দুর্নীতির থাবা বাজারে ঃ এলসির পেঁয়াজে ৩শ’ ভাগ মুনাফা

0
31
এলসির পেঁয়াজে ৩শ’ ভাগ মুনাফা

খবর৭১ঃ প্রতি কেজি পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা। অথচ খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। অপচয়, পরিবহন ব্যয় ছাড়াই ব্যবসায়ীদের মুনাফা দাঁড়াচ্ছে কেজিতে সর্বনিম্ন ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ শতাংশ। উচ্চমূল্য নিয়ে এই সিন্ডিকেট দুর্নীতি করছে। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ফলে বাজারে চলছে মূল্যসন্ত্রাস। গত কয়েক মাস ধরে লাফিয়ে লাফিলে দাম বাড়লেও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে সোমবার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পেঁয়াজের পাইকারি বাজারে অভিযান চালিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে গ্রামীণ বাণিজ্যালয় নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে অর্ধলক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৫২ দিনে কথিত সিন্ডিকেট ক্রেতার পকেট থেকে অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে দুই হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে যারা এই বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তের দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, যে কোনো ব্যবসায়ই সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ মুনাফা করা যেতে পারে। এর বেশি মুনাফা করা একেবারেই অনৈতিক। সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজে অনেকে শতভাগ মুনাফা করছেন। এটি একেবারেই বেআইনি কর্মকাণ্ড। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারতের রফতানি বন্ধের সুযোগে প্রতারণা ও জালিয়াতির ব্যবসায় নেমেছে চক্রটি।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভারত থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে আমদানি করা পেঁয়াজ ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে মিয়ানমার থেকে ৩৭ টাকা কেজি টাকা দরে আমদানি করা পেঁয়াজ ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি কেজি পেঁয়াজ বন্দর থেকে খালাস হওয়ার পর খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পরিবহন ও অপচয়সহ সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। এর সঙ্গে শতকরা ১৫ শতাংশ মুনাফা যোগ করলে কেজিপ্রতি মূল্য দাঁড়ায় ৫০-৫১ টাকা। ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজিতে মুনাফা করছেন ৭০ থেকে ১১০ টাকা। অপচয়, পরিবহন ব্যয় ছাড়াই ব্যবসায়ীদের মুনাফা দাঁড়াচ্ছে সর্বনিম্ন ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ শতাংশ।

এ হিসাবে আমদানিকৃত ভারতীয় পেঁয়াজ কেজিপ্রতি খুচরা মূল্য হওয়ার কথা ৫০ থেকে ৫১ টাকা। কিন্তু বাজরের চিত্র হল ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। একইভাবে মিয়ানমারের পেঁয়াজের খুচরা বিক্রি মূল্য হতে পারে সর্বোচ্চ ৫২ থেকে ৫৩ টাকা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১৪০ টাকা। তারা প্রতি কেজিতে মুনাফা করছেন ৫৮ থেকে ৭৭ টাকা। প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত এর রফতানি মূল্য প্রতি টনে ৩৯০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮০০ ডলার নির্ধারণ করে।

এর আগে ভারত থেকে প্রতি টন আমদানি হয়েছে ৩৯০ থেকে ৪২৫ ডলারে। এ হিসাবে ১৪ সেপ্টেম্বরের আগে প্রতি কেজির আমদানি মূল্য পড়েছে গড়ে ৩৫ টাকা। ১৪ সেপ্টেম্বরের পর বাড়তি দামে আমদানির ফলে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৬৬ থেকে ৭০ টাকা। বাড়তি দামে খুব কম পেঁয়াজই আমদানি হচ্ছে। এ ছাড়া গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে এখন আর নতুন করে আমদানির এলসি খোলা যাচ্ছে না।

এখন যেগুলো আসছে সেগুলোর এলসি ৩০ সেপ্টেম্বরের আগেই খোলা হয়েছিল। সূত্র জানায়, এলসি খোলার পর ভারত থেকে পণ্যটি আসতে কমপক্ষে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। গত অক্টোবর পর্যন্ত যেসব পেঁয়াজ এসেছে সেগুলোর বেশির ভাগের এলসিই দাম বাড়ানোর আগে খোলা। টেকনাফ স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। গত এক অক্টোবরে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩০ কেজি আমদানি হয়েছে। যার প্রতি কেজি এলসি মূল্য পড়েছে ৪৩ টাকা ৫২ পয়সা। ৩১ অক্টোবর আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৪২ হাজার ২০০ কেজি। যার প্রতি কেজির এলসি মূল্য ৪৩ টাকা ৫২ পয়সা।

এছাড়া গত এক অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত টেকনাফ স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি হয়েছে দুই লাখ ৪৫ হাজার ৩০০ কেজি। এগুলোর প্রতি কেজিতে গড় মূল্য পড়েছে ৩৭ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ১৩ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৫০ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পেঁয়াজ আমদানির এলসি খোলা হয়েছে।

যার মূল্য ১৭ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি হয়েছে ৯৩ লাখ ৬৪ হাজার কেজি। যার মূল্য ৪২ কোটি ২৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজিতে দাম পড়েছে গড়ে ৪৫ টাকা। সূত্র জানায়, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হয় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। বাকি ৮ থেকে ৯ লাখ টন আমদানি করা হয়। কিন্তু চাহিদার বাইরেও সরবরাহ লাইনে থাকে আরও ৬ থেকে ৭ লাখ টন। ফলে বছরে দরকার হয় ৩০ থেকে ৩১ লাখ টন। উৎপাদনের বাইরে গত অর্থবছরে ১২ লাখ টন আমদানি হয়েছে।

এ হিসাবে দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি থাকার কথা নয়। ভারতে দাম বাড়ানোর আগেই যেসব পেঁয়াজ দেশে এসেছে সেগুলো এখনো রয়ে গেছে। এছাড়া মিয়ানমার থেকে আমদানি হচ্ছে কম দামে। কেননা তারা এর দাম বাড়ায়নি। গত জুলাই আগস্ট পর্যন্ত ভারত থেকে আমদানি হয়েছে গড়ে ২০ থেকে ২২ টাকা কেজি দরে। সেগুলো তখন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। ভারতে পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে এর দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। ওই সময়ে বাজারে থাকা পেঁয়াজ আগেই আমদানি করা হয়েছিল। অর্থাৎ ২০ থেকে ২২ টাকা কেজি দরে সেগুলো আমদানি হয়েছিল সেগুলোই ১২০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদফতরের সূত্র জানায়, কৃষিপণ্যের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ মুনাফা করার সুযোগ রয়েছে। এর বেশি মুনাফা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্দে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। আমদানি মূল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত থেকে ৮০০ ডলার টন দরে পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ ছিল মাত্র ১৫ দিন। ওই সময়ে খুব কম পরিমাণ আমদানি হয়েছে। এগুলোর প্রতি কেজির দাম পড়েছে ৬৬ থেকে ৭০ টাকা। মিয়ানমার ও মিসর থেকে যেসব পেঁয়াজ এখন আসছে সেগুলোর প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৩৭ থেকে ৪৫ টাকা। ফলে এগুলো খুচরা বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত পরিবহন খরচ, অপচয় ও ব্যবসায়ীদের মুনাফাসহ সর্বোচ্চ ৫২ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে।

কেন এভাবে ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে- এ প্রশ্ন ছিল দু’জন ব্যবসায়ীর কাছে। এ প্রশ্নে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. আমানত আলী বলেন, দাম বাড়ানোর জন্য শুধুমাত্র আমদানিকারকরাই দায়ী। তাদের দেয়া রেট অনুযায়ী আমাদের বিক্রি করতে হয়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারে ৪১ নং আড়তের ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত বাজারে যে নৈরাজ্য চলছে, তা সম্পূর্ণ আমদানিকারকদের জন্য। কারণ তারা যে রেটে পেঁয়াজ আনে তার দ্বিগুণ দামে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে। যার প্রভাব পড়ে খুচরা পর্যায়ে।

এ অভিযোগের বিষয়ে আমদানিকারক চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেসার্স বিএইচ ট্রেডিং অ্যান্ড কোম্পানির মালিক মো. বাবুল হাসনাত বলেন, আমরা যে পরিমাণ পণ্য আনি তা গুদামে পৌঁছা পর্যন্ত অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। সেই নষ্ট পেঁয়াজের দাম ধরে আমাদের বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here