সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কারও নাগরিকত্ব কাড়বে না বরং দেবে: অমিত শাহ

0
156
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কারও নাগরিকত্ব কাড়বে না বরং দেবে: অমিত শাহ

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জি শত চেষ্টা করলেও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা সংখ্যালঘু শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া আটকাতে পারবেন না বলে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর অভিমত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য নয় বরং এই আইনে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। রবিবার কলকাতার শহীদ মিনার ময়দানে সিএএ’এর সমর্থনে অনুষ্ঠিত এক জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একথা বলেন।

গত ডিসেম্বরে ভারতের সংসদে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাস হওয়ার পর এই প্রথম কলকাতা সফর করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিআইএম’সহ বিরোধী দলগুলোর দাবি ধর্মের ভিত্তিতে করা এই নতুন নাগরিকত্ব আইন তারা কোনোভাবেই মানবে না। আইন প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে বিরোধীরা। তবে এই আইন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছেন মমতা ব্যনার্জি।

তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন কোনভাবেই এ রাজ্যে তা চালু করা হবে না। এমনকি নতুন এই নাগরিকত্ব আইন এর প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গসহ দিলি­, কর্নাটক, মেঘালয়, আসামসহ গোটা দেশে বিক্ষোভ, প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তাতে একাধিক মানুষের মত্যু হয়েছে। এমন এক পরিপ্রেক্ষিতেই এদিন কলকাতায় এসে সিএএ নিয়ে সাধারণ মানুষের মন থেকে বিভ্রান্তি দূর করতে শহীদ মিনারের মঞ্চকে বেছে নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অমিত শাহ বলেন, ‘এই বাংলায় লাখ লাখ মানুষের কাছে একটা সমস্যা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তা হল শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছিলো না। মমতা ব্যনার্জি যখন বিরোধী দলনেতা ছিলেন তখন উনি নিজেই এই সমস্যা তুলে ধরেছিলেন সংসদে। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরই পাল্টে গেলেন। ভোট ব্যাংকের রাজনীতি শুরু হয়ে গেল। আর যখন নরেন্দ্র মোদি সিএএ নিয়ে আসল তখন কংগ্রেস, সিপিআইএম, মমতা সকলেই তার বিরোধিতা শুরু করে দিল। তারা সকলেই সংখ্যালঘু মুসলিম ভাই-বোনেদের ভয় দেখাতে লাগলো-যে তাদের নাগরিকত্ব চলে যাবে। কিন্তু আমি এই কলকাতা থেকে সব সংখ্যালঘু ভাই-বোনেদের বলতে চাই যে সিএএ’এর ফলে আপনাদের নাগরিকত্ব কখনোই যাবে না। এটা নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন। নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার আইন নয়। কিন্তু বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে যেসব কোটি কোটি হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান ভাই-বোনেরা নির্যাতিত হয়েছেন; ধর্ষিতা হয়েছেন; ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন; প্রাণের ভয়ে ভারতে আসা সেই সব মানুষদের গত ৭০ বছর ধরে নাগরিকত্ব নেই। ওদের কি নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত? মোদিজি সিএএ নিয়ে এসেছেন, কোটি কোটি বাঙালিদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মমতা দিদি এর বিরোধিতা করছে। বাংলার মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়ে দিয়েছে। ট্রেন, রেল স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়েছে। আমি মমতা দিদির কাছে জানতে চাই যে উনি কেন বিরোধিতা করছে? দলিত, মতুয়া ভাই-বোনেদের উনি নিজের মনে করেন না, উনার কাছেই অনুপ্রবেশকারীরাই বেশি আপন। ’
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, ‘আপনার (মমতা) যাই মনে হোক না কেন? ৭০ বছর ধরে যে ভাই-বোনেরা এখানে এসেছেন-আমরা ওদের নাগরিকত্ব দেবো, সম্মান দেবো। মমতা দিদি যতই চেষ্টা করুক না কেন, তিনি কোনভাবেই আমাদের আটকাতে পারবেন না। ’

নাগরিকত্ব পেতে শরণার্থীদের কোন নথি দিতে হবে না বলেও এদিন স্পষ্ট করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আপনাদের কোথাও যেতে হবে না। হিন্দুসহ যত সংখ্যালঘু মানুষ ভারতে এসেছেন-কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তাদের সকলকে নাগরিকত্ব দেবে।

এদিনের সভা থেকে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। বোমা বিস্ফোরণ, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, খুন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস রাজ্যজুড়ে বেড়েই চলেছে। একমাত্র বিজেপিই এই অপশাসন দূর করতে পারে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে সকলকে এক এক করে কারাগারে প্রেরণ করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ’
তাঁর অভিমত, ‘মমতার শাসনে বাংলা সব দিক থেকে পিছিয়ে গেছে। উন্নয়নের নিরিখে বাংলা অনেক পিছিয়ে। রাজ্যের প্রতি পাঁচজনের একজন দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে যাচ্ছে। রাজ্যের শতকরা ৭০ ভাগ কৃষক ঋণগ্রস্ত। মোদিজি কৃষকদের কল্যাণে রুপি পাঠানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু কৃষকদের কাছে তা পৌঁচ্ছাছে না। আজ বাংলার মাথায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার কোটি রুপির ঋণের বোঝা রয়েছে। ’

আগামী একুশে বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানিয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘মমতা দিদির নেতৃত্বে আজ সোনার বাংলা তেরি হচ্ছে না। বিজেপির হাতে বাংলার কামান দিয়ে দিলে পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা সোনার বাংলা তৈরি করে দেবো। ’ আসন্ন বিধানসভার ভোটে এ রাজ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি সরকার গঠন করবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এদিনের সভা থেকে রাজ্যের প্রায় পাঁচ কোটি ভোটারের মধ্যে পৌঁছতে ‘আর নয় অন্যায়’ অভিযান কর্মসূচির শুভ সূচনাও করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলার মানুষের কাছে আর্জি জানাবো তারা যেন এই কর্মসূচির সাথে একাত্ম হয় এবং অপশাসন থেকে সকলকে মুক্তি করে। মানুষ আর অন্যায় সহ্য করবে না। বিজেপি কর্মীরা বাংলার মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব রুখে দেবে। তাঁর দাবি, এই স্লোগানের মধ্যে দিয়েই বাংলায় পরিবর্তন আসবে। কোন রাজপুত এর হাতে বাংলার শাসনভার যাবে না। ’

জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার নিয়ে মোদি সরকারের প্রশংসা করে তিনি বলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘এক দেশ-এক আইন’এর যে স্বপ্ন দেখেছিলেন মোদি সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে চলেছেন। কিন্তু মমতা দিদির মতো কয়েকজন সংসদে এই ধারা বিলোপের বিরোধিতা করেছেন।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হবে বলেও এদিন আশ্বাস দেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, ‘অযোধ্যায় রামের জন্মভূমিতে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য ৫০০ বছর আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আর কিছু দিনের মধ্যে অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি হয়ে যাবে। নরেন্দ্র মোদি ট্রাস্ট তৈরি করে অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরির পথ প্রশস্ত করেছেন। ’

অমিত শাহ ছাড়া এদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, দেবশ্রী চৌধুরী, দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, কেন্দ্রীয় নেতা মুকুল রায়, কৈলাস বিজয়বর্গীয়, রাহুল সিনহা, সাংসদ লকেট চ্যাটার্জি, অর্জুন সিং, সৌমিত্র খাঁ, সুভাষ সরকার প্রমুখ।

শহীদ মিনারে সভার আগে এদিন সকালে রাজারহাটে এনএসজি’এর একটি নতুন ভবনের উদ্বোধন করেন। সেখানে এনএসজি’এর মহড়াতেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। ওই অনুষ্ঠান থেকে নিরাপত্তাবাহিনীর পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণে মোদি সরকার কাজ করবে বলে আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি বাহিনীর প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘নিরাপত্তার দিক থেকে ভারত আজ অনেকটাই শক্তিশালী। ভারতের আগে একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছিল। কিন্তু মোদি সরকারের নেতৃত্বে ভারতও আজ অন্যের সীমানায় গিয়ে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে দিয়ে আসতে সক্ষম। মোদি সরকারের আমলেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও এয়ার স্ট্রাইক হয়েছে। ’

এই ভবনের উদ্বোধন এর পরেই তিনি চলে যান শহীদ মিনারে। সেখানে জনসভা শেষ করে তিনি বিকালে যান কালীঘাট মন্দিরে পূজা দিতে। প্রায় আধা ঘণ্টার মতো সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন কালীঘাট মন্দিরের গর্ভগৃহে।

এদিন সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কলকাতায় পা রাখতেই বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভে সামিল হন বাম, কংগ্রেস কর্মী সমর্থকরা। অমিত শাহকে উদ্দেশ্যে করে কোথাও কালো পতাকা, কালো বেলুন আবার কোথাও গো ব্যাক স্লোগান দেওয়া হয়। কলকাতা বিমানবন্দর ১ নম্বর গেট, পার্ক সার্কাস, কৈখালী, গড়িয়াহাট, শ্যামবাজার, যাদবপুর, সন্তোষপুরে প্রতিবাদ মিছিল করে বাম-কংগ্রেস। ধর্মতলায় পুলিশের ব্যারিকেড ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় বিক্ষোভকারীদের।

এদিকে অমিত শাহের কলকাতায় পৌঁছনোর কয়েক ঘণ্টা আগে সমাজে বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। রবিবার সকালে টুইট করে মমতা লেখেন, ‘আজ @ জাতিসংঘ# জিরো বৈষম্য দিবসে ভারতের বুকে যেভাবে বৈষম্যের রাজনীতি ছড়িয়ে পড়ছে তা দেখে আমি খুব কষ্ট পাই। আসুন আমরা আমাদের সমাজ থেকে সকল ধরনের বর্ণ, ধর্ম, জাতি বিভাজন উপরে দেওয়ার অঙ্গীকার করি। আমরা কখনই কোন প্রকার বৈষম্যের পক্ষে দাঁড়াবো না। ’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here