত মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবেন।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কক্সবাজার আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম বলেন, বৃহস্পতিবার মেজর সিনহা হত্যা মামলার কার্যদিন ছিল না। কিন্তু মামলার বাদি শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌসি কয়েকটি যুক্তি উত্থাপন করে একটি আবেদন করেছেন, কক্সবাজারের এসপিকে সিনহা হত্যা মামলায় আসামী হিসেকে অন্তভুক্তি করার। আবেদন শুনানির পর তা নামঞ্জুর করে একটি অবজারভেশন দিয়েছেন বিজ্ঞ বিচারক তামান্না ফারাহ। তা হলো, মামলা তদন্তকালে কেউ হস্তক্ষেপ কিংবা প্রভাব বিস্তার করলে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার রয়েছে। তাই আবেদনটি আমলে নেওয়া হয়নি।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের কাছে বাহারছড়া চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা। ওই ঘটনায় সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস গত ৫ অগাস্ট কক্সবাজারের হাকিম আদালতে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেখানে বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে ১ নম্বর এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২ নম্বর আসামি করা হয়।

মামলার পর ওসি প্রদীপসহ সাত পুলিশ সদস্য ৬ অগাস্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। অন্য দুই আসামি পলাতক। মামলায় সহযোগী আসামীসহ বর্তমানে কারান্তরিণ রয়েছেন ১৩ জন। মামলাটি র‌্যাব তদন্ত করছে। তারা মামলার ১৩ আসামিকে নানা মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এ পর্যন্ত মামলায় ১২ আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে, অন্যতম অভিযুক্ত ওসি প্রদীপ সর্বোচ্চ ১৫ দিন রিমান্ডে থাকলেও তিনি স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেননি।

অপরদিকে, সিনহা হত্যার ঘটনার পর ২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি কার্যক্রম শুরু করে ৩ আগস্ট। সাত কর্ম দিবস অর্থাৎ ১০ আগস্ট কমিটিকে প্রতিবেদন জমাদানের সময় বেধে দিলেও প্রথমবার কমিটির সময় বাড়ানো হয় ২৩ আগস্ট পর্যন্ত পরে কমিটির আবেদনের প্রেক্ষিতে আবারও সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বক্তব্য গ্রহণ করতে না পারায় কমিটির মেয়াদ সর্বশেষ ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ২ সেপ্টেম্বর কমিটি কক্সবাজার জেলা কারাগারে প্রদীপ কুমার দাশের বক্তব্য গ্রহণ করেন। এরপর কমিটি ১৩ সুপারিশসহ ৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরী করে। সাথে সংযুক্তি দেয়া হচ্ছে ৫৮৬ পৃষ্ঠা। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে সেই প্রতিবেদনে কী আছে তা এখনও খোলাসা করেনি মন্ত্রণালয়। এ প্রতিবেদন দেয়া হলেও এ ঘটনার মুল মামলা চলছে আদালতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here