ঋণের ৭৫৮ কোটি টাকার দায় সরকারের ঘাড়ে

0
89
ঋণের ৭৫৮ কোটি টাকার দায় সরকারের ঘাড়ে

খবর৭১ঃ
হালিমা টেক্সটাইল ১৯৮২ সালের ১৪ ডিসেম্বর ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। শর্ত ছিল আমদানিকৃত পণ্য, আন্তঃমিলের হিসাবে থাকা অর্র্থ এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদিসহ ব্যাংক ঋণ ৩৭ কোটি টাকা দিতে হবে সরকারকে। এজন্য ৯ বছর সময় বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু অদ্যাবধি মিলের মালিক এক টাকাও পরিশোধ করেননি। উল্টো বস্ত্র মিল বিক্রি করে সেখানে আবাসন গড়ে তোলা হয়েছে।

একইভাবে বগুড়া কটন মিল ১৯৮২ সালের ১৪ ডিসেম্বর সরকার ছেড়ে দেয় ব্যক্তি খাতে। শর্ত ছিল পাওনা ৩৬৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে ৯ বছরে। কিন্তু বগুড়া কটন মিলস কোনো টাকা শোধ করেনি। মিলের ৯ একর জমির মধ্যে ৫ একরই বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।

বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তারা ৭৫০ কোটি টাকা ঋণের দায় নিয়ে মোট ১৭টি বস্ত্র মিলের মালিকানা গ্রহণ করেছিলেন। মালিকরা ঋণের এক টাকাও পরিশোধ করেননি। শর্তভঙ্গ করে একাধিক মিল অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। মিল-জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল আবাসিক ভবন। অথচ জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এর মধ্যে হালিমা এবং বগুড়া কটন মিলও ছিল। ১৯৮২ সালে মিলগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়া মিলগুলোর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা আটকে থাকার বিষয়টি নজরে আসে বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের। এজন্য সরকারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে আপত্তি তুলে রিপোর্ট করেছে সংস্থাটি (অডিট বিভাগ)। সেখানে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আদায় না হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কোনো প্রমাণ নথিতে পাওয়া যায়নি। এর দায়দায়িত্ব নির্ধারণসহ অর্থ আদায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক। এ সংক্রান্ত রিপোর্ট বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) কার্যালয় থেকে জমা দেয়া হয় রাষ্ট্রপতির কাছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সীমা সাহা (অডিট) বলেন, অডিট আপত্তি আসার পর নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয়, অডিট বিভাগ ও যাদের বিরুদ্ধে আপত্তি, তাদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করা হয়। সেখানে নিষ্পত্তি না হলে সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। তবে টেক্সটাইল মিল সংক্রান্ত এ বিষয়ে আমার জানা নেই। আইন অনুযায়ী এই অডিট রিপোর্টের ওপর কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে কি না জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ছিল যারা বস্ত্র মিল নিয়ে শর্ত ভঙ্গ করেছে তাদের কাছ থেকে মিলগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়া। আমি ওই নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকটি মিল ফিরিয়ে আনি। এখন নতুন মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির ওপর এই কার্যক্রম নির্ভর করবে। তবে আমি মনে করি, ব্যক্তি খাতে নেয়ার পর কোনো শর্তই পূরণ করেনি উদ্যোক্তারা। তিনি আরও বলেন, আগামী দিনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

সূত্রমতে, এসব বস্ত্র মিলের মধ্যে হাবিবুর রহমান টেক্সটাইলের কাছে পাওনা প্রায় ১৭৭ কোটি, ঈগল স্টার টেক্সটাইলের কাছে ৫২ কোটি, হালিমা টেক্সটাইলের কাছে ৩৭ কোটি, চিটাগাং টেক্সটাইলের কাছে প্রায় ৩০ কোটি এবং কাসেম কটনের কাছে প্রায় ২৩ কোটি টাকা। এছাড়া আফসার কটনের ১৫ কোটি টাকা, ইব্রাহিম কটনের প্রায় ১৪ কোটি, গাউছিয়া টেক্সটাইলের ১২ কোটি, চাঁদ টেক্সটাইলের প্রায় ১২ কোটি, জলিল টেক্সটাইলের প্রায় ৯ কোটি এবং গোয়ালন্দ টেক্সটাইলের ৮ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। আর ময়নামতি টেক্সটাইলের কাছে প্রায় ৩ কোটি টাকা, মাওলা টেক্সটাইলের ৪৬ লাখ, মোটেক্স টেক্সটাইলের ৩৭ লাখ, জেস ব্রাংকেটের ২৮ লাখ এবং আহমেদ টেক্সটাইলের কাছে ৪০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

সরকারের ঘাড়ে চেপে পড়া এসব পাওনা নিয়ে সিএজি রিপোর্টে বলা হয়, সরকার ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল কর্পোরেশন (বিটিএমসি) কর্তৃক দেশীয় মালিকানাধীন ৩৩টি বস্ত্র শিল্প কারখানা সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই সময় শিল্পকারখানার দায়দেনা এবং সরকারের ঋণের অর্থসহ সমুদয় পাওনা পরবর্তী ৬ থেকে ৯ বছরের মধ্যে পরিশোধের শর্ত ছিল। রিপোর্টে আরও বলা হয়, ১৭টি বস্ত্র মিলের কাছে ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিটিএমসির আমদানি, চলতি ও আন্তঃমিল হিসাব এবং সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদিসহ ব্যাংক ঋণ (সুদসহ) ৭৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দাঁড়িয়েছে। তবে আজ (১৩ জুলাই) পর্যন্ত এ হিসাব ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

অডিট রিপোর্টে বলা হয়, এই টাকা আদায়ের জন্য বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে (বস্ত্র) প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটির কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বস্ত্র) কামরুজ্জামান বলেন, আমি নিজেও জানি না এ পদে আমি আছি কি না। কারণ একদিন আগে থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেছি। নথিপত্র না দেখে কোনো মন্তব্য করতে পারব না। জানা গেছে, অডিট রিপোর্টের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনিয়ম ও চুক্তি লঙ্ঘনকারী এসব কারখানা সরকারের অধীনে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর এ বিষয়ে খতিয়ে দেখতে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির দেয়া সুপারিশে বলা হয়, যেসব মিল চালু আছে কেবল ওইসব মিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।

জানতে চাইলে বিটিএমসির সচিব (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ফিরোজ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মিলগুলো শর্ত অনুযায়ী পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পুনরায় সরকারের অধীনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ নিয়ে একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার কাজ চলছে। তবে মিলগুলো পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, প্রথমে মিলগুলো সরকারের অধীনে আনা হবে। এরপর যারা শর্তভঙ্গ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, ১৯৮২ সালে যখন জাতীয়করণকৃত কারখানা ফিরিয়ে দেয়া শুরু হয়, তখন বিপুল পরিমাণ দায়দেনা ছিল। এগুলো শোধ করার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। এর মধ্যে কিছু কারখানায় শুরুতে সরকারের শেয়ার থাকলেও পরে শতভাগ মালিকানাই বেসরকারি খাতে চলে আসে। কিন্তু ১৯৯০ সাল পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে সরকারি মিলগুলোয় হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। এতে বেসরকারি খাতে আসা মিলগুলো লোকসানে পড়ে। একটা পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় কারখানা।

জানা গেছে, ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ হয় বস্ত্র ও পাট খাতের বেশকিছু কারখানা। এরপর ১৯৮২ থেকে শর্তসাপেক্ষে বেসরকারি মালিকানায় ফিরতে শুরু করে সেগুলো। কিন্তু ব্যক্তি খাতে নেয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বস্ত্র শিল্পের মধ্যে শ্যামপুরে গড়ে ওঠা ‘চান্দ টেক্সটাইল’ একটি। বর্তমানে এর কোনো চিহ্ন নেই। মিলের জায়গায় সারি সারি প্লট। বিটিএমসি জানায়, শ্যামপুরে ২১ বিঘা জমির ওপর ছিল এই মিল। ২০০৬ সালে মিলের ১১ দশমিক ৫০ বিঘা জমি বিক্রি করে দেয় মালিকপক্ষ। যদিও মিলটিতে সরকারের শেয়ারের পরিমাণ ২৭ হাজার ৮০টি, যা প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

অপর মিল সাভারের আফসার কটন ৬ দশমিক ১৯ একর জমির অধিকাংশই বিক্রি করে দেয়া হয়। সেখানে তিন থেকে সাততলার বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে এক একর জমির ওপর মিলটি বন্ধ অবস্থায় আছে। আর বগুড়া কটন মিলের নয় একর জমির মধ্যে পাঁচ একর বিক্রি করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। বর্তমানে সেখানে বিভিন্ন প্লটে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বিটিএমসির তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া কটন মিলে সরকারের এখন পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৭০০ শেয়ার আছে, যা মোট শেয়ারের প্রায় ১৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

এছাড়া চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের উত্তর কাট্টলীর ঈগল স্টার টেক্সটাইল মিলের জায়গা ছিল ১৮ দশমিক ১২ একর। পরে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ জমি বিক্রি করে দেয় মিল মালিক। এছাড়া বর্তমান মালিক আরও ৮ একর জমি বিক্রি করেছেন। বাকি জমিতে বর্তমানে কারখানার ভবন ও গোডাউন আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here